বাংলাদেশের মানব বসতি ও রাজনৈতিক ইতিহাস
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডে মানব বসতির অস্তিত্ব ছিল। সম্প্রতি আবিষ্কৃত প্রত্ননিদর্শন থেকে প্রমাণ হয়েছে এই ভূমির প্রাচীনতা। চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, সীতাকুণ্ড, কুমিল্লার লালমাই, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে পাওয়া গিয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের হাতিয়ার। এর মধ্যে রয়েছে পাথর ও ফসিল, কাঠের হাতকুঠার, বাটালি, তীরের ফলক প্রভৃতি। এই সময়ে মানুষ বনে-বাদাড়ে ঘুরে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করেছে।
এরপর বগুড়ার মহাস্থানগড় এবং নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ মানব বসতি। মহাস্থানগড়ে অবস্থিত প্রাচীন নগরটির নাম পুণ্ড্রনগর যা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গড়ে উঠেছিল। ওদিকে উয়ারী-বটেশ্বর থেকেও পাওয়া গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মানব বসতির চিহ্ন। সমসাময়িক কালে ভারত উপমহাদেশের ১৬টি মহাজনপদের নাম জানা যায় । উপমহাদেশের বিভিন্ন জনপদের মৌর্য যুগ-পূর্ব রাজনৈতিক ইতিহাস জানা যায়। তবে বর্তমান বাংলাদেশ অংশের ইতিহাসের প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে প্রাপ্ত শিলালিপিটি মৌর্য যুগের বলে মনে করা হয়। অনেকের মতে লিপিটি সম্রাট অশোকের জারিকৃত। এই শিলালিপির বিবরণ থেকে অনুমান করা হয় মৌর্য সম্রাট অশোক পুণ্ড্রনগর শাসন করেছেন। তারপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজবংশ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ড শাসন করেছে।
গুপ্ত যুগ
আমাদের দেশের বিস্তারিত ইতিহাস জানা গিয়েছে গুপ্ত যুগ থেকে। তারা ভারত উপমহাদেশের উত্তর অঞ্চলের শাসক ছিলেন। বাংলাদেশের উত্তরাংশে পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি নামে একটি প্রদেশ গুপ্তদের শাসনাভুক্ত ছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে আজকের বাংলাদেশ প্রাচীনকালে একক কোনো দেশ ছিল না। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল তখন পুণ্ড্রবর্ধন, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, বরেন্দ্র, হরিকেল প্রভৃতি জনপদ নামে পরিচিত ছিল।
শশাঙ্ক
গুপ্ত শাসন পতনের পর কয়েকজন রাজার নাম পাওয়া যায়। 'পরবর্তী গুপ্ত' নামে পরিচিত এই সময়কালের তিনজন বিখ্যাত রাজা ছিলেন গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব। তারপর সপ্তম শতকে শশাঙ্ক নামে একজন প্রতাপশালী শাসকের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি গৌড়ের শাসক ছিলেন। তার উপাধি ছিল গৌড়েশ্বর। তার মৃত্যুর পর প্রায় একশ বছর প্রাচীন বাংলায় কোনো স্থায়ী শাসক ছিল না। বিশৃঙ্খল অবস্থায় বাংলার ছোট ছোট রাজ্যগুলো নিজেদের মধ্যে কলহ ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।
পাল রাজবংশ
পাল রাজবংশ বাংলায় দীর্ঘদিন শাসন করে। এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গোপাল। তিনি 'মাৎস্যন্যায়' তথা মাছের রাজত্বের মতো অরাজকতা দূর করে গৌড়ের সিংহাসনে বসেছিলেন। গোপালের পর ধর্মপাল, দেবপাল, রামপাল ও মহীপাল ছিলেন এ বংশের বিখ্যাত শাসক ছিলেন। পালবংশ প্রায় ৪০০ বছর বাংলা শাসন করে। তাদের সময়কালে রাজনীতি, অর্থনীতি, স্থাপত্য, চিত্রশিল্প ও শিল্পকলায় সমৃদ্ধ হয়েছিল বাংলা। নওগাঁ জেলার বিখ্যাত পাহাড়পুর মহাবিহার পালযুগের নিদর্শন।
পাল শাসকদের সময়কালে তাদের রাজত্বের বাইরে কুমিল্লা ও বিক্রমপুর অঞ্চলে খড়গ, দেব, চন্দ্র ও বর্ম রাজবংশ স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেছিল। সমতট অঞ্চল নামে পরিচিত এই এলাকায় ভ্রমণ করেন চীনের বিখ্যাত পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ। তিনি এখানে ৩০টির মতো বৌদ্ধবিহার দেখতে পেয়েছিলেন। তৎকালীন বিক্রমপুর অঞ্চলের প্রখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর। তিনি একাদশ শতকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য তিব্বতে গিয়েছিলেন।
সেন রাজবংশ
ভারতের দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে পালদের সেনাবাহিনীতে চাকরি করার জন্য বাংলায় এসেছিল সেনরা। দুর্বল পাল রাজা মদনপালকে পরাজিত করে বিজয় সেন ক্ষমতা দখল করেন। তারপর রাজা ছিলেন বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেন। বিজয় সেন এবং বল্লাল সেন ছিলেন শৈব সম্প্রদায়ের। পরে লক্ষণ সেন হয়ে ওঠেন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অনুরাগী। লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি নদীয়া জয় করেন। তবে লক্ষণ সেনের পর তার দুই ছেলে বিশ্বরূপ সেন এবং কেশব সেন বিক্রমপুর থেকে কিছুদিন এই এলাকা শাসন করেছিলেন।
| কাজ- ১: প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রত্নস্থানগুলো ও প্রত্নস্থানে প্রাপ্ত উপকরণগুলোর নামের তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ- ২: বাংলার জনপদগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ- ৩: প্রাচীন বাংলার রাজবংশগুলোর তালিকা প্রস্তুত কর। |
প্রাচীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবন প্রভৃতি সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। সীমিত সাহিত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্র থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যায় মাত্র। আমরা পরবর্তী পাঠগুলোতে প্রাচীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে জানব।
Read more