ঈশ্বরের সকল সৃষ্টি ও সৃষ্টির উত্তমতা সম্পর্কে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে প্রতিটি মানুষের সম্যক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তার চেয়ে বড়ো কথা হলো যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তাঁর সম্বন্ধে জানা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমস্ত কিছুই সৃষ্টি করা হয়েছে ঈশ্বরের গৌরবার্থে। সব সৃষ্টিই কোনো না কোনোভাবে মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে। সমস্ত সৃষ্টিই অতি উত্তম। যিনি সব উত্তম করে সৃষ্টি করেছেন তিনি নিশ্চয় আরও কতই-না উত্তম!
সৃষ্টির মাধ্যমে ঈশ্বর বিশ্বজগতের পূর্ণতা দিয়েছেন। জগৎ সৃষ্টির পূর্বে সবকিছু ছিল অন্ধকার, ফাঁকা বা শূন্য। শূন্যতার মাঝে ঈশ্বর বিচরণ করতেন। তিনি পরিকল্পনা করলেন তিনি সৃষ্টিকর্ম সম্পাদন করবেন। সে অনুসারে সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর সর্বময় ক্ষমতা প্রকাশ করলেন। তিনি সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর। তিনি বললেন সৃষ্টি হোক, আর সাথে সাথে সৃষ্টি হলো। তিনি ছয় দিনে জগৎ ও মানুষ সৃষ্টি করলেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম করলেন। প্রতিদিনের সৃষ্টির পর ঈশ্বর তাঁর আপন সৃষ্টিকে 'উত্তম' বলে ঘোষণা করেছেন। ষষ্ঠ দিনে সব সৃষ্টির শেষে 'সমস্তই অতি উত্তম' বলে ঘোষণা করেছেন (আদি পুস্তক ১:৩১)। আর সপ্তম দিনে তিনি সৃষ্টিকর্ম থেকে বিরতি নিলেন। প্রতিদিনের সৃষ্টির শেষে তিনি তাঁর সৃষ্টিকে দেখলেন। বিচার-বিশ্লেষণ করলেন। নিজে নিজে মূল্যায়ন করলেন। তিনি দেখলেন তাঁর সৃষ্টি ভালোই হয়েছে। তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি খুশি হয়ে বললেন, ভালো অর্থাৎ 'উত্তম' হয়েছে।
| কাজ: তোমার চারপাশে সৃষ্টির কী কী উত্তম সৃষ্টি হিসেবে দেখ তার একটি তালিকা তৈরি করো। |
ঈশ্বর যা সৃষ্টি করেছেন সবই উত্তম। ঈশ্বর প্রতিদিন তাঁর সেই উত্তমতাকে উপভোগ করেছেন। যা উত্তম নয় তা হলো মানুষের পাপ, মানুষের পতন। পাপ ঈশ্বরের সৃষ্টি নয় বরং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার অপব্যবহার। লোভ ও ভোগবিলাসিতার উদ্দেশ্যে ভূমি, জল, বায়ু ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদকে শোষণ করা যায় না। মানুষের জীবনে এগুলোর প্রয়োজন ও গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতি আমাদের জীবন দেয়, খাদ্য দেয় ও আমাদের রক্ষা করে। এক উত্তম আরেক উত্তমের সেবা করে।
মানুষ সৃষ্টির পর ঈশ্বর বলেছিলেন 'অতি উত্তম' কিংবা 'সমস্তই উত্তম'। তাই তুমিও উত্তম, আমিও উত্তম, সব মানুষই উত্তম। মানুষের এই উত্তমতা প্রকাশ পায় তার আধিপত্যে ও প্রভুত্বে। মানুষের উত্তমতাকে ধরে রাখতে হলে সৃষ্টির উত্তমতাকে রক্ষা করতে হবে।
সৃষ্টির যত্ন ও তার উপর প্রভুত্ব করতে গিয়ে মানুষকে অবশ্যই সর্বপ্রথম তার নিজের উত্তমতা সুদৃঢ় করে রাখতে হবে। নতুবা সে সৃষ্টিকে উত্তমতার পথে পরিচালিত ও যত্ন করতে পারবে না। সৃষ্টিকে যত্ন করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন দাস হবার জন্য নয়। ভোগ বা ধ্বংস করার জন্য নয়। মানুষ সৃষ্টির যত্ন নেবে; সৃষ্টিও মানুষের যত্ন নেওয়ার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট হয়েছে। সেই সেবা পাওয়ার কারণেও মানুষকে সৃষ্ট সমস্ত কিছুর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং যত্ন করা প্রয়োজন।
প্রকৃতি নানাভাবে অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও শোষিত হচ্ছে। ফলে প্রকৃতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বর্তমান শিল্পায়নের যুগে ভূমি, জল, বায়ু ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার রোধ করা প্রয়োজন। এই সম্পদগুলো নিজের ভিতরে থাকার সুযোগ পেলে আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। কেবল ক্ষমতাশালীরাই নয়, দরিদ্র সমাজও যেন উপকৃত হতে পারে সেদিকে দৃষ্টি রাখা দরকার।
সৃষ্টির সম্পদ রক্ষা করতে হলে ভোগবিলাসিতার সামগ্রী উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। মানুষের জীবন এতে আরও সহজ-সরল হবে। ভূমি, জল, বায়ু অত্যধিক দূষিত হওয়ার ফলে সৃষ্টির সম্পদগুলো মাত্রাধিকভাবে অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা হয়ে যাচ্ছে। ভূমি, জল, বায়ু ইত্যাদির নিজস্ব সৌন্দর্য ও পবিত্রতা আছে। মোশীর কাছে ঈশ্বর জ্বলন্ত ঝোপের মধ্য থেকে বলেছিলেন, "তোমার পায়ের জুতা খুলে ফেল, কেননা যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে আছ তা পবিত্র ভূমি” (যাত্রাপুস্তক ৩:৫)। সমগ্র সৃষ্টির ব্যাপারেই ঈশ্বরের এই কথা খাটে। সেই মন নিয়েই ঈশ্বরের সৃষ্টির মাঝে বিচরণ করা প্রয়োজন। সৃষ্টিকে যত্ন নেওয়া ও মানুষকে ভালোবাসা প্রয়োজন। সৃষ্টির পরিচর্যা ও মানবসেবা করার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকে সেবা ও ভালোবাসতে পারি। এতে সৃষ্টির উত্তমতাও রক্ষা পায়।
| কাজ: শ্রেণির সব শিক্ষার্থী বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাগান ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। |