যীশুর জীবনের প্রধান প্রধান রহস্য (পাঠ ১)

মুক্তিদাতা যীশুর জীবন ও কাজ - খ্রীষ্টধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

252

রহস্য বলতে আমরা সাধারণত বুঝি যা সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে উদঘাটন করা যায় না। আমাদের সাধারণ বুদ্ধির অতীত বলে রহস্য বোঝার জন্য গভীর বিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। আমাদের মুক্তিদাতা প্রভু যীশুর জীবন, কাজ, বাণী প্রচার, মৃত্যু ও পুনরুত্থান সবকিছুর মধ্যেই গভীর রহস্য নিহিত রয়েছে। তাঁর মধ্য দিয়ে পিতা ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তাই যীশু বলেন, যে আমাকে দেখেছে সে পিতাকেও দেখেছে। পিতার ইচ্ছা পূর্ণ করতেই আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্ট মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছেন। তাই তাঁর রহস্যের ক্ষুদ্রতম বিষয়টিও আমাদের মাঝে ঈশ্বরের ভালোবাসা প্রকাশ করে।

যীশুর দেহধারণ রহস্য: প্রভু যীশু খ্রীষ্ট তাঁর পিতার সাথে গভীর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু সময়ের পূর্ণতায় পিতা ঈশ্বর তাঁর একমাত্র পুত্রকে দান করলেন মানুষের মুক্তির জন্য। তিনি ঈশ্বর হয়েও ঈশ্বরের সমতুল্যতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাননি। তিনি নিজেকে একেবারে রিক্ত করেছেন। স্বর্গধাম থেকে তিনি মাটির ধরায় নেমে এসেছেন। মারীয়ার মতো একজন সাধারণ কুমারী কন্যাকে ঈশ্বর বেছে নিয়েছেন মুক্তিদাতার মা হবার জন্য। তিনি মারীয়াকে সেভাবেই প্রস্তুত করেছেন। পাপশূন্য করেই তাঁকে সৃষ্টি করেছেন যেন আমাদের ত্রাণকর্তা একটি নিষ্কলঙ্ক গর্ভে জন্ম নিতে পারেন। কুমারী মারীয়া প্রথমে একটু বিব্রত হলেও নিজেকে 'প্রভুর দাসী' বলে ঈশ্বরের ইচ্ছা মেনে নিয়েছেন। মারীয়ার এই 'হ্যাঁ' বলার মধ্য দিয়েই মহান ঈশ্বর পুত্রের রূপ ধরে এই পৃথিবীতে এসেছেন। আকারে-প্রকারে মানুষ হয়ে নিজেকে একেবারে নমিত করেছেন। তাঁর এই দেহধারণের মধ্য দিয়ে তিনি দরিদ্র হয়েছেন, তাঁর দরিদ্রতায় তিনি আমাদেরকে ধনশালী করে তুলেছেন। তিনি দেহধারণ করে মানুষ হয়ে মানুষের সবকিছু নিজের মধ্যে গ্রহণ করে নিলেন। মানুষের জন্য মুক্তির এক সহজ-সরল পথ খুলে দিলেন। আমাদের আদি পিতামাতার পাপের ফলে যে স্বর্গসুখ আমরা হারিয়েছি, পুত্রের দেহ ধারণের মধ্য দিয়ে আমরা তা আবার ফিরে পেয়েছি। তিনি দরিদ্র বেশে এক গোশালায় জন্ম নিয়েছেন। দরিদ্র রাখালেরা ছিলেন তাঁর প্রথম সাক্ষী। তাঁরাই তাঁর জয়গানে মুখর হয়েছিলেন।

যীশুর নিস্তার রহস্য: যীশুর সম্পূর্ণ জীবনটাই পরিত্রাণের রহস্য। তিনি তাঁর প্রচারজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন একেবারে দীন-দরিদ্র, অভাবী, দুঃখী, নিপীড়িত ও বঞ্চিতদের মাঝে। এর কারণ হলো মানুষ যেন মুক্তির স্বাদ পেতে পারে; দুঃখ, শোক, ব্যথাবেদনা ও পাপের বন্ধন থেকে যেন তারা মুক্তি পেতে পারে। তবে আমাদের কাছে তাঁর পরিপূর্ণ মুক্তি আসে কালভেরি পর্বতে ক্রুশের উপর রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। তিনি নির্দোষ ও নিষ্পাপ হয়েও নিজের কাঁধে আমাদের পাপ বহন করেছেন। ক্রুশীয় ঘৃণ্য মৃত্যু মেনে নিয়েছেন। তিনি সমস্ত কিছু সহ্য করেছেন। পিতার একান্ত বাধ্য হয়ে সবকিছু মাথা পেতে নিয়েছেন। তাঁর রক্তমূল্যের বিনিময়ে আমরা মুক্তি লাভ করেছি। আমরা হয়ে উঠেছি স্বাধীন মানুষ।

যীশুর অপ্রকাশ্য জীবনের রহস্য: প্রভু যীশু খ্রীষ্টের দৈনন্দিন জীবন ছিল নিতান্ত সহজ-সরল। ধর্মীয় নিয়ম- নীতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর আস্থা। তিনি পিতামাতার খুবই বাধ্য ছিলেন। তাঁর এই বাধ্যতা পিতা ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। তাঁর মধ্যে যে ঐশ পিতার উপস্থিতি ছিল তা তিনি তাঁর পিতামাতাকে এই কথা বলে জানান, "তোমরা কি জানতে না যে, আমার পিতার গৃহেই আমাকে থাকতে হবে?" তিনি যে পিতার বিশেষ প্রেরণকাজে নিবেদিত তা তিনি স্পষ্টভাবেই প্রকাশ করেছেন।

যীশুর মহিমা লাভের রহস্য: প্রভু যীশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। তিনি সমাহিত হয়েছেন এবং তিনদিন পর পুনরুত্থান করেছেন। প্রভু যীশু খ্রীষ্ট নিজে পুনরুত্থান করে আমাদেরকেও তাঁর পুনরুত্থানের সহভাগী করেছেন। আমাদের মধ্যেও একটা প্রত্যাশার জন্ম নিয়েছে যে, এখানে মৃত্যুই জীবনের শেষ নয়। আমরা একদিন খ্রীষ্টের সাথে পুনরুত্থিত হব। কারণ যীশু নিজেই আমাদের বলেছেন যে, আমিই পুনরুত্থান, আমিই জীবন। যে আমাকে বিশ্বাস করবে সে অনন্ত জীবন লাভ করবে। প্রভু যীশুর পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা প্রত্যেকে তাঁর অনন্ত জীবনের সহভাগী হয়ে উঠেছি। যীশুর মহিমা আমাদেরকেও পরিত্রাণের মহিমায় মহিমান্বিত করে তুলেছে।

সুতরাং, প্রভু যীশুর সমগ্র জীবনই ছিল রহস্যে ভরপুর। তাঁর দেহধারণ থেকে শুরু করে যাতনাভোগের তিক্ত সিকা এবং পুনরুত্থানের শববস্ত্র পর্যন্ত সবকিছুই ছিল যীশুর জীবনের রহস্যগুলোর চিহ্ন। বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে তা উদ্‌ঘাটন করতে হয়।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...