ফাদার ইয়াং পৃথিবীর ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ) মতো একটি দরিদ্র দেশে কাজ করতে এসেছেন। তিনি ময়মনসিংহ এলাকায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মানুষকে দরিদ্রতার হাত থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি বহু চিন্তাভাবনা করেছেন ও নানাবিধ পন্থা অবলম্বন করেছেন। অবশেষে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, সমবায় ঋণদান সমিতির দ্বারাই এই জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব। তিনি মানুষকে নগদ টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না। এধরনের কাজ তিনি পছন্দও করতেন না। এর চাইতে বরং মানুষকে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সহায়তা করাকেই সবচেয়ে উপকারী সাহায্য বলে গণ্য করতেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল: প্রত্যয়, স্থির লক্ষ্য, কঠোর শ্রম-সাধনা এবং বলিষ্ঠ অন্তর্দৃষ্টি থাকলে যে-কোনো মানুষের পক্ষে দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। তাই তিনি এবিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করার চিন্তাভাবনা করছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে কো-অপারেটিভ কাজে বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন। এই বিষয়ে নিজের মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় জন্ম নেওয়ার পর তিনি আর্চবিশপ লরেন্স গ্রেনার সিএসসি-র কাছে গেলেন। তাঁকে তিনি বোঝালেন যে, এতদিন তাঁরা ধর্মপল্লিতে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে জনগণকে সংগঠিত করার কাজে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, দলীয়ভাবে জনগণের মধ্যে গতিশীলতা আনতে হবে, তাদেরকে সংঘবদ্ধ করতে হবে। এভাবে বর্তমান সমাজের গুরুতর সমস্যাবলির আবর্ত থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য দরকার বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা।
এই লক্ষ্যে ফাদার ইয়াং-এর বিপুল উৎসাহ দেখে আর্চবিশপ লরেন্স গ্রেনার ফাদার ইয়াংকে কানাডায় অবস্থিত নোভা স্কটিয়া-র অ্যান্টিগোনিশ-এ সমবায় ঋণদান সমিতির ওপর পড়াশুনা করার জন্য পাঠালেন। ১৯৫৩ ও ১৯৫৪- এই দুই বছর পড়াশুনা শেষ করে তিনি দেশে ফিরলেন। এরপর তিনি বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) সমবায় ঋণদান সমিতি স্থাপনের উদ্যোগ নিলেন।
সমবায় ঋণদান সমিতি
সমবায় ঋণদান সমিতি বা ক্রেডিট ইউনিয়ন সম্পর্কে স্পষ্ট একটি ধারণা থাকা দরকার। ক্রেডিট ইউনিয়নকে বলা যেতে পারে সহৃদয়তা বা পরদুঃখকাতরতার সাথে টাকা জমা করা ও নিম্নতম পরিমাণ সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদান করার একটা প্রক্রিয়া। আবার এটাকে বিবেকহীন সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায়ও বলা যেতে পারে। কেউ কেউ আবার এটাকে বলতে পারে একটি অধিকতর ভালো ও পরিপক্বতর সমাজজীবনের ভিত্তি। ফাদার ইয়াং-এর মতে, ক্রেডিট ইউনিয়ন হচ্ছে আদি খ্রীষ্টমণ্ডলীর ভক্তদের মনোভাব অনুসারে অধিকতর কল্যাণকর ও অধিকতর সম্পদশালী সমাজজীবন গঠনের ভিত্তিস্বরূপ। তিনি বলতেন, সমাজ গঠন করার অর্থ স্থানীয় মন্ডলী গড়ে তোলা। এটি স্থানীয় মণ্ডলীকে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করবে ও ধর্মপল্লীগুলোকে পরিচালনার ব্যয়ভার বহনে আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে।
প্রথম খ্রীষ্টান ক্রেডিট ইউনিয়নের জন্ম
কানাডায় প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দে ঢাকায় ফিরে এসে ফাদার ইয়াং আর্চবিশপ হাউসে থাকতে শুরু করেন। এখান থেকে তিনি এক মিশন থেকে অন্য মিশনে যাতায়াত করে ভক্ত জনগণ ও যাজকদের প্রশিক্ষণ দিতে লাগলেন। এর মধ্যে দেশে আবার নানারকম দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যা, খরা, ঝড়বাদল ইত্যাদি একটার পর একটা লেগেই রইল। এত কিছুর পরেও ফাদার ইয়াং নিরুৎসাহিত হননি। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে চলল। নেতৃবৃন্দের সাথে বেশ কয়েকটি প্রস্তুতিমূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে, সকলেরই টাকার প্রয়োজন এবং পরের কাছে হাত না-বাড়িয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। পরে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে স্থাপিত হলো প্রথম ক্রেডিট ইউনিয়ন। বর্নার্ড ম্যাককার্থি ছিলেন এর প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং প্রথম সেক্রেটারি ছিলেন যোনাস রোজারিও। সমবায় ঋণদান সমিতির নাম দেওয়া হয় খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড। মন্ত্রবাণী হিসেবে তাঁরা গ্রহণ করলেন ফাদার ইয়াং-এর একটি কথা: "দয়ার কাজের জন্য নয়, লাভের জন্যও নয়, বরং সেবার জন্য।”

ক্রেডিট ইউনিয়নকে তাঁরা রেজিস্ট্রিকৃত করেন। রেজিস্ট্রি নম্বর ছিল ৪২। শুরুতে সদস্যসংখ্যা ছিল ৬০ জন এবং বছরের শেষান্তে গিয়ে এর সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ১১০। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল:
ক) সদস্যদের মধ্যে মিতব্যয়িতার মনোভাব জন্মান;
খ) সদস্যদের মধ্যে উৎপাদনশীল ও দূরদর্শী (প্রভিডেন্ট) উদ্দেশ্যে ঋণ দেওয়ার জন্য তহবিল গঠন;
গ) সদস্যদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীল ও পারস্পরিক উপকার সাধনের মনোভাব বপন এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন।
প্রথম ক্রেডিট ইউনিয়নটি খুব ধীর গতিতে বৃদ্ধি পেতে লাগল। ১৯৫৯ খ্রীষ্টাব্দে এর সদস্যসংখ্যা ছিল ২৩৭জন। ইউনিয়নের দশম বার্ষিকীতে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭৬জনে। শহরের বেশিরভাগ জনগণেরই মূল বাসস্থান কোনো না কোনো গ্রামে। ছুটিতে তারা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ক্রেডিট ইউনিয়ন ও এর কৃতকার্যতার কথা বর্ণনা করতেন। এর ফলে প্রতিটি মিশনেই ক্রেডিট ইউনিয়ন দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
নিধন ডি' রোজারিও সমবায় খবর-এর তৃতীয় সংখ্যায় লিখেছিলেন যে, কেরানি, গৃহিণী, বাবুর্চি, নার্স ও শিক্ষার্থী ক্রেডিট ইউনিয়ন কো-অপারেটিভে যোগ দিয়ে অনেকভাবে উপকৃত হচ্ছে। তাঁরা এর যথাযথ পরিচালনার ওপর বিশ্বাস ও আস্থার শিকড় গাড়তে সক্ষম হয়েছে।
ফাদার ইয়াং-এর দূরদর্শী চিন্তার আরেকটি যুগান্তকারী ফসল হলো 'দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ।' এটাকে সংক্ষেপে বলা হয় কাল্ব। এটি ক্রেডিট ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংগঠন এবং এর গঠনকাল হলো ১৯৭৯ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি। বর্তমানে এর কর্মপরিধি সারা বাংলাদেশের সকল ধর্মীয় সম্প্রদায় ও বিভিন্ন পেশাজীবীদের মাঝে।
Read more