বুদ্ধের মৈত্রী প্রদর্শন (পাঠ : ৩)

গৌতম বুদ্ধের জীবপ্রেম - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

442

পালি 'মেত্তা' শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে মৈত্রী; যার সমার্থক শব্দ হচ্ছে মিত্রতা, বন্ধুত্ব, প্রেম, ভালোবাসা, হিতচিন্তা, পরোপকারিতা, শুভেচ্ছা, সৌহার্দ্য, সৌজন্যবোধ ইত্যাদি। মৈত্রী মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বা সংস্কার। এটি হিংসা-বিদ্বেষের বিপরীত দিক। হিংসা-বিদ্বেষ পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও ঘৃণার জন্ম দেয়। মনের মধ্যে হিংসার দাবানল জ্বলে। এতে মানুষের মন হিংস্র পশুর চেয়েও ভয়ংকর হয়। ফলে সে যেকোনো অন্যায়-অবিচার ও প্রাণী হত্যার মতো খারাপ কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। মৈত্রী মানুষের মনকে উদার, শান্ত ও ঈর্যামুক্ত রাখে। মৈত্রী মন থেকে ক্রোধ, হিংসা, হীন প্রবৃত্তি দূরীভূত করে এবং অপরের প্রতি প্রেম, ভালোবাসা ও মমত্ববোধ জাগ্রত করে। বুদ্ধ বলেছেন, 'মৈত্রী দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, সাধুতা দ্বারা অসাধুতাকে জয় করবে, ত্যাগ দ্বারা কৃপণকে জয় করবে এবং সত্যের দ্বারা মিথ্যাবাদীকে জয় করবে।' বুদ্ধ আরো বলেছেন, 'মা যেমন তাঁর একমাত্র পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেন, তেমনি সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী পোষণ করবে।' নিম্নে বুদ্ধের মৈত্রী প্রদর্শনের একটি কাহিনি তুলে ধরা হলো।

সিদ্ধার্থ গৌতম ও ছাগশিশু
গৃহত্যাগের পর একদিন সিদ্ধার্থ গৌতম রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাচ্ছিলেন। পথের মধ্যে এক ছাগশিশুর করুণ কান্না তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এ সময় তিনি ছাগশিশুটি কোলে তুলে নিয়ে রাখালকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এদেরকে নিয়ে তুমি কোথায় যাচ্ছ।' রাখাল বলল,
'এগুলো রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে এক মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানে হাজার হাজার ছাগশিশু বলি দেওয়া হবে।'
পুত্রসন্তান কামনায় রাজা বিম্বিসার এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। তিনি ভেরি বাজিয়ে ঘোষণা করেন যে, রাজ্যে যত ছাগশিশু আছে, সেগুলো যেন রাজপ্রাসাদে আনা হয়। রাখালের মুখে এ কথা শুনে শ্রমণ গৌতম যজ্ঞ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, এতগুলো অবোধ প্রাণীর রক্তে প্লাবিত হবে যজ্ঞভূমি। তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। রাজপ্রাসাদের সামনে একটি মন্দির। সেই মন্দিরের সামনে এই মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পুরোহিতরা মন্ত্র পাঠ করছিলেন। ছাগশিশুর করুণ কান্নায় তাঁদের মন্ত্র উচ্চারণের শব্দ চাপা পড়ে যায়। এ অবস্থায় কোলে ছাগশিশু নিয়ে মহাযজ্ঞস্থলে সিদ্ধার্থ গৌতম প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে রাজা আনন্দিত হলেন। রাজা বললেন,
'আমার কী সৌভাগ্য যে আমার অনুষ্ঠানে নবীন সন্ন্যাসীও অংশগ্রহণ করছেন।'
সিদ্ধার্থ গৌতম চারদিকে একপলক তাকিয়ে রাজাকে বললেন, 'মহারাজ, আপনার নিকট আমার একটি প্রার্থনা আছে।' তখন রাজা বললেন, 'আপনার প্রার্থনা আমাকে বলুন। আমি আপনার প্রার্থনা পূরণ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব।'

সিদ্ধার্থ গৌতম তখন বললেন, 'আমি ছাগশিশুর প্রাণভিক্ষা চাই।' রাজা বললেন, 'পুত্র লাভের আশায় আমি ধর্মীয় বিধান অনুসারে মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছি। এখানে সহস্র ছাগশিশু বলি দেওয়া হবে। আপনি আমার যজ্ঞ নষ্ট করবেন না।' সিদ্ধার্থ গৌতম বললেন, 'মহারাজ, আমি আপনার যজ্ঞ নষ্ট করতে চাই না। বিনা রক্তে যদি আপনার দেবতা তুষ্ট না হন তবে এ ছাগশিশুর পরিবর্তে আমাকে বলি দিন। এতে আপনার নরহত্যাজনিত পাপ হবে না। কারণ, আমি স্বেচ্ছায় আত্মদান করছি।' গৌতম পুনরায় রাজা বিম্বিসারকে বললেন, 'মহারাজ শুনুন, ওই ছাগশিশুর কান্না। পশুর পরিবর্তে মানুষ পেলে আপনার দেবতা আরো বেশি তুষ্ট হবেন। সুতরাং আমাকে বলি দিন। এতে যজ্ঞও হবে, ছাগশিশুরাও জীবন ফিরে পাবে।' এ কথা বলে শ্রমণ গৌতম যূপকাষ্ঠে বন্দী ছাগশিশুকে মুক্ত করে দিলেন এবং নিজেকে বলি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।

এ দৃশ্য দেখে সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পুরোহিতরা মন্ত্রপাঠ বন্ধ করে দিলেন। তখন রাজা বিম্বিসারের মনে বিরাট পরিবর্তন দেখা দিল। রাজা বললেন, 'হে জ্ঞানতাপস! অহংকার ও আভিজাত্যে আমার দৃষ্টিভ্রম হয়েছিল। আপনি আজ আমাকে সত্যের পথ দেখালেন। আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।'
এ বলে রাজা সকল ছাগশিশু ছেড়ে দিতে এবং যজ্ঞ বন্ধের আদেশ দিলেন। শুধু তা-ই নয়, তখন থেকে রাজা বিম্বিসার তাঁর রাজ্যে চিরদিনের জন্য পশুবলি বন্ধ করার নির্দেশ দেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
ছাগশিশুগুলো কীভাবে জীবন ফিরে পেল?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...