আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও আগে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক।
তাঁর ধর্মের অনুসারীদের বৌদ্ধ বলা হয়। আমরা বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। গৌতম বুদ্ধের বাল্য নাম ছিল সিদ্ধার্থ গৌতম। বুদ্ধত্ব লাভ করে তিনি গৌতম বুদ্ধ নামে খ্যাত হন। ছোটবেলা থেকেই জীবের প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম মমত্ববোধ। ছোট-বড় সকল প্রাণীকে তিনি সমানভাবে ভালোবাসতেন। তাঁর সেবায় ও আদরে অনেক প্রাণী সুস্থ হয়েছে এবং মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। ত্রিপিটকের গ্রন্থসমূহে গৌতম বুদ্ধের জীবপ্রেমের অনেক কাহিনি পাওয়া যায়। এ অধ্যায়ে আমরা গৌতম বুদ্ধের জীবপ্রেম সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা
- বুদ্ধের জীবপ্রেম ব্যাখ্যা করতে পারব।
- গৌতম বুদ্ধের জীবপ্রেমের কাহিনি বর্ণনা করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সুজন অহিংসতায় বিশ্বাসী। সে বলে, “মা যেমন তাঁর একমাত্র পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেন। তেমনি সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী পোষণ করবে।” সে সকলের সাথে মৈত্রী স্থাপন করতে বলে।
রাজা সুরেশ বর্মণের একমাত্র পুত্র নরেশ বর্মন। রাজপুত্র ছিল জগৎ সম্পর্কে উদাসীন। তাই রাজা রাজপুত্রকে শহর ভ্রমণে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন এবং নির্দেশ দিলেন, "কোনো অসুন্দর দৃশ্য যেন রাজকুমারের দৃষ্টির মধ্যে না পড়ে।"
খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে সিদ্ধার্থ গৌতম কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শুদ্ধোদন এবং মাতার নাম মহামায়া। তাঁরা শাক্য রাজের রাজা এবং রানি ছিলেন। সিদ্ধার্থের জন্মের সাত দিন পর মাতা রানি মহামায়া মৃত্যুবরণ করেন। তারপর সিদ্ধার্থের লালন-পালনের দায়িত্ব নেন রানি মহাপ্রজাপতি গৌতমী। তিনি রানি মহামায়ার বোন ছিলেন। বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী কর্তৃক লালিত-পালিত হয়েছিলেন বলে সিদ্ধার্থের অপর নাম হয় গৌতম। শাক্যরাজ বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে তিনি শাক্যসিংহ নামেও পরিচিত।
সিদ্ধার্থের জন্মের খবর শুনে অনেক জ্যোতিষী রাজপ্রাসাদে আগমন করেন। তাঁরা শিশু সিদ্ধার্থের মধ্যে বত্রিশটি সুলক্ষণ দেখতে পান এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন, 'এই রাজকুমার গৃহে থাকলে রাজচক্রবর্তী রাজা হবেন, সন্ন্যাস জীবন ধারণ করলে মহাজ্ঞানী বুদ্ধ হবেন।' কিন্তু একমাত্র ঋষি অসিত বলেন, রাজকুমার মহাজ্ঞানী বুদ্ধ হবেন।
রানি মহাপ্রজাপতি গৌতমী এবং রাজা শুদ্ধোদনের অপরিসীম স্নেহ-মমতায় সিদ্ধার্থ ক্রমে বড় হয়ে উঠতে থাকেন। রাজা রাজকুমারের শিক্ষার জন্য বহু শাস্ত্রবিদ পণ্ডিত নিয়োগ করেন। তিনি এঁদের নিকট নানা লিপিবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন। ক্রমে তিনি ঘোড়ায় চড়া, রথচালনা, অসি-চালনা, যুদ্ধকৌশল এবং অন্যান্য বিদ্যা শেখেন। রাজকুমারের বুদ্ধি, মেধা ও স্মৃতিশক্তি দেখে গুরু । গুরু বিস্মিত হন। অল্প দিনের মধ্যে রাজকুমার সকল শাস্ত্র ও শিল্পকলায় পারদর্শিতা লাভ করেন।
রাজকীয় পরিবেশে রাজকুমার ক্রমে কৈশোরে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু কিশোর বয়স থেকেই রাজকীয় ভোগ-বিলাসে তিনি উদাসীন ছিলেন। প্রায়ই তাঁকে একাকী নির্জনে ধ্যানমগ্ন থাকতে দেখা যেত। রাজকুমারের ভোগ-বিলাসের প্রতি উদাসীনতা দেখে রাজা শুদ্ধোদন চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করে অস্বস্তিতে দিনাতিপাত করতে থাকেন। ক্রমে রাজকুমার সিদ্ধার্থ যৌবনে পদার্পণ করেন। কিন্তু রাজা লক্ষ্য করলেন, যতই দিন যাচ্ছে কুমার ততই উদাসীন হয়ে যাচ্ছেন। তিনি রাজকুমারকে ভোগ-বিলাসে নিমজ্জিত রাখার জন্য সকল প্রকার আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু কোনো কিছুই বাজকুমারকে আকৃষ্ট করতে পারল না। অবশেষে রাজা অমাত্যদের (মন্ত্রী) সঙ্গে পরামর্শ করেন। অমাত্যগণ রাজকুমারকে সংসারমুখী করার জন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার পরামর্শ দেন। সপ্তাহব্যাপী জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে যশোধরার সঙ্গে সিদ্ধার্থ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। যশোধরা গোপাদেবী নামেও পরিচিত ছিলেন।
বাল্যকাল হতে সিদ্ধার্থের মনে যে বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়, যৌবনে এসে তা আরো বৃদ্ধি পায়। রাজ-অন্তঃপুরের ভোগ-বিলাসের মধ্যেও সিদ্ধার্থের মনে শান্তি ছিল না। একদা তাঁর নগরভ্রমণের বাসনা হলো। রাজা ঘোষণা করে দিলেন, রাজকুমার নগরভ্রমণে যাবেন, পথ-ঘাট সব যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়। নির্দেশ দিলেন, কোনো অসুন্দর দৃশ্য যেন রাজকুমারের দৃষ্টির মধ্যে না পড়ে। রাজার আদেশে রাজপথ পরিচ্ছন্ন ও সজ্জিত করা হলো। রাজকুমার নগর ভ্রমণে বের হলেন। সাজসজ্জা দেখে রাজকুমারের প্রথম মনে হলো জগতে দুঃখ, বেদনা, হতাশা নেই। কিছুদূর যাওয়ার পর রাজকুমার দেখলেন, এক জরাজীর্ণ দুর্বল বৃদ্ধ বক্রদেহে লাঠিতে ভর দিয়ে অতিকষ্টে পথ চলছে। সিদ্ধার্থ রথচালক ছন্দককে জিজ্ঞাসা করলেন, 'ও কে?' ছন্দক বললেন, 'এক বৃদ্ধ'। সিদ্ধার্থ বললেন, 'সকলেই কি বৃদ্ধ হবে, আমরাও?'
উত্তরে তিনি বললেন, 'সকলেই বৃদ্ধ হবে। এটাই জগতের নিয়ম।' ছন্দকের কথা শুনে বিষণ্ণ মনে সিদ্ধার্থ রাজপ্রাসাদে ফিরে যান।
পরদিন আবার নগরভ্রমণে বের হন। দ্বিতীয় দিন দেখতে পেলেন, ব্যাধিগ্রস্ত এক লোক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। সিদ্ধার্থ ছন্দকের নিকট কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এই লোক ব্যাধিগ্রস্ত, সংসারের যে কেউ যে কোনো সময় এ রকম রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে।' সিদ্ধার্থ বিষণ্ণ মনে রাজপ্রাসাদে ফিরে যান।
তৃতীয় দিন সিদ্ধার্থ আবার নগরভ্রমণে বের হলেন। দেখলেন, চারজন লোক একটি মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। পিছনে একদল লোক ক্রন্দন ও বিলাপ করছিল। কারণ জিজ্ঞাসা করলে ছন্দক বলেন, 'জন্মগ্রহণ করলে মৃত্যুবরণ করতে হয়। সকলেই মৃত্যুর অধীন। জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু মানুষের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।' সিদ্ধার্থ বিষণ্ণ মনে পুনরায় রাজপ্রাসাদে ফিরে যান।
চতুর্থ দিন রাজকুমার পুনরায় নগর ভ্রমণে বের হলেন। দেখলেন শান্ত, সৌম্য, গেরুয়া বসনধারী মুন্ডিত মস্তক এক সন্ন্যাসী ধীরগতিতে পথ চলেছেন। পরিচয় জানতে চাইলে ছন্দক বলেন, 'ইনি সংসার ত্যাগী বন্ধনহীন এক মুক্ত পুরুষ। ভোগ-বিলাস বিসর্জন দিয়ে শান্তি অন্বেষণ করছেন।' ছন্দকের কথা শুনে সিদ্ধার্থ খুশি হন এবং গৃহত্যাগের সংকল্প করে রাজপ্রাসাদে ফিরে যান।

সিদ্ধার্থ যখন সংসার ত্যাগের চিন্তায় অস্থির, তখন খবর এল তাঁর এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। খবর শুনে তিনি বিচলিত হয়ে বললেন, 'রাহু জন্মেছে, কন্ধন জন্মেছে।' তাই পুত্রের নাম রাখা হলো রাহুল। পুত্রের জন্মসংবাদ শুনে সিদ্ধার্থ দৃঢ় সংকল্প করলেন, 'আমি আর কালবিলম্ব না করে সকল বন্ধন ছিন্ন করে ।

শীঘ্রই বেরিয়ে পড়ব।' ক্রমে সিদ্ধার্থ ২৯ বছর বয়সে উপনীত হন। সেদিন ছিল আষাঢ়ী পূর্ণিমা। রাজ- অন্তঃপুরের সবাই গভীর নিদ্রায় মগ্ন। সিদ্ধার্থ বিদায়কালে গোপাদেবী ও প্রাণপ্রিয় পুত্রকে শেষবারের মতো দেখার জন্য গোপার কক্ষে প্রবেশ করলেন। দেখলেন, গোপা শিশুপুত্রকে বুকে জড়িয়ে গভীর নিদ্রামগ্ন। একবার ইচ্ছা হলো শিশুটিকে কোলে নিয়ে আদর করবেন। পরক্ষণে ভাবলেন, কোলে তুলে নিলে মা জেগে উঠবেন, তাহলে তাঁর যাওয়াই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আত্মসংবরণ করে তিনি গোপার কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন।
অতঃপর রথচালক ছন্দককে নির্দেশ দিলেন অশ্ব কন্ঠককে প্রস্তুত করে নিয়ে আসতে। ছন্দক কন্ধককে নিয়ে এলে উভয়ে অশ্বপৃষ্ঠে চড়ে গৃহত্যাগ করেন। বৌদ্ধ পরিভাষায় সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগকে 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' বলা হয়। অনোমা নদী পার হয়ে সিদ্ধার্থ ছন্দককে বললেন, 'তুমি কন্ঠককে নিয়ে ফিরে যাও।' ছন্দক গৌতমকে খুব ভালোবাসতেন। তাঁর মন কষ্টে ব্যথিত হয়ে উঠল। প্রিয় অশ্ব ক্যক শোকে সেখানেই মৃত্যুবরণ করল। সিদ্ধার্থ পায়ে হেঁটে বৈশালী নগরে পৌঁছলেন। ঋষি আলার কালাম, রামপুত্র রুদ্রকের কাছে যোগ, ধ্যান ইত্যাদি শিক্ষা গ্রহণ করলেন। তাতে তাঁর মন তৃপ্ত হলো না। সেখান থেকে গেলেন রাজগৃহে। রাজগৃহ থেকে উরুবেলার সেনানী গ্রামে। গ্রামটি নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। এখানে অশ্বথ গাছের নিচে শুরু করেন কঠোর ধ্যান-সাধনা। ছয় বছর কাটল তাঁর ধ্যান-সাধনায়। অবশেষে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে ।

লাভ করেন বুদ্ধত্ব, জগতে তিনি খ্যাত হন বুদ্ধ নামে। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল পঁয়ত্রিশ বছর। বুদ্ধত্ব লাভের পর তিনি সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের নিকট প্রথম ধর্মপ্রচার করেন, যা ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র নামে অভিহিত। সকল প্রাণীর দুঃখমুক্তি এবং মঙ্গলের জন্য তিনি সুদীর্ঘ প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর তাঁর অমৃতময় ধর্মবাণী প্রচার করেন এবং আশি বছর বয়সে কুশিনারার শালবনে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন।
| অনুশীলনমূলক কাজ চারি নিমিত্ত কী কী? |
বৌদ্ধধর্মে জীবপ্রেমকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গৌতম বুদ্ধের জীবন জীবপ্রেমে সিক্ত। শুধু মানুষ নয়, ছোট-বড় সকল জীবের প্রতি বুদ্ধের অপরিসীম মমত্ববোধ ছিল। 'সকল প্রাণী সুখী হোক'- বৌদ্ধদের অন্যতম কামনা। বুদ্ধের প্রতিটি ধর্মবাণীতে রয়েছে জীবপ্রেমের অমিয় আহ্বান। সকল বৌদ্ধকে পঞ্চশীল গ্রহণ করতে হয়। পঞ্চশীলের প্রথম শীলটি হচ্ছে- প্রাণিহত্যা হতে বিরত থাকব, এই শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি। এই শীলের মধ্যে শুধু প্রাণীর প্রতি গভীর মমত্ববোধই প্রকাশিত হয়নি, অধিকন্তু ছোট-বড় সকল প্রাণীকে রক্ষা করার প্রেরণাও রয়েছে। তাই বাঘ, হরিণ, হাতিসহ বনের কোনো প্রাণীই শিকার বা হত্যা করা উচিত নয়। বুদ্ধের জীবপ্রেমের একটি কাহিনি নিচে তুলে ধরা হলো।
সিদ্ধার্থ ও রাজহংস
বুদ্ধের বাল্যজীবনের ঘটনা। একদিন সিদ্ধার্থ পুষ্প উদ্যানে একাকী বসে ছিলেন। এমন সময় সাদা মেঘখণ্ডের মতো একঝাঁক রাজহাঁস পরম আনন্দে আকাশে উড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটি রাজহাঁস তিরবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় তাঁর সামনে পতিত হয়। শরাহত রাজহাঁসটি মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছিল। সিদ্ধার্থ পরম যত্নে রাজহাঁসটিকে কোলে তুলে নিলেন। রাজহাঁসটির শরীর থেকে শর বের করলেন, ক্ষতস্থানে প্রলেপ লাগিয়ে পরম মমতায় সেবা-সুশ্রুষা করে রাজহাঁসটিকে সুস্থ করে তুললেন। পরম সুখে রাজহাঁসটির দুচোখ দিয়ে অশ্রু নির্গত হলো এবং সিদ্ধার্থের দিকে কৃতজ্ঞচিত্তে তাকিয়ে রইল। এমন সময় বুদ্ধের জ্ঞাতি ভ্রাতা দেবদত্ত সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন,
'শরবিদ্ধ রাজহাঁসটি আমার। আমিই তির নিক্ষেপ করে রাজহাঁসটিকে ভূমিতে পতিত করেছি। আমার হাঁস আমাকে দাও।'
তখন মমতায় ভরা কণ্ঠে সিদ্ধার্থ বললেন, ‘ভাই দেবদত্ত! যে প্রাণরক্ষা করে প্রাণীর ওপর তারই অধিকার। যে প্রাণ হননে উদ্যত হয়, প্রাণীর ওপর তার অধিকার থাকতে পারে না। হাঁসটি মৃত নয়, আহত মাত্র। আমিই সেবা দিয়ে সুস্থ করে হাঁসটির জীবনরক্ষা করেছি। তাই হাঁসটি আমার। আমি এই শাক্যরাজ্য তোমাকে দিতে পারি, কিন্তু হাঁসটি দিতে পারব না।’ এরূপ বলে সিদ্ধার্থ হাঁসটি আকাশে উড়িয়ে দিলেন।

| অনুশীলনমূলক কাজ - আহত রাজহংসটি কার? তোমার মতামত দাও। |
পালি 'মেত্তা' শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে মৈত্রী; যার সমার্থক শব্দ হচ্ছে মিত্রতা, বন্ধুত্ব, প্রেম, ভালোবাসা, হিতচিন্তা, পরোপকারিতা, শুভেচ্ছা, সৌহার্দ্য, সৌজন্যবোধ ইত্যাদি। মৈত্রী মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বা সংস্কার। এটি হিংসা-বিদ্বেষের বিপরীত দিক। হিংসা-বিদ্বেষ পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও ঘৃণার জন্ম দেয়। মনের মধ্যে হিংসার দাবানল জ্বলে। এতে মানুষের মন হিংস্র পশুর চেয়েও ভয়ংকর হয়। ফলে সে যেকোনো অন্যায়-অবিচার ও প্রাণী হত্যার মতো খারাপ কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। মৈত্রী মানুষের মনকে উদার, শান্ত ও ঈর্যামুক্ত রাখে। মৈত্রী মন থেকে ক্রোধ, হিংসা, হীন প্রবৃত্তি দূরীভূত করে এবং অপরের প্রতি প্রেম, ভালোবাসা ও মমত্ববোধ জাগ্রত করে। বুদ্ধ বলেছেন, 'মৈত্রী দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, সাধুতা দ্বারা অসাধুতাকে জয় করবে, ত্যাগ দ্বারা কৃপণকে জয় করবে এবং সত্যের দ্বারা মিথ্যাবাদীকে জয় করবে।' বুদ্ধ আরো বলেছেন, 'মা যেমন তাঁর একমাত্র পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেন, তেমনি সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী পোষণ করবে।' নিম্নে বুদ্ধের মৈত্রী প্রদর্শনের একটি কাহিনি তুলে ধরা হলো।
সিদ্ধার্থ গৌতম ও ছাগশিশু
গৃহত্যাগের পর একদিন সিদ্ধার্থ গৌতম রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাচ্ছিলেন। পথের মধ্যে এক ছাগশিশুর করুণ কান্না তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এ সময় তিনি ছাগশিশুটি কোলে তুলে নিয়ে রাখালকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এদেরকে নিয়ে তুমি কোথায় যাচ্ছ।' রাখাল বলল,
'এগুলো রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে এক মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানে হাজার হাজার ছাগশিশু বলি দেওয়া হবে।'
পুত্রসন্তান কামনায় রাজা বিম্বিসার এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। তিনি ভেরি বাজিয়ে ঘোষণা করেন যে, রাজ্যে যত ছাগশিশু আছে, সেগুলো যেন রাজপ্রাসাদে আনা হয়। রাখালের মুখে এ কথা শুনে শ্রমণ গৌতম যজ্ঞ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, এতগুলো অবোধ প্রাণীর রক্তে প্লাবিত হবে যজ্ঞভূমি। তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। রাজপ্রাসাদের সামনে একটি মন্দির। সেই মন্দিরের সামনে এই মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পুরোহিতরা মন্ত্র পাঠ করছিলেন। ছাগশিশুর করুণ কান্নায় তাঁদের মন্ত্র উচ্চারণের শব্দ চাপা পড়ে যায়। এ অবস্থায় কোলে ছাগশিশু নিয়ে মহাযজ্ঞস্থলে সিদ্ধার্থ গৌতম প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে রাজা আনন্দিত হলেন। রাজা বললেন,
'আমার কী সৌভাগ্য যে আমার অনুষ্ঠানে নবীন সন্ন্যাসীও অংশগ্রহণ করছেন।'
সিদ্ধার্থ গৌতম চারদিকে একপলক তাকিয়ে রাজাকে বললেন, 'মহারাজ, আপনার নিকট আমার একটি প্রার্থনা আছে।' তখন রাজা বললেন, 'আপনার প্রার্থনা আমাকে বলুন। আমি আপনার প্রার্থনা পূরণ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব।'
সিদ্ধার্থ গৌতম তখন বললেন, 'আমি ছাগশিশুর প্রাণভিক্ষা চাই।' রাজা বললেন, 'পুত্র লাভের আশায় আমি ধর্মীয় বিধান অনুসারে মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছি। এখানে সহস্র ছাগশিশু বলি দেওয়া হবে। আপনি আমার যজ্ঞ নষ্ট করবেন না।' সিদ্ধার্থ গৌতম বললেন, 'মহারাজ, আমি আপনার যজ্ঞ নষ্ট করতে চাই না। বিনা রক্তে যদি আপনার দেবতা তুষ্ট না হন তবে এ ছাগশিশুর পরিবর্তে আমাকে বলি দিন। এতে আপনার নরহত্যাজনিত পাপ হবে না। কারণ, আমি স্বেচ্ছায় আত্মদান করছি।' গৌতম পুনরায় রাজা বিম্বিসারকে বললেন, 'মহারাজ শুনুন, ওই ছাগশিশুর কান্না। পশুর পরিবর্তে মানুষ পেলে আপনার দেবতা আরো বেশি তুষ্ট হবেন। সুতরাং আমাকে বলি দিন। এতে যজ্ঞও হবে, ছাগশিশুরাও জীবন ফিরে পাবে।' এ কথা বলে শ্রমণ গৌতম যূপকাষ্ঠে বন্দী ছাগশিশুকে মুক্ত করে দিলেন এবং নিজেকে বলি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।

এ দৃশ্য দেখে সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পুরোহিতরা মন্ত্রপাঠ বন্ধ করে দিলেন। তখন রাজা বিম্বিসারের মনে বিরাট পরিবর্তন দেখা দিল। রাজা বললেন, 'হে জ্ঞানতাপস! অহংকার ও আভিজাত্যে আমার দৃষ্টিভ্রম হয়েছিল। আপনি আজ আমাকে সত্যের পথ দেখালেন। আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।'
এ বলে রাজা সকল ছাগশিশু ছেড়ে দিতে এবং যজ্ঞ বন্ধের আদেশ দিলেন। শুধু তা-ই নয়, তখন থেকে রাজা বিম্বিসার তাঁর রাজ্যে চিরদিনের জন্য পশুবলি বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
| অনুশীলনমূলক কাজ ছাগশিশুগুলো কীভাবে জীবন ফিরে পেল? |
বুদ্ধ অহিংসবাদী ছিলেন। তাই বৌদ্ধধর্মকে অহিংসার ধর্ম বলা হয়। অহিংসা শব্দের সাধারণ অর্থ হলো হিংসা না করা। কিন্তু বৌদ্ধশাস্ত্রে 'অহিংসা' শব্দটির বিভিন্ন রকম অর্থ রয়েছে। বৌদ্ধমতে অহিংসা শব্দের অর্থ হলো হিংসা না করা, কায়-মনো বাক্যে হিংসা বর্জন করা, কারো অনিষ্ট না করা, প্রাণীহত্যা হতে বিরত থাকা, সকল জীবকে রক্ষা করা, মানবতা, কোমলতা, দয়া, করুণা প্রভৃতি প্রদর্শন করা। বুদ্ধ বলেছেন, 'শুধু নিজেকে ভালোবাসলে হবে না, ভালোবাসতে হবে সকল জীবকে।' বুদ্ধ এ নীতি প্রবর্তন করেছিলেন। এখানে একটি অহিংসা বিষয়ক কাহিনি তুলে ধরা হলো।
বৃদ্ধা মা ও বউ
অনেক দিন আগের কথা। এক গ্রামে কাত্যায়নী নামে একজন মহিলা বসবাস করতেন। তাঁর একটি মাত্র ছেলে ছিল। ছেলেটি ছিল খুবই আদরের। তিনি পরম মমতায় তাকে লালন-পালন করেন। মায়ের বয়স হলে ছেলেটিও তাঁর সেবা ও যত্ন করত। মায়ের বিপদ-আপদকে নিজের বিপদ-আপদ মনে করত। বলা যায়, খুব যত্নসহকারে মায়ের দেখাশোনা করত। এভাবে মা ও ছেলে দুজনই সুখে দিন অতিবাহিত করতে থাকেন। একদিন মা মনে করলেন, আমি আর কত দিন বাঁচব- এ ভেবে এক সুন্দরী মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিলেন। বিয়ের পরেও ছেলে আগের মতোই তার মায়ের সেবা- যত্ন করতে থাকে। মায়ের প্রতি এ ধরনের ভালোবাসা দেখে সুন্দরী বউয়ের মনে খুব হিংসা উৎপন্ন হলো। কিন্তু হিংসা স্বামীকে দেখাতে পারত না। এভাবে স্ত্রীর হিংসা দিন দিন আরো বাড়তে থাকে। হিংসাবশত স্বামীর সাথে সে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ করত। একদিন ঝগড়ার সময় স্ত্রী স্বামীকে বলল, 'তোমার মায়ের সাথে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমার মাকে চলে যেতে বলো, নতুবা আমি চলে যাব।'
ছেলে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্ত্রীর মন রক্ষার জন্য বলল, 'মা! তুমি আমার স্ত্রীর সাথে রোজই ঝগড়া করো। যেদিকে তোমার মন চায় চলে যেতে পারো।' মনের দুঃখে মা দূরসম্পর্কের একজন আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। দিন-রাত পরিশ্রম করার বিনিময়ে মা নিজের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে নিলেন।
এদিকে বউয়ের একটি ছেলে জন্মগ্রহণ করল। নাতি হয়েছে শুনে মা খুবই খুশি হলেন। তবে মনে ব্যথা পেলেন। তিনি ভাবলেন আমার আদরের নাতিকে আমি আজও দেখতে পেলাম না। বিনা অপরাধে আমি ঘরছাড়া। পৃথিবীতে কি ধর্ম বলতে কিছুই নেই? এরূপ বলে মা আক্ষেপ করলেন। মা স্থির করলেন ধর্মপূজা করবেন। থালায় সাজালেন নানাবিধ ফুল, পানি, সুগন্ধি আর প্রদীপ। এদিকে দেবরাজ ইন্দ্র অসহায় মায়ের করুণ অবস্থা দেখলেন। অতঃপর ব্রাহ্মণের বেশ ধারণ করে তিনি উপস্থিত হলেন।
ব্রাহ্মণ বললেন, 'বুড়িমা, তুমি কী করছ?'
বুড়িমা উত্তর দিলেন, 'আমি ধর্মপূজা করছি।'
তখন বুড়িমা ছেলে ও বউয়ের সব কথা খুলে বললেন।
ইন্দ্র বললেন, 'মা, তুমি দুঃখ করো না। খুব শীঘ্রই তোমার বউ ও ছেলের মনের পরিবর্তন হবে। কারণ তাদেরও একটি ছেলে হয়েছে। তুমি ঘরে যাও। আমি দেবরাজ ইন্দ্র।'
দেবরাজ ইন্দ্রকে মা ভক্তি সহকারে প্রণাম জানিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হলেন। এদিকে তাঁর বউয়ের যে সহিংস মনোভাব ছিল, তা আর নেই। যে ক্রোধ দেখাত, সেগুলো আর নেই। বউয়ের মন দমিত হলো। নিজের হিংসাকে সে প্রশমিত করল। পথের অর্ধেক যেতে না যেতেই মা দেখলেন ছেলে আর বউ নাতি নিয়ে এগিয়ে আসছে। ছেলেটি বৃদ্ধ মায়ের কোলে নাতিকে তুলে দিল। ওরা দুজনে বলল 'মা, দেখ তোমার নাতি।' বউ তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল। মাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গেল। নিজের হিংসা ত্যাগ করে আবার সকলে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।
| অনুশীলনমূলক কাজ 'অহিংসা' শব্দের অর্থ লেখো। হিংসার কুফল বর্ণনা করো। |
Read more