আগে আমরা মথি, মার্ক, লুক ও যোহন লিখিত মঙ্গলসমাচারে প্রভু যীশুর আশ্চর্য কাজগুলোর কথা জেনেছি। আমরা খ্রীষ্টের আশ্চর্য কাজের একটি তালিকা দেখতে পেয়েছি। এ আশ্চর্য কাজগুলোর মধ্য দিয়ে যীশু খ্রীষ্ট তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা প্রকাশ করেছেন। এ শক্তি বা ক্ষমতা মন্দতা বা অপশক্তির বিরুদ্ধে। মন্দতার বিরুদ্ধে তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি একটি নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এই নতুন রাজ্যই হলো ঐশরাজ্য।
ঐশরাজ্য কী
আমরা রাজ্য বলতে এমন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে বুঝে থাকি যেখানে শাসনকর্তা ও প্রজা আছে। কিন্তু ঐশরাজ্য জাগতিক কোনো রাজ্যের মতো নয়। এটি হলো ঈশ্বরের রাজ্য যেখানে কোনো পাপ বা মন্দতা নেই; বরং আছে ন্যায্যতা, শান্তি, ভালোবাসা, ক্ষমা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি গুণগুলো। যেখানেই বা যে -কোনো ব্যক্তির মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়, সেখানেই ঐশরাজ্য বিরাজমান অর্থাৎ ঈশ্বর বিরাজমান। কাজেই বলা যায়, যেখানে ঈশ্বরের কর্মগুলো সাধিত হয় ও যাঁরা ঈশ্বরের ইচ্ছামতো চলে তাঁদের মধ্যে ঐশরাজ্য বিরাজমান। এটি বাইবেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এটি পবিত্র বাইবেলের পুরাতন ও নতুন-উভয় নিয়মেই পাওয়া যায়। পুরাতন নিয়মে ঐশরাজ্যের আগমনের কথা ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে এবং তা ঈশ্বরপুত্র যীশু খ্রীষ্টের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা লাভ করেছে। প্রভু যীশুর এই প্রকাশ তাঁর জীবন, তাঁর কথা ও তাঁর আশ্চর্য কাজ দ্বারা সাধিত হয়েছে। এই রাজ্য শুধু খ্রীষ্টানদের কাছে নয় বরং সমগ্র মানবজাতির কাছে ঘোষণা করা হয়েছে। এই জগতে খ্রীষ্টমণ্ডলী হলো ঐশরাজ্যের বীজ বা সূচনা। মন্ডলী সব সময় পরিপক্বতার দিকে এগিয়ে চলেছে যার মধ্য দিয়ে ঐশরাজ্যের পরিপূর্ণতা আসবে।
| কাজ: পার্থিব রাজ্য ও ঐশরাজ্যের বৈশিষ্ট্যগুলো পাশাপাশি দুটি কলামে লিখ। |
ঐশরাজ্যে প্রবেশের জন্য প্রভু যীশুর আহ্বান
প্রভু যীশু তাঁর প্রচারজীবন শুরু করেন ঐশরাজ্যে প্রবেশের আহ্বান জানিয়ে। দীক্ষাগুরু যোহন কারাগারে বন্দি হওয়ার পর তিনি তাঁর সুসমাচার এই বলে ঘোষণা করেন, সময় পূর্ণ হয়েছে, ঐশরাজ্য এখন খুব কাছে এসে গেছে। তোমরা মন পরিবর্তন কর ও সুসমাচারে বিশ্বাস কর। প্রভু যীশু জগতে এসেছেন তাঁর পিতার ইচ্ছা পালন করে এই জগতে ঐশরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁর পিতার ইচ্ছাই হচ্ছে, মানুষকে জীবন দান করা, যাতে মানুষ তাঁর ঐশ জীবন সহভাগিতা করতে পারে। এই কারণে তিনি তাঁর চারপাশের মানুষকে সমবেত করেন। তিনি তাঁর বাণীর দ্বারা, ঐশরাজ্যের প্রতীক স্বরূপ বিভিন্ন চিহ্ন ও তাঁর শিষ্যদের প্রেরণ করার মধ্য দিয়ে মানুষকে তাঁর চারপাশে সমবেত হতে আহ্বান করেন। সর্বোপরি প্রভু যীশু তাঁর ক্রুশ মৃত্যুবরণ ও পুনরুত্থানের মাধ্যমে ঐশরাজ্যের প্রকাশকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যান।
প্রভু যীশু তাঁর ঐশরাজ্যে সবাইকে আহ্বান করেন। যদিও ঐশরাজ্যের কথা প্রথমে ঈশ্বরের প্রিয় জাতি ইস্রায়েল সন্তানদের কাছে ঘোষণা করা হয়েছে, তথাপি তা সকল জাতির, সকল মানুষের জন্য। সবাই এই ঐশরাজ্যের নাগরিক হতে আহূত।
যদিও ঐশরাজ্য সবার জন্য তথাপি এই রাজ্যে প্রবেশের বা এর নাগরিক হওয়ার অগ্রাধিকার পাবে দরিদ্র ও বিনম্ররা। যীশু নিজেই বলেছেন যারা অন্তরে দীন, ধন্য তারা কারণ স্বর্গরাজ্য তাদেরই। তাঁরা তাঁর বাণী বিনম্র অন্তরে শোনে, গ্রহণ করে ও সে অনুসারে জীবনযাপন করে। ঐশরাজ্যের মর্মসত্য জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানদের কাছে গোপন রাখা হয়েছে কিন্তু প্রকাশ করা হয়েছে নিতান্ত দীনতম ও ক্ষুদ্রতমদের কাছে। প্রভু যীশু তাঁর পার্থিব জীবনে দীনদরিদ্রদের পক্ষ সমর্থন করেছেন, তাদের সাথে থেকেছেন, তাদের ভালোবেসে তাদের সমব্যথী হয়েছেন। সেই কারণে তিনি ঐশরাজ্যে প্রবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে ভালোবাসাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।
তথাপি ঐশরাজ্যের নাগরিক হওয়ার জন্য যীশু ঐশরাজ্যকে একটি ভোজসভার সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর এই ভোজসভায় তিনি পাপীদের নিমন্ত্রণ করেন। কারণ তিনি তো ধার্মিকদের জন্য এই জগতে আসেননি, এসেছেন পাপীদের আহ্বান করতে। মন পরিবর্তন হলো ঐশরাজ্যে প্রবেশের পথ। তাই একজন পাপীর মন পরির্বতনে ঐশরাজ্যে কতই-না আনন্দ হয়!
ঐশরাজ্যের প্রতীকসমূহ
ঐশরাজ্যের রহস্য খুবই গভীর। এই কারণে যীশু খ্রীষ্ট ঐশরাজ্যের রহস্যকে বিভিন্ন প্রতীক, চিহ্ন ও উপমার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। যেমন,
ক) যীশু ঐশরাজ্যকে সর্ষে বীজের সাথে তুলনা করেছেন। যীশুর অঞ্চলের সর্ষে গাছ অনেক বড়ো। বীজ হিসেবে তা খুবই ছোট। কিন্তু যখন চারা গজায় ও পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হয় তখন কিন্তু অন্য সব গাছ সে ছাড়িয়ে যায়। পাখিরাও এসে তাতে বাসা বাঁধতে পারে।
খ) ঐশরাজ্যকে যীশু খামিরের সাথেও তুলনা করেছেন। খামির ততক্ষণ পর্যন্ত মাখাতে হয় যতক্ষণ-না তা গেজে ওঠে।

গ) যীশু ঐশরাজ্যকে আবার লুকিয়ে রাখা কোনো জমিতে গুপ্তধনের সাথে তুলনা করেছেন। কোনো লোক তা খুঁজে পেয়ে মনের আনন্দে গিয়ে তার যা-কিছু রয়েছে তা বিক্রি করে সেই জমিটা কিনে ফেলে।
যীশু তাঁর বিভিন্ন উপমার মধ্য দিয়ে সবাইকে ঐশরাজ্যে প্রবেশের আমন্ত্রণ ও নিমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। তবে তা গ্রহণ করার জন্য প্রকৃত সিদ্ধান্ত আমাদের। ঐশরাজ্য লাভ করতে হলে আমাদের কিছু ছাড়তে হবে এবং তার বাণী অনুসারে জীবনযাপন করতে হবে।
| কাজ: শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা কীভাবে ঐশরাজ্যের নাগরিক হতে পারি? দলে আলোচনা করো। |