বৌদ্ধ আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবসমূহ ধর্মীয় ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে সংগতি রেখেই অনুষ্ঠিত হয়। যে অনুষ্ঠানগুলো চান্দ্রবছরের নিয়মে অনুষ্ঠিত হয়, সেগুলো ধর্মীয় তিথি বা পর্ব। যেমন: বুদ্ধপূর্ণিমা, আষাঢ়ী পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা ইত্যাদি। এছাড়া যে অনুষ্ঠানগুলো বছরের যেকোনো সময় করা যায়, সেগুলোকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বলা হয়। যেমন: সঙ্ঘদান, অষ্টপরিষ্কারদান, প্রব্রজ্যা, উপসম্পদা অনুষ্ঠান ইত্যাদি। আবার 'কঠিন চীবরদান' অনুষ্ঠান করতে হয় বছরের নির্দিষ্ট মাসে। এটিও একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানগুলো পালনের ব্যাপকতায় উৎসবে পরিণত হয়। বর্তমানকালে প্রায় সব অনুষ্ঠানই উৎসবের আকার ধারণ করে।
বৌদ্ধদের বেশির ভাগ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। তবে অমাবস্যায় কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা নেই। বৌদ্ধধর্ম মতে প্রতিটি দিনই শুভ। অশুভ বলে কোনো দিন নেই। নিজের কর্মের মধ্যেই শুভ-অশুভ নির্ভর করে। এমন কোনো সময় নেই, যে সময় ভালো কাজ করলে কোনো সুফল পাওয়া যায় না। ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা অত্যন্ত ভালো কাজ। যেকোনো দিন ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পাদন করা যায়। তবে কিছু আচার-অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট দিনেই সম্পাদন করতে হয়। পবিত্র মন নিয়ে এসব দিনে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা সকলের উচিত। এতে মন প্রসন্ন হয়। চিত্ত শুদ্ধ হয়। সৎ কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। নৈতিকতা জাগ্রত হয় এবং জীবন সুখের হয়।
বৌদ্ধধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো প্রধানত পূর্ণিমাকেন্দ্রিক। প্রতিটি পূর্ণিমার সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের জীবনের কোনো না কোনো স্মরণীয় ঘটনা জড়িত রয়েছে। বুদ্ধের জীবনাদর্শ স্মরণ ও অনুশীলনের জন্য বিবিধ ধর্মীয় আচার -অনুষ্ঠান ও উৎসবের আয়োজন করা হয়। মূলত, এসব আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্মরণীয় ঘটনাগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। যুগ যুগ ধরে এই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলো বৌদ্ধরা পালন করে আসছে। প্রতিটি পূর্ণিমায় বৌদ্ধ নর-নারী সকলে বিহারে সমবেত হয়। সম্মিলিতভাবে বুদ্ধপূজা ও উপাসনা করে। পঞ্চশীল ও উপোসথশীল গ্রহণ করে। দুপুরে ধ্যান সমাধি চর্চা করে। বিকালে ভিক্ষুদের কাছ থেকে ধর্মকথা শোনে। সন্ধ্যায় প্রদীপ পূজা ও পানীয় পূজা করে। অনেক বৌদ্ধবিহারে বিকালে ধর্মসভা ও সন্ধ্যায় বুদ্ধকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। রাতে নির্মল আনন্দচিত্তে সকলে বাড়ি ফিরে যায়।
এই ধর্মানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধরা একত্র হয়। তাই এসব অনুষ্ঠানের সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। এ অনুষ্ঠানগুলো একরকম সামাজিক মিলনমেলা। এগুলো ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালন করতে হয়। এ অনুষ্ঠানসমূহে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করা হয়।
বৌদ্ধদের কিছু অনুষ্ঠান আছে পরিবারকে কেন্দ্র করে। সেগুলোকে পারিবারিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানও বলা যায়। যেমন: শ্রমণের প্রব্রজ্যা, মৃতদেহ সৎকার, সূত্র বা পরিত্রাণ পাঠ প্রভৃতি। এসব অনুষ্ঠানে আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও এলাকার লোকজন সমবেত হয়। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পারস্পরিক ও সামাজিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। তাই এ অনুষ্ঠানগুলোরও সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসব যথাযথ মর্যাদার সাথে প্রতিপালন করা হয়। স্ব স্ব ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের পাশাপাশি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসসমূহ উদযাপন করা প্রয়োজন।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more