সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তর: কৃষি, শিল্প ও শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সমাজ (পাঠ-৫ ও ৬)

সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস - বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

3.5k

সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তর: কৃষি, শিল্প ও শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সমাজ

কৃষিভিত্তিক সমাজ

কৃষিকাজের সূচনা মেয়েরা করলেও লাঙল আবিষ্কারের পর পুরুষেরা জমি চাষের দায়িত্ব নেয়। প্রথমে তারা নিজের কাঁধে জোয়াল নিয়ে জমি চাষ শুরু করে। কালক্রমে হালের বলদের ব্যবহার শুরু হয়। লাঙল ও হালের বলদ ব্যবহার করে চাষ শুরু হলে উৎপাদন বাড়তে থাকে। যেসব অঞ্চলে বন্যা হতো এবং জমিতে পলি পড়ত মানুষ সেসব জমিতে গম ও বার্লির বীজ ছিটিয়ে দিত। এসব অঞ্চল ছিল টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকা, নীল নদের তীর ও সিন্ধু উপত্যকা। সে যুগে পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকায় প্রচুর বৃষ্টি হতো। তাই কৃষিকাজ এসব অঞ্চলে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। পরে আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য জায়গায় কৃষিকাজ ছড়িয়ে পড়ে। কৃষিকাজ প্রসারের সাথে সাথে পশুপালনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়।
কৃষিকাজের মধ্য দিয়ে সমাজজীবন ও সভ্যতার উন্নতি হতে থাকে। কৃষিকাজের উপযোগী স্থানে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। মানুষ স্থায়ীভাবে এক স্থানে বসবাস শুরু করে। কৃষিকাজ মানুষের খাদ্যের সংস্থান আরও নিশ্চিত করে। এ সমাজের উদ্বৃত্ত ফসল অবসর জীবনযাপনকারী শ্রেণির উদ্ভব করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে এবং নগর জীবনের বিকাশে ভূমিকা রাখে। কৃষির উদ্বৃত্ত ফসল সভ্যতার সূচনা করে। এ কারণে বলা হয়, সভ্যতা হচ্ছে কৃষির অবদান।

শিল্পভিত্তিক সমাজ

ইউরোপে মধ্যযুগের শেষ দিকে বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ঘটে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়ে যায়। ইউরোপের মানুষ আবিষ্কার করে প্রাচীন গ্রিস এবং রোমের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐতিহ্য। এটি ইউরোপের নবজাগৃতি বা রেনেসাঁ নামে পরিচিত। এই সময়ে ইউরোপের মানুষ বেরিয়ে পড়ে অজানাকে জানতে, পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে। ১৪৯২ সালে কলম্বাস পৌঁছে গেলেন আমেরিকায়।

১৬৮৫ সালে নিউটন তুলে ধরলেন তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কার মাধ্যাকর্ষণ। এভাবে শুরু হলো একের পর এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। আঠারো শতকে ইংল্যান্ডে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার হলে উৎপাদন ব্যবস্থায় বিপ্লবের সূচনা হয়। এই বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ধারণা কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা পরপর আবিষ্কার করেন সুতা কাটার মাকু বা স্পিনিং মেশিন, যান্ত্রিক তাঁত, বাষ্পচালিত জাহাজ ও রেলের ইঞ্জিন। এ সময় বিদ্যুৎ আবিষ্কার হয়। আর স্টিম টারবাইন নামে বিশেষ ধরনের বাষ্পীয় ইঞ্জিন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। এভাবে একদিকে বড়ো বড়ো শিল্পকারখানায় উৎপাদন শুরু হয় আর অন্যদিকে দ্রুতগামী জাহাজ ও রেলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের বিস্তার ঘটে। এভাবেই সূচনা হয় শিল্পবিপ্লবের। শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছিল ইউরোপে, পথিকৃৎ ছিল ইংল্যান্ড।


আঠারো-উনিশ শতকে কয়লা, গ্যাস, পেট্রোল ও বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়। উনিশ শতকে রেল যোগাযোগ চালু হয়। ক্রমবর্ধমান শিল্প কারখানার শ্রম ও কাঁচামালের চাহিদা মেটাতে ইউরোপের মানুষ উপনিবেশ স্থাপন করল মূলত এশিয়া ও আফ্রিকায়। তখন থেকে বিশ্বব্যাপী শিল্পবিপ্লবের প্রভাব পড়তে থাকে। বিশ শতকে শুরু হয় বিমান, রেডিয়ো, সিনেমা ও টেলিভিশনের ব্যবহার।

শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সমাজ

শিল্পভিত্তিক সমাজে শক্তির উৎস হিসাবে মানুষ ও পশুর স্থান দখল করে যন্ত্র। শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সমাজের ভিত্তি হচ্ছে জ্ঞান ও তথ্য। শিল্পের বদলে তথ্য প্রক্রিয়াজাত করাই হচ্ছে অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। সম্পত্তির মালিকদের বদলে পেশাজীবী, চাকরিজীবী, বিজ্ঞানী, তথ্য প্রকৌশলী এবং সেবা ও বিনোদন খাতের সাথে যুক্ত মানুষেরাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন এবং যোগাযোগের নানা মাধ্যম যেমন ফেসবুক পৃথিবীর মানুষকে অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বলা হচ্ছে সমস্ত পৃথিবী একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে বিশ্বায়ন।

কাজ: দলে ভাগ হয়ে কৃষিভিত্তিক ও শিল্পভিত্তিক সমাজের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত কর।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...