
সোনারগাঁ লোকশিল্প ও কারুশিল্প জাদুঘর ১৯৭৫ সালের ১২ই মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠা করেন
এ অধ্যায় পড়া শেষ করলে আমরা-
- লোকশিল্প কী তা উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করতে পারব।
- কারুশিল্প কী তা উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করতে পারব।
- বাংলাদেশের লোকশিল্পের বর্ণনা করতে পারব।
- বাংলাদেশের কারুশিল্প সম্পর্কে উদাহরণসহ ব্যাখ্যা দিতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

আদিম মানুষদের ছবি আঁকার কথা আমরা জানি। আদিম গুহাবাসী মানুষদের সবাই যে ছবি আঁকতে পারত তা কিন্তু নয়। তবে কেউ কেউ বেশ ভালো আঁকত। তাদের দিয়েই ছবিগুলো আঁকানো হতো। পরে তারা মাটি দিয়ে পাত্র, পুতুল, মূর্তি ইত্যাদি বানাতেও শিখেছিল। তাদের এই ছবি, পাত্র বা মূর্তি তৈরি হতো সহজ- সরলভাবে। যেমন- আদিম মানুষদের কেউ কেউ ভালো ছবি আঁকত বা মূর্তি গড়তে পারত, লোকশিল্পীরাও তেমনি। প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামে-গঞ্জে কিছু লোক ভালো ছবি আঁকতে বা পুতুল বানাতে পারত। যে সহজ রীতিতে তারা ছবি আঁকত বা পুতুল বানাত তা শিখে নিয়েছিল তাদের সন্তানেরা। তাদের পরিবারের ছেলেমেয়েরা আবার বাবা-কাকাদের কাছে বসে শিখেছে কীভাবে আঁকতে বা গড়তে হয়। এভাবে একই রীতিনীতিতে হাজার হাজার বছর ধরে লোকশিল্প তৈরি হয়ে আসছে। এ শিল্প সাধারণ মানুষের মনে আনন্দ জোগায়। তাই বলা হয়, 'লোকশিল্প সাধারণ লোকের জন্য সাধারণ লোকের সৃষ্টি।' পৃথিবীর সবখানেই লোকশিল্পের উপকরণ সাধারণ। উপকরণ অর্থ যা দিয়ে কোনো কিছু তৈরি করা হয়। যেমন- মাটি, কাঠ, কাপড়, সুতা, ধাতব দ্রব্য, পাতা, বাঁশ, বেত প্রভৃতি দিয়ে সব দেশেই কিছু কিছু অভিন্ন লোকশিল্প তৈরি হয়। সেগুলো হচ্ছে পোশাক, আসবাব, লোক অলংকার, লোক বাদ্যযন্ত্র, সূচিকর্ম, পুতুল, বাসন-কোসন ইত্যাদি।

কাজ:
| ১. চার-পাঁচজনের দল তৈরি করে 'লোকশিল্প সাধারণ লোকের জন্য সাধারণ লোকের সৃষ্টি'- এ কথাটির ব্যাখ্যা করো। প্রতি দল থেকে একজন শ্রেণিতে পড়ে শোনাও। ২. লোকশিল্পের সাথে আদিমশিল্পের মিল খুঁজে বের করো। |
নতুন শিখলাম: লোকশিল্প, লোকশিল্পী, উপকরণ।
আমাদের বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে মেলা বসে। শহরেও আজকাল এমন মেলার আয়োজন হয়। তোমরা নিশ্চয়ই কখনো না কখনো এমন মেলায় গিয়েছ। যেমন- বাংলা নববর্ষে বৈশাখী মেলা কিংবা পৌষ সংক্রান্তির মেলা। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন উৎসব যেমন- ঈদ, পূজা, মহররম, রথযাত্রা ইত্যাদি উপলক্ষ্যেও মেলার আয়োজন করা হয়। এসব মেলাতে অন্যান্য সামগ্রীর সাথে আকর্ষণীয় উজ্জ্বল রঙের এর বিভিন্ন পুতুল, পাট, বাঁশ, বেত ও কাঠের তৈরি বিভিন্ন আসবাব ও খেলনা, মাটির তৈরি বিভিন্ন পাত্র ইত্যাদি কিনতে পাওয়া যায়। খেলনাগুলো তৈরি হয় কাঠ অথবা মাটি দিয়ে। মাটি টিপে টিপে নানারকম হাতি, ঘোড়া, মানুষ ও পুতুল বানানো হয়। কাঠের ছোট-বড় হাতি, ঘোড়া ও মানুষের পুতুলও তৈরি করা হয়। তারপর এই মাটি ও কাঠের তৈরি খেলনা ও পুতুলগুলোকে উজ্জ্বল লাল, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজ, কালো ইত্যাদি নানা রঙে খুবই আকর্ষণীয় করে রং করা হয়।

হাতি, ঘোড়া কাঠের পাটাতনের উপর বসিয়ে নিচে চারটি চাকা লাগিয়ে দেয়া হয়, যাতে এগুলো খেলনা হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এছাড়াও পাট দিয়ে বিভিন্ন রকম শিকা, ফ্লোরম্যাট, টেবিলম্যাট ইত্যাদি তৈরি করে রং করা হয়। বাংলার গ্রামের মেয়েরা তাদের অবসর সময়ে খুব যত্ন করে রঙিন সুতার সেলাই দিয়ে মনোরম নকশা বা বিভিন্ন ছবির মাধ্যমে এক ধরনের কাঁথা তৈরি করে। যার নাম নকশিকাঁথা। তাদের জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প মিশে থাকে সেসব ছবিতে। এসব পুতুল, পাত্র, খেলনা ও নকশিকাঁথা বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য লোকশিল্প। এছাড়াও শখের হাঁড়ি, লক্ষ্মীসরা, পটচিত্র, পুথিচিত্র, পিঁড়িচিত্র, দেয়ালচিত্র, নকশি পাখা, নকশি পিঠা, পোড়ামাটির ফলকচিত্র- এগুলো সবই বাংলাদেশের লোকশিল্প নামে পরিচিত।
বিভিন্ন ব্রত, অনুষ্ঠানে ও পূজায় ঘরে এবং উঠানে আলপনা আঁকা বাংলাদেশের এক অতি প্রাচীন রীতি। এটিও বাংলার লোকশিল্প। এখন বিয়ে, গায়ে হলুদ, একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে বা রাস্তায় যে আলপনা আঁকা হয় তা সেই প্রাচীন লোকরীতিরই ধারাবাহিকতা।

যেমন- নকশি পিঠা, নকশি পাখা, পাটের শিকা, শখের হাঁড়ি ইত্যাদি।
মাটি, পুরোনো কাপড়, কাঠ, বাঁশ, বেত, শোলা, তাল ও খেজুর পাতা প্রভৃতি সাধারণ উপকরণে তৈরি হয় লোকশিল্প। অতি সাধারণ হলদি, খড়িমাটি, নীল আবীর, সিঁদুর, কাঠকয়লা প্রভৃতি রং দিয়েই তৈরি হয় এই শিল্প। এ সমস্ত লোকশিল্প তৈরি করতে নকশা হিসেবে একই চিত্রের বারবার ব্যবহার করা হয়। এই বারবার ব্যবহার করা চিত্রকে বলা হয় মোটিফ বা মুদ্রা। বাংলাদেশের লোকশিল্পে বহুল ব্যবহৃত মোটিফ হচ্ছে-পদ্ম, কলকা, চন্দ্র, সূর্য, হাতি, পাখি, পানপাতা ইত্যাদি। হাজার হাজার বছর ধরে এ শিল্প মিশে আছে আমাদের জীবনে। দেশের বাইরেও আমাদের জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে আমাদের লোকশিল্প।

| কাজ: ১. পাঁচ-ছয়জনের দল তৈরি করে প্রতিদল এই পাঠের মধ্যে যেসব লোকশিল্পের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার তালিকা করো। দেখা যাক, কোন দল সবচেয়ে বেশি লোকশিল্পের নাম লিখতে পারে। ২. যেকোনো দুটি মোটিফ দিয়ে একটি নকশা অঙ্কন করো। |
নতুন শিখলাম: শিল্পধারা, নকশিকাঁথা, উপকরণ, মোটিফ।
আমরা প্রতিদিন অনেক রকম জিনিসপত্র বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করি। এ সমস্ত ব্যবহার্য জিনিসে সৌন্দর্য আরোপের জন্য নানা রকম কারুকাজ করা হয়। নকশা করা এসব ব্যবহার সামগ্রীকে কারুশিল্প বলে।
এখন থেকে আনুমানিক কুড়ি বা পঁচিশ লাখ বছর আগে আদিম মানুষেরা ধারালো পাথরের হাতিয়ার তৈরি করতে শিখেছিল। এসব পাথুরে অস্ত্র, গাছের ডাল দিয়ে তৈরি কাঠের শাবল ও কাঠের লাঠি ছিল মানুষের প্রথম ব্যবহার্য হাতিয়ার।

তবে এখন থেকে ১৭,০০০ বা ১২,০০০ বছর আগে ফ্রান্সে একদল শিকারি মানুষ বাস করত, যারা হরিণের শিং ও হাতির দাঁত দিয়ে হাতিয়ার বানাত। হাতিয়ারগুলোর উপর তারা আবার সুন্দর ছবি আঁকত বা খোদাই করত। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য কোনো জিনিসের উপর খোদাই করে, আঁচড় কেটে বা অন্য কোনো উপায়ে নকশা বা কোনো আকৃতি ফুটিয়ে তোলাকে বলে কারুকাজ বা অলংকার। মূলত ব্যবহার্য বস্তুতে অলংকারণের সূত্রপাত সেই আদিম শিকারি মানুষেরাই শুরু করেছিল।
পুরোনো পাথরের যুগের শেষদিকে মানুষ মাছের মেরুদণ্ডের হাড়, ঝিনুক, হরিণের দাঁত ইত্যাদি গেঁথে গলার হার তৈরি করে করত। তার নিদর্শন পাওয়া গেছে। গুহার দেয়ালে ছবি আঁকার জন্য পাথরের তৈরি পিরিচ আকৃতির এক ধরনের প্রদীপ তারা ব্যবহার করত। নতুন পাথরের যুগে মানুষ মাটির পাত্র তৈরি করতে শিখল। এভাবেই সভ্যতা এগিয়েছে আর সাথে সাথে মানুষ বিভিন্ন উপাদানে নতুন নতুন ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরি করতে শিখেছে এবং তাতে বিভিন্ন কারুকাজ বা অলংকরণ করে শিল্পরূপ দিয়েছে।
কারুশিল্পের অলংকরণের জন্য ব্যবহার করা হয় সহজ উপকরণ বা হাতিয়ার। কখনো কখনো তা করা হয় শুধু হাতে। তাই বলা যায়, যখন কোনো ব্যবহার্য সামগ্রীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তাতে সহজ সাধারণ হাতিয়ারের মাধ্যমে কারুকাজ করা হয়, তখন তাকে কারুশিল্প বলে। যেমন- একটি সাধারণ কাঠের দরজা একটি ঘরের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু তবে সেটা কারুশিল্প নয়। কিন্তু এই প্রয়োজনীয় সাধারণ বস্তুটি যখন আমরা সুন্দর রূপে দেখতে চাই, তখন তাকে ফুল, লতা, পাতা বা অন্য কোনো নকশা দিয়ে কারুকাজ করা হয়। তখন এই নকশা বা কারুকাজ করা দরজাটি হয়ে যায় কারুশিল্পের নিদর্শন। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার কারুশিল্প বিকাশ লাভ করেছে। ভূ-প্রকৃতি, মানুষের বুচি, স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত উপাদান, অধিবাসীদের জীবিকা ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্পের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে।
কাজ: ১ একটি লোকশিল্প ও একটি কারুশিল্পের নাম লেখো এবং পাশে তার ছবি আঁকো। |
১. নতুন শিখলাম: কারুশিল্প, হাতিয়ার, অলংকরণ, কারুকাজ।
লোকশিল্পের মতো বাংলাদেশের কারুশিল্পও আমাদের দেশের মানুষের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। আমাদের প্রকৃতিতে সহজে পাওয়া যায় এমন কারুশিল্পের উপাদান হচ্ছে বাঁশ, বেত ও কাঠ। তাই বাঁশ, বেত ও কাঠের তৈরি কারুশিল্প আমাদের দেশে বিকাশ লাভ করেছে এবং এর শিল্পগুণ সারা পৃথিবীতে প্রশংসিত হচ্ছে। তাছাড়া মাটির তৈরি বিভিন্ন বাসনপত্র এবং তামা, কাঁসা ও পিতলের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র আমাদের কারুশিল্পের উজ্জ্বল নিদর্শন।

বাঙালি মেয়েদের সাজসজ্জায় অলংকারের ব্যবহার অতিপ্রাচীন। চমৎকার নকশা করা সোনা ও রূপার নানা ধরনের অলংকারও সুন্দর কারুশিল্প। বাংলাদেশের আদিবাসীদের ব্যবহার করা বিভিন্ন অলংকারও আমাদের কারুশিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। তাছাড়া তাঁতের শাড়ি বিশেষ করে জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়ি, রাজশাহী সিল্ক ও কাতান শাড়ি বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কারুশিল্প হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সোরাই, পিতল ও কাঁসার থালা, গ্লাস, কলসি, গামলা, চিলমচি, পানের বাটা থেকে শুরু করে লোহার তৈরি দা, কুড়াল, খন্তা, কাস্তে, কড়াই, জাঁতী ইত্যাদি সবকিছুর গায়েই আঁচড় কেটে বা খোদাই করে ফুল, লতা, পাতা, পাখি ও নানা ধরনের নকশা আঁকা হয়। এগুলো সবই বাংলাদেশের কারুশিল্প।
নতুন শিখলাম: দারুশিল্প।

এছাড়া বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন আসবাব, চেয়ার, টেবিল, মোড়া, খাট, সাজি, ডালা, কুলা, মাছ ধরার চাঁই, পলো, ওঁচা, চোঁচ এবং আদিবাসীদের তৈরি নানারকম নকশা করা কাপড়, চাদর, কম্বল, বাঁশ ও বেতের টুকরি, মাথাল, শাঁখার চুড়ি, ঝিনুকের বোতাম, হাড়ের চিরুনি ইত্যাদি অসংখ্য জিনিস নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের কারুশিল্পের সমৃদ্ধ ভুবন।
কাজ: ১. তোমার বাড়িতে বা আশেপাশে ব্যবহার করা হয় এরকম কয়েকটি কারুশিল্পের নাম খাতায় লেখো এবং পাশে তার ছবি আঁকো। |
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. লোকশিল্প কাদের সৃষ্টি?
ক. আধুনিক শিল্পীদের সৃষ্টি
খ. বিখ্যাত শিল্পীদের সৃষ্টি
গ. সাধারণ লোকের সৃষ্টি
ঘ. বাউল শিল্পীদের সৃষ্টি
২. নকশিকাঁথা তৈরি করেন কারা?
ক. বাংলার গ্রামের মেয়েরা
খ. বাংলার তাঁতি সম্প্রদায়
গ. বাংলার পটশিল্পীরা
ঘ. বাংলার কুমার সম্প্রদায়
৩. লোকশিল্প তৈরির জন্য নকশা হিসেবে একই চিত্রের বারবার ব্যবহারকে কী বলে?
ক. 'প্রতীক'
খ. 'মোটিফ'
গ. 'আলপনা'
ঘ. ‘উপকরণ’
৪. ব্যবহার্য বস্তুকে সুন্দর করার জন্য কারুকাজ করাকে কী বলে?
ক. চারুশিল্প
গ. নান্দনিক শিল্প
খ. আদিম শিল্প
ঘ. কারুশিল্প
৫. বাংলাদেশের কারুশিল্পের অনেক নিদর্শন কোথায় সংরক্ষিত আছে?
ক. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে
গ. বরেন্দ্র জাদুঘরে
খ. জাতীয় জাদুঘরে
ঘ. জয়নুল সংগ্রহশালায়
রচনামূলক প্রশ্ন
১। বাংলাদেশের কারুশিল্প সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
২। লোকশিল্প সম্পর্কে বর্ণনা করো।
সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
১। লোকশিল্প ও কারুশিল্পের ৩টি পার্থক্য উল্লেখ করো।
২। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য লোকশিল্পের ৫টি নামের তালিকা দাও।
৩। বাংলাদেশের লোকশিল্পে বহুল ব্যবহৃত ৩টি মোটিফের চিত্র আঁকো।
৪। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কারুশিল্পের ব্যবহার করা হয় কেন?
৫। বাংলাদেশের কারুশিল্পের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
Read more