সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস (প্রথম অধ্যায়)

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

8.9k

সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস
আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি তা জুড়ে রয়েছে মানুষ, আর নানা প্রজাতির গাছপালা, জীবজন্তু ও সামুদ্রিক প্রাণী। আদিমকালে জীবজন্তুর আক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা বিপদের সামনে মানুষ ছিল অসহায়। অস্তিত্ব রক্ষা আর জীবনযাপনের চাহিদা পূরণের জন্য তারা একে অন্যকে সহযোগিতা করার প্রয়োজন অনুভব করে। এভাবে পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে গিয়ে মানুষ গড়ে তুলেছে সমাজ। শুধু মানুষই নয়, পশুপাখি এবং কীটপতঙ্গের মাঝেও আমরা দলবদ্ধ জীবনধারা লক্ষ করি। যেমন- হাতি দল বেঁধে একসঙ্গে চলাফেরা করতে ভালোবাসে। কোনো কাক বিপদে পড়লে দল বেঁধে সব কাক তাকে বাঁচাতে ছুটে আসে। মৌমাছিরা মৌচাক এবং উইপোকা ঢিপি তৈরি করে তার মাঝে সবাই মিলেমিশে থাকে। বাংলাদেশের সমাজ ও সভ্যতার ধারাকে বুঝতে সমাজ কী ও কীভাবে তা গড়ে উঠেছে- এ অধ্যায়ের পাঠগুলোতে আমরা সে সম্পর্কে জানব।
এ অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা-

  • সমাজের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব;
  • সমাজজীবনে প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাব বর্ণনা করতে পারব;
  • সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তর যেমন-শিকার ও খাদ্য সংগ্রহভিত্তিক, উদ্যানকৃষি, পশুপালন, কৃষিভিত্তিক, শিল্পভিত্তিক ও শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সমাজের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা বর্ণনা করতে পারব;
  • বিবর্তনের বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে বাংলাদেশের সমাজের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে পারব;
  • কৃষিভিত্তিক সমাজ ও আধুনিক সমাজের উৎপাদন পদ্ধতির তুলনা করতে পারব;
  • সমাজ বিকাশে বিবর্তনের গুরুত্ব উপলব্ধি করব
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

শিমুলতলী গ্রামের চৌধুরী পরিবারের মেয়ে মিনা ও সরকার পরিবারের ছেলে সোহাগ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ধর্মীয় রীতিতে তাদের সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া হয়।

কুমিল্লার লালমাই
ফরিদপুরের মধুখালি
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর
গোপালগঞ্জের তারাশী

মানুষ একাকী বাস করতে চায় না। নিরাপদে ও শান্তিতে বেঁচে থাকার জন্য সবাই দলবদ্ধভাবে বাস করে। যার ফলে মানুষে মানুষে আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে সাহায্য-সহযোগিতা, সহানুভূতি, দ্বন্ধ ও পারস্পরিক নির্ভরতার মতো বিভিন্ন সম্পর্ক। এসবই হচ্ছে সামাজিক সম্পর্ক। মিলেমিশে থাকা একতাবদ্ধ মানবগোষ্ঠীকে বলা হয় সমাজ।
সমাজের মধ্যে ছোটো ছোটো প্রতিষ্ঠান ও সংঘ থাকে। যেমন- পরিবার, গোত্র, ক্লাব, সমিতি ইত্যাদি। আমরা কোনো না কোনো পরিবারে বাস করি। মা-বাবা তাদের এক বা একাধিক সন্তান নিয়ে একসাথে বসবাস করে যা এক রকমের পরিবার। কোনো কোনো পরিবারে বাবা-মা ও তাদের সন্তান ছাড়াও তাদের ভাই-বোন অথবা মা-বাবা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, দাদা-দাদিসহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের বন্ধন ও কার্যকলাপের সমন্বয়ে পরিবার গড়ে ওঠে। সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ হচ্ছে পরিবার। প্রাচীন কালে সমাজ গঠনের আগে পরিবার বলতে কিছু ছিল না। মানুষকে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে বাঁচতে হতো। তাই খাদ্য সংগ্রহ ও হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এভাবেই মানুষ সমাজ গড়ে তোলে। পরিবার থেকে গোত্র, সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষ। এভাবে ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সমাজের উদ্ভব হয়েছে।
সাধারণভাবে সমাজের দুটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এর প্রথমটি হচ্ছে, বহুলোকের সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সংঘবদ্ধতার পিছনে কোনো উদ্দেশ্য থাকা। সুতরাং সমাজ বলতে আমরা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে বুঝি, যার ভিত্তিতে মানুষ বিশেষ উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনে সমবেতভাবে বাস করে।

কাজ: দলে ভাগ হয়ে আদিম সমাজের দলবদ্ধ কাজগুলোর অভিনয় কর।
Content added By

মানুষের জীবন প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। জীবনধারণের জন্য মানুষ যেমন পরিবেশের উপর প্রভাব বিস্তার করে, আবার অনেকক্ষেত্রে পরিবেশই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য মানব সমাজের প্রকৃতি, আচার-আচরণ ও সংস্কৃতির উপর পরিবেশের প্রভাব স্পষ্ট। নদী মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে দেয়। পৃথিবীর প্রধান সভ্যতাগুলো ছিল নদীভিত্তিক। যেমন- সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা, নীল নদের তীরে মিশরীয় সভ্যতা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেসোপটেমীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতা গঙ্গা অববাহিকায় বিকাশ লাভ করেছে। আবার কোনো অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর সেই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর পেশা নির্ভর করে। যেমন- খনি অঞ্চলে খনি-শ্রমিক ও শিল্প এলাকায় শিল্প-শ্রমিক বাস করে। নদীমাতৃক দেশ বলে বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের যানবাহন হচ্ছে নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার। আবার কোনো কোনো এলাকার যানবাহন রেলগাড়ি, বাস, রিকশা ও গরুর গাড়ি ইত্যাদি। কুটিরশিল্প বিকাশেও ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাব রয়েছে। নদীবহুল এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ঢাকার ডেমরায় তাঁতিরা বাস করে এবং এখানেই বিখ্যাত ঢাকাই শাড়ি বোনা হয়। রাজশাহীতে রেশমি শাড়ি তৈরির জন্য বস্ত্রশিল্প গড়ে উঠেছে। কারণ এ অঞ্চলে তুঁতগাছ জন্মে এবং তুঁতগাছে রেশম কীট বাসা বাঁধে।
ফরিদপুরের খেজুরগুড়, মুক্তাগাছার মন্ডা, টাঙ্গাইলের শাড়ি, সুন্দরবনের মধু, সিলেটের শীতল পাটি প্রভৃতি ঐ সব এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত। সোনারগাঁও এর বিখ্যাত মসলিন শিল্পও এ অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ ও কাঁচামালের সহজলভ্যতার জন্যই বিকাশ লাভ করেছিল। পোশাক-পরিচ্ছদ ও ঘরবাড়ির বৈশিষ্ট্যও ভৌগোলিক পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত। শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষ গরম পশমি কাপড় পরে আর গ্রীষ্মপ্রধান এলাকার মানুষ পরে হালকা সুতি কাপড়। যেসব অঞ্চলে ঘন ঘন ভূমিকম্প হয় সেখানকার মানুষ ঘরবাড়ি তৈরি করতে কাঠ বেশি ব্যবহার করে। যেসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত সেখানে সহজেই শিল্পায়ন ঘটে এবং নগর গড়ে ওঠে। নৌ-যোগাযোগ ভালো বলে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে অনেক আগে থেকেই শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

কাজ: বাংলাদেশের মানচিত্রে শাড়ি, শীতলপাটি, রেশমশিল্পের জন্য বিখ্যাত স্থানগুলো চিহ্নিত কর।
Content added By

সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তর: শিকার ও সংগ্রহ, উদ্যানকৃষি ও পশুপালন সমাজ

সমাজ পরিবর্তনশীল। আজকের দিনে আমরা বাংলাদেশের যে সমাজকে দেখছি, আগের দিনের সমাজ কিন্তু এরকম ছিল না। আজকের সমাজ দীর্ঘকালের বিকাশধারার ফল। কালে কালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে পুরানো সমাজ পরিবর্তন হয়ে একালের আধুনিক সমাজ গঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে সমাজ আরও পরিবর্তন হবে। কালের সুদীর্ঘ যাত্রাপথে সমাজের পরিবর্তনকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হচ্ছেঃ (১) শিকার ও সংগ্রহভিত্তিক সমাজ (২) উদ্যান কৃষিভিত্তিক সমাজ (৩) পশুপালন সমাজ (৪) কৃষিভিত্তিক সমাজ (৫) শিল্পভিত্তিক সমাজ (৬) শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সমাজ।

শিকার ও খাদ্য সংগ্রহভিত্তিক সমাজ
শিকার ও খাদ্য সংগ্রহভিত্তিক সমাজ হচ্ছে মানব সমাজের আদিমতম রূপ। তখন স্থায়ী কোনো ঘরবাড়ি ছিল না। মানুষ গুহায় ও বনজঙ্গলে বাস করত। প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল প্রচুর। কিন্তু এ সম্পদকে ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন করতে শেখেনি। বনজঙ্গল থেকে তারা খাবার খুঁজে নিত আর শিকার করত। খাবারের খোঁজে তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াত। ফলমূলসংগ্রহ, পশুপাখি ও মৎস্য শিকার ছিল আদিম সমাজের প্রধান কাজ। যখন শিকার মিলত তখন তারা খেতো, শিকার না মিললে উপোস থাকতে হতো। মেয়েরা ফলমূল সংগ্রহ করত আর পুরুষেরা শিকার করত। সেসময় পাথরই ছিল একমাত্র হাতিয়ার। এ কারণে এ সমাজকে প্রাগৈতিহাসিক বা প্রস্তরযুগের সমাজও বলা হয়। এ সমাজের উল্লেখযোগ্য হাতিয়ারগুলো হচ্ছে-খাঁজকাটা বল্লম, মাছ ধরার হারপুন এবং হাড়ের সুই ইত্যাদি। শীত ও রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষ গাছের ছাল ও লতাপাতা এবং পশুর চামড়া ব্যবহার করত। এ সমাজের মানুষ কোনো শক্তিশালী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি। মানুষকে তখন খাবারের সন্ধানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়াতে হতো।

উদ্যান কৃষিভিত্তিক সমাজ
এ সমাজে খাদ্য সংগ্রহকারী মানুষ খাদ্য উৎপাদনকারীতে পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মেয়েরাই কৃষিকাজের উদ্ভাবন করেছে। আদিম সমাজে পুরুষেরা যেত শিকারের সন্ধানে, ফলমূল আহরণের ভার ছিল মেয়েদের উপর। ফলমূল সংগ্রহ করতে গিয়ে কখনো তারা নিয়ে আসত বুনো গম ও বার্লি, মেটে আলু, কচুর মূল ও কন্দ। আস্তানার আশপাশে গম ও বার্লির যেসব দানা পড়ত তা থেকে গজিয়ে উঠত চারা গাছ। চারা গাছে পরে দেখা দিত শিষ ও দানা। এ ধরনের ঘটনা থেকে বীজ ছিটিয়ে খাওয়ার উপযোগী শস্য পাওয়ার ধারণা সৃষ্টি হয়। কৃষিকাজের এ পর্যায়কে বলা হয় উদ্যান চাষ। এক্ষেত্রে প্রথমে মেয়েরা তাদের বসবাসের আশপাশে পতিত জমিতে একটি লম্বা লাঠি বা পশুর শিং দিয়ে মাটি চিরে গর্তে বীজ ফেলে ফসল ও ফলমূল উৎপাদন করত। ফসল পাকলে পশুর চোয়ালের হাড় দিয়ে ফসল কাটত। তবে প্রয়োজনের বেশি ফসল তারা উৎপাদন করেনি। এক জায়গায় বারবার এমন ফসল ফলানো যেতো না বলে তাদের জীবন ছিল যাযাবর প্রকৃতির ।

পশুপালন সমাজ
সমাজ বিকাশের ধারায় পশুপালন শুরু হলে সমাজ আরও এগিয়ে যায়। এ সমাজের মানুষ খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করত। শিকারি মানুষ প্রথমে কুকুরকে পোষ মানিয়ে গৃহপালিত পশুতে পরিণত করে। কুকুর ছিল বিশ্বস্ত প্রহরী ও শিকারের সঙ্গী। অনেক সময় বুনো ষাঁড়, ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া, গাধা প্রভৃতি পশু মানুষের হাতে ধরা পড়ত। সেগুলোকে তারা ধরে এনে বেঁধে রাখত। এগুলো ছিল তাদের জীবন্ত খাদ্যভাণ্ডার। শিকার না মিললে এগুলোকে বধ করে আহার করত। মানুষ ক্রমে বুঝতে পারে গরু, ছাগল ভেড়াকে না মেরে এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখলে বেশি লাভজনক হবে। যেমন- প্রতিদিন দুধ ও বছর বছর বাচ্চা পাওয়া যাবে, চামড়া ও পশমকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যাবে। এভাবে সমাজে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা বেড়ে তা মানুষের সম্পদে পরিণত হয়। এ সমাজে মুদ্রার প্রচলন হয়নি। তবে দ্রব্য বিনিময় প্রথার উদ্ভব ঘটে। একজনের পণ্যের সঙ্গে অন্য পশু কিংবা অন্য কিছু বদল করা হতো। তবে আদিম সমাজের মতো এ সমাজের মানুষও যাযাবর জীবনযাপন করত ।

কাজ: দলে ভাগ হয়ে উল্লিখিত তিনটি সমাজের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে উপস্থাপন কর।
Content added By

সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তর: কৃষি, শিল্প ও শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সমাজ

কৃষিভিত্তিক সমাজ

কৃষিকাজের সূচনা মেয়েরা করলেও লাঙল আবিষ্কারের পর পুরুষেরা জমি চাষের দায়িত্ব নেয়। প্রথমে তারা নিজের কাঁধে জোয়াল নিয়ে জমি চাষ শুরু করে। কালক্রমে হালের বলদের ব্যবহার শুরু হয়। লাঙল ও হালের বলদ ব্যবহার করে চাষ শুরু হলে উৎপাদন বাড়তে থাকে। যেসব অঞ্চলে বন্যা হতো এবং জমিতে পলি পড়ত মানুষ সেসব জমিতে গম ও বার্লির বীজ ছিটিয়ে দিত। এসব অঞ্চল ছিল টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকা, নীল নদের তীর ও সিন্ধু উপত্যকা। সে যুগে পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকায় প্রচুর বৃষ্টি হতো। তাই কৃষিকাজ এসব অঞ্চলে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। পরে আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য জায়গায় কৃষিকাজ ছড়িয়ে পড়ে। কৃষিকাজ প্রসারের সাথে সাথে পশুপালনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়।
কৃষিকাজের মধ্য দিয়ে সমাজজীবন ও সভ্যতার উন্নতি হতে থাকে। কৃষিকাজের উপযোগী স্থানে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। মানুষ স্থায়ীভাবে এক স্থানে বসবাস শুরু করে। কৃষিকাজ মানুষের খাদ্যের সংস্থান আরও নিশ্চিত করে। এ সমাজের উদ্বৃত্ত ফসল অবসর জীবনযাপনকারী শ্রেণির উদ্ভব করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে এবং নগর জীবনের বিকাশে ভূমিকা রাখে। কৃষির উদ্বৃত্ত ফসল সভ্যতার সূচনা করে। এ কারণে বলা হয়, সভ্যতা হচ্ছে কৃষির অবদান।

শিল্পভিত্তিক সমাজ

ইউরোপে মধ্যযুগের শেষ দিকে বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ঘটে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়ে যায়। ইউরোপের মানুষ আবিষ্কার করে প্রাচীন গ্রিস এবং রোমের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐতিহ্য। এটি ইউরোপের নবজাগৃতি বা রেনেসাঁ নামে পরিচিত। এই সময়ে ইউরোপের মানুষ বেরিয়ে পড়ে অজানাকে জানতে, পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে। ১৪৯২ সালে কলম্বাস পৌঁছে গেলেন আমেরিকায়।

১৬৮৫ সালে নিউটন তুলে ধরলেন তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কার মাধ্যাকর্ষণ। এভাবে শুরু হলো একের পর এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। আঠারো শতকে ইংল্যান্ডে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার হলে উৎপাদন ব্যবস্থায় বিপ্লবের সূচনা হয়। এই বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ধারণা কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা পরপর আবিষ্কার করেন সুতা কাটার মাকু বা স্পিনিং মেশিন, যান্ত্রিক তাঁত, বাষ্পচালিত জাহাজ ও রেলের ইঞ্জিন। এ সময় বিদ্যুৎ আবিষ্কার হয়। আর স্টিম টারবাইন নামে বিশেষ ধরনের বাষ্পীয় ইঞ্জিন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। এভাবে একদিকে বড়ো বড়ো শিল্পকারখানায় উৎপাদন শুরু হয় আর অন্যদিকে দ্রুতগামী জাহাজ ও রেলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের বিস্তার ঘটে। এভাবেই সূচনা হয় শিল্পবিপ্লবের। শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছিল ইউরোপে, পথিকৃৎ ছিল ইংল্যান্ড।


আঠারো-উনিশ শতকে কয়লা, গ্যাস, পেট্রোল ও বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়। উনিশ শতকে রেল যোগাযোগ চালু হয়। ক্রমবর্ধমান শিল্প কারখানার শ্রম ও কাঁচামালের চাহিদা মেটাতে ইউরোপের মানুষ উপনিবেশ স্থাপন করল মূলত এশিয়া ও আফ্রিকায়। তখন থেকে বিশ্বব্যাপী শিল্পবিপ্লবের প্রভাব পড়তে থাকে। বিশ শতকে শুরু হয় বিমান, রেডিয়ো, সিনেমা ও টেলিভিশনের ব্যবহার।

শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সমাজ

শিল্পভিত্তিক সমাজে শক্তির উৎস হিসাবে মানুষ ও পশুর স্থান দখল করে যন্ত্র। শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সমাজের ভিত্তি হচ্ছে জ্ঞান ও তথ্য। শিল্পের বদলে তথ্য প্রক্রিয়াজাত করাই হচ্ছে অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। সম্পত্তির মালিকদের বদলে পেশাজীবী, চাকরিজীবী, বিজ্ঞানী, তথ্য প্রকৌশলী এবং সেবা ও বিনোদন খাতের সাথে যুক্ত মানুষেরাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন এবং যোগাযোগের নানা মাধ্যম যেমন ফেসবুক পৃথিবীর মানুষকে অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বলা হচ্ছে সমস্ত পৃথিবী একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে বিশ্বায়ন।

কাজ: দলে ভাগ হয়ে কৃষিভিত্তিক ও শিল্পভিত্তিক সমাজের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত কর।
Content added By

বাংলাদেশের সমাজের প্রকৃতি

কালের অগ্রযাত্রায় আজ বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তন হয়ে আধুনিক সমাজে রূপ পেয়েছে। কুমিল্লার লালমাই, নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বাঙালির প্রাচীন বসতির নিদর্শন পাওয়া গেছে। বাঙালির এই আদি পুরুষরাই এ অঞ্চলে কৃষির সূচনা করেছিল। তখন কৃষিতে উদ্বৃত্ত ফসল উৎপাদন হতো। এ উদ্বৃত্ত ফসলের উপর নির্ভর করেই বিকশিত হয় আরও কিছু পেশা। যেমন- কারিগর, ব্যবসায়ী, শ্রমিক। কৃষিপ্রধান সমাজে কৃষিকে কেন্দ্র করেই উদ্ভব ঘটে নানা লোকাচার, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও উৎসবের। কৃষিকাজের পাশাপাশি তখন পশুশিকার ও পশুপালনও ছিল।

তবে অষ্টাদশ শতকে পলাশীর যুদ্ধে হারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ঔপনিবেশিক যুগে প্রবেশ করে। যে যুগে এ অঞ্চলের যেকোনো শিল্প সৃষ্টির চেষ্টাকে ব্রিটিশ রাজ্যের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী নির্দেশিত হতে হতো। এ কারণে ব্রিটিশ আমলে এদেশের স্থানীয় শিল্পায়নের সম্ভাবনা নষ্ট করে গড়ে ওঠে পর নির্ভর উন্নয়ন ভাবনা যা পাকিস্তান আমল পর্যন্ত চালু থাকে। সমাজ বিকাশের একটা স্তরে প্রবেশ করা মানেই যে পূর্ববর্তী স্তর বিলুপ্ত হয়ে যায় তা নয়। তাই বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠী বর্তমানে শিল্পভিত্তিক সমাজ ও শিল্পবিপ্লব-উত্তর সমাজে প্রবেশ করলেও তার পূর্ববর্তী ঐতিহ্যগুলোকেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধারণ করে আছে। তাই এখনও উদ্যানকৃষি, পশুপালন, কৃষি আমাদের অর্থনীতিতে বড়ো ভূমিকা রাখছে। এখনো এদেশে উদ্যানকৃষি নির্ভর গারো, ত্রিপুরা, চাকমা নৃ-গোষ্ঠীরা যেমন আছে, তেমনি আছে পশুপালক গোষ্ঠী। আবার ছোটো চাষী যেমন পূর্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী কৃষিকে টিকিয়ে রাখছেন, তবে সাথে সাথে বড় পুঁজির বাজারমুখী কৃষক ও কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানাও অপ্রতুল নয়। আর ভারীশিল্পও বিকাশিত হয়েছে ইদানীং। যদিও পাকিস্তানি আমলে শাসকদের অবহেলার কারণে শিল্পের বিকাশ ঘটেনি, কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাপকভাবে শিল্পের প্রসার ঘটে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো শহরগুলোতেও এর প্রান্তসীমায় বড়ো আকারের শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।


তবে বর্তমানে শিল্পবিপ্লব-উত্তর যুগে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উৎকর্ষের সময়ে বাংলাদেশও যোগ দিয়েছে তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লবে। এখন বাংলাদেশের প্রশাসনিক, শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সর্বত্রই ব্যবহার হচ্ছে ইন্টারনেট, সফটওয়ার, নেটওয়ার্কিংসহ নানা মাত্রার প্রযুক্তি জ্ঞান।

কাজ-: "বাংলাদেশের সমাজ যেন মানব সমাজ বিকাশের স্তরসমূহের ধারাবাহিক ফসল"-বিশ্লেষণ কর।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...