বৌদ্ধধর্মে রাজন্যবর্গের অবদান: রাজা বিম্বিসার (একাদশ অধ্যায়)

বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

713

বুদ্ধের সময়কালে প্রাচীন ভারতবর্ষ ছোট ছোট ষোলোটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল। রাজ্যের রাজারা ছিলেন অনেক ক্ষমতাধর। রাজার ইচ্ছাতেই রাজ্যের সব কাজ পরিচালিত হতো। এ রাজাদের অনেকের সাথে গৌতম বুদ্ধের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিস। এ সময় অনেক রাজা বুদ্ধের বাণ ও উপদেশ গ্রহণ করে রাজ্যে অপ্রয়োজনে প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ করেছিলেন। এমনকি পূজা বা যজ্ঞের নামেও পশু হত্যা অনেক রাজ্যে নিষিদ্ধ ছিল। জনকল্যাণে দায়িত্বশীল ও কর্তব্যপরায়ণ হতে বুদ্ধ রাজাদের উপদেশ দিতেন। অনেক রাজা বুদ্ধের গৃহী শিষ্য বা উপাসক ছিলেন।
এ রাজাদের অনেকেই গৌতম বুদ্ধের ধর্ম প্রচার ও প্রসারে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে এটি রাজন্যবর্গের অবদান নামে স্বীকৃত। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মগধের রাজা বিম্বিসার। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারে তাঁর অবদান শ্রদ্ধাচিত্তে স্মরণযোগ্য। এ অধ্যায়ে আমরা রাজা বিম্বিসার সম্পর্কে পড়ব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • রাজা বিম্বিসারের পরিচয় বর্ণনা করতে পারব;
  • বৌদ্ধধর্ম প্রচার ও প্রসারে রাজা বিম্বিসারের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

'ক' জীবিতকালেই তার পুত্র কর্তৃক কারারুদ্ধ হন। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।

বিম্বিসার ছিলেন মগধ রাজ্যের বিখ্যাত রাজা। গৌতম বুদ্ধের সময়ে যে ষোলটি জনপদ বা রাজ্যের কথা জানা যায়, তার মধ্যে মগধ খুবই শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধিশালী রাজ্য ছিল। মগধের রাজধানী ছিল রাজগৃহ। বর্তমানকালের ভারতের বিহার রাজ্যই ছিল মগধ রাজ্য। এই রাজ্যের মাটি উর্বর ছিল এবং প্রচুর ফসল হতো। এ রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে হিরণ্যবতী বা শোন নদী।
বিম্বিসার ছিলেন হর্ষঙ্ক বংশের খ্যাতিমান নৃপতি। তাঁর নামের সাথে 'শেণিয়' বা 'শ্রেণিক' বিশেষণ যুক্ত হয়ে তিনি 'মগধরাজ শ্রেণিক বিম্বিসার' নামে খ্যাত ছিলেন। এটি ছিল তাঁর বংশের উপাধিবিশেষ। রাজা বিম্বিসারের রাজ্যাভিষেকের সঠিক সময় জানা যায় না। ধারণা করা হয় যে, গৌতম বুদ্ধের পরিনির্বাণের আনুমানিক ষাট বছর আগে তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। বিম্বিসারের রাজত্বকাল থেকেই মগধের অগ্রগতির ইতিহাস শুরু হয়েছিল।
বিম্বিসারের জীবনকথা
বিম্বিসারের পিতার নাম ছিল ভট্টিয় বা মহাপদ্ম। অঙ্গরাজ্যের রাজা ব্রহ্মদত্ত একদা বিম্বিসারের পিতা রাজা মহাপদ্মকে পরাজিত করেছিলেন। বিম্বিসার পনেরো বছর বয়সে রাজা হন। রাজা হয়ে তিনি রাজা ব্রহ্মদত্তকে পরাজিত করে অঙ্গরাজ্য দখল করে নেন। তার পর থেকে মগধ রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। রাজা বিম্বিসার অত্যন্ত প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। যুদ্ধবিদ্যায় তাঁর সৈন্যবাহিনী খুব পারদর্শী ছিল। যুদ্ধে তিনি হাতি ব্যবহার করতেন। ফলে তিনি সহজেই যুদ্ধে জয়লাভ করতেন। তাঁর রাজ্যসীমা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। জানা যায়, তাঁর রাজ্যে আশি হাজার শহর ছিল। শহরগুলোর মধ্যে তিনি সুন্দর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। কোশল রাজ্যের রাজকুমারীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি কোশল, বৈশালী, গান্ধার, অবন্তী প্রভৃতি রাজ্যের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন করেন। রাজা বিম্বিসার প্রাচীন রাজগৃহ নগরী নির্মাণ করেছিলেন। রাজগৃহ পাঁচটি পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এখানে ছিল তাঁর রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদের চারদিক পাথরের প্রাচীর দ্বারা ঘেরা ছিল। রাজগৃহে বুদ্ধ অনেক দিন বসবাস করেছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধর্মোপদেশ দান করেছিলেন। এখানে প্রথম ত্রিপিটক সংকলিত হয়েছিল। এ নগরীর ধ্বংসাবশেষ এখনও আছে। রাজগৃহের নিকটেই অবস্থিত ছিল নালন্দা।

রাজা বিম্বিসার সুশাসক ছিলেন। তিনি ন্যায়ের সঙ্গে রাজ্য শাসন করতেন। প্রজাদের খুব ভালোবাসতেন। সব সময় প্রজাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করতেন। বিম্বিসারের জীবিতকালেই তাঁর পুত্র অজাতশত্রু রাজা হন। পরে দেবদত্তের প্ররোচনায় অজাতশত্রু পিতৃবিরোধী হয়ে ওঠেন। একসময় তিনি পিতাকে কারারুদ্ধ করেন। তাঁকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেন। বিম্বিসার কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল পয়ষট্টি বছর।
রাজা বিম্বিসার অন্য রাজ্যের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন শান্তিপ্রিয় রাজা ও উত্তম সংগঠক। পার্শ্ববর্তী অন্য রাজ্যের রাজারাও তাঁর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছিলেন। গান্ধারের রাজা পুকুরসাতি তাঁর কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন। অবন্তীরাজ প্রদ্যোতের চিকিৎসার জন্য তিনি তাঁর চিকিৎসক জীবককে প্রেরণ করেছিলেন। জীবক ছিলেন তদানীন্তন ভারতবর্ষের একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক।
রাজা বিম্বিসারের রাজ্যে জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম উভয়েই সমসাময়িককালে বিকাশ লাভ করেছিল। মহাবীর জৈন, গৌতমবুদ্ধ এবং রাজা বিম্বিসার প্রায় সমকালীন ব্যক্তিত্ব। রাজা বিম্বিসার বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেও জৈনধর্মসহ সে সময়ে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তিনি নিয়মিত রাজ্য পরিদর্শন করতেন। গ্রামের শাসক গ্রামিকদের সাথে তিনি সব সময় মতবিনিময় করতেন। কথিত আছে, তিনি আশি হাজার গ্রামিকের ওপর ভিত্তি করে রাজ্য পরিচালনা করতেন। রাজ্যের রাস্তা ঘাট ও বাঁধ নির্মাণ এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
বিম্বিসারের জীবনকাহিনি লেখো।

Content added By

বুদ্ধত্ব লাভের আগেই রাজা বিম্বিসারের সাথে বুদ্ধের সাক্ষাৎ হয়। তিনি রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বোধিজ্ঞান লাভের জন্য উপযুক্ত গুরুর সন্ধান করছিলেন। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে প্রথমে তিনি অনুপ্রিয় নামক আমবাগানে পৌঁছান। সেখানে তিনি মস্তক মুণ্ডন করেন। তারপর কাষায় বস্ত্র পরিধান করে সন্ন্যাস ব্রত ধারণ করেন। এ সময় তিনি ভিক্ষান্নে জীবন ধারণের সিদ্ধান্ত নেন। পায়ে হেঁটে তিনি এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যেতেন। এভাবে তিনি বৈশালী থেকে রাজগৃহে পৌঁছান। উপযুক্ত গুরুর সন্ধান ও ভিক্ষান্ন সংগ্রহই ছিল তাঁর লক্ষ্য। সৌম্য-শান্ত অপূর্ব সুন্দর এক যুবক ভিক্ষা করছেন। রাজগৃহের নগররক্ষীরা তাঁকে দেখে অবাক হন। এ খবর তারা পৌঁছে দেন রাজা বিম্বিসারের কাছে। রাজ প্রাসাদ থেকেই রাজা বিম্বিসার তাঁকে দেখতে পান। রাজা নিজে এসে তাঁর সাথে দেখা করে ভিক্ষা করার কারণ জানতে চাইলেন। রাজা তাঁকে এই কঠিন ব্রত ছেড়ে রাজসুখ ভোগ করার আহ্বান জানান। সেনাপতির পদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। তখন সিদ্ধার্থ রাজা বিম্বিসারকে বলেন, 'মহারাজ! আমি সুখপ্রার্থী নই। আমি কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোদনের পুত্র। বুদ্ধত্ব লাভের আশায় আমি সবকিছু ত্যাগ করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেছি।' রাজা বলেন, 'বৎস! আপনার পিতা আমার পরম মিত্র। আপনার উদ্দেশ্য জেনে আমি খুব খুশি হয়েছি। যদি আপনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন, আমাকে একবার দর্শন দেবেন। আমি আপনার সেবা করব, আপনাকে বন্দনা করব।' রাজা বিম্বিসারের কথায় সিদ্ধার্থ সম্মতি প্রদান করে সেখান থেকে বের হয়ে যান।
রাজা বিম্বিসারের সঙ্গে বুদ্ধের আবার দেখা হয় বুদ্ধত্ব লাভের পর। তখন বুদ্ধ রাজগৃহের লঠি বন উদ্যানে বসবাস করছিলেন। তার দুই বছর আগেই তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন। লোকমুখে তাঁর যশ-খ্যাতির কথা শুনে রাজা বিম্বিসার তাঁর সাথে দেখা করেন। বিম্বিসার ভগবান বুদ্ধের কাছে নতুন ধর্মের বাণী শোনার প্রার্থনা করেন। বুদ্ধ তাঁকে দান, শীল ও স্বর্গ সম্বন্ধে সরলভাবে ধর্মোপদেশ দান করেন। তারপর, চতুরার্য সত্য, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ সম্পর্কে উপদেশ দেন।

রাজা বিম্বিসার বুদ্ধের বাণী ও উপদেশ শুনে মুগ্ধ হন। তিনি বুদ্ধের গৃহী শিষ্য বা উপাসক হন। এ সময় রাজা বিম্বিসারের বয়স হয়েছিল উনত্রিশ বছর। সে সময় রাজা বিম্বিসার ভিক্ষুসংখসহ বুদ্ধকে রাজপ্রাসাদে নিমন্ত্রণ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান। বুদ্ধ নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে প্রাসাদে গিয়ে রাজাকে নানা ধর্মকথা শোনান। রাজা ধর্মকথা শুনে আনন্দচিত্তে বুদ্ধকে বললেন, 'প্রভু! ছোটকালে আমার পাঁচটি কামনা ছিল। তা আজ পূর্ণ হলো।' কামনাগুলো হলো:

১. আমি ভবিষ্যতে রাজপদে অভিষিক্ত হব।
২. আমার রাজ্যে অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ অবতীর্ণ হবেন।
৩. আমি সেই বুদ্ধকে সেবা ও পরিচর্যা করব।
৪ সেই ভগবান বুদ্ধ আমাকে ধর্মোপদেশ দান করবেন।
৫. আমি বুদ্ধের ধর্ম উপলব্ধি করব

তারপর রাজা বিম্বিসার অত্যন্ত শ্রদ্ধাচিত্তে তাঁর রাজ্যের অতি মনোরম বেনুবন উদ্যান বুদ্ধ এবং তাঁর ভিক্ষুসংখকে দান করেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
বিম্বিসারের সঙ্গে বুদ্ধের কখন এবং কীভাবে সাক্ষাৎ হয়?
রাজা বিম্বিসারের কামনাগুলো লেখো (দলীয় কাজ)।

Content added By

বুদ্ধের উপাসক হওয়ার পর থেকে রাজা বিম্বিসার নানাভাবে বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে সহযোগিতা করতে থাকেন। তিনি ছত্রিশ বছর বুদ্ধ ও তাঁর ধর্মের সেবা করেন। তিনি মগধের অধিবাসীদের ধর্ম দেশনা করার জন্য বুদ্ধকে অনুরোধ করেন। বুদ্ধ তাঁর অনুরোধে মগধবাসীর উদ্দেশে ধর্ম দেশনা করেন। সেই সময় থেকে ভিক্ষুংখঘ কর্তৃক গৃহীদের পঞ্চশীল ও অষ্টশীল দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়।
এ সময় বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের পরিব্রাজকগণ পূর্ণিমা, অষ্টমী ও অমাবস্যা তিথিতে সমবেতভাবে ধর্ম আলোচনা করতেন। সাধারণ লোকেরা তাঁদের নিকট ধর্মকথা শুনতেন। তাঁদের ধর্মে দীক্ষা নিতেন। রাজা বিম্বিসার এসব লক্ষ্য করে ভিক্ষুদেরও ঐ সব তিথিতে ধর্ম আলোচনার সুযোগ দিতে বুদ্ধকে অনুরোধ করেন। বুদ্ধ তাঁর অনুরোধ রক্ষা করেন। বুদ্ধ ভিক্ষুদের উপোসথ পালন ও ধর্ম আলোচনার নির্দেশ দেন। রাজা বিম্বিসারের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন জীবক। তিনি খুবই বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন। রাজার আদেশে তিনি বুদ্ধ ও ভিক্ষুসঙ্ঘের চিকিৎসা করতেন। তাঁদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়ে তিনি সর্বদা সচেতন থাকতেন।
ভিক্ষুরা আগে পুরাতন ও পরিত্যক্ত কাপড় ধুয়ে শুকিয়ে সেলাই করে পরিধান করতেন। এতে ভিক্ষুদের অনেক রকম রোগ হতো। চিকিৎসক জীবক ভিক্ষুদের নীরোগ জীবন চিন্তা করেন এবং নতুন কাপড় পরিধানের অনুমতি প্রদানের জন্য বুদ্ধকে অনুরোধ করেন। বুদ্ধ জীবকের আবেদন মঞ্জুর করে ভিক্ষুদের নতুন কাপড় পরিধানের বিধান দিয়েছিলেন। এর পর থেকে রাজা বিম্বিসারও ভিক্ষুদের নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন কাপড় দান করতেন। এভাবে রাজা বিম্বিসার বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে অবদান রাখেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে রাজা বিম্বিসার বুদ্ধকে কী কী অনুরোধ করেছিলেন?

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...