মুগল সাম্রাজ্য (১৫২৬ - ১৮৫৭ খ্রি.)
জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর (১৫২৬-১৫৩০ খ্রি.) সাহসিকতা ও নির্ভীকতার জন্য ইতিহাসে 'বাবর' নামে প্রসিদ্ধি লাভকরেন। 'বাবর' ফার্সি শব্দ -এর অর্থ বাঘ (মতান্তরে বাবর তুর্কি শব্দ যার অর্থ সিংহ)। অধুনা উজবেকিস্তানের অন্তর্গত ফারগানায় বাবরের জন্ম। তুর্কি ভাষায় রচিত বাবরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'তুযুক-ই-বাবুরী' (বাবুরনামা)
সাহিত্য ও সমকালীন ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ।
![]() নির্মাণকাল: ১৫২৮-২৯ খ্রিষ্টাব্দ নির্মাতা : সম্রাট বাবর অবস্থান : অযোধ্যা, উত্তর প্রদেশ, ভারত। ধ্বংস : ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২। উগ্রবাদী হিন্দুগোষ্ঠী কর্তৃক |
১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইবরাহিম লোদির বিরুদ্ধে বাবরের জয়ের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। মুঘল সম্রাটরা ছিলেন মধ্য এশিয়ার টাকো মঙ্গোল বংশোদ্ভূত। তারা চাগতাই খান ও তৈমুরের মাধ্যমে চেঙ্গিস খানের বংশধর। ১৫৫৬ সালে আকবরের ক্ষমতারোহণের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্রুপদী যুগ শুরু হয়। ১৫৭৬ সালে যুদ্ধে সম্রাট আকবর বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত করেন মুঘল সাম্রাজ্যের মোট শাসক ছিলেন ১৭ জন, এদের মাঝে প্রসিদ্ধ হলেন ৬ জন। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পরাজয়ের ফলে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহর রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। নির্বাসনের মধ্য দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ভারতের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনকারী পানিপথের তিনটি যুদ্ধই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরিয়ানার পানিপথ নামক স্থানে সংঘটিত এই যুদ্ধগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬)
এই যুদ্ধের মাধ্যমেই ভারতে দিল্লি সালতানাতের অবসান ঘটে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
সময়: ২১শে এপ্রিল, ১৫২৬।
পক্ষ: মুঘল সম্রাট বাবর বনাম দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদী।
ফলাফল: বাবর জয়ী হন এবং ইব্রাহিম লোদী যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন।
বিশেষত্ব: ভারতে এই প্রথম কোনো যুদ্ধে কামান ও বারুদের (Turko-Mongol 'Rumi' method) সফল ব্যবহার করা হয়। বাবরের সুদক্ষ রণকৌশলের কাছে লোদীর বিশাল বাহিনী পরাজিত হয়।
২. পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৫৫৬)
এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুঘলরা ভারতে তাদের হারানো ক্ষমতা পুনরায় ফিরে পায় এবং আকবরের শাসন পাকাপোক্ত হয়।
সময়: ৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬।
পক্ষ: মুঘল সম্রাট আকবর (পক্ষে বৈরাম খাঁ) বনাম আফগান সেনাপতি হিমু।
ফলাফল: মুঘলরা জয়ী হয় এবং হিমুকে বন্দি ও হত্যা করা হয়।
গুরুত্ব: সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর আফগানরা দিল্লি দখলের চেষ্টা করলে এই যুদ্ধটি হয়। জয়ের ফলে আফগান আধিপত্য চিরতরে শেষ হয় এবং আকবরের বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ সুগম হয়।
৩. পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ (১৭৬১)
এই যুদ্ধটি ছিল ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এবং এটি মুঘলদের দুর্বলতা ও মারাঠাদের আধিপত্য খর্ব করেছিল।
সময়: ১৪ই জানুয়ারি, ১৭৬১।
পক্ষ: আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালী বনাম মারাঠা বাহিনী (নেতৃত্বে সদাশিব রাও ভাউ)।
ফলাফল: আহমদ শাহ আবদালী জয়ী হন এবং মারাঠারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
প্রভাব: এই যুদ্ধের ফলে মারাঠাদের ভারত জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়। অন্যদিকে, ভারতের প্রধান দুটি শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় পরোক্ষভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা দখলের পথ সহজ হয়ে যায়।
পানিপথের যুদ্ধসমূহঃ
| যুদ্ধ | সাল | বিজয়ী | বিজিত |
|---|---|---|---|
| ১ম যুদ্ধ | ১৫২৬ | বাবর | ইব্রাহিম লোদী |
| ২য় যুদ্ধ | ১৫৫৬ | আকবর (বৈরাম খাঁ) | হিমু |
| ৩য় যুদ্ধ | ১৭৬১ | আহমদ শাহ আবদালী | মারাঠা বাহিনী |
- পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবর ও ইব্রাহিম লোদীর মধ্যে সংগঠিত হয়। যুদ্ধে লোদী পরাজিত হন এবং মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করেন বাবর।
- পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আকবরের সেনাপতি বৈরাম খান ও আফগান নেতা হিমুর মধ্যে সংগঠিত হয়। । যুদ্ধে হিমু পরাজিত হন এবং সম্রাট আকবর দিল্লি অধিকার করেন।
- পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে আহমদ শাহ আবদালি ও মারাঠাদের মধ্যে সংগঠিত হয়। যুদ্ধে মারাঠাদের পতন এবং বর্গী অত্যাচারী শাসনের অবসান ঘটে ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
পানিপথের প্রথম যুদ্ধ
পানিপথের প্রথম যুদ্ধ
পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ
দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ
জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর তার সাহসিকতা ও নির্ভীকতার জন্য ইতিহাসে বাবর নামে প্রসিদ্ধ। বর্তমান রুশ-তুর্কিস্তানের অন্তর্গত ফারগানা নামক রাজ্যে বাবরের জন্ম। বাবর পিতার দিক থেকে তৈমুর লং এবং মায়ের দিক থেক চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। বাবর শব্দের অর্থ সিংহ। বাবর ফারগানার সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন মাত্র ১১ বছর বয়সে।
জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ছিলেন মধ্য এশিয়ার ফারগানা রাজ্যের শাসক, যিনি ১৫২৬ সালে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রক্তে মিশে ছিল বিশ্বের দুই দুর্ধর্ষ বিজেতার ধারা—পিতার দিক থেকে তিনি ছিলেন তৈমুর লং-এর পঞ্চম বংশধর এবং মাতার দিক থেকে চেঙ্গিস খানের চতুর্দশ বংশধর। মধ্য এশিয়ায় পৈত্রিক রাজ্য হারিয়ে তিনি ভারত জয়ের পরিকল্পনা করেন এবং ১৫২৬ সালের ২১শে এপ্রিল পানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লির শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে ভারতে মুঘল শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন। মাত্র চার বছরের শাসনামলে তিনি কেবল সামরিক বিজয়ই অর্জন করেননি, বরং 'তুজুক-ই-বাবরি' নামক অসাধারণ এক আত্মজীবনী লিখে তাঁর সাহিত্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ১৫৩০ সালে আগ্রায় তাঁর মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে তাঁকে তাঁর প্রিয় শহর কাবুলে সমাহিত করা হয়।
বাবরের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসমূহ (যা পরীক্ষায় বারবার আসে):
১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬): ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা।
২. খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭): মেবারের রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধের পর তিনি 'গাজী' উপাধি গ্রহণ করেন।
৩. চান্দেরীর যুদ্ধ (১৫২৮): রাজপুত নেতা মেদিনী রায়কে পরাজিত করেন।
৪. ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯): বাংলার সুলতান নুসরাত শাহ ও আফগানদের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। এটি বাবরের জীবনের শেষ বড় যুদ্ধ।
Quick Notes:
পুরো নাম: জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (বাবর শব্দের অর্থ— বাঘ)।
জন্ম: ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৪৮৩ (ফারগানা, উজবেকিস্তান)।
আত্মজীবনী: 'তুজুক-ই-বাবরি' বা 'বাবরনামা'। এটি মূল তুর্কি ভাষায় রচিত (পরবর্তীতে আবদুর রহিম খান-ই-খানান এটি ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেন)।
রণকৌশল: তিনি যুদ্ধে 'রুমি' বা 'তুলুগুমা' নামক বিশেষ রণকৌশল এবং কামানের সফল ব্যবহার করেন। তাঁর প্রধান গোলন্দাজ ছিলেন ওস্তাদ আলী ও মোস্তফা।
উপাধি: তাঁকে 'কালান্দার' বলা হতো তাঁর দানশীলতার জন্য এবং খানুয়ার যুদ্ধের পর তিনি 'গাজী' উপাধি নেন।
সমাধি: প্রথমে আগ্রার আরামবাগে, পরে কাবুলের 'বাগ-ই-বাবর'-এ স্থানান্তরিত করা হয়।
একনজরে বাবরের শাসনকাল:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বংশ | চাগতাই তুর্কি (মুঘল) |
| রাজধানী | আগ্রা |
| প্রধান অস্ত্র | কামান ও বারুদ |
| বিখ্যাত স্থাপনা | পানিপথের কাবুলি বাগ মসজিদ এবং দিল্লির বাবরি মসজিদ (মীর বাকী কর্তৃক নির্মিত) |
বাবরের পর তাঁর পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে বসেন, যাঁর জীবন ছিল চরম নাটকীয় ও উত্থান-পতনে ঘেরা। আপনি কি হুমায়ুন এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী শেরশাহ সূরী সম্পর্কে জানতে চান? বিসিএস পরীক্ষার জন্য শেরশাহের প্রশাসনিক সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জেনে নিই
- মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ জহিরউদ্দীন মুহম্মদ বাবর।
- পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করে বাবর।
- পানিপথের প্রথম যুদ্ধ হয় বাবর ও ইবরাহীম লোদীর মধ্যে।
- পানিপথ নামক স্থানটি বর্তমানে অবস্থিত- ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে।
- পানিপথের প্রাস্তবে ঐতিহাসিক যুদ্ধ হয়- ৩টি।
- মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় পানিপথের প্রথম যুদ্ধের মাধ্যমে- ১৫২৬ সালে।
- ১৫২৭ সালে তিনি বাবরি মসজিদ (অযোধ্যা) নির্মাণ করেন।
- ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম কামানের ব্যবহার করেন- পানিপথের প্রথম যুদ্ধে।
- সম্রাট বাবর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন বাবরনামা বা তুযুক-ই-বাবর নামে ।
- বাবর মৃত্যুবরণ করেন। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে, বাবরকে সমাহিত করা হয় কাবুলে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
৬০৭৬ ফুট
৬০০০ ফুট
৬০৮০ ফুট
৭০৫০ ফুট
সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর ১৫৩০ সালের ডিসেম্বরে হুমায়ূন পিতার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হন। ১৫৩৮ সালে তিনি বাংলার গৌড় অধিকার করেন। গৌড় নগরের অপরূপ সৌন্দর্য তাকে বিমোহিত করে ফলে এর নাম রাখেন 'জান্নাতাবাদ'। হুমায়ূন কনৌজের যুদ্ধে ১৫৪০ সালে শেরশাহের নিকট পরাজিত হয়ে দিল্লি ত্যাগ করেন। ১৫৪০-১৫৫৫ খ্রি: পর্যন্ত শেরশাহের নেতৃত্বে ভারতবর্ষে শুরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫৫৫ সালে ১৫ বছর পর হুমায়ুন পুনরায় পারস্য সাম্রাজ্যের সহায়তায় মুঘল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
হুমায়ুন ছিলেন সম্রাট বাবরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। ১৫৩০ সালে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। 'হুমায়ুন' শব্দের অর্থ 'ভাগ্যবান', কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁর পুরো জীবনই ছিল প্রতিকূলতায় ভরা। একদিকে তাঁর নিজের ভাইদের (কামরান, আসকারি ও হিন্দাল) অসহযোগিতা, অন্যদিকে আফগান নেতা শেরশাহ সূরীর ক্রমবর্ধমান শক্তি তাঁর শাসনকালকে অস্থির করে তোলে। ১৫৪০ সালে শেরশাহের কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়ে তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর যাযাবরের মতো নির্বাসিত জীবন কাটান। অবশেষে ১৫৫৫ সালে পারস্যের শাহর সহায়তায় তিনি পুনরায় দিল্লি পুনরুদ্ধার করেন, কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তার পরের বছরই গ্রন্থাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
শেরশাহের সাথে প্রধান যুদ্ধসমূহ:
১. চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯): এই যুদ্ধে শেরশাহের কাছে হুমায়ুন পরাজিত হন। কোনোমতে গঙ্গা নদী পার হয়ে তিনি প্রাণ রক্ষা করেন। এই জয়ের পর শের খাঁ 'শেরশাহ' উপাধি ধারণ করেন।
২. কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধ (১৫৪০): এটি ছিল হুমায়ুনের জীবনের সবচেয়ে বিপর্যয়কর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর তিনি দিল্লি ও আগ্রার ক্ষমতা হারিয়ে পারস্যে (ইরান) পালিয়ে যান এবং ভারতে সাময়িকভাবে মুঘল শাসনের অবসান ঘটে।
হুমায়ুনের প্রত্যাবর্তন ও মৃত্যু:
১৫ বছর নির্বাসনে থাকার পর, ১৫৫৫ সালে 'সরহিন্দের যুদ্ধে' আফগানদের পরাজিত করে হুমায়ুন পুনরায় দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। কিন্তু তাঁর এই দ্বিতীয় দফার শাসনকাল ছিল মাত্র কয়েক মাসের। ১৫৫৬ সালে দিল্লির 'দীন-পানাহ' প্রাসাদের গ্রন্থাগারের (শের মণ্ডল) সিঁড়ি থেকে পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন। ঐতিহাসিক লেনপুল তাঁর সম্পর্কে বলেছেন— “হুমায়ুন সারাজীবন হোঁচট খেয়েছেন এবং হোঁচট খেয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।”
Quick Notes:
পুরো নাম: নাসিরুদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন।
বোন ও সাহিত্য: তাঁর বোন গুলবদন বেগম তাঁর জীবনী 'হুমায়ুননামা' রচনা করেন।
স্থাপত্য: তিনি দিল্লিতে 'দীন-পানাহ' (ধর্মের আশ্রয়) নামে একটি নতুন শহর গড়ে তুলেছিলেন।
হুমায়ুনের সমাধি: এটি দিল্লিতে অবস্থিত এবং মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এটি তাঁর স্ত্রী হামিদা বানু বেগমের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল। এই সমাধিকে 'তাজমহলের পূর্বসূরী' বলা হয়।
বাংলার নাম: গৌড় বিজয়ের পর সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি গৌড়ের নাম রেখেছিলেন 'জান্নাতাবাদ'।
হুমায়ুনের শাসনকাল:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বংশ | মুঘল |
| প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী | শেরশাহ সূরী |
| নির্বাসন কাল | ১৫৪০–১৫৫৫ (১৫ বছর) |
| মৃত্যু | ১৫৫৬ (সিঁড়ি থেকে পড়ে) |
হুমায়ুনের এই ১৫ বছরের নির্বাসনকালে ভারতে যে শক্তিশালী রাজবংশ শাসন করেছিল, সেটি হলো সূর বংশ।
জেনে নিই
- ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে সাম্রাজ্য হতে বিতাড়িত হন।
- ১৫৩৮ সালে বাংলার নামকরণ করেন জান্নাতাবাদ।
- বাবরের জ্যৈষ্ঠ পুত্রের নাম হুমায়ুন। হুমায়ূন শব্দের অর্থ ভাগ্যবান।
- চৌসার যুদ্ধ হয় ১৫৩৯ সালে শের শাহের সাথে।
- হুমায়ুন পুনরায় সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন ১৫৫৫ সালে ।
- হুমায়ুন মৃত্যুবরণ করেন গ্রন্থাগারের সিঁড়ি হতে পড়ে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শেরশাহ সম্রাট বাবরের সেনাবাহিনীর সেনা নায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৫৩৯ সালে চৌসারের যুদ্ধে দূর্বল হুমায়ুনকে পরাজিত করে শেরখান শেরশাহ উপাধি ধারন করেন। তিনি নিজেকে বিহারের স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৫৪০ সালে তিনি বাংলা দখল করেন এবং হুমায়ুনকে পরাজিত করে দিল্লি। অধিকার করে উপমহাদেশে আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
ভারতের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং দূরদর্শী শাসক ছিলেন শেরশাহ সূরী। মুঘলদের ১৫ বছরের জন্য ভারত ছাড়া করে তিনি যে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবর এবং ব্রিটিশ সরকারও অনুসরণ করেছিল। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
শেরশাহ সূরী ও শূর রাজবংশ (১৫৪০–১৫৫৫ খ্রি.) শেরশাহ সূরী ছিলেন ভারতের দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্যের (সূর বংশ) প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ফরিদ খাঁ। একটি বাঘকে একা হত্যা করার পর বিহারের সুবাদার তাঁকে 'শের খাঁ' উপাধি দেন। ১৫৩৯ সালে চৌসার যুদ্ধে এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে তিনি দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। যদিও তিনি মাত্র পাঁচ বছর (১৫৪০-১৫৪৫) শাসন করার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি এমন সব বৈপ্লবিক সংস্কার করেন যা তাকে ইতিহাসের অমর এক শাসকে পরিণত করে।
শেরশাহের উল্লেখযোগ্য সংস্কারসমূহ:
১. যোগাযোগ ব্যবস্থা: তিনি পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁও থেকে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের সিন্ধু নদ পর্যন্ত প্রায় ৪,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা নির্মাণ করেন, যা বর্তমানে 'গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড' (G.T. Road) নামে পরিচিত। রাস্তার ধারে যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য তিনি অসংখ্য 'সরাইখানা' নির্মাণ করেন।
২. ডাক ও মুদ্রাব্যবস্থা:
তিনি ঘোড়ার পিঠে ডাক আদান-প্রদান বা 'ঘোড়ার ডাক' প্রথা প্রবর্তন করেন।
তিনি বর্তমানে আমাদের প্রচলিত মুদ্রার নাম 'রুপিয়া' (Rupia) বা টাকার প্রবর্তন করেন। তাঁর প্রবর্তিত রৌপ্য মুদ্রার নাম ছিল 'রূপী' এবং তাম্র মুদ্রার নাম ছিল 'দাম'।
৩. রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার: তিনি কৃষকদের ওপর জবরদস্তি না করে জমির উর্বরতা অনুযায়ী খাজনা নির্ধারণ করেন। ভূমি মালিকানার দলিল হিসেবে তিনি 'পাট্টা' এবং কৃষকদের পক্ষ থেকে অঙ্গীকারপত্র হিসেবে 'কবুলিয়ত' প্রথা চালু করেন।
৪. পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা: তিনি অপরাধ দমনের জন্য 'স্থানীয় দায়িত্ব' নীতি চালু করেন। কোনো এলাকায় চুরি বা ডাকাতি হলে ওই এলাকার গ্রামপ্রধানকে অপরাধী ধরার দায়িত্ব নিতে হতো, অন্যথায় তাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হতো।
আরও কিছু তথ্য জেনে নেইঃ
- সম্রাট শেরশাহ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (সড়ক-ই-আজম) নির্মাণ করেন।
- গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডটি সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
- তিনি ভারতবর্ষে 'ঘোড়ার ডাক' প্রচলন করেন।
- ভারতবর্ষে 'দাম' নামে তাম্র মুদ্রার প্রচলন করেন।
- তিনি রুপিয়া নামে একধরনের মুদ্রারও প্রচলন করেছিলেন।
- আফগান দুর্গ নির্মাণ করেন (ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার)।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
আকবর
বাহাদুর শাহ
শাহজাহান
শের শাহ
শের শাহ
মুহম্মদ বিন তুঘলক
ইলতুতমিশ
লর্ড কর্ণওয়ালিশ
ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ১৫৫৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে আকবর ভারতের শাসনতার গ্রহণ করেন। ১৫৫৬ সালে হিমু দিল্লি দখল করে নিলে বৈরাম খান (আকবরের প্রধান সেনাপতি) পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে দিল্লি অধিকার করেন। আকবর | বৈরাম খানকে খান-ই বাবা বলে ডাকতেন। বৈরাম খানের তত্ত্বাবধানে তিনি সময় দক্ষিণ এশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। ১৫৬০ সালে আকবর পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা গ্রহন করেন।
সম্রাট আকবর (১৫৫৬–১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ)
আকবর ছিলেন মুঘল সম্রাট হুমায়ুন ও হামিদা বানু বেগমের পুত্র। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্য এক বিশাল রূপ ধারণ করে এবং তিনি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। তাঁর শাসনামলকে মুঘল সাম্রাজ্যের 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়।
১. রাজনৈতিক ও সামরিক সাফল্য
পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৫৫৬): সিংহাসনে বসার পরপরই তিনি তাঁর অভিভাবক বৈরাম খাঁ-এর নেতৃত্বে আফগান সেনাপতি হিমুকে পরাজিত করেন এবং মুঘল শাসন সুসংহত করেন।
সাম্রাজ্য বিস্তার: তিনি মেবার (হলদিঘাটির যুদ্ধ), গুজরাট, বাংলা (১৫৭৬ সালে দাউদ খান কররানিকে পরাজয়ের মাধ্যমে) এবং কাবুল পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন।
রাজপুত নীতি: তিনি রাজপুতদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক এবং উচ্চপদে নিয়োগের মাধ্যমে তাদের আনুগত্য লাভ করেন (যেমন: রাজা মানসিংহ ও টোডরমল)।
২. প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার
মনসবদারি প্রথা: এটি আকবরের একটি অনন্য সামরিক ও প্রশাসনিক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা (মনসব) এবং তাদের অধীনে থাকা সৈন্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হতো।
রাজস্ব সংস্কার (জবতি প্রথা): তাঁর অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমল জমির উর্বরতা ও ১০ বছরের গড় ফলন অনুযায়ী খাজনা নির্ধারণের পদ্ধতি প্রবর্তন করেন।
বাংলায় বাংলা সন প্রবর্তন: খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে আকবরের নির্দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি হিজরি ও সৌর সনের সমন্বয় করে ১৫৮৪ সালে (মতান্তরে ১৫৫৬ থেকে কার্যকর) 'বাংলা সন' প্রবর্তন করেন।
৩. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবদান
দ্বীন-ই-ইলাহি (১৫৮২): সকল ধর্মের সারকথা নিয়ে তিনি একটি সমন্বিত জীবনদর্শন বা মতবাদ প্রচার করেন, যার নাম ছিল 'দ্বীন-ই-ইলাহি'।
ইবাদতখানা: ১৫৭৫ সালে ফতেহপুর সিকরিতে তিনি সকল ধর্মের পণ্ডিতদের সাথে আলোচনার জন্য একটি উপাসনালয় বা ইবাদতখানা নির্মাণ করেন।
নবরত্ন (Nine Gems): তাঁর রাজসভায় ৯ জন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও গুণী ব্যক্তি ছিলেন (যেমন: বীরবল, আবুল ফজল, ফৈজী, তানসেন, টোডরমল প্রমুখ)।
Quick Notes:
উপাধি: জিল-ই-ইলাহি (আল্লাহর ছায়া)।
বাংলার বিজয়: ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
বিখ্যাত স্থাপত্য: আগ্রা দুর্গ, ফতেহপুর সিকরি, বুলন্দ দরওয়াজা (গুজরাট জয় স্মরণে)।
আত্মজীবনী: আকবরের সভাকবি আবুল ফজল তাঁর জীবনী 'আকবরনামা' এবং প্রশাসনিক নিয়মাবলী নিয়ে 'আইন-ই-আকবরী' রচনা করেন।
সঙ্গীত: বিখ্যাত গায়ক মিঞা তানসেন তাঁর রাজসভার অলঙ্কার ছিলেন।
জবতি প্রথা: রাজা টোডরমল প্রবর্তিত ভূমি ব্যবস্থা।
আকবরের শাসনকাল:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১৫৪২ (উমরকোট, সিন্ধু) |
| সিংহাসন আরোহণ | ১৫৫৬ (পাঞ্জাবের কালানৌরে) |
| অভিভাবক | বৈরাম খাঁ |
| রাজধানী | আগ্রা (পরবর্তীতে ফতেহপুর সিকরি) |
| মৃত্যু | ১৬০৫ (সিকান্দ্রায় সমাহিত) |
সম্রাট আকবরের পর তাঁর পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর ক্ষমতায় আসেন, যাঁর আমলে সুবাদার ইসলাম খাঁ ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করেন।
আরও কিছু তথ্য জেনে নিইঃ
- মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন সম্রাট আকবর।
- আকবর দিল্লির সিংহাসনে বসেন ১৩ বছর বয়সে।
- বাংলার মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন ১৫৭৬ সালে।
- ১৫৭৬ সালের রাজমহলের (ঝাড়খন্ড) যুদ্ধ জয়ে বাংলায় মুঘল শাসন শুরু।
- আবুল ফজল ছিলেন- সম্রাট আকবরের সভাকবি।
- আইন-ই-আকবরী গ্রন্থের রচয়িতা- আবুল ফজল।
- দেশবাচক বাংলা শব্দের প্রথম ব্যবহার হয় আইন-ই-আকবর গ্রন্থে।
- সম্রাট আকবরের আমলে সমগ্র বঙ্গদেশ 'সুবহ-ই-বাঙ্গালাহ' নামে পরিচিত।
- আকবরের রাজসভার গায়ক ছিলেন তানসেন ।
- সম্রাট আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী ছিলেন টোডরমল।
- আকবরের রাজসভায় বিখ্যাত কৌতুককার ছিলেন বীরবল।
- প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে বলা হতো সুবেদারকে।
- আকবর প্রবর্তিত মনসবদারি প্রথা হল সেনাবাহিনী সংস্কার পরিকল্পনা।
- আকবর মৃত্যুবরণ করেন ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে, আকবরের সমাধিস্থল অবস্থিত সেকেন্দ্রায়।
সম্রাট আকবরের সংস্কারমূলক অবদানঃ
- "দ্বীন-ই-ইলাহী' ধর্মের প্রবর্তন (১৫৮২)
- ‘মানসবদারি’ প্রথার প্রচলন (১৫৭৭)
- রাজপুত নীতির প্রবর্তন (১৫৬২)
- বাংলা সনের প্রবর্তন (ইংরেজি-১৫৫৬)
- জিজিয়া কর ও তীর্থকর রহিত করেন।
- ফতেহপুর সিক্তি নির্মাণ করেন।
- অমৃতসার স্বর্ণমন্দির নির্মাণ করেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সম্রাট আকবর ১৫৭৬ সনে বাংলা জয় করলেও বারো ভূঁইয়াদের কারনে মুঘল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। পরে, সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলায় মুঘল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং বাংলার রাজধানী রাজমহল হতে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ তুজুক-ই জাহাঙ্গীর। তিনি এদেশের সরকারি কাজে ফারসি ভাষা চালু করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে নুরজাহানের বিবাহ মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৬০৫–১৬২৭ খ্রিস্টাব্দ)
জাহাঙ্গীর ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট। তিনি তাঁর ন্যায়বিচার এবং শিল্পের প্রতি অনুরাগের জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় ছিল এবং শিল্পকলা, বিশেষ করে চিত্রশিল্প অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল তাঁর বিদুষী পত্নী নূরজাহানের প্রভাব, যিনি পর্দার আড়াল থেকে সাম্রাজ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।
১. বাংলার ইতিহাস ও ঢাকা (বিসিএস-এর জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ)
বারো ভূঁইয়া দমন: জাহাঙ্গীরের আমলেই বাংলার প্রতাপশালী জমিদার বা বারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে দমন করা হয়।
ঢাকার রাজধানী স্থাপন (১৬১০): ১৬১০ সালে জাহাঙ্গীরের সুবাদার ইসলাম খাঁ বারো ভূঁইয়াদের নেতা মুসা খাঁকে পরাজিত করে ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করেন।
জাহাঙ্গীরনগর: সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে ইসলাম খাঁ ঢাকার নামকরণ করেন 'জাহাঙ্গীরনগর'।
২. প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা
ন্যায়বিচারের শিকল (Chain of Justice): আগ্রা দুর্গের শাহবুরুজ থেকে যমুনা নদীর তীর পর্যন্ত তিনি একটি সোনার শিকল ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। কোনো বিচারপ্রার্থী সেই শিকল ধরে টান দিলে সম্রাট নিজেই তাঁর অভিযোগ শুনতেন।
বারো নির্দেশ (Dastur-ul-Amal): সিংহাসনে বসার পর তিনি জনকল্যাণে ১২টি ফরমান বা নির্দেশ জারি করেন।
তামাক নিষিদ্ধকরণ: তিনি ভারতে তামাকের চাষ ও সেবন নিষিদ্ধ করেছিলেন (যদিও পর্তুগিজরা তাঁর আমলেই তামাক নিয়ে এসেছিল)।
৩. শিল্প ও ইউরোপীয় আগমন
চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগ: জাহাঙ্গীরের আমলকে মুঘল চিত্রশিল্পের স্বর্ণযুগ বলা হয়। তিনি নিজেই একজন বড় মাপের চিত্রসমালোচক ছিলেন।
ইংরেজদের আগমন: ১৬০৮ সালে ব্রিটিশ রাজা প্রথম জেমসের দূত হিসেবে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স এবং পরবর্তীতে ১৬১৫ সালে স্যার টমাস রো জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন এবং সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি লাভ করেন।
Quick Notes:
নূরজাহান: তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মেহেরুন্নেসা। তিনি ছিলেন জাহাঙ্গীরের ২০তম পত্নী এবং অত্যন্ত ক্ষমতাধর নারী।
আত্মজীবনী: তিনি তুর্কি ভাষায় তাঁর আত্মজীবনী 'তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী' রচনা করেন।
শিখ গুরু নিধন: জাহাঙ্গীর শিখদের পঞ্চম গুরু অর্জুন দেবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন (যুবরাজ খসরুর বিদ্রোহে সহায়তা করার অভিযোগে)।
বিখ্যাত স্থাপনা: লাহোরের শালিমার বাগ এবং তাঁর নিজের সমাধি (লাহোর)। কাশ্মীরের নিশাত বাগও তাঁর সময়ে নির্মিত।
উপাধি: তাঁর বাল্যনাম ছিল সেলিম (আকবর তাঁকে ভালোবেসে 'শেখু বাবা' ডাকতেন)।
জাহাঙ্গীরের শাসনকাল:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১৫৬৯ (ফতেহপুর সিকরি) |
| রাজধানী | আগ্রা |
| প্রধান সুবাদার | ইসলাম খাঁ (যিনি ঢাকাকে রাজধানী করেন) |
| মৃত্যু | ১৬২৭ (লাহোরের শাহদারাতে সমাহিত) |
সম্রাট জাহাঙ্গীরের পর তাঁর পুত্র শাহজাহান সিংহাসনে বসেন, যাঁর আমলকে মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়।
আরও কিছু তথ্য জেনে নিইঃ
- জাহাঙ্গীরের ডাকনাম ছিল- শেখু বাবা।
- নূরজাহানের প্রকৃত নাম মেহেরুন্নিসা।
- বাংলার সুবাদার হিসেবে দ্বিতীয়বার নিয়োগ পান ইসলাম খান ।
- তাঁর আমলেই ইসলাম খান কর্তৃক বারো ভূঁইয়াদের দমন করা হয়।
- বাংলার রাজধানী রাজমহল হতে ঢাকায় স্থানাস্তর (১৬১০) করা হয়।
- ইসলাম খান ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর।
- ১৬১২ সালে সমগ্র বাংলা মুঘলদের অধীনে আনয়ন করেন ।
- তাঁর আমলেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় আগমন করে।
- সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুবরণ করেন- ১৯২৭ সালে, সমাধি পাকিস্তানের লাহোরে।
- তার অবদানঃ সরকারি কাজে ফারসি ভাষা চালু , নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন, আগ্রার দূর্গ নির্মাণ ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ক্যাপ্টেন হকিংস
এডওয়ার্ডস
স্যার টমাস রো
উইলিয়াম কেরি
সম্রাট জাহাঙ্গীরের পরে মুঘল সাম্রাজ্যের ৫ম শাসক হন শাহজাহান। Prince of Builders বলা হয় স্থাপত্য শিল্পের অবদান ও আগ্রহের কারনে। তাজমহল ও ময়ূর সিংহাসনসহ বিভিন্ন স্থাপত্য তার শ্রেষ্ঠ নির্মানশৈলী। ১৬৩৩ সালে ইংরেজদের প্রথম বাণিজ্য কুঠি (পিপিলাই) স্থাপন করার অনুমতি দেন শাহজাহান। শাহজাহান' উপাধি প্রদান করেন তার পিতা সম্রাট জাহাঙ্গীর।
মুঘল সাম্রাজ্যের পঞ্চম সম্রাট শাহজাহান (যাঁর বাল্যনাম ছিল খুররম) তাঁর শাসনামলকে মুঘল স্থাপত্য ও আভিজাত্যের 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে অমর করে রেখেছেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর ১৬২৮ সালে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন।তাঁর শাসনকালের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ
শাহজাহানকে ইতিহাসের 'রাজপুত্র স্থপতি' (Prince of Builders) বলা হয়। তাঁর সময়ে নির্মিত স্থাপনাগুলো আজও বিশ্বের বিস্ময়:
তাজমহল: তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে এটি নির্মাণ করেন (১৬৩২–১৬৫৩)। এর প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ আহমেদ লাহোরী।
লাল কেল্লা (Red Fort): দিল্লির এই বিশাল দুর্গটি তিনি নির্মাণ করেন। এর ভেতরে দেওয়ান-ই-আম এবং দেওয়ান-ই-খাস নামক দুটি অপূর্ব কক্ষ রয়েছে।
জামে মসজিদ: দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদটিও তাঁর অন্যতম প্রধান স্থাপত্য।
ময়ূর সিংহাসন (Peacock Throne): তিনি জহরত খচিত একটি অসাধারণ সিংহাসন তৈরি করেছিলেন, যার চূড়ায় দুটি ময়ূর বসানো ছিল। এটি তৈরিতে বিখ্যাত কোহিনূর হীরা ব্যবহার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করে এটি পারস্যে নিয়ে যান।
২. প্রশাসনিক ও সামরিক বিজয়
রাজধানী পরিবর্তন: তিনি ১৬৩৮ সালে রাজধানী আগ্রা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করেন এবং দিল্লির নাম রাখেন 'শাহজাহানাবাদ'।
দাক্ষিণাত্য বিজয়: তিনি আহমেদনগর জয় করেন এবং বিজাপুর ও গোলকুন্ডাকে মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেন।
পর্তুগিজ দমন: ১৬৩২ সালে পর্তুগিজরা হুগলিতে দস্যুবৃত্তি শুরু করলে তিনি তাদের কঠোরভাবে দমন করেন।
৩. বাংলার ইতিহাস ও শাহজাহান
রাজকুমার সুজা: শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা দীর্ঘ সময় বাংলার সুবাদার ছিলেন। তাঁর সময়ে রাজমহল ছিল বাংলার রাজধানী।
স্থাপত্য: ঢাকার বড় কাটরা এবং কুমিল্লা ও চাটগাঁর কিছু মসজিদ শাহজাহানের আমলের স্থাপত্যরীতির প্রভাব বহন করে।
Quick Notes:
বাল্যনাম: খুররম (খুররম শব্দের অর্থ— আনন্দদায়ক)।
উপাধি: শাহজাহান (দুনিয়ার মালিক)। তিনি 'শাহানশাহ' উপাধিও গ্রহণ করেছিলেন।
মমতাজ মহল: তাঁর আসল নাম ছিল আরজুমান্দ বানু বেগম।
বিদেশী পর্যটক: তাঁর সময়ে ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ার, টাভার্নিয়ার এবং ইতালীয় পর্যটক ম্যানুচি ভারত ভ্রমণ করেন।
শেষ জীবন: ১৬৫৮ সালে তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেব তাঁকে বন্দি করেন। জীবনের শেষ ৮ বছর তিনি আগ্রা দুর্গের 'শাহবুরুজ'-এ বন্দি অবস্থায় কাটান এবং যমুনার তীরে তাজমহল দেখে সময় কাটাতেন।
শাহজাহানের শাসনকাল:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১৫৯২ (লাহোর) |
| শ্রেষ্ঠ কীর্তি | তাজমহল ও ময়ূর সিংহাসন |
| প্রিয় পুত্র | দারা শিকোহ |
| সমাধি | তাজমহল (আগ্রা) |
শাহজাহানের চার পুত্রের (দারা, সুজা, মুরাদ ও আওরঙ্গজেব) মধ্যে সিংহাসন নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বা 'উত্তরাধিকার যুদ্ধ' ইতিহাসে খুব বিখ্যাত।
জেনে নিই
- আগ্রার তাজমহল ও ময়ূর সিংহাসন নির্মাণ।
- ময়ূর সিংহাসন লুট করেন ১৭৩৮ সালে ইরানের নাদির শাহ।
- ময়ূর সিংহাসনের শিল্পী ছিলেন পারস্যের বেবাদল খান।
- দেওয়ানে আম ও দেওয়ানে খাস নির্মাণ করেন।
- দিল্লি জামে মসজিদ নির্মাণ ও দিল্লির লালকেল্লা (দুর্গ) নির্মাণ।
- আগ্রায় মতি মসজিদ নির্মাণ।
- লাহোরে সালিমার উদ্যান নির্মাণ।
- খাসসমহল ও শীর্ষমহল নির্মাণ।
- ঢাকার হোসনী দালান তার আমলের স্থাপত্যকীর্তি।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
তাজমহল আগ্রার যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত । নির্মাণের সময়কাল (১৬৩২-১৬৫৩) খ্রিস্টাব্দ। এর স্থপতি ওস্তাদ লাহোরী, ওস্তাদ ঈশা খাঁ। তাজমহল নির্মাণ করেন ২০ হাজার শ্রমিক ২২ বছরে। এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করা হয় ১৯৮৩ সালে।
তাজমহল হলো ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত একটি রাজকীয় সমাধি সৌধ। সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মমতাজ মহলের (আসল নাম: আরজুমান্দ বানু বেগম) স্মৃতি রক্ষার্থে এটি নির্মাণ করেন।
১. নির্মাণ ও স্থপতি
নির্মাণকাল: ১৬৩২ সালে কাজ শুরু হয় এবং ১৬৫৩ সালে শেষ হয় (প্রায় ২২ বছর সময় লেগেছিল)।
প্রধান স্থপতি: তাজমহলের প্রধান নকশাকার ছিলেন ওস্তাদ আহমেদ লাহোরী।
শ্রমশক্তি: প্রায় ২০,০০০ শ্রমিক এবং অসংখ্য শিল্পী এর নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছিলেন।
উপাদান: এটি তৈরিতে রাজস্থান থেকে উন্নত মানের শ্বেতপাথর (White Marble) আনা হয়েছিল। পাথরের গায়ে দামি রত্ন ও লতাপাতার কারুকাজ করা হয়েছে, যাকে 'পিতরা দুরা' (Pietra Dura) পদ্ধতি বলা হয়।
২. স্থাপত্যশৈলী
তাজমহলের স্থাপত্যে পারস্য, মধ্য এশিয়া এবং ইসলামি রীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।
প্রধান গম্বুজ: এটি একটি বিশাল পেঁয়াজাকৃতির গম্বুজ দ্বারা আবৃত।
মিনার: মূল বেদীর চার কোণায় চারটি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। মিনারগুলো সামান্য বাইরের দিকে হেলে আছে যাতে ভূমিকম্পে ভেঙে পড়লেও তা মূল সমাধির ওপর না পড়ে।
প্রতিসাম্য (Symmetry): তাজমহল তার নিখুঁত প্রতিসাম্যের জন্য বিখ্যাত। কেবল শাহজাহানের সমাধিটি মূল কক্ষের মাঝখানের চেয়ে কিছুটা একপাশে (মমতাজের সমাধির পাশে), যা এই নিখুঁত প্রতিসাম্যের একমাত্র ব্যতিক্রম।
৩. ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব
ইউনেস্কো মর্যাদা: ১৯৮৩ সালে তাজমহলকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য (World Heritage Site) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সপ্তাশ্চর্য: ২০০৭ সালে এটি আধুনিক বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় স্থান পায়।
রঙ পরিবর্তন: দিনের বিভিন্ন সময়ে তাজমহলের শ্বেতপাথর ভিন্ন ভিন্ন রঙ ধারণ করে (ভোরে গোলাপি, দুপুরে সাদা এবং পূর্ণিমার রাতে সোনালি বা রূপালি)।
Quick Recap:
অবস্থান: আগ্রা, উত্তর প্রদেশ (যমুনা নদীর তীরে)।
নির্মাণ করেন: সম্রাট শাহজাহান।
স্মৃতিতে: মমতাজ মহল।
সময়কাল: ১৬৩২–১৬৫৩ খ্রি.।
প্রধান নকশাকার: ওস্তাদ আহমেদ লাহোরী।
স্থাপত্য রীতি: মুঘল স্থাপত্য (পারস্য ও তুর্কি রীতির মিশ্রণ)।
শাহজাহানের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পর তাঁর শেষ জীবন কিন্তু বেশ কষ্টের ছিল। তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেব তাঁকে বন্দি করলে তিনি জীবনের শেষ কয়েক বছর আগ্রা দুর্গ থেকে কেবল এই তাজমহলের দিকে তাকিয়েই দিন কাটাতেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের গর্ভে চারপুত্র ও দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পুত্রদের নাম দারা, সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ। কন্যাদের নাম ছিল জাহান আরা ও রওশন আরা। ভ্রাতৃযুদ্ধে জাহান আরা দারার পক্ষ এবং রওশন আরা আওরঙ্গজেবের পক্ষ সমর্থন করে। যুদ্ধে অপর ভাইদের পরাজিত করে আওরঙ্গজেব ক্ষমতা দখল করেন। সম্রাট শাজাহান তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেবকে যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ 'আলমগীর' নামক তরবারী প্রদান করেন। জিন্দাপীরের সম্মানে বাংলার সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬১ খ্রি. বিনাযুদ্ধে কুচবিহার মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এসময় কুচবিহারের নাম রাখা হয়েছিল ‘আলমগীরনগর’।
সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর (১৬৫৮–১৭০৭)
তিনি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ এবং শেষ শক্তিশালী সম্রাট। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমেই মূলত মুঘলদের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে।
১. রাজনৈতিক অর্জন ও উপাধি
উপাধি: তিনি 'আলমগীর' (বিশ্ববিজয়ী) এবং 'জিন্দা পীর' (জীবন্ত সাধু) নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর অনাড়ম্বর জীবনযাপনের জন্য তাঁকে জিন্দা পীর বলা হতো।
সীমানা বিস্তার: তাঁর সময়ে মুঘল সাম্রাজ্য ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভৌগোলিক বিস্তার লাভ করে (কাবুল থেকে চট্টগ্রাম এবং কাশ্মীর থেকে দক্ষিণ ভারত)।
বাংলার বিজয়: তাঁর আমলে ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রাম জয় করেন এবং এর নাম রাখেন 'ইসলামাবাদ'।
২. বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিসমূহ
জিজিয়া কর (১৬৭৯): সম্রাট আকবর যে জিজিয়া কর রহিত করেছিলেন, আওরঙ্গজেব তা পুনরায় প্রবর্তন করেন।
ধর্মীয় নীতি: তিনি অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিলেন এবং শরিয়াহ আইন কঠোরভাবে পালন করতেন। তিনি মদ্যপান, জুয়া এবং সঙ্গীত (রাজদরবারে) নিষিদ্ধ করেছিলেন।
শিখ বিদ্রোহ: শিখদের নবম গুরু তেগ বাহাদুরকে তিনি মৃত্যুদণ্ড দেন, যা মুঘল-শিখ সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায়।
৩. দাক্ষিণাত্য নীতি (Deccan Policy)
আওরঙ্গজেব তাঁর জীবনের শেষ ২৫ বছর দক্ষিণ ভারত জয়ে ব্যয় করেন। একে ঐতিহাসিকরা 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' (Deccan Ulcer) বলেন।
এটি মুঘল রাজকোষকে শূন্য করে দেয়।
মারাঠা নেতা শিবাজীর সাথে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মুঘল শক্তির ভিত নাড়িয়ে দেয়।
৪. স্থাপত্য ও সাহিত্য
স্থাপত্য: লাহোরের বাদশাহী মসজিদ, দিল্লির লাল কেল্লার মতি মসজিদ এবং তাঁর স্ত্রীর সমাধি বিবি কা মাকবারা (দ্বিতীয় তাজমহল)।
সাহিত্য: তাঁর সময়ে ইসলামি আইনের বিখ্যাত সংকলন 'ফাতাওয়া-ই-আলমগিরি' রচিত হয়।
একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১৬১৮ (গুজরাট) |
| পিতা ও মাতা | শাহজাহান ও মমতাজ মহল |
| রাজত্বকাল | ১৬৫৮–১৭০৭ (৪৯ বছর) |
| প্রধান সেনাপতি | মীর জুমলা ও রাজা জয়সিংহ |
| সমাধি | খুলদাবাদ (মহারাষ্ট্র) |
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এরপরের শাসকদের 'পরবর্তী মুঘল' বলা হয়।
জেনে নিই
- সম্রাট আওরঙ্গজেব অতিশয় ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন।
- তাঁকে 'জিন্দাপীর' বলা হয়।
- ফতওয়া-ই-আলমগীরী রচনা করেন আওরঙ্গজেব।
- তিনি জিজিয়া কর পুনঃস্থাপন করেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
দুর্বল ও অকর্মণ্য মুঘল সম্রাট মুহম্মদ শাহ এর আমলে (১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে) পারস্যের নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করেন। নাদির শাহ ভারত হতে মহামূল্যবান কোহিনুর হীরা, ময়ূর সিংহাসন এবং প্রচুর ধনরত্ন পারস্যে নিয়ে যান।
সম্রাট মুহাম্মদ শাহ (১৭১৯–১৭৪৮)
তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের ১২তম সম্রাট ছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তাঁর দীর্ঘ ২৯ বছরের শাসনামলে সেই ভাঙন আরও ত্বরান্বিত হয়।
১. উপাধি ও চরিত্র:
রঙ্গিলা (Rangila): তিনি অত্যন্ত বিলাসপ্রিয় এবং আমোদ-প্রমোদে মত্ত থাকতেন বলে ইতিহাসে তাঁকে 'মুহাম্মদ শাহ রঙ্গিলা' বলা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার চেয়ে নাচ-গান ও শিল্পকলার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি।
২. সাম্রাজ্যের ভাঙন ও স্বাধীন রাজ্যের উত্থান:
তাঁর দুর্বল শাসনের সুযোগে মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশ স্বাধীন হতে শুরু করে:
বাংলা: মুর্শিদকুলি খাঁর নেতৃত্বে বাংলা কার্যত স্বাধীন হয়ে যায়।
হায়দ্রাবাদ: নিজাম-উল-মুলক হায়দ্রাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
অযোধ্যা (Awadh): সাদাত খাঁ স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
৩. নাদির শাহের আক্রমণ (১৭৩৯):
মুহাম্মদ শাহের আমলের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হলো পারস্যের শাসক নাদির শাহের ভারত আক্রমণ।
কারনালের যুদ্ধ (Battle of Karnal): ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ মুঘল বাহিনীকে পরাজিত করে দিল্লি দখল করেন।
লুণ্ঠন: নাদির শাহ দিল্লি থেকে প্রচুর ধনসম্পদ লুট করেন, যার মধ্যে ছিল বিশ্ববিখ্যাত কোহিনূর হীরা এবং শাহজাহানের তৈরি ময়ূর সিংহাসন। এর ফলে মুঘলদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়
Quick Notes:
সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের পতন: মুহাম্মদ শাহ নিজাম-উল-মুলকের সহায়তায় ক্ষমতাধর 'সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়কে' (যাঁদের কিং মেকার বলা হতো) ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করেন।
উর্দু ভাষা: তাঁর শাসনামলে উর্দু ভাষা ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা পায় এবং এটি রাজদরবারের ভাষায় পরিণত হতে শুরু করে।
আহমদ শাহ আবদালী: তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে (১৭৪৮ সালে) আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালী প্রথমবার ভারত আক্রমণ করেছিলেন।
একনজরে মুহাম্মদ শাহ:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| আসল নাম | রওশন আখতার |
| উপাধি | রঙ্গিলা |
| প্রধান বিপর্যয় | নাদির শাহের আক্রমণ (১৭৩৯) |
| লুণ্ঠিত সম্পদ | ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর হীরা |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শেষ মুঘল সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুনে) নির্বাসন দেওয়া হয়। ১৮৬২ সালে তিনি রেঙ্গুনে নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রেঙ্গুনেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর (১৮৩৭–১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) তিনি ছিলেন মুঘল বংশের ১৯তম এবং শেষ সম্রাট। তাঁর শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্য কেবল দিল্লির লাল কেল্লার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রকৃতপক্ষে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দয়ার ওপর নির্ভরশীল একজন পেনশনভোগী শাসক ছিলেন। তবে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী সিপাহিরা তাঁকে ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করলে তিনি ব্রিটিশদের রোষানলে পড়েন। বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশরা তাঁকে বন্দি করে রেঙ্গুনে (বর্তমান মিয়ানমার) নির্বাসিত করে, যার মাধ্যমে ৩৩২ বছরের মুঘল শাসনের চিরস্থায়ী অবসান ঘটে।
১. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ও সম্রাট
১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাটে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর সিপাহিরা দিল্লিতে এসে বাহাদুর শাহ জাফরকে 'শাহেনশাহ-ই-হিন্দুস্তান' (ভারতের সম্রাট) হিসেবে ঘোষণা করেন।
বৃদ্ধ সম্রাট অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিদ্রোহের প্রতীকী নেতৃত্ব দেন।
বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ সেনাপতি হডসন তাঁকে দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি থেকে বন্দি করেন এবং তাঁর চোখের সামনেই তাঁর দুই পুত্র ও এক পৌত্রকে হত্যা করা হয়।
২. কবি ও সাহিত্যিক জাফর
বাহাদুর শাহ জাফর একজন উঁচু দরের কবি ছিলেন। 'জাফর' ছিল তাঁর কাব্যিক ছদ্মনাম।
তিনি উর্দু সাহিত্যের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বিখ্যাত কবি মির্জা গালিব এবং জক (Zauq) তাঁর রাজসভা অলংকৃত করেছিলেন।
নির্বাসিত জীবনে তাঁর লেখা বিখ্যাত দুঃখগাথা আজও উর্দু সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছে:
"কিতনা হ্যায় বদনসীব জাফর দাফন কে লিয়ে, দো গজ জমিন ভি না মিলি কু-এ-ইয়ার মে।" (জাফর কতই না দুর্ভাগ্যবান যে, তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য প্রিয় স্বদেশের মাটিতে দু-গজ জমিও জুটল না।)
৩. বিচার ও নির্বাসন
বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা তাঁর ওপর বিচারকার্য চালায় এবং তাঁকে রাজ্যচ্যুত করে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়।
১৮৬২ সালে রেঙ্গুনেই এই মুঘল সম্রাটের মৃত্যু হয় এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more
