খ্রীষ্টের সঙ্গে মারীয়ার সম্পর্ক কোনোক্রমেই বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কারণ মারীয়া প্রকৃত অর্থেই ঈশ্বর ও মুক্তিদাতার মা। আমরাও তাঁকে এভাবে স্বীকৃতি দেই ও সম্মান করি। যে কারণে খ্রীষ্ট ও মারীয়ার সম্পর্ক বিছিন্ন করা যায় না, ঠিক সেই কারণেই খ্রীষ্টমন্ডলীর সঙ্গে মারীয়ার বন্ধনও বিচ্ছিন্ন করা যায় না। মানবজাতির পরিত্রাণকাজে পুত্রের সঙ্গে মাতার একাত্মতা ছিল। এই একাত্মতা কুমারীর গর্ভে যীশুর আগমন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে।
১। অনুগৃহীতা: প্রভুর আগমনবার্তা ঘোষণার সময় মহাদূত গাব্রিয়েল তাঁকে 'অনুগৃহীতা' বলে সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন। এই বিশেষ সময় মারীয়া যেন তাঁর বিশ্বাসের গুণে ঈশ্বরের আহ্বানে সাড়া দিতে পারেন তার জন্য 'অনুগ্রহে পূর্ণ' হওয়া খুব দরকার ছিল। মারীয়া আশিসধন্যা হয়েছেন ও তাঁর পবিত্রতা এসেছে সম্পূর্ণরূপে খ্রীষ্টের কাছ থেকে। "খ্রীষ্টের পুণ্য ফলে তিনি এক মহত্তর উপায়ে পরিত্রাণ লাভ করেছেন ।
২। বাধ্যতা: স্বর্গদূত মারীয়াকে বলেছিলেন যে পবিত্র আত্মার শক্তিতে তিনি একটি পুত্রের জন্ম দেবেন। বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে অসম্ভব মনে হলেও মারীয়া বিশ্বাসপূর্ণ বাধ্যতা সহকারে তাতে সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চিত জানতেন যে "ঈশ্বরের অসাধ্য কিছুই নেই।" বাধ্যতা ও নম্রতার কারণেই তিনি বলতে পেরেছিলেন যে, "আমি প্রভুর দাসী; আপনি যা বলেছেন, আমার প্রতি তা-ই ঘটুক।" এই সম্মতিদানের মধ্য দিয়েই তিনি ঈশ্বরপুত্রের মা হয়েছিলেন। মানুষের পরিত্রাণের জন্য ঐশ ইচ্ছাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছেন। নিজ পুত্রের নিকট এবং তাঁর কাজে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করেছেন। হবার অবাধ্যতার ফলে মানুষ পাপে কলুষিত হয়েছিল। কিন্তু মারীয়ার বিশ্বাস ও বাধ্যতার কারণে মানুষ পাপমুক্ত হয়েছে। হবার অবাধ্যতায় পৃথিবীতে এসেছিল মৃত্যু। কিন্তু মারীয়ার বাধ্যতায় পৃথিবীতে এসেছে জীবন। তিনি হয়ে উঠেছেন জীবিতদের মাতা। স্বয়ং যীশুর সাথে যুক্ত থেকেই তিনি বাধ্যতার এই ঐশগুণ লাভ করেছেন।
৩। মারীয়া যীশুকে জগতে এনেছেন: যীশুর জন্য মারীয়া পুরো জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন। মারীয়া যীশুকে গর্ভে ধারণ করলেন ও পৃথিবীর জন্য একজন ত্রাণকর্তাকে উপহার দিলেন। ছোট্ট যীশুকে তিনি বড়ো করে তুললেন, শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে সুবুদ্ধি দান করলেন। মারীয়ার জীবনের সব আনন্দ-বেদনা যীশুকে ঘিরেই। যীশুর জন্য মারীয়া সাতটি শোক পেয়েছিলেন। এই সাতটি শোক ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মারীয়া যীশুর জন্য অনেক কষ্ট পেয়েছেন। তবে এই দুঃখ-শোকের মধ্য দিয়ে মারীয়ার মাতৃত্বের রূপটি আরও সুন্দর ও অর্থপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মা হিসেবেই মারীয়া সবসময় মণ্ডলীর জন্য প্রার্থনা করেন। এভাবে খ্রীষ্ট ও তাঁর মন্ডলীর সাথে মারীয়ার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
৪। মারীয়ার ঐশ মাতৃত্ব: পবিত্র বাইবেলে মারীয়াকে 'যীশুর মাতা' বলে অভিহিত করা হয়েছে। পবিত্র আত্মার অনুপ্রেরণায় এলিজাবেথ তাঁর পুত্রের জন্মের আগেই মারীয়াকে 'আমার প্রভুর মা' বলে সম্বোধন করেছেন। মারীয়ার এই ঐশ মাতৃত্বকে মণ্ডলীও স্বীকার করে নিয়েছে: মারীয়া ঈশ্বরজননী। তিনি পরমেশ্বরের পুত্র, যিনি মানুষ হয়েছেন এবং যিনি নিজেই ঈশ্বর- তাঁর জননী হয়েছেন মারীয়া। মা ও পুত্রের চিরকালীন ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বন্ধনে যীশু ও মারীয়া আবদ্ধ।
৫। ক্রুশের তলায় মারীয়া: মারীয়ার সাথে খ্রীষ্ট ও মণ্ডলীর একাত্মতা সবচেয়ে গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে যীশুর যন্ত্রণাভোগের সময়। যীশু শত্রুদের হাতে সমর্পিত হলেন।

তাঁর বিচার হলো এবং তাঁকে ক্রুশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। এতে মারীয়া ভীষণভাবে আঘাত পেলেন। যীশুর কাঁধে অতি ভারী ক্রুশ চাপিয়ে দেওয়া হলো। তিনি ক্রুশ কাঁধে চললেন কালভেরির পথে। মারীয়াও তাঁর সাথে চললেন। পথে তাঁর প্রিয় পুত্রের সাথে দেখা হলো। যীশু কালভেরিতে পৌঁছলে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হলো। মৃত্যুর পূর্বে যীশু তিন ঘণ্টা ক্রুশীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। এই যন্ত্রণাকালে প্রায় সব শিষ্যেরা ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু যীশুর মা মারীয়া সাহস করে ক্রুশের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন। মা হিসেবে সন্তানের এই মৃত্যুযন্ত্রণাকালে তাঁর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ী।
এভাবে মারীয়া তাঁর বিশ্বাসের তীর্থযাত্রায় এগিয়ে গিয়েছেন। ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত পুত্রের সাথে বিশ্বস্ততায় অটল ছিলেন। ঐশ পরিকল্পনা অনুসারে তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রের চরম যন্ত্রণার সময় পাশে ছিলেন। তিনি তাঁর মাতৃহৃদয়ে পুত্রের যাতনার এ গভীরতা অনুভব করেছেন। মুক্তির কাজে এগিয়ে যেতে ভালোবাসাপূর্ণ সম্মতি দিয়েছেন। যীশুও মৃত্যুর পূর্বে তাঁর মাকে প্রিয় শিষ্যের মা হিসেবে দান করেছিলেন। ক্রুশের তলায় মারীয়ার মাতৃত্বের এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে। ক্রুশের তলায় মারীয়ার মাতৃত্বের তিনটি বিশেষ দিক আমরা লক্ষ করি। সেগুলো হলো: সাধারণ নারী ও মানুষ হিসেবে তাঁর মানবিক মাতৃত্ব, ঈশ্বরপুত্রের জননী হিসেবে তাঁর ঐশ মাতৃত্ব এবং বিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাঁর আধ্যাত্মিক মাতৃত্ব। আমরা উপলব্ধি করতে পারি, মারীয়ার মাতৃত্বের এক চরম প্রকাশ এই ক্রুশের তলায় দাঁড়িয়ে থাকার সময়। যীশু নিজেও মারীয়ার কাছ থেকে শক্তি ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন এই চরম যন্ত্রণা ভোগ করার জন্য।
যোহনের কাছে নিজের মাকে তুলে দিয়ে মারীয়াকে তিনি বিশ্বের সকল মানুষ ও মানবজাতির মা করে দিয়েছেন। আর যোহনকে মারীয়ার পুত্র হিসেবে দান করে সমগ্র মানবজাতিকে দিয়েছেন সন্তানের অধিকার। যীশুর মৃত্যুর পূর্বে ক্রুশের তলায় মা মারীয়ার উপস্থিতিতে মানবজাতির ইতিহাসের এই অসাধারণ ঘটনাটি ঘটেছিল। আজ পর্যন্ত মারীয়া আমাদের সবার দুঃখবেদনার সময় একইভাবে আমাদের পাশে দাঁড়ান। আমাদের আশা দেন, শক্তি ও সাহস জোগান জীবনের পথে এগিয়ে যাবার জন্য। কঠিন কাজ সম্পন্ন করার ও সকল বাঁধা অতিক্রম করার জন্য উৎসাহিত করেন।
| কাজ: তোমার জীবনের একটি ঘটনা সহভাগিতা কর, যখন তুমি মা মারীয়ার অনুপ্রেরণাদায়ী উপস্থিতি অনুভব করেছ। |
৬। প্রার্থনার মাধ্যমে মারীয়া খ্রীষ্ট ও মন্ডলীর সাথে সংযুক্ত: মারীয়া তাঁর পুত্রের স্বর্গারোহণের পর প্রেরিতশিষ্যদের
সাথে ছিলেন। তিনি তাঁদের সাথে একাত্ম হয়ে প্রার্থনায় রত ছিলেন। এভাবে তিনি খ্রীষ্টমণ্ডলীর ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করেছেন। সকলের সাথে প্রার্থনায় রত থেকে তিনি পবিত্র আত্মার অবতরণের অপেক্ষায় ছিলেন। পবিত্র আত্মার প্রভাবেই মারীয়া গর্ভবতী হয়েছিলেন এবং সব সময় মারীয়াকে ঘিরে ছিলেন।
৭। মারীয়ার কুমারীত্ব: মা মারীয়া ঈশ্বরপুত্রের জননী। কিন্তু খ্রীষ্টমণ্ডলী প্রথম থেকেই একথা স্বীকার করেছে যে যীশু একমাত্র পবিত্র আত্মার শক্তিতেই কুমারী মারীয়ার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন। পবিত্র বাইবেলের বিবরণ অনুযায়ী কুমারীর গর্ভে যীশুর জন্ম এক ঐশ্বরিক কাজ। এ বিষয়টি মানুষের পক্ষে পুরোপুরি বুঝে ওঠা কঠিন। স্বপ্নে দূত যোসেফকে দেখা দিয়ে বলেছিলেন যে, "মারীয়ার গর্ভে যা জন্মেছে তা পবিত্র আত্মার প্রভাবেই হয়েছে।" তাছাড়াও খ্রীষ্টমণ্ডলী মারীয়ার কুমারীত্বের ঐশ প্রতিশ্রুতির পূর্ণতা দেখতে পেয়েছে। এ সম্পর্কে প্রবক্তা ইসাইয়ার গ্রন্থে লেখা ছিল: "দেখ, যুবতীটি গর্ভবতী হয়ে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করবে।" মারীয়ার ঈশ্বরপুত্রকে জন্মদান একটি রহস্যাবৃত সত্য। তাই মণ্ডলীর উপাসনায় মারীয়াকে সগর্বে 'চিরকুমারী' বলে ঘোষণা করা হয়।
৮। ঐশ পরিকল্পনায় মারীয়ার কুমারী মাতৃত্ব: ঈশ্বর তাঁর মুক্তি পরিকল্পনায় চেয়েছিলেন যে তাঁর পুত্র এক কুমারীর গর্ভে জন্ম নেবেন। সমগ্র মানবজাতির পক্ষে মারীয়া সেই মুক্তিদায়ী কাজকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর কুমারীত্ব হলো তাঁর বিশ্বাসের চিহ্ন। তাঁর বিশ্বাসই তাঁকে তাঁর ত্রাণকর্তার জননী হতে সাহায্য করেছে। "খ্রীষ্টের রক্তমাংসের দেহকে গর্ভে ধারণ করার জন্য মারীয়া ধন্যা ঠিকই, কিন্তু তিনি আরও অধিক ধন্যা, কেননা তিনি বিশ্বাসে খ্রীষ্টকে আলিঙ্গন করেছেন।" মারীয়া তাঁর মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছেন খ্রীষ্টমন্ডলীর প্রতীক। খ্রীষ্টের সাথে তাঁর সম্পর্ক হয়ে উঠেছে আরও দৃঢ়।
| কাজ: যীশুর সাথে মারীয়ার সম্পর্ক তুমি ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে দেখ সেই অনুভূতি ছোটো দলে সহভাগিতা করো। |