সামাজিকীকরণের মাধ্যম ও এর গুরুত্ব (পাঠ-২ ও ৩)

শিশুর বেড়ে ওঠা ও প্রতিবন্ধকতা: সামাজিকীকরণ - বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1k

সামাজিকীকরণের কতিপয় মাধ্যম ও এর গুরুত্ব বর্ণনা করা হলো-
পরিবার: শিশুর সামাজিকীকরণ শুরু হয় পরিবার থেকে। শিশুর চারিত্রিক গুণাবলি পারিবারিক পরিবেশে বিকশিত হয়। সহযোগিতা, সহিষ্ণুতা, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ, আত্মত্যাগ, ভালোবাসা প্রভৃতি সামাজিক শিক্ষা শিশু পরিবার থেকে অর্জন করে। শিশুর সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের জন্য প্রয়োজন হয় সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ। পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক মধুর হলে শিশু সুন্দর পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। অপরপক্ষে, পারিবারিক অশান্তি দ্বন্দ্ব, সংঘাত, মারামারি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে শিশুর বেড়ে উঠার জন্য সবসময় সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ বজায় রাখা উচিত। পরিবার সম্প্রীতিও সৌহার্দের চর্চা না হলে শিশু তা শিখতে পারে না। কাজেই সততা ও সৌহার্দের শিক্ষা পরিবার থেকেই শিখতে হয়।

প্রতিবেশী: আমাদের বাড়ির আশপাশে যারা বসবাস করেন তারা হলো আমাদের প্রতিবেশী। পাশাপাশি বাড়িগুলোর সমবয়সী শিশুদের নিয়ে একটি প্রতিবেশী দল গড়ে উঠতে পারে, যার মাধ্যমে আমরা পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সমতা, ঐক্য প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষার্জন করতে পারি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি কতগুলো সামাজিক আদর্শও শিখে থাকে।
এসব আদর্শ হচ্ছে-শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্ববোধ, নিয়মানুবর্তিতা, শ্রদ্ধাবোধ, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক ভালোবাসা ইত্যাদি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে শিশু বৃহত্তর সমাজের আদব-কায়দা, আচার-আচরণ ও মূল্যবোধও শিখে থাকে। শিশুর মধ্যে অন্যের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়ার শিক্ষা এখান থেকেই হয়। ফলে পরার্থ শিখতে পারে স্কুল থেকে। শিশুর সুঅভ্যাস গঠনের ক্ষেত্রেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভূমিকা পালন করে। পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুও শিশুর আচরণকে প্রভাবিত করে। সামাজিকীকরণে তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

খেলা ও পড়ার সাথি: শিশুর সামাজিকীকরণে খেলা ও পড়ার সাথির ভূমিকা কম নয়। শিশু খেলা ও পড়ার সাথির সাথে মেলামেশা করে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে পারে। ভালো-মন্দ গুণাবলির সমালোচনা শুনে সমাজের কাঙ্ক্ষিত আচরণ করতে শেখে। তবে মন্দ খেলা ও পড়ার সাথি অনেক সময় শিশুকে বিপথগামী করতে পারে। তাই খেলা ও পড়ার সাথি নির্বাচনে আমরা সচেতন হব।

ধর্ম: ধর্ম হচ্ছে এক ধরনের বিশ্বাস, যা নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রতিটি ধর্মেরই মূল বিষয় হচ্ছে ব্যক্তিকে ন্যায় ও কল্যাণের প্রতি আহবান করা এবং অন্যায় ও অকল্যাণ থেকে দূরে রাখা। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা প্রভৃতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকদের জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। ধর্ম মানুষের মনে সামাজিক মূল্যবোধ সঞ্চারিত করে, সহযোগিতা, কর্তব্যপরায়ণতা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা প্রভৃতি গুণাবলির অধিকারী করে। সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হতে শিক্ষা দেয়। আমরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এবং অন্য কেও তার ধর্ম মেনে চলার সুযোগ দিলে জাতি, বর্ণ, ধর্ম, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা সম্ভব।

গণমাধ্যম: জনগণের কাছে সংবাদ, মতামত, বিনোদন প্রভৃতি পরিবেশন করার মাধ্যমকে বলা হয় গণমাধ্যম। গণমাধ্যমসমূহ যেমন- সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র, ম্যাগাজিনে সমাজের মূল্যবোধ, প্রথা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা প্রভৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য থাকে যা শিশুর সামাজিকীকরণে ভূমিকা পালন করে। বেতার নানা ধরনের বিনোদনমূলক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করে শিশুর সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে। একই সাথে দেখা ও শোনার মাধ্যমে টেলিভিশন থেকে সংগৃহীত তথ্য শিশুর সামাজিকীকরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। চলচ্চিত্রও সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে যদি তা শুধু বিনোদনধর্মী না হয়ে আদর্শ ও বাস্তবধর্মী শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র হয়। এ ধরনের চলচ্চিত্র শিশুর মনোভাব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইদানিং ইন্টারনেট শিশুর বিনোদন ও সামাজিকীকরণের বড়ো ভূমিকা রয়েছে। এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বড়োদের ভূমিকা রাখতে হবে।

কাজ - ১: শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবারের ভূমিকা চিহ্নিত কর।
কাজ - ২: শিশুর সামাজিকীকরণে খেলার সাথি ও পড়ার সাথির ভূমিকা চিহ্নিত কর।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...