গুপ্ত যুগে বাংলা ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।
গুপ্ত সাম্রাজ্য
ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগ সামগ্রিকভাবে 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে খ্যাত। এ যুগে ভারতের কলা, স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। এ যুগের ভাস্কর্যকে ধ্রুপদী ভাস্কর্য বলা হয়।গুপ্ত যুগে বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংহতি মূলত এই তিনজন প্রধান সম্রাটের হাত ধরেই মজবুত হয়েছিল:
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৪০ খ্রি.)
তাকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তার সময়েই বাংলার কিছু অংশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি (প্রদেশ) গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে শুরু করে।
সমুদ্রগুপ্ত (৩৪০–৩৮০ খ্রি.)
সমুদ্রগুপ্তের আমলেই বাংলার অধিকাংশ অঞ্চল গুপ্ত শাসনের অধীনে আসে। তার এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায় যে, তিনি পশ্চিম বাংলার 'পুষ্করণ' (বর্তমান বাঁকুড়া জেলা) জয় করেছিলেন।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য (৩৮০–৪১৫ খ্রি.)
তার সময়ে বাংলায় গুপ্ত শাসন পূর্ণতা পায়। সমগ্র বাংলাই (সমতটসহ) কার্যত তার সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। দিল্লির মেহরাউলি লৌহস্তম্ভ লিপি অনুযায়ী, তিনি বাংলার রাজাদের একটি সম্মিলিত জোটকে পরাজিত করেছিলেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় গুপ্ত যুগকে। গুপ্ত বংশের নামমাত্র প্রতিষ্ঠাতা শ্ৰীগুপ্ত । গুপ্ত বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তকে। প্রথম চন্দ্রগুপ্তের উপাধি মহারাজাধিরাজ। চন্দ্রগুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটালিপুত্রে। গুপ্তদের সময়ে রাজতন্ত্র ছিল সামন্ত নির্ভর। গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো অঞ্চলের শাসককে বলা হতো মহাসামন্ত। মৌর্যদের মতো এদেশে গুপ্তদের রাজধানী ছিল মহাস্থানগড়ের পুণ্ড্রনগর।
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৪০ খ্রি.) ছিলেন ভারতে গুপ্তবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
উপাধি: তিনি প্রথম গুপ্ত রাজা যিনি 'মহারাজাধিরাজ' উপাধি গ্রহণ করেন। এটি তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক ছিল।
গুপ্তাব্দ (Gupta Era):প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ৩২০ খ্রিস্টাব্দের (মতান্তরে ৩১৯-৩২০) সিংহাসনে আরোহণের সময় এই অব্দের প্রচলন করেন তাঁর সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে 'গুপ্তাব্দ' বা গুপ্ত সংবতের প্রচলন করেন। এটি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৈবাহিক সম্পর্ক: তিনি লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করেন। এই বিবাহের ফলে তাঁর রাজনৈতিক শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
মুদ্রা: তাঁর সময়ে 'রাজা-রানী' শৈলীর স্বর্ণমুদ্রা প্রচলিত ছিল, যাকে 'লিচ্ছবি প্রকার' মুদ্রাও বলা হয়। মুদ্রার একপিঠে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও কুমারদেবীর ছবি এবং অন্যপিঠে 'লিচ্ছবয়াঃ' (Licchavayah) কথাটি খোদাই করা ছিল।
সাম্রাজ্য বিস্তার: তিনি মগধ, সাকেত (অযোধ্যা) এবং প্রয়াগ (এলাহাবাদ) পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।
উত্তরাধিকারী: তাঁর পর তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন, যাঁকে 'ভারতের নেপোলিয়ন' বলা হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সমুদ্র গুপ্তের শাসনকাল ছিল ৩৪০-৩৮০ খ্রিস্টাব্দ। গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক সমুদ্রগুপ্ত সমগ্র বাংলা জয় করেন। তাঁকে প্রাচীন ভারতের "নেপোলিয়ন" বলা হয়। সমুদ্রগুপ্তের রাজত্বকালে সমগ্র বাংলা জয় করা হলেও সমতট ছিল করদ রাজ্য।
সমুদ্রগুপ্ত (৩৪০-৩৮০ খ্রি.) ছিলেন গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তাঁকে 'প্রাচীন ভারতের নেপোলিয়ন' বলা হয়। গুপ্ত অধিকৃত বাংলার রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর।
ভারতের নেপোলিয়ন: সমুদ্রগুপ্তের বীরত্ব এবং অপ্রতিহত সামরিক বিজয়ের কারণে ঐতিহাসিক ভি. এ. স্মিথ তাঁকে 'ভারতের নেপোলিয়ন' বলে অভিহিত করেছেন।
এলাহাবাদ প্রশস্তি: তাঁর সভাকবি হরিষেণ সংস্কৃত ভাষায় 'এলাহাবাদ প্রশস্তি' বা 'প্রয়াগ প্রশস্তি' রচনা করেন। এটি সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয় জানার প্রধান উৎস।
উপাধি: তিনি 'কবিরাজ', 'অশ্বমেধ পরাক্রম', 'পরাক্রমাঙ্ক' এবং 'সর্বরাজোচ্ছেত্তা' উপাধি ধারণ করেছিলেন।
রাজ্যজয়ের নীতি: তিনি উত্তর ভারতের জন্য 'উন্মূলকরণ' (রাজ্য দখল) এবং দক্ষিণ ভারতের ১২ জন রাজার ক্ষেত্রে 'গ্রহণ-মোক্ষ-অনুগ্রহ' (রাজ্য জয় করে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া) নীতি গ্রহণ করেন। একে 'ধর্মবিজয়' বলা হয়।
ধর্মীয় সহনশীলতা: তিনি নিজে পরম বৈষ্ণব হলেও বৌদ্ধ পণ্ডিত বসুবন্ধু তাঁর দরবারে উচ্চপদে আসীন ছিলেন। সিংহলের রাজা মেঘবর্মণ তাঁর অনুমতি নিয়ে গয়ায় বৌদ্ধ মঠ নির্মাণ করেছিলেন।
মুদ্রা: তিনি স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেছিলেন যা 'দিনার' নামে পরিচিত ছিল। তাঁর মুদ্রায় অশ্বমেধ যজ্ঞের ছবিও পাওয়া যায়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৫ খ্রি.) সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন। তিনি মালবের উজ্জয়িনীতে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন। 'বিক্রমাদিত্য' ছিল তাঁর উপাধি। তাঁর শাসনকালে গুপ্ত সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়। অনেক প্রতিভাবান ও গুণী ব্যক্তি বিক্রম দরবারে সমবেত হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে প্রধান নয়জনকে 'নবরত্ন' বলা হয় যথা- কালিদাস, অমরসিংহ, বরাহমিহির প্রমুখ। মহাকবি কালিদাস সংস্কৃত ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার। তাঁর রচনাবলির মধ্যে মালবিকাগ্নিমিত্র, অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটক, রঘুবংশ ও কুমারসম্ভব মহাকাব্য এবং মেঘদূত ও ঋতুসংহার গীতিকাব্য সাহিত্যমাধুর্যে অতুলনীয়। অমরসিংহ ছিলেন সংস্কৃত কবি, ব্যাকরণবিদ এবং প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিধান প্রণেতা। তাঁর প্রসিদ্ধ সংস্কৃত অভিধান 'অমরকোষ'। বরাহমিহির ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'বৃহৎ সংহিতা'।
৬ষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে বিশাল গুপ্ত সম্রাজ্যের পতন ঘটে। মধ্য এশিয়ার দুর্ধর্ষ যাযাবর জাতি হুনদের আক্রমণে টুকরো টুকরো হয়ে যায় গুপ্ত সাম্রাজ্য।
সমুদ্রতন্ত্রের মৃত্যুর পর পাটালিপুত্রের সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। তাঁর উপাধি ছিল 'বিক্রমাদিত্য'। তিনি নবরত্নের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
যেমনঃ
- কাপিলাস (মেঘনৃত)
- অমরসিংহ (অমরকোষ)
- বরাহমিহির (বৃহৎ সংহিতা)
দ্বিতীয় চন্দ্রখণ্ডের শাসনামলে চৈনিক তীর্থযাত্রী ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ফা-হিয়েন-ই প্রথম চীনা পরিব্রাজক হিসেবে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তাঁর ভারত সফরের ৭টি বইয়ের মধ্যে ফো-কুয়ো-কিং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more