কোনো সমাজ বা জনগোষ্ঠী সাধারণত যে ধরনের অর্থনৈতিক কাজ করে জীবনধারণ করে তাকেই ঐ সমাজ বা জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক জীবনধারা বলে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। জমিতে চাষ করে তারা শস্য উৎপাদন করে। তা দিয়ে নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটায়। উৎপাদিত ফসলের একটা অংশ তারা বাজারে বিক্রি করে সেই অর্থে সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটায়। বাড়তি শস্য উৎপাদন করে তারা দেশবাসীর খাদ্যের জোগান দেয়। এভাবে তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। একইভাবে শহরাঞ্চলের শ্রমিক, শিল্পপতি, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক জীবনধারাও শিল্প কিংবা ব্যবসাকেন্দ্রিক।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। গ্রামের অধিকাংশ লোক কৃষিজীবী। কৃষিই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। এমনকি যাদের নিজস্ব জমি নেই তারাও অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। অর্থাৎ দেশের কয়েক কোটি মানুষ তাদের জীবিকার জন্য সরাসরি কৃষির উপর নির্ভরশীল। সে কারণে বাংলাদেশকে কৃষিনির্ভর দেশ বলা হয়।
কৃষিকাজ ছাড়াও গ্রামের মানুষের একটা অংশ জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, ছুতার, মুদি হিসেবে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। কিছু কিছু লোক গ্রামের হাট-বাজার বা কাছাকাছি শহরে-গঞ্জে ছোটোখাটো ব্যবসা করে। এদের সবাইকে নিয়েই বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রয়েছে।
বর্তমানে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং সার, কীটনাশক ও উচ্চফলনশীল বীজের প্রয়োগ হচ্ছে। এর ফলে ফসলের উৎপাদনই শুধু বাড়েনি, গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও তা নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। সাথে তৈরি জ করেছে পরিবেশ ঝুঁকি, গ্রামের মানুষের শিক্ষা স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার উপর এর প্রভাব পড়েছে।

কুমার মাটির পাতিল তৈরি করছে

জেলে জাল দিয়ে মাছ ধরছে

তাঁতি কাপড় বুনছে
গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্ব -
আমাদের দেশের মোট খাদ্য চাহিদার বড়ো অংশ আসে কৃষি থেকে। আর গ্রামের মানুষই এর উৎপাদক। দেশে শিল্পের কাঁচামালের অন্যতম উৎসও হচ্ছে গ্রামীণ কৃষিখাত। অর্থাৎ দেশের শিল্প-বাণিজ্য ও জনগণের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অনেকাংশে গ্রামীণ অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের শহুরে অর্থনীতি
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ত্রিশ শতাংশ শহরাঞ্চলে বাস করে। রাজধানী ঢাকা, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম, শিল্প শহর নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায় বাস করে বিপুল সংখ্যক মানুষ। এসব শহর ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে বসবাসকারী মানুষ সাধারণত অফিস-আদালত ও শিল্প- কারখানায় চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, যানবাহন চালনা, নানা ধরনের দিনমজুরি ও বাসাবাড়িতে সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা ধনী তারা নগরীর অভিজাত এলাকায় বাস করে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজস্ব বা ভাড়া বাসায় থাকে। এছাড়া বিশালসংখ্যক মানুষ বস্তি এলাকায় বাস করে। বড় বড় শহরগুলোতে ভাসমান মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তারা অস্থায়ীভাবে ফুটপাত, পার্ক, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট ইত্যাদিতে রাত কাটায়। বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকেও কোনো না কোনো জীবিকা অবলম্বন করতে হয়। শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমিক, দিনমজুর, বস্তিবাসী সবাই মিলেই শহরের অর্থনৈতিক জীবনকে সচল রাখে।

শহুরে অর্থনীতির গুরুত্ব
শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে আজ বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের মানুষের জীবনধারার পার্থক্য কিছুটা কমে আসছে। বাড়ছে গ্রাম ও শহরের একে অপরের উপর নির্ভরশীলতা। লেখাপড়া, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, ইত্যাদির জন্য গ্রামের মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শহরের উপর নির্ভরশীল। নগর জীবনের বিস্তার, শিল্পায়ন ও কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে প্রতিদিন বহুলোক শহরে আসে। তাছাড়া উঠতি বড়লোকরা সবাই শহরেই থাকে ফলে মোট উৎপাদনে শহরে অর্থনীতির ভূমিকা অনেক। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে শহুরে জনগণের ভূমিকা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
| কাজ: বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের অর্থনৈতিক কাজের গুরুত্ব চিহ্নিত কর। |