সংস্কৃতি নির্মাণে ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, উৎপাদন পদ্ধতি ইত্যাদি বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফলে একেক দেশের মানুষের সংস্কৃতি একেক রকম। আবার একটি দেশের মধ্যেও নানা ধরনের সংস্কৃতি বিকশিত হতে পারে। তাই সংস্কৃতি কোনো স্থবির বিষয় নয়, বরং পরিবর্তনশীল। সংস্কৃতির সবটাই বদলে যায় তা কিন্তু নয়। সংস্কৃতির কিছু প্রধান দিক দীর্ঘসময় অপরিবর্তনীয় থেকে যায়।
পেশা, লিঙ্গ, বয়স, স্থান, উৎপাদন পদ্ধতি, শিক্ষা, ধর্ম ইত্যাদি নানা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একটি দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির চর্চা হতে পারে। যেমন, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শহুরে সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গ্রামের ভৌগোলিক পরিবেশে থাকে পুকুর, নদী-নালা, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ ইত্যাদি। কৃষি, মৎস্যচাষ, নৌকাচালানো ইত্যাদি পেশা গ্রামের সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য ভাত-মাছ এখনও গ্রামের খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জারি, সারি, বাউল, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বারমাস্যা, গম্ভীরা ইত্যাদি নানা আঞ্চলিক গানে ফুটে ওঠে গ্রামের মানুষের হাসি-কান্না। গ্রামের মেলায় ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পালাগান, যাত্রাগান, কবিগান, কীর্তনগান, মুর্শিদি গান প্রভৃতির আয়োজন আধুনিক কালেও গ্রামের অনন্যতা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে শহরের ভৌগোলিক পরিবেশ, পেশা, যান্ত্রিক জীবন ইত্যাদি গড়ে তুলেছে শহুরে সংস্কৃতি। বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির পাশাপাশি এখানে প্রবেশ করেছে আধুনিক দালান কোঠা ও প্রচুর যান্ত্রিক গাড়ি। বিশ্বায়নের প্রভাব শহরে বেশি।
একইভাবে বিভিন্ন পেশার মানুষ গড়ে তোলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা। উৎসব-পার্বণ পালনে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। নারী-পুরুষের পোশাক, জীবনাচার, চিন্তা-ভাবনার মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে।
আদিকাল থেকেই বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর শব্দভাণ্ডারের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের ভাষিক সংস্কৃতি। অস্ট্রো-এশীয়, দ্রাবিড়ীয়, তিব্বতি-বর্মী, ইন্দো-ইউরোপিয়ান ইত্যাদি নানা ভাষা পরিবার মিলে তৈরি হয়েছে আমাদের ভাষারীতি। পরবর্তীকালে ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ফরাসি, ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছ থেকেও আমাদের ভাষা গ্রহণ করেছে অনেক শব্দ ও রীতি। সামগ্রিক বিচারে বাংলাদেশের সংস্কৃতি অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানবতাবাদী- যা আমরা পূর্ববর্তী পাঠে জেনেছি। নানাভাবে এর প্রমাণ আমরা পাই। চৈত্রসংক্রান্তি মেলা যেমন আমাদের চিরায়ত কৃষিসংস্কৃতির পরিচায়ক, একইভাবে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন উৎসব যেমন- গারোদের ওয়ানগালা, সাঁওতালদের সোহরাই আমাদের কৃষি সংস্কৃতির সমান অংশীদার। মণিপুরি নৃত্য, উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঝুমুর নৃত্য, ত্রিপুরাদের বোতল নৃত্য ইত্যাদি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও বুঝুমুর তালে লিখেছেন অনেক গান।
সুতরাং প্রতিনিয়ত অন্য সংস্কৃতির উপাদান গ্রহণ, বর্জন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে চর্চা করব এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
| কাজ: দলে ভাগ হয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতির ধরন চিহ্নিত কর। |
Read more