প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দ দুইটি দিকেরই প্রভাব রয়েছে। কখনো কখনো ভালো শক্তিটা প্রবল হয় আবার কখনো কখনো প্রবল হয়ে ওঠে মন্দ শক্তিটা। ঠিক তেমনিভাবে পৃথিবীতে শুভশক্তি ও অপশক্তি-এই দুইটিরই প্রভাব রয়েছে। কখনো কখনো আমরা দেখি শুভশক্তি খুব জোরদার ভূমিকা পালন করছে, আবার কখনো কখনো দেখি অপশক্তিটা যেন সব দখল করে নিয়েছে। মানুষ তার শুভশক্তি বা ভালো শক্তির গুণে পৃথিবী আরও সুন্দর করতে পারে। আবার মানুষই তার অপশক্তি বা মন্দ শক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীটা ধ্বংস করতে পারে। মন্দ শক্তির ধারক ও বাহক হলো শয়তান। এই মন্দ শক্তি পৃথিবীতে আদি থেকেই বিদ্যমান ছিল। যীশু অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে তাকে পরাজিত করেছেন। আজও মানুষের মধ্যে শুভ ও অপশক্তির মধ্যে লড়াই চলছে
| কাজ: বাস্তব জগতে কোথায় কোথায় মন্দ শক্তি সক্রিয় এবং কী কী উপায়ে মন্দ শক্তি থেকে মুক্ত থাকা যায় দলে তার একটা তালিকা তৈরি করো। |
দূত ও অপদূত
প্রভু যীশু খ্রীষ্ট অনেক অপদূত বিতাড়িত করেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে মন্দের ওপর তাঁর জয়লাভের দিকটি প্রকাশিত হয়েছে। বাইবেলে প্রভু যীশু খ্রীষ্ট কর্তৃক অপদূত বিতাড়নের বিষয়ে আলোচনার পূর্বে দূত ও অপদূত সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকা প্রয়োজন। আমরা জানি, দূতদের শুধু আত্মা আছে কিন্তু তাদের শরীর নেই। স্বর্গে চিরকাল ঈশ্বরের আরাধনা ও সেবা করতে ও তাঁর দর্শনসুখ ভোগ করতে ঈশ্বর দেবদূতদের সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র। ঈশ্বর তাঁর প্রয়োজনে তাঁর বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য দূতদের ব্যবহার করেছেন। যেমন যীশুর জন্মসংবাদ দেওয়ার জন্য মহাদূত গাব্রিয়েলকে প্রেরণ করেছেন। যীশুর জন্মের সংবাদ রাখালদের কাছে দেওয়ার জন্য দূতদের পাঠিয়েছেন। যীশুর শূন্য কবরে দূতেরা বসেছিলেন এবং শিষ্যদের কাছে যীশুর পুনরুত্থানের বার্তা শুনিয়েছেন। এছাড়া আমাদের রক্ষা করার জন্যও ঈশ্বর রক্ষীদূতদের নিযুক্ত করেছেন। তাঁরা প্রতিনিয়ত আমাদের বন্ধু ও রক্ষাকর্তা হিসেবে রক্ষা করে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে অপদূতদেরও শুধু আত্মা আছে, তাদের কোনো শরীর নেই। তারাও অনেক শক্তিশালী কিন্তু তাদের শক্তি সীমাহীন নয়। ঈশ্বরের রাজ্যগঠন প্রতিহত করাই অপদূতদের প্রধান কাজ। অপদূতেরা এই জগতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে বটে, কিন্তু ঈশ্বরের শক্তির কাছে তা কিছুই নয়। একজন মানুষ মন্দ আত্মার দ্বারা তাড়িত হয় যখন সে শয়তানের শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়। এই জগতে শয়তানের কাজ বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। এমনও হতে পারে যে একজন লোক নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও শয়তানের হাতিয়ার হয়ে পড়ে।
| কাজ: দূত ও অপদূতদের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য নির্ণয় করো। |
যীশু অপদূত তাড়ান
বাইবেলের বিভিন্ন মঙ্গলসমাচার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট আট বার অপদূতগ্রস্ত লোককে নিরাময় করেছেন। নিম্নে এর তালিকা তুলে ধরা হলো:
১। অপদূতে পাওয়া অন্ধ ও বোবা লোকটি (মথি ১২: ২২-২৮; মার্ক ৩:২২-২৭; লুক ১১:১৪-২৩)
২। অপদূতে পাওয়া কানানীয় স্ত্রীলোকের মেয়েটি (মথি ১৫: ২১-২৮; মার্ক ৭:২৪-৩০)
৩। অপদূতে পাওয়া বোবা লোকটি (মথি ৯:৩২-৩৩; লুক ১১:১৪-১৫)
৪। অপদূতে পাওয়া মৃগীরোগী ছেলেটি (১৭:১৪-২০; মার্ক ১৪-২৯; লুক ৯:৩৭-৪৩)।
৫। অপদূতে পাওয়া গেরাসেনীয় লোকটি (মথি ৮:২৮-৩৪; মার্ক ৫:১-২০; লুক ৮:২৬-৩৯)।
৬। কাফার্নাউম/কফরনাহুম সমাজগৃহে অপদূতে পাওয়া একজন লোক (মথি ৭:২৮-২৯; মার্ক ১:২৩-২৮; লুক ৪:৩১-৩৭)।
৭। মান্দালার মারীয়া (মার্ক ১৬:৯; যোহন ২০: ১১-১৮)।
৮। অপদূতে পাওয়া নুয়ে পড়া স্ত্রীলোকটি (লুক ১৩:১০-১৭)।
| কাজ: যীশু অপদূতগ্রস্ত লোকদের সুস্থ করার ঘটনাগুলোর মধ্য থেকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে অভিনয় করে দেখাবে। |
ঐশ আত্মার শক্তিতেই শয়তানের শক্তি নাশ
উপরে উল্লিখিত তালিকার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট অনেক অপদূতগ্রস্ত লোককে সুস্থ করেছেন। একবার প্রভু যীশুর কাছে অপদূতে পাওয়া একটি লোককে আনা হলো। লোকটি বোবা ও অন্ধ ছিল। যীশু লোকটিকে সুস্থ করে তুললেন। লোকটি যে সঙ্গে সঙ্গে কথা বলার ও দেখার শক্তি ফিরে পেয়েছে তা দেখে উপস্থিত সকলে খুবই আশ্চর্য হয়ে গেল। তারা সকলে যীশুর জয়ধ্বনি করতে লাগল। কিন্তু ফরিসিরা তাতে খুশি না- হয়ে বলতে লাগল যীশু নাকি অপদূতরাজ বেয়েলজেবুলের শক্তিতে অপদূত তাড়িয়ে বেড়ান। যীশু তাদের মনোভাব জানতেন। তাই তিনি তাদের যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, বিবাদে বিভক্ত রাজ্য খুব তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। ঠিক তেমনি শয়তান নিজে যদি শয়তানকে তাড়িয়ে বেড়ায় তাহলে শয়তানেরা নিজেদের মধ্যে নিজেরাই বিবাদে বিভক্ত হয়ে যায়। তাহলে সে রাজ্য বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। তিনি ফরিসিদের আরও জিজ্ঞেস করেন, তাদের শিষ্যরা যখন অপদূত তাড়ায় তখন কার শক্তিতে তা করে? সেটা নিশ্চয় শয়তানের শক্তিতে নয়! তারা সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। তাই প্রভু যীশুও ফরিসিদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। আমরা জানি, প্রভু যীশু স্বয়ং পরমাত্মার শক্তিতে অপদূত তাড়ান এবং এর মধ্য দিয়ে যে মানুষের মাঝে ঐশরাজ্যের প্রকাশ করে চলছেন তারই ইঙ্গিত তিনি তাদের দান করেন।
কাজেই দেখা যায়, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট সমস্ত মন্দতার ওপর তাঁর আধিপত্য বিস্তার করেছেন স্বয়ং পরমপিতার কাছ থেকে পাওয়া শক্তির মধ্য দিয়ে। তিনি মন্দতাকে নির্মূল করতে এ জগতে আসেননি বরং এসেছেন যেন মানুষ মন্দতার দাসে পরিণত না-হয়। মানুষ যেন মন্দতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে পরিত্রাণ বা মুক্তির স্বাদ লাভকরতে পারে এ জগতে ঐশরাজ্য প্রসারিত করার কাজ চালিয়ে যেতে পারে। প্রভু যীশুর মধ্য দিয়েই আমরা ঐশরাজ্যের সন্ধান পেয়েছি।