বাংলাদেশের ইতিহাস
১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হলেও বাংলার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। প্রাচীন যুগ থেকে হিসেব করলে মৌর্য, শুঙ্গ, কুষাণ, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসনের ধারাবাহিকতায় এসেছিল মধ্যযুগ। বখতিয়ার খলজির নদীয়া জয়ের পর বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম শাসন। ইলিয়াসশাহী ও হোসেনশাহী বংশ বাংলায় গড়ে তোলে শক্তিশালী শাসন কাঠামো। এরপর পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলা ও ভারতবর্ষ চলে গিয়েছিল ইংরেজদের অধীনে। তাদের হাত থেকে মুক্তির পর বর্তমান বাংলাদেশের নাম হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি আমাদের এই বাংলাদেশ।
এ অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা-
- বাংলায় মানব বসতির ধারা বর্ণনা করতে পারব
- রাজনৈতিক ইতিহাসের যুগ বিভাজন করতে পারব;
- প্রাচীন বাংলার আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবন বর্ণনা করতে পারব;
- মধ্যযুগে বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব:
- ঔপনিবেশিক যুগে বাংলার রাজনৈতিক জীবন বর্ণনা করতে পারব।
- দেশটির জন্মকথা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারব;
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শান্তার বাবা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন। এজন্য তার পরিবার গর্বিত। শান্তা তার চাচার কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছে
বাংলাদেশের মানব বসতি ও রাজনৈতিক ইতিহাস
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডে মানব বসতির অস্তিত্ব ছিল। সম্প্রতি আবিষ্কৃত প্রত্ননিদর্শন থেকে প্রমাণ হয়েছে এই ভূমির প্রাচীনতা। চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, সীতাকুণ্ড, কুমিল্লার লালমাই, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে পাওয়া গিয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের হাতিয়ার। এর মধ্যে রয়েছে পাথর ও ফসিল, কাঠের হাতকুঠার, বাটালি, তীরের ফলক প্রভৃতি। এই সময়ে মানুষ বনে-বাদাড়ে ঘুরে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করেছে।
এরপর বগুড়ার মহাস্থানগড় এবং নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ মানব বসতি। মহাস্থানগড়ে অবস্থিত প্রাচীন নগরটির নাম পুণ্ড্রনগর যা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গড়ে উঠেছিল। ওদিকে উয়ারী-বটেশ্বর থেকেও পাওয়া গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মানব বসতির চিহ্ন। সমসাময়িক কালে ভারত উপমহাদেশের ১৬টি মহাজনপদের নাম জানা যায় । উপমহাদেশের বিভিন্ন জনপদের মৌর্য যুগ-পূর্ব রাজনৈতিক ইতিহাস জানা যায়। তবে বর্তমান বাংলাদেশ অংশের ইতিহাসের প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে প্রাপ্ত শিলালিপিটি মৌর্য যুগের বলে মনে করা হয়। অনেকের মতে লিপিটি সম্রাট অশোকের জারিকৃত। এই শিলালিপির বিবরণ থেকে অনুমান করা হয় মৌর্য সম্রাট অশোক পুণ্ড্রনগর শাসন করেছেন। তারপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজবংশ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ড শাসন করেছে।
গুপ্ত যুগ
আমাদের দেশের বিস্তারিত ইতিহাস জানা গিয়েছে গুপ্ত যুগ থেকে। তারা ভারত উপমহাদেশের উত্তর অঞ্চলের শাসক ছিলেন। বাংলাদেশের উত্তরাংশে পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি নামে একটি প্রদেশ গুপ্তদের শাসনাভুক্ত ছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে আজকের বাংলাদেশ প্রাচীনকালে একক কোনো দেশ ছিল না। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল তখন পুণ্ড্রবর্ধন, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, বরেন্দ্র, হরিকেল প্রভৃতি জনপদ নামে পরিচিত ছিল।
শশাঙ্ক
গুপ্ত শাসন পতনের পর কয়েকজন রাজার নাম পাওয়া যায়। 'পরবর্তী গুপ্ত' নামে পরিচিত এই সময়কালের তিনজন বিখ্যাত রাজা ছিলেন গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব। তারপর সপ্তম শতকে শশাঙ্ক নামে একজন প্রতাপশালী শাসকের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি গৌড়ের শাসক ছিলেন। তার উপাধি ছিল গৌড়েশ্বর। তার মৃত্যুর পর প্রায় একশ বছর প্রাচীন বাংলায় কোনো স্থায়ী শাসক ছিল না। বিশৃঙ্খল অবস্থায় বাংলার ছোট ছোট রাজ্যগুলো নিজেদের মধ্যে কলহ ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।
পাল রাজবংশ
পাল রাজবংশ বাংলায় দীর্ঘদিন শাসন করে। এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গোপাল। তিনি 'মাৎস্যন্যায়' তথা মাছের রাজত্বের মতো অরাজকতা দূর করে গৌড়ের সিংহাসনে বসেছিলেন। গোপালের পর ধর্মপাল, দেবপাল, রামপাল ও মহীপাল ছিলেন এ বংশের বিখ্যাত শাসক ছিলেন। পালবংশ প্রায় ৪০০ বছর বাংলা শাসন করে। তাদের সময়কালে রাজনীতি, অর্থনীতি, স্থাপত্য, চিত্রশিল্প ও শিল্পকলায় সমৃদ্ধ হয়েছিল বাংলা। নওগাঁ জেলার বিখ্যাত পাহাড়পুর মহাবিহার পালযুগের নিদর্শন।
পাল শাসকদের সময়কালে তাদের রাজত্বের বাইরে কুমিল্লা ও বিক্রমপুর অঞ্চলে খড়গ, দেব, চন্দ্র ও বর্ম রাজবংশ স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেছিল। সমতট অঞ্চল নামে পরিচিত এই এলাকায় ভ্রমণ করেন চীনের বিখ্যাত পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ। তিনি এখানে ৩০টির মতো বৌদ্ধবিহার দেখতে পেয়েছিলেন। তৎকালীন বিক্রমপুর অঞ্চলের প্রখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর। তিনি একাদশ শতকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য তিব্বতে গিয়েছিলেন।
সেন রাজবংশ
ভারতের দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে পালদের সেনাবাহিনীতে চাকরি করার জন্য বাংলায় এসেছিল সেনরা। দুর্বল পাল রাজা মদনপালকে পরাজিত করে বিজয় সেন ক্ষমতা দখল করেন। তারপর রাজা ছিলেন বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেন। বিজয় সেন এবং বল্লাল সেন ছিলেন শৈব সম্প্রদায়ের। পরে লক্ষণ সেন হয়ে ওঠেন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অনুরাগী। লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি নদীয়া জয় করেন। তবে লক্ষণ সেনের পর তার দুই ছেলে বিশ্বরূপ সেন এবং কেশব সেন বিক্রমপুর থেকে কিছুদিন এই এলাকা শাসন করেছিলেন।
| কাজ- ১: প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রত্নস্থানগুলো ও প্রত্নস্থানে প্রাপ্ত উপকরণগুলোর নামের তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ- ২: বাংলার জনপদগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ- ৩: প্রাচীন বাংলার রাজবংশগুলোর তালিকা প্রস্তুত কর। |
প্রাচীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবন প্রভৃতি সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। সীমিত সাহিত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্র থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যায় মাত্র। আমরা পরবর্তী পাঠগুলোতে প্রাচীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে জানব।
প্রাচীন বাংলার সমাজ, অর্থনীতি ও ধর্ম
কৃষি: প্রাচীনযুগে বাংলার অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। ধান ছিল প্রধান ফসল। প্রচুর আখও উৎপাদন হতো। আখ থেকে উৎপাদন করা হতো গুড় ও চিনি। এই গুড় ও চিনি বিদেশে রপ্তানির কথা জানা গিয়েছে। তুলা, সরিষা ও পান চাষের জন্যও পরিচিতি ছিল বাংলার। তখন নারিকেল, সুপারি, আম, কাঁঠাল, কলা, ডুমুর প্রভৃতি ফলের কথাও জানা যায়।
কুটিরশিল্প: প্রাচীনযুগ থেকেই বাংলার তাঁতিরা মিহি সুতি ও রেশমি কাপড় বুনতে পারদর্শী ছিল। আমাদের মসলিন কাপড় ছিল পৃথিবী বিখ্যাত যা রপ্তানি হতো। তখন উন্নতমানের মৃৎপাত্র, ধাতবপাত্র ও অলংকারও নির্মাণ করা হতো। প্রাচীন বাংলার পোড়ামাটি, ধাতু ও পাথরের ভাস্কর্য এবং মূর্তি ছিল প্রশংসনীয়। ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা, স্বল্প- মূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতিও তৈরি হতো তখন।
ব্যবসা-বাণিজ্য: কৃষির অতিরিক্ত ফসল এবং শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশ লাভ করে। নদীর তীরগুলোতে গড়ে উঠেছিল হাট-বাজার ও গঞ্জ। ব্যবসা-বাণিজ্য নদীপথেই হতো বেশি। উয়ারী-বটেশ্বর ও পুণ্ড্রনগর তথা মহাস্থানগড় ছিল সমৃদ্ধ নদীবন্দর। ভারতবর্ষের বিভিন্ন বন্দর ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে প্রেরণ করা হতো তৎকালীন বাংলার পণ্য।
ধর্মমত ও সম্প্রদায়: অনুমান করা হয় পাথর যুগে এ অঞ্চলের মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো পাহাড়- পর্বত, নদ-নদী, চন্দ্র, সূর্য প্রভৃতির পূজা করত। দীর্ঘসময় বৌদ্ধ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রাধান্য লাভ করে। পাল সম্রাটগণ বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ধর্মীয় সম্প্রীতিকে পাল যুগের বৈশিষ্ট্য হিসাবে চিহ্নিত হয়।
| কাজ: বাংলাদেশের কুটিরশিল্প একটি তালিকা প্রস্তুত কর। |
প্রাচীন বাংলার বিনোদন, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা
বিনোদন: প্রাচীন যুগে বাংলাদেশে বিনোদনের অংশ হিসেবে নাচ, গান, নাটক, মল্লযুদ্ধ ও কুস্তি খেলার প্রচলন ছিল। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। মন্দিরের সেবাদাসীদের সকলকেই নৃত্য-গীত-বাদ্য পটিয়সী হতে হতো। পোড়ামাটির ফলকে কাঁসর, করতাল, ঢাক, বীণা, বাঁশি, মৃদঙ্গ, মৃভাণ্ড প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়।
স্থাপত্য: প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে মহাস্থানগড় ও উয়ারী-বটেশ্বর থেকে ইট-নির্মিত স্থাপত্য আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। বাংলার মানুষ স্থাপত্যশিল্পে উৎকর্ষ অর্জন করে পাল শাসনামলে। সম্রাট ধর্মপাল একাই ৫০টি বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

ভাস্কর্য ও চিত্রকলা
উয়ারী-বটেশ্বর, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর ও ময়নামতি প্রভৃতি অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত পোড়ামাটি, পাথর ও ধাতব ভাস্কর্য ও মূর্তি প্রাচীন বাংলার শিল্প সম্পর্কে পরিচয় দেয়। গুপ্ত ও পাল যুগের ভাস্কর্যগুলোর শিল্পশৈলী ছিল অনন্য। পাল যুগের দুজন বিখ্যাত ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী ছিলেন ধীমানপাল ও বীটপাল। ওদিকে সেনযুগের শ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন শূলপাণি। তখনকার বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে বৌদ্ধ দেব-দেবীকে চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো।
| কাজ: দলে ভাগ হয়ে বাংলার প্রাচীন স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের তালিকা প্রস্তুত কর। |
প্রাচীন বাংলার ভাষা, সাহিত্য ও শিক্ষা
ভাষা ও সাহিত্য
বাংলার নানা স্থান থেকে পাথর ও তামার পাতে খোদাই করে লিখিত লিপি পাওয়া গিয়েছে। বগুড়ার মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত কালো পাথরে খোদাইকৃত লিপিটি এর মধ্যে প্রাচীনতম। গুপ্ত, পাল ও সেন যুগেরও প্রচুর লিপি পাওয়া গিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার শাসকদের জারিকৃত লিপির সংখ্যাও অনেক। এই লিপিগুলো থেকে প্রাচীন বাংলার ভাষা ও বর্ণমালা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পালযুগের ঘটনা নিয়ে কবি সন্ধ্যাকর নন্দী রচনা করেছিলেন প্রখ্যাত 'রামচরিত' কাব্যগ্রন্থ। এর পাশাপাশি পাল আমলে আরও রচনা করা হয়েছিল চর্যাপদ। চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন হিসাবে স্বীকৃত। সেন রাজাদের মধ্যে রাজা বল্লাল সেন 'দানসাগর' ও 'অদ্ভুতসাগর' রচনা করেন।
শিক্ষা
পাল যুগের আগে বাংলার শিক্ষা সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। এই সময়ে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার দেখে অনুমান করা যায় মৌর্য ও গুপ্ত যুগেও শিক্ষার প্রচলন ছিল। বাংলা থেকে পাল যুগের অনেক বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করা হয়েছে। বিহারগুলো ছিল বড়ো পরিসরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বৌদ্ধ ছাত্ররা এখানে পড়াশোনা করত। এখানকার শিক্ষকদের বলা হতো আচার্য বা ভিক্ষু। আর শিক্ষার্থীদের বলা হতো শ্রমণ। বর্তমান যুগের আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিহারেও ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। বিহারে শুধু ধর্মীয় বই পড়ানো হতো তা নয়-এখানে চিকিৎসাবিদ্যা, ব্যাক্সণ, জ্যোতিষশাস্ত্রসহ নানা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো। এসব আলোচনা থেকে বোঝা যায় শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাচীন বাংলার মানুষ বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল।
| কাজ: পাল ও সেন যুগের সাহিত্যকর্মগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত কর। |
মুসলিম শাসনামলে বাংলা
বাংলায় মধ্যযুগের সূচনা হয় ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে। তখন রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করেন তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি। পর্যায়ক্রমে তুর্কি সেনাপতিরা পুরো বাংলায় শাসন বিস্তার করতে থাকেন। এর আগেই ভারতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দিল্লি ছিল তাদের রাজধানী। দিল্লির সুলতানদের পাঠানো সেনাপতিরা বাংলায় প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতেন। দিল্লি থেকে বাংলার দূরত্ব অনেক। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো ছিল না। সম্পদে পরিপূর্ণ হওয়ায় বাংলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শাসকগণ স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনার ইচ্ছা করতেন। তাঁরা অনেকেই দিল্লির সুলতানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সময় পুরো বাংলা স্বাধীন হয়ে যায়।
বাংলার স্বাধীনতা টিকেছিল ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ দুইশত বছর। বাংলার স্বাধীন এই দুইশত বছরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সুলতানি বংশ শাসন করেছিল। যার একটি ইলিয়াস শাহী এবং অন্যটি হোসেন শাহী বংশ নামে সুপরিচিত। হোসেন শাহী বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। ১৫২৬ সালে দিল্লির সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে। তখন দিল্লিকে কেন্দ্র করে ভারতে মোগল শাসন শুরু হয়। তারাও বাংলা দখলের চেষ্টা করেছিল। তারা প্রথমে সফল হয়নি।
বিহার অঞ্চলে তখন আফগানদের জমিদারি ছিল। তাদের বিখ্যাত নেতা ছিলেন শেরখান শূর। তিনি শেরশাহ নামে দিল্লির সিংহাসনেও বসেছিলেন। তার মাধ্যমেই বাংলায় শুরু হয়েছিল আফগান শাসন। মোগল সম্রাট আকবরও আমাদের এই দেশ দখল করতে পারেন নি। বাংলার বড়ো বড়ো জমিদারদের তখন বলা হতো বারো ভূঁইয়া। তারা একজোট হয়ে মোগলদের হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে সেনাপতি ইসলাম খান চিশতি বাংলা অধিকার করেন। তখন স্বাধীনতা হারিয়ে মোগলদের অধীনে একটি সুবা তথা প্রদেশে পরিণত হয় বাংলা। এই শাসন চলেছিল ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
| কাজ: মুসলিম শাসনামলে বাংলার শাসকদের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। |
ঔপনিবেশিক যুগের বাংলা
বাংলায় মধ্যযুগের পরবর্তী সময়কাল ঔপনিবেশিক যুগ হিসেবে পরিচিত। উপনিবেশবাদী ব্রিটিশরা এই সময় বাংলার উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল বলে এই সময়কালকে বলা হয় ঔপনিবেশিক শাসন। শুরুতে ১৭৫৭ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নানাভাবে বাংলাকে শোষণ করে। তারপর ১৮৫৭ সালে সংঘটিত হয় সিপাহী বিপ্লব। এরপর সরাসরি রানীর শাসনের অধীনে চলে গিয়েছিল বাংলা। পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজিত হওয়ার পর থেকে শুরু করে ভারত স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত (১৭৫৭-১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ) দীর্ঘ সময়কালকে ঔপনিবেশিক শাসন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ পরাজিত হলে বাংলার নামমাত্র নবাব হন বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর আলি খান। তারপর তারা ক্ষমতায় বসায় মীর জাফরের জামাতা মীর কাসিমকে। শুরুতে ব্রিটিশদের আজ্ঞাবহ থাকলেও পরে বিদ্রোহ করে বসেন মীর কাসিম। তিনি বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর বাংলা পুরোপুরি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
শুধু বাংলা নয়, এরপর পুরো ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ শাসন চলেছিল ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় দুইশ বছর। প্রথম দিকে ভারত শাসন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরে শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করে ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়া। রানির পক্ষ থেকে ইংরেজ শাসকরা ভারত উপমহাদেশ শাসন করতেন। তাদের অপশাসনকে মেনে নিতে পারেনি বাংলার মানুষ। তারা বিভিন্ন পর্যায়ে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, সিপাহী বিপ্লব, তিতুমীরের বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন, নীল বিদ্রোহসহ অনেকগুলো আন্দোলন ও সংগ্রাম গড়ে ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। শেষ অবধি শুরু হয় বিখ্যাত 'ভারত ছাড়' আন্দোলন। ইংরেজরা ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
পাকিস্তান ছিল দুটি ভিন্ন অঞ্চল নিয়ে গঠিত। ভৌগোলিকভাবে অনেক দূর অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের পশ্চিম অংশটিকে বলা হতো পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব অংশটিকে বলা হতো পূর্ব পাকিস্তান। তৎকালীন দুই ভূখণ্ডে বিভক্ত পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। তারাও নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে শোষণ করত। একটা পর্যায়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একত্রিত হয় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বুঝতে পারে পূর্ব পাকিস্তানের উপর তাদের আধিপত্য আর ধরে রাখা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী আক্রমণ চালিয়ে গণহত্যা শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। ২৬শে মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর তিনি ২৭শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ জন্ম নেয় নতুন দেশ, বাংলাদেশ।
Read more