মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। কেউ চিরদিন এ জগতে বেঁচে থাকেন না। মানুষের কর্মই মানুষকে অমরত্ব দান করে। পৃথিবীতে যুগে যুগে অনেক স্মরণীয় ও বরণীয় মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁদের আলোয় জগৎ আলোকিত হয়েছে। এজন্য মানুষ তাঁদের শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে এবং ভক্তি করে। তাঁদের নির্মল চরিত্র সহজেই মানুষের হৃদয় জয় করে নেয়। জ্ঞানে, গুণে ও কর্মে তাঁরা মহান। এ সকল মহৎ ব্যক্তির জীবন সকলের অনুকরণীয়। মহৎ মানুষের জীবনকথা সৎ জীবন যাপনের প্রেরণা এ অধ্যায়ে আমরা কয়েকজন থের-থেরী ও বিশিষ্ট বৌদ্ধ মনীষীদের জীবনী পড়ব এবং তাঁদের অবদান সম্পর্কে জানব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- জীবনচরিত পাঠের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করতে পারব;
- থের-থেরী ও বিশিষ্ট বৌদ্ধ মনীষীদের পরিচয় দিতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
কমলা তার বন্ধুদের দেওয়া উপহার সামগ্রী ত্যাগ করে জ্ঞানীর কাছে দীক্ষা নিলেন। তিনি জ্ঞানীর কাছাকাছি থেকে দীক্ষা নিতে থাকলেন।
কমলা তার বন্ধুদের দেওয়া উপহার সামগ্রী ত্যাগ করে জ্ঞানীর কাছে দীক্ষা নিলেন। তিনি জ্ঞানীর কাছাকাছি থেকে দীক্ষা নিতে থাকলেন।
উপালির জন্ম কপিলাবস্তুর নিম্নকুলের নাপিত বংশে। তাঁর গৃহী নাম ছিল পূর্ণ। তাঁর মাতার নাম ছিল মস্তানী। পূর্ণ ছিলেন অনুরুদ্ধ, ভৃগু, কেম্বিল, ভদ্দীয়, আনন্দ, দেবদত্ত প্রমুখ রাজপুত্রের সহচর।
বুদ্ধ এক সময়ে অনুপ্রিয় নামক স্থানের আম্রবনে অবস্থান করছিলেন। সে সময় কয়েকজন রাজপুত্র ঠিক করলেন তাঁরা একত্রে বুদ্ধের নিকট গিয়ে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করবেন। এই ভেবে একদিন তাঁরা বুদ্ধের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। পূর্ণও তাঁদের সঙ্গী হলেন। কপিলাবস্তু থেকে কিছু দূরে এসে তাঁরা থামলেন। তারপর সকলে নিজেদের মূল্যবান পোশাক খুলে পূর্ণের হাতে তুলে দিলেন। তাঁরা বললেন, 'পূর্ণ! এসব তোমাকে দিলাম। তুমি কপিলাবস্তুতে ফিরে যাও।' এ বলে রাজপুত্ররা চলে গেলেন। পূর্ণ তখন ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। ভাবতে লাগলেন, কপিলাবস্তুতে ফিরে গিয়ে রাজপুত্রদের সংসার ত্যাগের কথা কীভাবে জানাবেন? তিনি আরও ভাবলেন, নাপিত বংশে আমার জন্ম। এই মূল্যবান পোশাক আমার উপযুক্ত নয়। তাছাড়া তাঁরা রাজপুত্র। তাঁদের বিপুল অর্থ, ধনসম্পদ, প্রভাব ও প্রতিপত্তি আছে। এসব ছেড়ে তাঁরা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করতে পারলে আমি কেন পারব না? আমার তো কিছুই নেই। এ বলে তিনি মূল্যবান পোশাকগুলো একটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে

রাজকুমারদের পথে পা বাড়ালেন। ইতোমধ্যে অনুরুদ্ধ, ভৃগু, আনন্দ প্রমুখ রাজকুমারগণ বুদ্ধের কাছে গিয়ে প্রব্রজ্যাধর্মে দীক্ষিত হওয়ার প্রার্থনা জানালেন। এমন সময় পূর্ণও এসে বুদ্ধকে কন্দনা করে প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করলেন। তখন রাজকুমারগণ বুদ্ধকে অনুরোধ করে বললেন, 'ভন্তে! আগে পূর্ণকে প্রব্রজ্যা দিন। তাহলে তাকে আমরা প্রণাম ও সম্মান করতে বাধ্য হবো। এতে আমাদের বংশমর্যাদা ও অহংকার দূর হবে।'
তাঁদের অনুরোধ শুনে বুদ্ধ খুশি হলেন। বুদ্ধ প্রথমে পূর্ণকে এবং পরে রাজকুমারদের প্রব্রজ্যা দান করেন। প্রব্রজ্যা গ্রহণ করার পর পূর্ণের নাম হয় উপালি।
প্রব্রজ্যা গ্রহণের কয়েক দিন পরই উপালি বুদ্ধের নিকট অরণ্যে বসবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু বুদ্ধ তাঁকে বুদ্ধের সঙ্গে থেকে ধর্ম বিনয় অনুশীলন করতে বললেন। উপালি বুদ্ধের উপদেশ অনুসরণ করে অতি অল্প সময়ে অর্হত্ব ফল লাভ করতে সমর্থ হলেন। বুদ্ধের সঙ্গে থেকে উপালি বিনয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন। বিনয়ে দক্ষতা দেখে বুদ্ধ তাঁকে 'বিনয়ধর' (নীতিজ্ঞানে সর্বশ্রেষ্ঠ) বলে ঘোষণা করেন।
একদিন উপোসথ দিবসে প্রাতিমোক্ষ আবৃত্তিকালে উপালি ভিক্ষুদের নিম্নরূপ উপদেশ দান করেন, 'প্রথম শিক্ষার্থী নব প্রব্রজিত কর্মফল ও রত্নত্রয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে গৃহ হতে বের হয়ে শুদ্ধ জীবন যাপনকারী, শৌর্যবান কল্যাণমিত্রের নিকট উপস্থিত হবেন। সঙ্ঘের মধ্যে বাস করবেন। জ্ঞানী ভিক্ষু বিনয় শিক্ষা করবেন। যোগ্য অযোগ্য বিষয়ে সুদক্ষ হবেন এবং তৃষ্ণা উৎপাদন না করে বাস করবেন।'
বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর আয়োজিত প্রথম মহাসঙ্গীতিতে উপালি বিনয় আবৃত্তি করেন। সেই মহাসঙ্গীতিতে পাঁচশত মহাজ্ঞানী অর্হৎ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা উপালির আবৃত্তি করা বিনয়ের যথার্থতা পরীক্ষা- নিরীক্ষা করেন। পরে এগুলো বিনয়পিটক নামে সংকলিত করা হয়। বুদ্ধ প্রদত্ত বিনয়ধর অভিধার মর্যাদা রাখতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। এটি তাঁর জীবনের পরম গৌরব। প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায় থাকলে মানুষের জীবনে অনেক কিছু করা সম্ভব। এর জন্য বংশমর্যাদার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সৎ কর্ম করার প্রচেষ্টা। উপালি থের র জীবনী থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই।
অনুশীলনমূলক কাজ |
মহৎ ও আদর্শসম্পন্ন জীবনচরিত মানুষকে আকৃষ্ট করে। আদর্শিক জীবন গঠনে প্রেরণা জোগায়। বহু ত্যাগ- তিতিক্ষার মাধ্যমে এরূপ জীবন অর্জিত হয়। থের-থেরী ও বিশিষ্ট বৌদ্ধ মনীষীদের জীবনচরিতে এই শিক্ষা পাওয়া যায়। এতে অনেক অনুশীলনীয় বিষয় রয়েছে, যা সকল শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষকে সৃষ্টিশীল কল্যাণ চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
জগতে সহজে কিছু লাভ করা যায় না। একাগ্রতা, অধ্যবসায়, ত্যাগ ও সংযম ছাড়া মহৎ জীবন গঠন করা সম্ভব নয়। চরিত্রের এই গুণগুলো জীবনের গতির সাথে ধীরে ধীরে অর্জন করতে হয়। থের-থেরী ও বিশিষ্ট বৌদ্ধ মনীষীদের জীবনচরিত পাঠে দেখা যায়- তাদের জীবনেও সুখ, দুঃখ, হাসি-কান্না ও বেদনা ছিল। কিন্তু তাঁরা কখনো আনন্দে বিভোর ও দুঃখে বিমর্ষ হয়ে আদর্শচ্যুত হননি। নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষাই ছিল তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তাঁরা ছিলেন মহৎ ও মহানুভব। আমাদের জীবনও সুন্দরভাবে গঠন করার লক্ষ্যে তাঁদের জীবনী পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এগুলো পাঠের মাধ্যমে আমাদের আদর্শিক চেতনা ও নৈতিকবোধ আরো সমৃদ্ধ হবে। তাই থের-থেরী ও বিশিষ্ট বৌদ্ধ মনীষীদের জীবনচরিত পাঠ করা একান্ত প্রয়োজন।
ত্রিপিটক সাহিত্যে অনেক নারী-পুরুষের জীবনী পাওয়া যায়, যাঁরা কর্মগুণে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে সংসার ত্যাগ করে ভিক্ষু বা ভিক্ষুণী হয়েছেন। ভিক্ষুদের থের আর ভিক্ষুণীদের থেরী বলা হয়। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারে তাঁদের অনেক অবদান রয়েছে। থেরদের মধ্যে উপালি ও আনন্দ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। থেরীদের মধ্যে মহাপ্রজাপতি গৌতমী, কৃশাগৌতমী, ক্ষেমা বিশেষভাবে স্মরণীয়। এছাড়া অনেকে গৃহীজীবন যাপন করে বৌদ্ধধর্মের সেবা করেছেন। ধর্ম প্রচার করতে সাহায্য করেছেন। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে তাঁরা বিশিষ্ট বৌদ্ধ উপাসক নামে খ্যাত। এঁদের মধ্যে রাজা বিম্বিসার, অজাতশত্রু, অনাথপিণ্ডিক, বিশাখা, সুজাতা, মল্লিকা প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
অনুশীলনমূলক কাজ |
আনন্দের জন্ম শাক্যরাজ বংশে। তিনি রাজকুমার সিদ্ধার্থের কাকাতো ভাই ছিলেন। তাঁর পিতার নাম অমিতোদন। সিদ্ধার্থ ও আনন্দ একই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অনুরুদ্ধ, ভৃগু, ভদ্দীয় ও অন্যান্য শাক্য রাজকুমারদের সাথে তিনি একই দিনে বুদ্ধের কাছে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। আনন্দ সুপুরুষ ছিলেন। তিনি বুদ্ধের প্রিয় শিষ্য ছিলেন এবং আটটি শর্তের মাধ্যমে বুদ্ধের প্রধান সেবকের পদ লাভ করেছিলেন। তিনি ভালো বক্তা ছিলেন। দৈহিক সৌন্দর্য ও সুন্দর ব্যবহারের জন্য সকলেই তাঁকে ভালোবাসতেন।
বুদ্ধের বয়স যখন ৫৫ বছর, তখন তাঁর একজন স্থায়ী সেবকের দরকার হয়। সারিপুত্র, মৌগল্লায়ান এবং আনন্দসহ অনেকেই বুদ্ধের সেবক হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বুদ্ধ জানতেন, আনন্দ কল্পকাল ধরে এই পদের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করে আসছেন। আনন্দ তখন মাত্র স্রোতাপত্তি ফল লাভ করেছিলেন। বুদ্ধ তাই আনন্দ থেরকে সেবক পদে নিযুক্ত করেন। সেদিন থেকে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভ পর্যন্ত আনন্দ সব সময় বুদ্ধের সঙ্গে ছিলেন। তথাগত বুদ্ধ আনন্দকে সম্বোধন করে ভিক্ষুসঙ্ঘের উদ্দেশ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েছেন এসব উপদেশ 'মহাপরিনির্বাণ' সূত্রে পাওয়া যায়। আনন্দ থের অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে বুদ্ধের সেবা করতেন। বুদ্ধ যখন উপদেশ দিতেন, তিনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনতেন। সব উপদেশ মনে রাখতেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল খুবই প্রখর। তিনি বুদ্ধের যেকোনো উপদেশ প্রয়োজনে হুবহু অন্যকে বলতে পারতেন। এ জন্য তিনি 'ধর্মভান্ডারিক' ও 'শ্রুতিধর' ভিক্ষু নামে খ্যাত হন।
বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের অল্পকাল পরেই রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহায় প্রথম মহাসঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়। মহাসঙ্গীতিতে একমাত্র অর্হৎ ভিক্ষুদেরই প্রবেশাধিকার ছিল। তবে বুদ্ধের সেবক ও শ্রুতিধর হিসেবে আনন্দের জন্য একটি আসন সংরক্ষিত ছিল। এ আমন্ত্রণ পেয়ে আনন্দ মহাসঙ্গীতির পূর্বরাতে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। সেই রাতেই তিনি অর্হত্ব ফলে উন্নীত হন। অর্হত্ব লাভ করে তিনি ভিক্ষুদের অনেক উপদেশ প্রদান করেন। নিম্নে দুটি উপদেশ তুলে ধরা হলো:
১. কর্কশ বাক্যভাষী, ক্রোধী, অহংকারী এবং সংঘভেদকারী ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে না, তাদের সঙ্গী হওয়া উচিত নয়।
২. শ্রদ্ধাবান, শীলবান, জ্ঞানবান ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে। তাঁদের সঙ্গ উত্তম।
এদিকে মহাসঙ্গীতি উপলক্ষে সম্মেলনকক্ষে সকল অর্হৎ ভিক্ষু সমবেত হন। শুধু আনন্দ থের ছিলেন অনুপস্থিত। মহাসঙ্গীতি শুরু হলো। হঠাৎ সকলেই দেখলেন আনন্দ তাঁর আসনে বসে আছেন। সকলের মন খুশিতে ভরে উঠল। কথিত আছে, তিনি আকাশপথে এসে তাঁর জন্য রাখা নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম মহাসঙ্গীতিতে আনন্দ ধর্ম (সূত্র ও অভিধর্ম) আবৃত্তি করেছিলেন।
ভিক্ষুণী সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠায় আনন্দের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মহারাজ শুদ্ধোদনের মৃত্যুর পর মহাপ্রজাপতি গৌতমী বুদ্ধের কাছে গিয়ে প্রব্রজ্যা গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু বুদ্ধ প্রথমে এতে সম্মত হননি। পরে আনন্দের প্রবল অনুরোধে নারীদেরও সঙ্ঘে প্রবেশাধিকার অনুমোদন করেন। সে সময়ে নারীদের ভিক্ষুণী পদের মর্যাদা প্রদান করা খুবই কঠিন ছিল। নারীদের গৃহে থাকাই ছিল সামাজিক প্রথা। তাই বলা হয়, মাতৃজাতিকে ধর্মীয় ক্ষেত্রে মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিতকরণে আনন্দ থের র ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
অনুশীলনমূলক কাজ |
বুদ্ধের সময়ে কৃশা গৌতমী শ্রাবস্তী নগরের এক গরিবের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম ছিল গৌতমী। তাঁর দেহ অত্যন্ত কৃশ হওয়ায় তিনি কৃশা গৌতমী নামে অভিহিত হন। তাঁর বিবাহিত জীবনে তিনি সুখ লাভ করতে পারেননি। অনাদর-অবহেলায় কেটেছে তাঁর জীবন। অসময়ে তাঁর স্বামীও মৃত্যুবরণ করেন। লোকে তাঁকে অনাথা বলত। কিন্তু এক পুত্রসন্তান প্রসব করে তিনি সম্মান লাভ করেন। পুত্রটিই ছিল তাঁর একমাত্র আশা-ভরসা। পুত্রটি বড় হয়ে ক্রমে কৈশোরে উত্তীর্ণ হলে হঠাৎ তারও মৃত্যু হয়। পুত্রের মৃত্যুতে তিনি শোকে পাগল হয়ে যান। একমাত্র পুত্রের মৃত্যু তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। সকলের কাছে মৃত সন্তানকে বাঁচানোর জন্য ঔষধ ভিক্ষা চাইলেন। ঔষধ কেউ দিতে পারলেন না। বরং নগরবাসী কেউ কেউ তাঁকে পাগল বলে ভৎর্সনা করলেন। কৃশা গৌতমী কারো কথাতেই ভ্রূক্ষেপ করলেন না। সন্তানকে বাঁচানোর আশায় তিনি ছুটে চললেন প্রত্যেকের দুয়ারে দুয়ারে। অবশেষে এক মহৎ ব্যক্তি তাঁকে তথাগত বুদ্ধের

কাছে গিয়ে ঔষধ প্রার্থনা করতে বললেন। অতঃপর কৃশা গৌতমী মৃত সন্তান কোলে নিয়ে বুদ্ধের নিকট উপস্থিত হন। উপস্থিত হয়ে তিনি বুদ্ধকে বললেন, 'ভগবান! আমার সন্তানের জন্য ঔষধ দিন।' বুদ্ধ কৃশা গৌতমীর দিকে তাকালেন এবং ধ্যান চেতনায় দেখলেন কৃশা গৌতমীর পূর্বজন্মের অনেক সুকৃতি আছে। কিন্তু এ জন্মের নানাবিধ কর্ম ও কর্মফলে তার হৃদয় কষ্টে ভরপুর। বুদ্ধ তার মানসিক অশান্তি দূর করার জন্য তাঁকে বললেন; 'নগরে গিয়ে এমন একটি ঘর থেকে সরিষাবীজ নিয়ে এসো, যে ঘরে কখনো কোনো মানুষের মৃত্যু হয়নি।' বুদ্ধের কথা শুনে কৃশা গৌতমী কিছুটা শান্ত হন এবং মৃত পুত্রকে বুকে নিয়ে তিনি নগরে প্রবেশ করেন। তিনি প্রতিটি ঘরের দরজায় গিয়ে সরিষাবীজ ভিক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, ঐ ঘরে কোনো মৃত্যু ঘটেছে কি না। সকল ঘরে একই উত্তর পেল, এখানে কত মৃত্যু হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তিনি বুঝতে পারলেন, কোনো ঘরই মৃত্যুর করাল গ্রাস থেকে মুক্ত নয়। 'জন্ম হলেই মৃত্যু অনিবার্য। সর্ব বস্তু অনিত্য।' অতঃপর পুত্রের সৎকার করে তিনি বুদ্ধের নিকট ফিরে যান। বুদ্ধ জিজ্ঞাসা করেন, 'গৌতমী! সরিষাবীজ পেয়েছ কি? কৃশা গৌতমী বললেন, 'ভগবান! সরিষাবীজের আর প্রয়োজন নেই। আমাকে দীক্ষা দিন।' তখন বুদ্ধ তাকে বললেন, 'বন্যার স্রোত যেমন গ্রাম, নগর ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি ভোগবিলাসে রত মানুষও মৃত্যুর মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায়।' বুদ্ধের উপদেশ শুনে কৃশা গৌতমী স্রোতাপত্তি ফল লাভ করে ভিক্ষুণীধর্মে দীক্ষা প্রার্থনা করেন। দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি খুব ভালোভাবে ভিক্ষুণী জীবনের নিয়ম পালন করেন। সকল প্রকার লোভ, হিংসা, মোহ, তৃষ্ণা ক্ষয় করে তিনি অর্হত্বপ্রাপ্ত হন। বুদ্ধ তাঁকে অমসৃণ বস্ত্র পরিধানকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করেন। স্বীয় সাফল্যে উল্লসিত হয়ে তিনি অনেক গাথা ভাষণ করেছিলেন।
তাঁর কিছু উপদেশ নিচে তুলে ধরা হলো:
১) সাধু ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করা জ্ঞানীগণ প্রশংসা করেন। সাধু ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে জ্ঞানী হওয়া যায়।
২) সৎ মানুষের অনুসরণ করো। এতে জ্ঞান বর্ধিত হয়।
৩) চতুরার্য সত্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করো।
৪) আমি আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, নির্বাণ উপলব্ধি করেছি।
৫) আমি বেদনা মুক্ত, ভার মুক্ত। আমার চিত্ত সম্পূর্ণ মুক্ত।
অনুশীলনমূলক কাজ |
হিমালয়ের পাদদেশে ছিল কপিলাবস্তু রাজ্য। এই রাজ্যে শাক্য জাতি বাস করত। সিদ্ধার্থ গৌতমের পিতা শুদ্ধোদন ছিলেন শাক্যদের রাজা। শাসনকার্য পরিচালনায় সুবিধার জন্য রাজ্যটি কয়েকজন নায়কের অধীন বিভক্ত ছিল। তেমনি এক নায়ক ছিলেন ক্ষেমক। নন্দা ছিলেন ক্ষেমকের প্রধান স্ত্রীর কন্যা। নন্দা অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন। তাই তাঁর নাম হয় অভিরূপা নন্দা।
নন্দা বিবাহযোগ্যা হলে বহু ধনী ব্যক্তির পুত্র বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। অনেক বিচার-বিবেচনা করার পর নন্দা এক শাক্য যুবককে পছন্দ করলেন। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য! সেই দিনই সেই শাক্য যুবকের মৃত্যু হয়। সমাজে তখন তা অমঙ্গল হিসেবে বিবেচিত হতো। নন্দার মা-বাবাও ভীষণ মর্মাহত হন। তাঁরা ঠিক করলেন নন্দাকে সংসারধর্মে আবদ্ধ না রাখতে। অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য তাঁকে প্রব্রজিত করলেন। প্রব্রজিত হলেও নন্দা তাঁর রূপের জন্য খুব অহংকার করতেন। মস্তক মুন্ডিত করে ভিক্ষুণীর বেশ গ্রহণে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। কিন্তু পরিবারের সিদ্ধান্তে বাধ্য হয়ে নন্দা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন।
প্রব্রজ্যা গ্রহণের পর নন্দার নতুন জীবন শুরু হলো। নন্দা এখন ভিক্ষুণী। কিন্তু ভিক্ষুণী হলেও তিনি রূপের অহংকার করতেন। উপদেশ শোনার জন্য প্রতিদিন অনেক ভিক্ষুণী বুদ্ধের নিকট যেতেন। কিন্তু নন্দা বুদ্ধের সামনে যেতে ভয় পেতেন। কারণ তিনি মনে করতেন, বুদ্ধ তাঁর মনোভাব জেনে তাঁকে সকলের সামনে ভর্ৎসনা করতে পারেন। এই ভয়ে তিনি সবসময় বুদ্ধকে এড়িয়ে চলতেন। বুদ্ধ জানতেন, নন্দা জ্ঞান লাভের উপযুক্ত। তিনি নন্দাকে ডেকে আনেন। সে সময় বুদ্ধ দিব্যশক্তিতে নন্দার চেয়ে অপরূপ সুন্দরী নারীকে উপস্থিত করেন। সে নারীর সৌন্দর্য দেখে নন্দা হতভম্ব হয়ে যান। এক দৃষ্টিতে নন্দা চেয়ে রইলেন সেই সুন্দরী নারীর দিকে। বুদ্ধ দিব্যশক্তিতে সুন্দরী নারীকে পুনরায় বৃদ্ধ, জরা, শীর্ণ অবস্থায় পরিণত করলেন। সেই দৃশ্য নন্দার মনে আঘাত করল। তাঁর রূপের মিথ্যা অহংকার নিমেষেই ধ্বংস হয়ে গেল। তখন বুদ্ধ তাঁকে অহংকার পরিত্যাগ করার জন্য উপদেশ দেন। বুদ্ধের উপদেশ শুনে তিনি বুঝতে পারলেন; রূপ ক্ষণস্থায়ী, অন্তরের সৌন্দর্যই চিরস্থায়ী। অতঃপর তিনি তৃষ্ণামুক্ত হয়ে অর্হত্বপ্রাপ্ত হন এবং উপদেশস্বরূপ বলেন; 'এই দেহ অশুচি এবং ব্যাধির আগয়। এতে অহংকারের কিছুই নেই। অনিষ্টকর অহংকার পরিত্যাগ করো। মনকে শান্ত ও সংযত করো।'
নন্দার জীবনী থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে রূপের জন্য অহংকার করা উচিত নয়। সৎ জ্ঞানই মানুষের পরম সম্পদ।

অনুশীলনমূলক কাজ |
যুগে যুগে বাংলাদেশে বহু জ্ঞানী পণ্ডিত ও মনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁরা নিজ গুণে বিশ্বের ইতিহাসে শ্রদ্ধার আসন লাভ করেছেন। অমর হয়ে আছেন মানুষের মনের মধ্যে। সেই রকম এক মনীষী অতীশ দীপঙ্কর। অতীশ দীপঙ্কর বাংলাদেশের লোক ছিলেন। ৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন ঢাকা জেলার অন্তর্গত বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে তাঁর জন্ম। এটি বর্তমানে ঢাকা বিভাগের মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। অতীশের বাস্তুভিটাটি এখনও বিদ্যমান।

বজ্রযোগিনীর সেই ঐতিহাসিক স্থানটিতে অতীশ দীপঙ্করের নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এটি করেছে 'বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ' নামক একটি সংগঠন। চীনসহ অনেক দেশ থেকে অনেক লোক এই বাস্তুভিটাটি দেখতে আসেন।
অতীশের পিতার নাম ছিল কল্যাণশ্রী। মাতার নাম প্রভাবতী। জন্মের পর মা-বাবা আদর করে তাঁর নাম রাখেন চন্দ্রগর্ভ। তাঁদের পরিবার ছিল অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী। বজ্রযোগিনী গ্রামে এখনও তাঁর বসতভিটার চিহ্ন রয়েছে। সেখানকার লোকেরা সেই স্থানটিকে বলেন নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা। চন্দ্রগর্ভ শৈশবকাল থেকেই খুবই মেধাবী ছিলেন। জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। খুব অল্প সময়েই তিনি সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্র এবং কারিগরি বিদ্যায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য চলে গেলেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি কঠোর অধ্যবসায়গুণে নানা শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করেন। চন্দ্রগর্ভ ঊনত্রিশ বছর বয়সে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তখন তাঁর নতুন নাম হয় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। একত্রিশ বছর বয়সে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সুবর্ণ দ্বীপে যান। তাঁর সঙ্গে ছিল শতাধিক শিষ্য। সেখানে তিনি দীর্ঘ বার বছর বৌদ্ধধর্ম বিষয়ে শিক্ষালাভ করেন।
তারপর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান দেশে ফিরে আসেন। তখন বাংলাদেশের রাজা ছিলেন নয়াপাল। রাজার অনুরোধে তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহারের অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যও ছিলেন।
তাঁর পাণ্ডিত্যের কথা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ে তিব্বতে বৌদ্ধধর্মে নানারকম অনাচার প্রবেশ করে। তিব্বতের রাজা দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের অগাধ পান্ডিত্যের কথা শুনে তাঁকে তিব্বতে আমন্ত্রণ জানান। রাজার ধারণা ছিল, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে নিয়ে যেতে পারলে সে দেশের মানুষের প্রকৃত ধর্মীয় চেতনার বিকাশ ঘটবে।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান রাজার আমন্ত্রণে প্রথম সাড়া দেননি। কিন্তু পরে তিনি রাজি হন। আনুমানিক ১০৪১ সালে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতের উদ্দেশে রওয়ানা হন।

সে সময় তিব্বতে যাওয়ার পথ সুগম ছিল না। অনেক কষ্টে হিমালয়ের দুর্গম পথ অতিক্রম করে তিনি তিব্বতে প্রবেশ করেন। তিব্বত সীমান্তে অপেক্ষারত রাজপ্রতিনিধিরা দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে বিপুল সংবর্ধনা জানান। তিনি তিব্বতের প্রধান প্রধান শহর, নানা গ্রাম ঘুরে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। তাঁর পাণ্ডিত্য ও ব্যবহারে লোকে মুগ্ধ হতো। তিব্বতের লোকেরা তাঁর ধর্মদেশনা শুনে আস্তে আস্তে ফিরে পেল প্রকৃত ধর্মীয় চেতনা। ধর্মে যেসব অনাচার প্রবেশ করেছিল, সেগুলো তারা পরিত্যাগ করল।
বিক্রমশীলা ত্যাগ করার সময় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বলে গিয়েছিলেন তিব্বতে তিনি মাত্র তিন বছর থাকবেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে দেশে আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত তিব্বতেই থেকে গেলেন। তিব্বতের মানুষকে তিনি খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিব্বতিরাও তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতেন এবং ভালোবাসতেন।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতি ভাষায় বহু ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করেন। তা ছাড়া অনেক বই সংস্কৃত থেকে তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। চিকিৎসা ও কারিগরি বিদ্যা সম্পর্কেও তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন।
তিব্বতের ক্রাথাং বিহারে তাঁকে 'অতীশ' উপাধি প্রদান করা হয়। 'অতীশ' খুব সম্মানজনক উপাধি। ১০৫৪ সালে তিব্বতের এ্যাথাং বিহারে ৭৩ বছর বয়সে এই মহাপণ্ডিত মৃত্যুবরণ করেন। অতীশের দেহভস্ম সেই বিহারে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে সংরক্ষিত আছে। ১৯৭৮ সালে চীন থেকে তাঁর দেহভস্মের কিছু অংশ বাংলাদেশে আনা হয়। ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে এগুলো সংরক্ষিত আছে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
কোনো মহৎ জীবনই সহজে গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রচেষ্টা ও সাধনা করতে হয়। যাঁরা এরূপ কীর্তিমান জীবন গঠনে সক্ষম হন, তাঁরা অমরত্ব লাভ করেন। ইতিহাসে তাঁরা অমর হয়ে থাকেন। যুগ-যুগান্তরের মানুষ তাঁদের আদর্শ ও গুণাবলি অনুশীলন করেন। মহৎ মানুষের জীবনাদর্শে আমাদের অনুসরণীয় অনেক বিষয় রয়েছে। তাই এই জীবনীসমূহ পাঠ করে শুধু মানসিক আনন্দ লাভ করলেই হবে না, আদর্শিক দিকগুলোও আমাদের অনুশীলন করতে হবে। আবেগে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। একাগ্র অনুশীলন ও অনুসরণের মাধ্যমেই একমাত্র লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়। গৌতম বুদ্ধ নৈতিকতার আদর্শ অনুসরণে জীবনকে সুন্দর করার জন্য অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন।
বুদ্ধের সময়ে বক্কলি নামে একজন মুনি ছিলেন। তিনি বুদ্ধের খুবই ভক্ত ছিলেন। তিনি সর্বদা বুদ্ধের জ্যোতির্ময় দেহাবয়বের দিকে ভক্তিচিত্তে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকতেন। ভগবান বুদ্ধ দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করে একসময় তাঁকে ডেকে বললেন; এই ধ্বংসশীল দেহাবয়বের দিকে চেয়ে থেকে ফল কী? নীতি-আদর্শ অনুসরণ করো। আবেগ ত্যাগ করো। নিজের মধ্যে জ্যোতির্ময় আলোক উৎপাদনের বীজ বপন করো। নিজেকে আলোকময় করে গড়ে তোলো। বুদ্ধের এই উপদেশ লাভ করে বক্কলি ঋষি সাধনায় রত হলেন এবং অচিরেই অর্হত্ব ফলে উন্নীত হন।
অনুরুপ আর একটি ঘটনা জানা যায়। তখন বুদ্ধ উরুবিল্ব নগরে পরিভ্রমণ করছিলেন। সে সময় উরুবিল্ব বনে বাস করতেন তিনজন ঋষি। উরুবেলাকশ্যপ, নদীকশ্যপ ও গয়াকশ্যপ তিন ভাই। তাঁরা নিজ নিজ শিষ্য নিয়ে পৃথক পৃথকভাবে সেখানে বাস করতেন। তাঁরা কারো নীতি অনুসরণ করতেন না। নিজেদের ধারণা মতে গরমে ও আগুনে তপ্ত হয়ে এবং ঠান্ডায় পানিতে ডুবে থেকে দুঃখ মুক্তির চেষ্টা করতেন। বুদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ হলে বুদ্ধ তাঁদের উপদেশ দেন।
বুদ্ধ বলেন, পানিতে ভিজে বা রোদে পুড়ে মানুষ পরিশুদ্ধ হতে পারে না। বুদ্ধ তাঁদের কাছে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বর্ণনা করেন। তারপর বলেন, জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে হলে আদর্শ ও নৈতিকতার অনুশীলন আবশ্যক। পরে তাঁরা বুদ্ধের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে মুক্তি অন্বেষণে ব্রতী হন।
সুতরাং মহৎ জীবন গঠনের জন্য মহৎ আদর্শের অনুসরণ আবশ্যক। আমাদের জীবনকে খ্যাতিসম্পন্ন ও জ্যোতির্ময় করার জন্য আলোকিত ব্যক্তিদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজন। থের-থেরী ও বিশিষ্ট বৌদ্ধ মনীষীরা আদর্শের পথিকৃৎ। তাঁদের জীবনচরিত থেকে তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, অধ্যবসায়, সংযম ও অনুশীলনীয় নীতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারি। তাঁদের জীবনীর এই অনুসরণীয় দিকগুলো সঠিকভাবে অনুশীলন করতে পারলে সকলের জীবন সার্থক ও সফল হবে।
Read more