বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান (দশম অধ্যায়)

বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1.4k

বাংলাদেশের বৌদ্ধ সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রাচীন ইতিহাস এবং ঐতিহ্য অত্যন্ত গৌরবের। কালের পরিক্রমায় এগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। খননকার্যের ফলে এসব ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাচীন অনেক মূল্যবান নিদর্শন ও প্রত্নসামগ্রী আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর সঙ্গে বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বৌদ্ধ রাজন্যবর্গের অনেক কীর্তি জড়িত আছে। বাংলাদেশ সরকার এসব ধ্বংসস্তূপ ও আবিষ্কৃত দ্রব্যাদি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করছে। এছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক অপূর্ব সুন্দর বৌদ্ধবিহার, বুদ্ধমূর্তি ও চৈত্য আছে। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক লোক এগুলো দেখতে আসে। তাই এগুলো বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান হিসেবে খ্যাত। এগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সভ্যতার ইতিহাস। এসব স্থান বৌদ্ধদের নিকট খুবই পবিত্র এবং প্রিয়। এগুলো দর্শন করলে মনের প্রসারতা বৃদ্ধি পায়। এ অধ্যায়ে বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে পড়ব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা দিতে পারব;
  • বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

লাবনী প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে জানতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করে। সে জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম বৌদ্ধবিহারটি ভ্রমণ করে এবং মার্চ মাসে কুমিল্লা শহর থেকে ৮ মাইল দূরের একটি স্থানে ভ্রমণে যায়।

বাংলাদেশে অসংখ্য বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান আছে। এগুলোর মধ্যে বিহার, চৈত্য, বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব ও দেব-দেবীর মূর্তি, স্তূপ, প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও নগরের ধ্বংসাবশেষ, ব্যবহার্য দ্রব্য, পোড়ামাটির ফলক, চিত্র, মুদ্রা, শিলালিপি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসবের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম। দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে।
খননকার্যের ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। কুমিল্লার ময়নামতিতে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ বিহার ও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে শালবন মহাবিহার, আনন্দবিহার, ভোজবিহার, রূপবান বিহার, ইটাখোলা বিহার, কৌটিল্যমুড়া, কোটবাড়ীমুড়া, চারপত্রমুড়া, ত্রিরত্নমুড়া উল্লেখযোগ্য। বগুড়া জেলায় আবিষ্কৃত বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে মহাস্থানগড়, ভাসুবিহার, গোবিন্দভিটা, বৈরাগীর ভিটা অন্যতম। নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে সোমপুর মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের আবিষ্কৃত সর্ববৃহৎ প্রাচীন বৌদ্ধবিহার। এছাড়া এ অঞ্চলে হলুদ বিহার, জগদ্দল বিহারের ধ্বংসাবশেষ আছে। দিনাজপুরে সীতাকোট বিহারের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। সম্প্রতি নরসিংদী জেলায় উয়ারী-বটেশ্বর, পঞ্চগড়ে পদ্মবিহার, এবং মুন্সিগঞ্জ জেলার রঘুনাথপুরে বিক্রমপুরী বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো আমাদের অতীত ঐতিহ্যের স্মারক। বাংলাদেশ সরকার এগুলো গুরুত্বের সঙ্গে সংরক্ষণ করছে। এসব বৌদ্ধ ঐতিহ্য দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম হয়।
আধুনিককালে নির্মিত অপূর্ব সুন্দর বৌদ্ধবিহার ও বুদ্ধমূর্তি আছে, যেগুলো বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে। বৌদ্ধবিহারগুলোর মধ্যে পাহাড়তলীর মহামুনি বিহার, রাউজানের সুদর্শন বিহার, বাগোয়ানের ফরাচিন বিহার, পটিয়ার সেবাসদন বিহার, ঠেগরপুনির বুড়া গোঁসাই বিহার, চক্রশালা বিহার, রামুর রামকোট বিহার, কক্সবাজারের অগ্‌গমেধা বিহার, রাঙামাটির চিৎমরম বিহার, রাজবন বিহার, সীতাকুণ্ডের সঙ্ঘারাম বিহার, খাগড়াছড়ির পানছড়িতে অবস্থিত অরণ্য কুটির বিহার, ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহার, বান্দরবানের স্বর্ণ মন্দির অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। এসব বিহারে স্থাপিত বুদ্ধমূর্তি ও অন্যান্য স্থাপনার নির্মাণশৈলী খুবই চমৎকার। বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন কাহিনি বিহারের দেয়ালে অঙ্কিত আছে, যা আকর্ষণীয় এবং দর্শনার্থীর মনে ধর্মভাব জাগ্রত করে। দেড় শ বছর আগে ঠেগরপুনি গ্রামের পুকুরে একটি বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। কথিত আছে যে, স্বর্ণমুদ্রার পাত্রসহ মূর্তিটি পুকুর থেকে উদ্ধার করার জন্য হারাধন বড়ুয়ার স্ত্রী নীলমনি বড়ুয়া স্বপ্নে আদেশপ্রাপ্ত হন। তাঁর স্বপ্নের বিবরণ অনুযায়ী স্বর্ণমুদ্রার পাত্রসহ মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়। মূর্তিটি অলৌকিক শক্তির অধিকারী বলে জানা যায়। এই মূর্তির নিকট যদি কেউ কুশলচিত্তে কোনো কিছু প্রার্থনা করে, তার সেই মনোবাসনা পূর্ণ হয়। অনুরূপভাবে চিৎমরমের বুদ্ধমূর্তি, মহামুনি বুদ্ধমূর্তি, বাগোয়ানের ফরাচিন মূর্তিও অলৌকিক শক্তির অধিকারী বলে বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে। তাই অনেক ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ যেকোনো শুভকাজ আরম্ভ করার আগে এসব বিহারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। বিহারগুলো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত। এসব বিহার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন পূর্ণিমা তিথিতে মেলা ও উৎসবের আয়োজন করা হয়। জাতি- ধর্মনির্বিশেষে এসব স্থানে বহু পর্যটকের সমাগম হয়। এগুলো ছাড়াও আরো অনেক বৌদ্ধবিহার, চৈত্য ও বুদ্ধমূর্তি আছে। এগুলো দেখতে খুবই সুন্দর।

অনুশীলনমূলক কাজ
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানসমূহের তালিকা তৈরি করো (দলীয় কাজ)।
আধুনিক কালের দশটি প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ বিহারের নাম লেখো।

Content added By

কুমিল্লা জেলার কেন্দ্রস্থল থেকে আট মাইল দূরে ময়নামতি অবস্থিত। ময়নামতি ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা এবং প্রায় এগারো মাইল বিস্তৃত। এই পাহাড়গুলো অতীতে বৌদ্ধবিহার, ও সস্তূপ ইত্যাদিতে পূর্ণ ছিল। খননকার্যের ফলে এখানে অনেক প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও সস্তূপের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৪৩-৪৪ সালে এ সকল নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। সে সময় এগুলো ঢিবি আকারে ছিল। স্থানীয় লোকেরা এসব ঢিবি থেকে ইট সংগ্রহ করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কুমিল্লা বিমানবন্দর তৈরির সময় ঠিকাদাররাও এসব ঢিবি থেকে ইট সংগ্রহ করত। ফলে অনেক মূল্যবান প্রত্নবস্তু নষ্ট ও হারিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সরকার ২০টি নিদর্শনকে প্রাচীন কীর্তি রক্ষা আইনে সংরক্ষিত করেছে। তার মধ্যে ময়নামতি অন্যতম। এখানে ১৯৫৫-৫৬ সালে খননকাজ চালানো হয়। অনেক প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, স্তূপ, বুদ্ধমূর্তি, স্বর্ণ ও তাম্র মুদ্রা, মৃৎফলক, আসবাবপত্র এবং শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কৃত শিলালিপি হতে জানা যায় যে, এখানে পালবংশ, খড়গবংশ, চন্দ্রবংশ, দেববংশ প্রভৃতি বংশের বৌদ্ধ রাজারা রাজত্ব করতেন। এই বৌদ্ধ রাজবংশের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ময়নামতি অঞ্চলে অনেক বৌদ্ধবিহার চৈত্য স্তূপ প্রভৃতি নির্মিত হয়। খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত ময়নামতি ছিল বৌদ্ধধর্মের প্রাণকেন্দ্র। বৌদ্ধ বিহারগুলো বিদ্যাচর্চার জন্যও প্রসিদ্ধ ছিল। এখানে বিদেশ থেকে পণ্ডিতেরা বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা করতে আসতেন।

শালবন মহাবিহার
কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার হলো শালবন মহাবিহার। খননকার্যের ফলে শালবন মহাবিহারের ধ্বংসস্তূপে একটি তাম্রলিপি পাওয়া যায়। সেই তাম্রলিপি হতে জানা যায় যে, শালবন মহাবিহারটি রাজা ভবদেব নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন দেববংশের রাজা আনন্দদেবের পুত্র। অষ্টম শতাব্দীর দিকে দেববংশ এ অঞ্চল শাসন করতেন। উক্ত বিহারের ধ্বংসাবশেষ হতে বোঝা যায়, বিহারটি ছিল বর্গাকৃতির। প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৫৫০ ফুট। বিহারের চারদিক দেয়ালবেষ্টিত। দেয়ালের উচ্চতা সাড়ে ১৬ ফুট ।

বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান

এই বিহারে ১১৫টি কক্ষ ছিল। সব কক্ষই সমান। কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস করতেন। একটি কক্ষ থেকে অপর কক্ষ ৫ ফুট পুরু দেয়াল দিয়ে পৃথক করা। উত্তর দিকে একটি মাত্র প্রবেশপথ ছিল। বিহারে প্রবেশের সিঁড়িও উত্তর দিকে ছিল। মূল বিহারটি কুশ আকৃতির। এটি ইট নির্মিত এবং বিহার অঙ্গনের মধ্যস্থলে অবস্থিত। এটি আয়তাকার। দৈর্ঘ্যে ১৬৮ ফুট, প্রস্থে ১১০ ফুট। বিহারকে বেষ্টন করে ৭ ফুট চওড়া প্রদক্ষিণ পথ রয়েছে। বিহার গাত্রের দেয়াল সারি সারি পোড়ামাটির ফলকচিত্রে অলংকৃত ছিল।
বিহারাঙ্গনে আরো অনেক স্থাপত্যের নিদর্শন আছে। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে স্তম্ভবিশিষ্ট একটি হলঘর আছে। কেন্দ্রীয় বিহারের পশ্চিমে দুটি ছোট মন্দির আছে। বিহারের বাইরে উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে ৬০ ফুট দূরে বর্গাকৃতির একটি চার কোনাকার বিহার আছে। পূজাকক্ষ বিহারের মধ্যস্থলে অবস্থিত।
খননের ফলে এখানে বহু প্রত্নসম্পদ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ৮টি তাম্রলিপি, স্বর্ণ, রৌপ্য মুদ্রা, অলংকার, ব্রোঞ্জের বুদ্ধ, ও বোধিসত্ত্বমূর্তি, নানা দেব-দেবীর মূর্তি, পোড়ামাটির অসংখ্য ফলক, অলংকৃত ইট, প্রস্তরমূর্তি, তামার পাত্র এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিসপত্র উল্লেখযোগ্য। মুর্তিগুলো খুবই সুন্দর এবং মুল্যবান।
শালবন মহাবিহার ছিল বৌদ্ধধর্ম চর্চার প্রাণকেন্দ্র। বৌদ্ধধর্ম ছাড়াও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় এই বিহারে শিক্ষা দেওয়া হতো। বিদ্যাপীঠ হিসেবে এ বিহারের খুব সুখ্যাতি ছিল। দেশ-বিদেশ থেকে পণ্ডিতেরা এখানে জ্ঞান অর্জনের জন্য আসতেন। দেববংশ, চন্দ্রবংশ ও পালবংশের রাজারাও এই বিহারের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বিহারটি চার শ বছর টিকে ছিল।

অনুশীলনমূলক কাজ
ময়নামতি কোথায় অবস্থিত?
ময়নামতিতে কখন বৌদ্ধ নিদর্শনগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল?
শালবন মহাবিহারে যেসব জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে তার একটি তালিকা প্রস্তুত করো।
শালবন মহাবিহারের একটি চিত্র অঙ্কন করো।

Content added By

জয়পুরহাট জেলার জামালগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে নওগাঁর বদলগাছী থানায় পাহাড়পুর অবস্থিত। পাল বংশের রাজারা এই অঞ্চল শাসন করতেন। এ অঞ্চলটি বৌদ্ধ সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ছিল। পাল বংশের রাজা ধর্মপাল এখানে একটি বৃহৎ বিহার নির্মাণ করেন। বিহারটির নাম 'সোমপুর মহাবিহার। এটি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম বৌদ্ধবিহার। এই বিহারের জন্য পাহাড়পুরের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। নিচে সোমপুর মহাবিহারের পরিচয় তুলে ধরা হলো।

সোমপুর মহাবিহার
খননকার্যের ফলে সোমপুর মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। বিহারটি বর্গাকৃতির। প্রায় ২৭ একর জমিজুড়ে বিহারটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই বিহারের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৯২২ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৯ ফুট। বিহারের চারদিক ইটের প্রকাণ্ড দেয়াল দিয়ে ঘেরা। বিশাল বিহারটি দুর্গের মতো দেখায়। এতে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য ১৭৭টি কক্ষ ছিল। কক্ষগুলোতে কোনো জানালা ছিল না। তবে দেয়ালের মধ্যে কুলুঙ্গি ছিল। সব কটি কক্ষ একই মাপের (১৪×১৩ ফুট)। প্রতিটি কক্ষে একটি প্রবেশপথ রয়েছে। বিহারাঙ্গনে অসংখ্য নিবেদন স্তূপ, ছোট ছোট মন্দির, পুষ্করিণী এবং অন্যান্য স্থাপনা ছড়িয়ে আছে। বিহারের কেন্দ্রস্থলে ক্রুশ আকৃতির সুউচ্চ একটি মন্দির আছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে এর ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত হয়েছে।

বিহারের প্রধান প্রবেশপথ উত্তর দিকে অবস্থিত। প্রবেশপথ ছিল বেশ বিস্তত্ব। বিহারের দেয়ালগাত্র পোড়ামাটির অপূর্ব ফলক চিত্রে অলঙ্কৃত ছিল। সহজ-সরল গ্রামীণ শিল্পীরা মাটি দিয়ে এগুলো তৈরি করেছিল। এগুলো ছিল প্রাচীন বাংলার সমাজ চিত্র। এগুলোর শিল্পমান অনন্যসাধারণ।
রাজা ধর্মপাল এ বিহারকে কেন্দ্র করে আরও পঞ্চাশটি বৌদ্ধবিহার ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে জানা যায়। এই বিহারের ধ্বংসাবশেষ থেকে খননকার্যের ফলে বহু বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব ও বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, মুদ্রা, শিলালিপি, তাম্র নির্মিত দ্রব্য, আসবাবপত্র আবিষ্কৃত হয়।
মহাপণ্ডিত বোধিভদ্র ও অতীশ দীপঙ্কর এ বিহারে অবস্থান করেন। পরে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে গিয়ে ধর্ম প্রচার এবং বহু গ্রন্থ রচনা করেন। এটি শুধু বৌদ্ধবিহারই ছিল না, বিদ্যাপীঠও ছিল। বৌদ্ধধর্ম ছাড়াও জ্ঞান- বিজ্ঞানের নানা বিষয় শিক্ষা দেওয়া হতো। দেশি-বিদেশি পণ্ডিতগণ এই বিহারে বিদ্যাশিক্ষার জন্য আসতেন। বহির্বিশ্বেও এ বিহারের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ইউনেস্কো পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারকে 'বিশ্ব ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দান করেছে।

অনুশীলনমূলক কাজ
সোমপুর মহাবিহার অঙ্গনে অবস্থিত স্থাপনাগুলোর তালিকা তৈরি করো। (দলীয় কাজ)। সোমপুর মহাবিহারে প্রাপ্ত দ্রব্যের তালিকা প্রস্তুত করো।

Content added By

কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় রামকোট বিহার অবস্থিত। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার প্রধান সড়কের প্রায় দু'ই মাইল পূর্বে প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা বিহারটি দেখতে খুবই সুন্দর। বিহারের ফটকে 'রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার' লেখা রয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে এটিকে সবাই রামকোট বনাশ্রম নামেই জানে। পণ্ডিত গবেষক ও বিভিন্ন ইতিহাসবিদের মতে, এ বিহার সম্রাট অশোকের সময়ে বা তার পরবর্তী কালে প্রতিষ্ঠিত।

সতেরোটি ছোট বড় পাহাড় দ্বারা অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে বিহারটি পরিবেষ্টিত। এখানে বিক্ষিপ্তভাবে চারদিকে ছড়ানো বহু প্রাচীন ইটের টুকরো, বুদ্ধমূর্তির ভগ্নাবশেষ, পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। বিহারটির চূড়ার উচ্চতা প্রায় ৪০ ফুট। এই অসাধারণ নির্মাণ কাজের জন্য বিহারটি অন্যতম বৌদ্ধ নিদর্শন হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।
রামকোট বিহারের দক্ষিণ পাশের অন্য একটি ছোট পাহাড়ের স্তূপ থেকে একটি মূল্যবান শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়। সেটি ডাকাত দল লুণ্ঠন করে নিয়ে যার। স্থানীয় জনসাধারণের বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই মূল্যবান শিলালিপিটি টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলা হয়েছে। স্তূপটিও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে। জানা যায়, ১৯৩০ সালে জগৎচন্দ্র মহাথের নামে মিয়ানমারের (আগের বার্মা) এক ভিক্ষু শ্রীলংকায় একখানি শিলালিপি উদ্ধার করেন। সেই শিলালিপির বর্ণনা মতে এখানে অনুসন্ধান ও খননকার্য চালানো হয়। খননকাজের ফলে বৃহৎ সঙ্ঘারামটির ধ্বংসাবশেষ ও পাথরে নির্মিত সুদৃশ্য বৃহদাকার অভয়মুদ্রার একটি বুদ্ধমূর্তি আবিষ্কৃত হয়।
প্রাচীন এ বুদ্ধমূর্তিটি এখনও রামকোট বিহারে সংরক্ষিত আছে। বিহারের চারপাশে প্রচুর পরিমাণে স্থানীয় বেলে পাথরে নির্মিত ভাস্কর্যের ভগ্নাবশেষ পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে বুদ্ধের দুটি পদচিহ্ন (পূর্ণাকার) ও ভূমিস্পর্শ মুদ্রার বুদ্ধমূর্তিটি অন্যতম।
বিহারটির দক্ষিণ-পূর্বদিকে সবচেয়ে মূল্যবান ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রত্নস্থলটি অবস্থিত। এ প্রত্নস্থলের কেন্দ্রস্থলটি আনুমানিক ৩০ ফুট উঁচু একটি টিলার ওপর অবস্থিত। গঠন প্রণালি বিবেচনা করে এটি একটি বিশাল সঙ্গারাম ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই বিহারটি চট্টগ্রামের সঙ্গে আরাকান রাজ্যের সম্পর্ক ও সংস্কৃতি বিনিময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
বর্তমানে বিহারটিতে 'অরিয়ধর্ম' নামে একটি পাঠাগার আছে। গ্রন্থসংখ্যা ছয়শর অধিক। পাঠাগারটি সকলের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
এ প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ একটি রম্যবতী নগরী ও বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যময় গৌরবগাথার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
স্থানীয় ধর্মপ্রাণ জনসাধারণ বিহারস্থ ভিক্ষু ও শ্রমণদের ব্যয়ভার সানন্দে বহন করেন। বিহারে অবস্থিত বৃহৎ বুদ্ধমূর্তিটি দর্শন করার জন্য দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক এখানে আসেন। খননকার্য চালানো হলে এখানে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তু আবিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অনুশীলনমূলক কাজ
রামকোট বিহার কোথায় অবস্থিত?
রামকোট বিহারের গঠনশৈলী বর্ণনা করো।

Content added By

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা শহরের একটি প্রসিদ্ধ বিহার হলো রাজবন বিহার। এটি ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিহারটি অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত। বিহারের মনোরম এলাকায় পশুপাখি নির্ভয়ে বিচরণ ও চলাচল করে। শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির এই বিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন। গভীর অরণ্যে ভাবনা করায় তিনি 'বনভন্তে' নামেই অধিক পরিচিত। বাংলাদেশি বৌদ্ধরা তাঁকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেন। বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণে তাঁর অনন্য ভূমিকা রয়েছে। তিনি চাকমা রাজপরিবার ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের আমন্ত্রণে ১৯৭৪ সালে রাঙামাটি জেলার লংগদু থেকে এ বিহারে আগমন করেন। রাজপরিবার কর্তৃক দানকৃত জমিসহ রাজবন বিহারের মোট আয়তন ৪৭ একর। বিহারে উপাসনা মন্দির, চৈত্য, ভিক্ষুশালা, দেশনাঘর, চংক্রমণ কুটির, ভিক্ষুসীমা, ভোজনালয়, পাঠাগার, জাদুঘর, বয়নশালা, ভিক্ষু উপগুপ্তের মূর্তি ।

বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান

সপ্তস্বর্গের প্রতীক, বোধিবৃক্ষ প্রভৃতি রয়েছে। বিহারটির নির্মাণশৈলী অপূর্ব। পার্বত্য চট্টগ্রামে বন বিহারের ষাটের অধিক শাখা আছে এবং বনভন্তের শিষ্য-প্রশিষ্যের সংখ্যা সহস্রাধিক। তাঁর শিষ্যমণ্ডলী ধূতাঙ্গশীল পালন করেন। বৌদ্ধদের নিকট এই বিহারটি তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাত। এ তীর্থস্থানে প্রতিদিন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে জনগণ এই বিহারে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা গ্রহণ করতে আসেন। এছাড়া দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এ বিহারে সন্তানের অন্নপ্রাশন, সঙ্ঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান, কঠিন চীবরদান প্রভৃতি ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান করতে আসেন।
এ বিহারে পূর্ণিমা তিথিতে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাঁকজমকপূর্ণভাবে বুদ্ধপূর্ণিমা, কঠিন চীবরদান এবং বনভন্তের জন্মদিন উদ্যাপন করা হয়। কঠিন চীবরদানের সময় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা কেটে, রং করে, কোমর তাঁতে বুনে, সেলাই করে চীবর তৈরি করা হয়। এই দৃশ্য খুবই চমৎকার। চাকমা রাজমাতা বা চাকমা রানি দিনের শুরুতে সুতা কাটা উদ্বোধন করেন এবং দিনের শেষে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্ম দেশনা প্রদানের পর চাকমা রাজা তৈরিকৃত চীবর দান করেন। এদিন প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। তখন বিহারটি একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়। বনভন্তে এবং রাজবন বিহারের খ্যাতি দেশের সীমা অতিক্রম করে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর পর্যটক এবং ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ জনসাধারণ রাজবন বিহার দর্শন করতে আসেন। বৌদ্ধ তীর্থস্থান হিসেবে এই বিহারের আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে।

অনুশীলনমূলক কাজ
রাজবন বিহার অঙ্গনে অবস্থিত স্থাপনাসমূহের একটি তালিকা প্রস্তুত করো।
কঠিন চীবরদানের সময় রাজবন বিহারে কীভাবে চীবর তৈরি করা হয় তা বর্ণনা

Content added By

দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের সুফল অনেক। দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করলে ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। মন উদার হয়। দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় অনুভূতির বিকাশ ঘটে। দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বাস্তব ধারণা সৃষ্টি হয়। দেশের সম্পদ ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রেরণা জাগে। তাই সময় পেলে মাতা-পিতা, ভাই-বোন, আত্মীয় স্বজন এবং শিক্ষকের সঙ্গে দর্শনীয় স্থানসমূহ ভ্রমণ করা উচিত।
দর্শনীয় স্থানসমূহ জাতীয় সম্পদ। এগুলো দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখে। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরে। পর্যটনশিল্প হিসেবে রাজস্ব আয় করে। তাই দর্শনীয় স্থানসমূহের গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলো সংরক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
বিভিন্ন কারণে দর্শনীয় স্থানসমূহ ধ্বংস বা নষ্ট হতে পারে। যেমন: সংরক্ষণের অভাব, অযত্ন, নদীভাঙন, বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি, তুফান, পশু-পাখির মল ত্যাগ, কীটপতঙ্গের উপদ্রব, অপ্রয়োজনীয় লতা-পাতা, গাছ পালা জন্মে বা উদ্ভিদজাত সংক্রমণ, বায়ুদূষণ, অজ্ঞ মানুষের অহেতুক কৌতূহল, লুটেরাদের দৌরাত্ম্য, যুদ্ধবিগ্রহ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতি কারণে দর্শনীয় স্থানগুলো ধ্বংস বা নষ্ট হতে পারে। তাই ওপরে বর্ণিত কারণে যাতে দর্শনীয় স্থানগুলোর ক্ষতি না হয়, সে জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। দর্শনীয় স্থানের চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দিতে হবে। দেখাশোনার ব্যবস্থা করতে হবে। সব সময় পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এ-জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণ করার জন্য সর্ব-সাধারণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের অগ্রণী ভূমিকা থাকা দরকার।

অনুশীলনমূলক কাজ
দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের সুফলগুলো লেখো।
দর্শনীয় স্থান ধ্বংসের কারণগুলো লিপিবদ্ধ করো।
দর্শনীয় স্থান সংরক্ষণের উপায় বর্ণনা করো।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...