ঈশ্বর আমাদের দশটি বিশেষ আজ্ঞা দিয়েছেন যেন আমরা এই পৃথিবীতে তাঁর পথে চলতে পারি ও পবিত্র জীবন যাপন করতে পারি। পূর্বে আমরা আজ্ঞাগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছি। পবিত্র জীবন যাপন করার ও পাপ থেকে বিরত থেকে সুপথে চলার জন্য এই আজ্ঞাগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এগুলো পালনে ব্যর্থ হলে আমরা পাপ করে থাকি। অর্থাৎ আজ্ঞাগুলোর মধ্যে যে নিষেধাজ্ঞাগুলো রয়েছে তার মধ্যে পাপ সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া আছে। দশ আজ্ঞার বিরুদ্ধে আমরা যেভাবে পাপ করে থাকি সেগুলো হলো:
১। ঈশ্বর ব্যতীত অন্য দেবতার পূজা করে বা অন্য কিছুতে আসক্ত হওয়া।
২। ঈশ্বরের পবিত্র নামের অবমাননা করে। অকারণে ঈশ্বরের নাম নিয়ে।
৩। বিশ্রামবার পালন না-করে ও প্রভুর প্রশংসা না- করে।
৪। পিতামাতা ও গুরুজনকে সম্মান না-করে।
৫। নরহত্যা করে।
৬। ব্যভিচার করে বা অবৈধ সম্পর্ক রেখে।
৭। চুরি করে।
৮। মিথ্যা কথা বলে বা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে।
৯। অন্যের জিনিসে লোভ করে।
১০। অন্যের স্বামী বা স্ত্রীতে লোভ করে।
| কাজ: তুমি কীভাবে দশ আজ্ঞার বিরুদ্ধে পাপ না- করে চলতে পার তা চিন্তা করে লিখ। |
পাপ-প্রবণতা
পাপ থেকে পাপের জন্ম হয় বা পাপ-প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বারবার একই পাপকাজ রিপুর জন্ম দেয়। সাতটি বিশেষ পাপ স্বভাবকে বলা হয় সপ্তরিপু। সপ্তরিপুর নামগুলো হলো: অহংকার, লোভ, ঈর্ষা, ক্রোধ, কামুকতা, পেটুকতা ও আলস্য। এগুলো পাপের প্রধান কারণ বা এগুলো অন্যান্য আরও পাপ বা কুপ্রবৃত্তির জন্ম দেয়। নিচে এই সাতটি রিপু বা পাপ-প্রবণতার ব্যাখ্যা করা হলো:
১। অহংকার: নিজেকে অন্যের চেয়ে বড়ো ভাবা বা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা; নিজেকে বা আমিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া।
অহংকারের কারণে মানুষ ঈশ্বর ও মানুষকে সম্মান করা থেকে বিরত থাকে। আমরা জানি, স্বর্গদূতদের পতন হয়েছিল কারণ তাঁরা নিজেদেরকে বড় মনে করেছিল আর ঈশ্বরের বিরোধিতা করেছিল। আমাদের আদি পিতামাতাও ঈশ্বরের সমান হতে চেয়েছিলেন বলে তাঁরা অবাধ্য হয়েছিলেন ও পাপ করেছিলেন। বর্তমানকালেও আমরা দেখি এমন অনেক মানুষ আছে যাদের অনেক ধনসম্পদ বা টাকাপয়সা আছে বলে তারা অন্যদের খুব হেয় মনে করে। অনেকে তাদের অনেক বুদ্ধি বা বিশেষ গুণ আছে বলেও তারা নিজেদের খুব বড় মনে করে, আর খুব অহংকারী হয়ে ওঠে। এভাবে আমরাও অনেক সময় অহংকার করে পাপ করি।
২। লোভ: যা আমার নয় বা পাবার সম্ভাবনাও নেই তা নিজের করে পাবার বাসনা বা আকাঙ্ক্ষা। লোভের বশবর্তী হয়েও মানুষ পাপ করে থাকে। যে জিনিস আমার নিজের নয় তা আমি নিজের করে পেতে চাইলে আমি লোভ করে পাপ করি। যেমন, ক্লাসে এক বন্ধু অনেক সুন্দর একটি কলম স্কুলে নিয়ে এলো, সেটি দেখে আমি হয়তো মনে মনে বলছি, এই কলমটি আমার চাই। এভাবে অন্যের জিনিসের প্রতি আমরা লোভকরে পাপ করি।
৩। ঈর্ষা: অন্যের ভালো বা সুখ সহ্য করতে না- পারা বা তার জন্য মনে মনে কষ্ট পাওয়া। ঈর্ষা হলো অন্যের ভালো সহ্য করতে না পারা বা অন্যের ভালোর জন্য মন খারাপ করা। অনেকবার আমাদের এরকম হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্লাসে যে মেয়েটি বা ছেলেটি প্রথম হয় বা শিক্ষক হয়ত বা কোনো এক শিক্ষার্থীর প্রতি একটু বেশি মনোযোগদেন। আমি তা সহ্য করতে পারি না। মনে মনে আমার খুব রাগ হয়। তার বিরুদ্ধে নানারকম কথাও বলি। ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে আমরা একে অন্যের ক্ষতি করতে পারি। ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে ফরিসিরা যীশুকে ক্রুশ দিয়ে মেরেছিল।
৪। ক্রোধ: কোনো বিষয়ে রেগে যাওয়া। ক্রোধ বা রাগ হলো কোনো বিষয়ে নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারা। শুধু তাই নয়, রেগে গিয়ে ক্ষতিকর কিছু করে ফেলা। আমরা বলতে শুনি রেগে গেলে মানুষ বন্য পশুর মতো হিংস্র হয়ে যায়।

নিজেরাও লক্ষ করি, রেগে গিয়ে আমরা পরিবেশ নষ্ট করি, খারাপ কথা বলে ফেলি, জিনিসপত্র ভেঙে ফেলি, অন্যকে আঘাত করি। কখনো কখনো রেগে গিয়ে এক মানুষ অন্য মানুষকে মেরেও ফেলে। কিন্তু রাগ করে ক্ষতিকর কিছু করে তার পরে মানুষ নিজের অপরাধ বুঝতে পারে ও অনুতপ্ত হয়।
৫। কামুকতা: ঈশ্বর আমাদের যৌনবাসনা দিয়েছেন গঠনমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য। যখন এই বাসনার অপব্যবহার করি তখন এটি পাপ। অনিয়ন্ত্রিত যৌনবাসনাকে বলা হয় কামুকতা। মানুষকে ভোগের জন্য কামনা, বিরক্ত করা, কটূক্তি করা, লালসার দৃষ্টিতে তাকানো, কুনভাবে তাকানো ইত্যাদি হলো কামুকতার কিছু উদাহরণ। আজকাল আমরা প্রায়ই দেখি ও শুনে থাকি কত রকম যৌন অনাচার ঘটছে। শিশু, যুবতী-কেউ নিরাপত্তা পাচ্ছে না। যৌনপ্রবৃত্তি মানুষকে পশুতে পরিণত করে। যারা সংযমী নয় তারা নানাভাবে পাপ করে থাকে।
৬। পেটুকতা: খাবারের প্রতি অতিরিক্ত লোভ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেতে চাওয়া ও খাওয়া, বার বার খেতে চাওয়া বা দুইচোখে যা দেখে তাই খেতে চাওয়া ও খাওয়া। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খাদ্য দরকার। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার খাওয়া পাপ। পেটুকতার কারণে মানুষের নানারকম অসুখবিসুখও হতে পারে।
৭। আলস্য: আধ্যাত্মিক চর্চা ও কাজের প্রতি অনীহা। আধ্যাত্মিক অনুশীলনে অবহেলা করা এবং কাজ না-করে শরীর বাঁচিয়ে চলা। অকর্মণ্য অবস্থায় সময় নষ্ট করা। ঈশ্বর আমাদের দেহ, মন ও আত্মা দিয়েছেন। আমরা যেন আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও কায়িক পরিশ্রম করে সুন্দর জীবন যাপন করতে পারি। কিন্তু কিছু মানুষ পরিশ্রম করতে প্রস্তুত নয়। তারা খুব অলস ও আরামপ্রিয়। অলসতা করেও আমরা পাপ করি।
Read more