
এ অধ্যায় পড়া শেষ করলে আমরা-
- চারু ও কারুকলা কী তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- ছবি আঁকার সূচনালগ্নের কথা বর্ণনা করতে পারব।
- কারুশিল্পের সূচনায় আদিম মানুষের ভূমিকা বর্ণনা করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

শিশুরা ছবি আঁকে, বড়রাও ছবি আঁকে- এই ছবি আঁকাই হলো চারুকলার প্রধান বিষয় এবং পরিচয়। এছাড়াও উপরের শ্রেণিতে তোমরা চারুকলার পরিচয় সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবে। ছবি আঁকা হয় কাগজে, কাপড়ে বা ক্যানভাসে, মাটির ফলকে, সিমেন্টের ফলকে, দেয়ালে, কাঠের পাটাতনে- এমনি বিভিন্ন বস্তুর ওপর। এক সময়ে তালপাতায় বা গাছের বড় পাতায় লেখা হতো এবং সেই সঙ্গে ছবিও আঁকা হতো। জাদুঘরে গেলে তোমরা পুরোনো দিনে যত রকম বস্তু বা সামগ্রীর ওপর ছবি আঁকা হতো তা দেখতে পাবে।
এখন ছবি আঁকার জন্য নানা ধরনের কাগজ তৈরি হচ্ছে, ক্যানভাস তৈরি হচ্ছে, ধাতব প্লেট বা জমিন তৈরি করা হচ্ছে। মাটির ফলক এখন অনেক উন্নত হয়েছে। অনেকদিন থেকে কাচের ওপর রং দিয়ে যেমন আঁকা হচ্ছে, অন্যদিকে ধারালো ছুরি বা সুচালো পাথর দিয়ে আঁচড় কেটে ছবি ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। কাগজে, ক্যানভাসে, মাটিতে, পাথরে, ধাতুর পাতে ও কাচের ওপর ছবি ফুটিয়ে তোলার জন্য রয়েছে নানারকম উপায়, পদ্ধতি। রঙের কথা তোমরা জান। ছবি আঁকার জন্য এখন অনেক রকম রং ব্যবহার করা হয়। পানিতে মিশিয়ে যে রং তৈরি করা হয় তার নাম জলরং। মোম মেশানো এক রকম রঙের কাঠি তৈরি হয়েছে, তার নাম প্যাস্টেল রং। রঙের সাথে তেল ও তারপিন মিশিয়ে বড় বড় শিল্পীরা ক্যানভাসে বা কাঠের পাটাতনে যে ছবি আঁকেন, তার নাম তৈলরং বা তেলরং।
বর্তমানে ছবি আঁকার জন্য অ্যাক্রেলিক রং নামে এক ধরনের রঙে খুব তাড়াতাড়ি ছবি আঁকা যায়। এই রং পানি ও তেল মিশিয়ে দুরকমভাবেই করা যায়। বাংলাদেশের শিল্পীদের কাছে অ্যাক্রেলিক রং এখন বেশ প্রিয়। এই অ্যাক্রেলিক রঙে ছোটরাও ছবি আঁকতে পারে। তবে যথেষ্ট তাড়াতাড়ি আঁকতে হয় বলে ছোটদের জন্য একটু কঠিন। ছোটদের জন্য জলরং, পোস্টার রং, মোম প্যাস্টেল- এসব রংই ভালো।
ছবি আঁকার জন্য ও ছবি ফুটিয়ে তোলার জন্য রয়েছে নানারকম পেনসিল, কলম, কালি, ছুরি, কাঁচি, হাতুড়ি, বাটাল ইত্যাদি। আরও রয়েছে নানা ধরনের তুলি। চারুকলা চর্চা করতে করতে বা ছবি আঁকতে আঁকতে এসব বিষয়ের সঙ্গে তোমাদের পরিচয় ঘটবে।
আঁকা ছবি কী, কেমন করে হয়, ইতোমধ্যে তোমরা জানতে পেরেছ। তোমাদের মতো শিশুরা কীভাবে ছবি আঁকে তার পরিচয় নিজে আঁকতে গেলেই বুঝতে আরও সহজ হবে। ছোটদের ছবি আঁকার এখন অনেক প্রতিযোগিতা হচ্ছে, সেসব ছবির প্রদর্শনীও হচ্ছে। বাংলাদেশের শিশুদের ছবি বিশ্বের অনেক দেশেই নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে প্রতিযোগিতার জন্য। তোমাদের মতো অনেক শিশুই সেসব দেশ থেকে পুরস্কার পেয়ে বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে।
আমাদের দেশের বড় বড় শিল্পীদের প্রদর্শনী হচ্ছে বিভিন্ন গ্যালারি, শিল্পকলা একাডেমিতে, জাদুঘরে ও বিভিন্ন স্থানে। সেসব প্রদর্শনী তোমরা নিশ্চয়ই কিছু কিছু দেখেছ। না দেখে থাকলে গিয়ে দেখে আসবে। এছাড়াও আমাদের জাতীয় জাদুঘরে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সব শিল্পকলা বা চারুকলার সব সময়ের জন্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে গেলেই চারুকলার সঙ্গে তোমাদের চমৎকার পরিচয় ঘটবে।
| কাজ: পাঁচ-ছয়জনের দল গঠন করে প্রতি দল নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে চারুকলার পরিচয় সম্পর্কে ৫-৬টি লাইন লেখো। |
বিভিন্নরকম নকশায় যেসব আসবাবপত্র তৈরি হয় সবই কারুশিল্প। বাঁশ, বেত দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের বেতের চমৎকার সব কারুশিল্প দেশে ও বিদেশে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছে। আমাদের দেশের অনেক শৌখিন পরিবারে, নামকরা হোটেল-রেস্তোরাঁয়, সরকারি- বেসরকারি অফিস ও অতিথিশালায় বেতের তৈরি কারুশিল্পমণ্ডিত আসবাবপত্র সমাদর পাচ্ছে। জাদুঘরে গেলে কারুকলা বিষয়ের সঙ্গেও তোমাদের পরিচয় ঘটবে। ঘর- বাড়ির বড় বড় দরজার ওপর রয়েছে কাঠ খোদাই করে নানারকম ছবি, নকশা, ফুল, পাতা, পাখি, জীবজন্তু। বড় বড় খাট, পালঙ্ক ও বিছানায় দেখতে পাবে অনেক ধরনের কারুকাজ ও নকশা।
আমাদের সামাজিক জীবনযাপনে ও পারিবারিক জীবনযাপনে ব্যবহৃত বহু বস্তুসামগ্রী রয়েছে, যা কারুশিল্প। গ্রামীণ জীবনে দা, কুড়াল, লাঙল, কাস্তে, বাখারি, মাটির হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদি সবই কারুশিল্প। কারুশিল্পের পাশাপাশি রয়েছে সাধারণ মানুষদেরই তৈরি অন্যান্য শিল্প, যা লোকশিল্প হিসেবে পরিচিত। সোনা-রুপার তৈরি নানারকম অলংকার, নকশিকাঁথা, মাটির পুতুল, চিত্রিত কাঠের পুতুল, (হাতি, ঘোড়া, মানুষ ইত্যাদি) আমাদের লোকশিল্পের নিদর্শন।
নববর্ষ, ঈদ, পূজা, বৌদ্ধপূর্ণিমা বা বড়দিন উপলক্ষ্যে শহরে ও গ্রামে মেলা বসে। মেলা উপলক্ষ্যে কারুশিল্প ও লোকশিল্পের সমারোহ দেখা যায়। গান-বাজনার জন্য যেসব বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়, যেমন- একতারা, দোতরা, তবলা, বায়া, সারেঙ্গী, সেতার, ডুগডুগি, নানারকম বাঁশি, ঢোল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র কারুশিল্প। তবে এসব বাদ্যযন্ত্রের গায়ে যেসব নকশা ও ছবি আঁকা হয়, সেগুলো আবার লোকশিল্প। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কাঁসা ও পেতলের হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করা হলো কারুশিল্প।
পাটি তৈরির জন্য মূর্তা নামে একপ্রকার বিশেষ গাছ থেকে সরু সরু নরম ফিতা বের করে, বেশ পরিশ্রম করে শীতলপাটি তৈরি করা হয়। এসব পাটিতে নানারকম জীবজন্তু, ঘর-বাড়ি, ফুল ও গাছের নকশা বুননের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। সুন্দর সুন্দর বাণী ও কথা ফুটিয়ে তোলা হয়। এই পাটি কারুশিল্প ও লোকশিল্পের মিশ্রিত রূপ। এ ধরনের আরও অনেক শিল্পবস্তু রয়েছে। যেমন- শখের হাঁড়ি, পোড়ামাটির টেপা পুতুল ও অন্যান্য পুতুল, লক্ষ্মীসরা- এগুলো লোকশিল্প।
পাট দিয়ে গ্রামের মেয়েরা অনেককাল আগেই শিকা তৈরি করত। শিকাতে পাট দিয়ে নানারকম বেণিসহ অনেক কারুকাজ থাকে। আজকাল পাটের আঁশ দিয়ে অনেক রকম কারুকাজ করা শিল্পকর্ম তৈরি হচ্ছে এবং মানুষ আনন্দের সঙ্গে সেগুলো ব্যবহার করছে। যেমন- ছোট-বড় ও শৌখিন জিনিসপত্র বিভিন্ন ব্যাগ, টেবিলম্যাট, মেঝেতে বিছানোর জন্য নানারকম ম্যাট, জুতা, স্যান্ডেল, ফাইল, বাক্স ইত্যাদি।
| কাজ: আমাদের সামাজিক জীবনে ও পারিবারিক জীবনে ব্যবহৃত হয় এরকম ১০টি কারুশিল্পের নাম লেখো। |
নতুন শিখলাম: মূর্তা।
মানুষের আঁকা প্রথম ছবি
আদিম মানুষরাও ছবি আঁকত। আর তাদের আঁকা ছবি দেখেই আজ আমরা জানতে পেরেছি তাদের জীবন ধারনের কথা। ঘর-বাড়ি তাদের ছিল না। বানাতেও জানত না। থাকত তারা গুহায়। চাষবাস, ফসল ফলানে-এসব কিছুই জানত না। পশু শিকার করে, মাংস খেয়ে জীবন বাঁচাত। যে গুহায় বাস করত তারা দল বেঁধে, সে গুহার এবড়োখেবড়ো দেয়ালেই তারা ছবি এঁকেছে। অনেকগুলো গুহা ফ্রান্সে ও স্পেনে আবিষ্কৃত হয়েছে।
ঘর সাজাবার জন্য তারা ছবি আঁকত না। কারণ ঘরই বানাতে শেখেনি, ছবি টাঙাবে কী! তবে কেন আঁকত জান? ছবি আঁকা আদিম মানুষের কাছে ছিল একটা জাদু বিশ্বাসের মতো। জীবজন্তু শিকার করাই ছিল তাদের একমাত্র কাজ। তাই যেসব পশু তারা শিকার করত, তার ছবিই এঁকেছে। আবার পশুর গায়ে তীর, বর্শা, এসবও এঁকে দিয়েছে। এর অর্থ হলো, শিকার করার হাতিয়ার দিয়ে পশুটিকে শিকার করা হলো। শিকারে বের হবার আগে এসব ছবি এঁকে শিকারে বের হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, শিকারে আজ সফল হবই। সে যুগের বেশিরভাগ জীবজন্তু ছিল বাইসন, ম্যামথ ইত্যাদি।
তোমাদের নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করে, কী দিয়ে আদিম মানুষরা ছবি আঁকত? তুলি দিয়ে? রং পেত কোথায়? হ্যাঁ, আমাদের মতো তারা এত সুন্দর তুলি বানাতে জানত না। পশুর শক্ত হাড় সুচালো করে তা দিয়ে আঁচড় কেটে রেখা টানত। জীবজন্তুর পশম একসঙ্গে বেঁধে তুলি বানাত, আর রং তৈরি করত নানা রঙের মাটির সঙ্গে চর্বি মিশিয়ে। আর অবাক কাণ্ড-হাজার হাজার বছর পরও এসব ছবির রং, রেখা এখনো খুব সুন্দর ও অক্ষত রয়েছে।
আদিম মানুষ পশু শিকারের জন্য পাথরের তৈরি বিভিন্ন হাতিয়ার ব্যবহার করত। একপর্যায়ে এসব হাতিয়ারের গায়ে আঁচড় কেটে তারা নানারকম ছবি ফুটিয়ে তুলত। এমনকি তারা মাছের মেরুদন্ডের কাঁটা, হাড়ের টুকরো ইত্যাদি দিয়ে গলার হার (মালা) তৈরি করত। সেখান থেকেই কারুশিল্পের শুরু। এভাবে আদিম মানবগোষ্ঠী চারু ও কারুশিল্পের সূচনা করেছিল।

| কাজ: আদিম মানবগোষ্ঠীই চারু ও কারুশিল্পের সূচনা করেছিল-কথাটির ব্যাখ্যা লেখো। |
নতুন শিখলাম: বাইসন, ম্যামথ।
আদিম মানুষের পর কয়েক হাজার বছর কেটে গেছে। পৃথিবীর কত উত্থান-পতন হয়েছে। কত জাতি, কত সভ্যতা এসেছে, আবার বিলীনও হয়ে গেছে। সব সভ্যতার কথা আমরা না জানলেও অনেক সভ্যতার কথা আমরা জানি। আর এই জানার উৎস হচ্ছে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, কারুশিল্প। তাদের বই-পুস্তক হয়তো বিলীন হয়ে গিয়েছে, ভাষা জানার কোনো উপায় নেই। কিন্তু ধ্বংসাবশেষে যেসব চিত্র, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় তা থেকেই পণ্ডিতরা বের করতে পারেন সে যুগের মানুষের চাল-চলন, সমাজ-সংস্কৃতি ও সভ্যতার ইতিহাস।
উদাহরণস্বরূপ: অ্যাশিরিও সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতা, মায়া সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা প্রভৃতি।
কারণ, চিত্রকলা বা শিল্পকলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ভাষা বা পৃথিবীর ভাষা অর্থাৎ এক দেশের বা এক যুগের চিত্রকলা বা শিল্পকলা অন্য দেশের লোকের কয়েক যুগ পরেও বুঝতে কষ্ট হয় না। মনে করো, আফ্রিকার জিম্বাবুয়ের একটি ছেলে তোমাকে একটি ছবি এঁকে পাঠাল। ছবিটি পেয়ে তোমার খুব ভালো লাগল এবং তুমি খুবই আনন্দিত। কারণ ছবিটি বুঝতে তোমার কষ্ট হয়নি। কিন্তু সেই ছেলেটি তার ভাষায় তোমার অনেক প্রশংসা করে বা গুণগান গেয়ে তোমাকে চিঠি লিখল। তুমি তার এক বর্ণ বুঝলে না কারণ তুমি জিম্বাবুয়ের ভাষা জানো না। কিন্তু একই ছেলের আঁকা ছবি বুঝতে তোমার কোনো কষ্টই হয়নি।
| কাজ: পাঁচ-ছয়জনের দল গঠন করে প্রতি দল নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আদিম মানুষের ছবি আঁকার কারণ সম্পর্কে ১০টি বাক্য লেখো। |
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন
শুদ্ধ উত্তরের নিচে দাগ দাও।
১। আদিম মানুষ কোথায় ছবি এঁকেছে?
ক. কাগজে
খ. গুহার গায়ে
গ. দালানের দেয়ালে
ঘ. বাকলে
২। আদিম মানুষের ছবি আঁকার বিষয় কী ছিল?
ক. নদী-নালা
খ. ঘর-বাড়ি
গ. জীব-জন্তু
ঘ. পাহাড়-পর্বত
৩। আদিম মানুষ কেন ছবি আঁকত?
ক. প্রদর্শনী করার জন্য
খ. ছবি বিক্রি করার জন্য
গ. জাদু বিশ্বাসের জন্য
ঘ. পশু শিকারে সফল হবে বলে
৪। বাংলাদেশের বিখ্যাত লোকশিল্প কোনটি?
ক. নকশিকাঁথা
খ. কাঁসার থালা
গ. তাঁতের শাড়ি
ঘ. তৈলচিত্র।
৫। মাটি দিয়ে হাঁড়ি, পাতিল বানায় কারা?
ক. কুমার
খ. তাঁতি
গ. কামার
ঘ. ছুতার
৬। জায়নামাজে কী ধরনের নকশা থাকে?
ক. মসজিদ ও মিনারের ছবি
খ. মানুষ ও হাট-বাজারের দৃশ্য
গ. শহর ও গ্রামের দৃশ্য
ঘ. পশু ও পাখির ছবি
সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
১। চারু ও কারুকলা বলতে কী বোঝায়?
২। শিল্পকলার সূচনালগ্ন সম্পর্কে লেখো।
৩। চিত্রকলা ও শিল্পকলাকে আন্তর্জাতিক ভাষা বলা হয় কেন?
৪। গুহাচিত্র সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।
Read more