পাল ও সেন শাসনামল

বাংলাদেশ বিষয়াবলী - সাধারণ জ্ঞান -

6.8k

পাল শাসনামল (৭৫০ – ১১৬১ খ্রিস্টাব্দ)

পাল বংশ ছিল বাংলার প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ, যা প্রায় ৪০০ বছর শাসন করেছিল। মাৎস্যন্যায়ের চরম অরাজকতার পর গোপাল নামক এক নেতাকে জনগণের প্রতিনিধিরা সিংহাসনে বসান, যার মাধ্যমে পাল বংশের যাত্রা শুরু হয়। পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এই বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন ধর্মপাল, যিনি উত্তর ভারতের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেন এবং বিখ্যাত সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর) নির্মাণ করেন। তাঁর পুত্র দেবপাল পাল সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করেন। পাল আমলে বাংলায় ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প এবং শিক্ষার প্রভূত উন্নতি ঘটে। তবে শেষ দিকে কৈবর্ত বিদ্রোহ এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে পাল শাসনের পতন ঘটে। পাল আমলকে বাংলার ইতিহাসের 'স্বর্ণযুগ' হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

সেন শাসনামল (১০৯৭ – ১২০৪ খ্রিস্টাব্দ)

পাল রাজবংশের পতনের পর বাংলায় সেন বংশের শাসন শুরু হয়। সেন রাজারা মূলত দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে এসেছিলেন। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সামন্ত সেন, তবে প্রকৃত শাসন শুরু করেন বিজয় সেন। সেন রাজারা ছিলেন হিন্দু (ব্রাহ্মণ্য) ধর্মাবলম্বী। বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন সমাজে 'কৌলিন্য প্রথা' প্রবর্তন করেন। সেন বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা ছিলেন লক্ষ্মণ সেন, যাঁর আমলে বাংলার শিল্প ও সাহিত্যের ব্যাপক উন্নতি ঘটে। জয়দেব এবং ধোয়ী ছিলেন তাঁর সভার বিখ্যাত কবি। ১২০৪ সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করলে বাংলায় সেন শাসনের অবসান ঘটে এবং মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

পাল সাম্রাজ্যের উৎসস্থল ছিল বাংলা অঞ্চল। পাল সম্রাটদের নামের শেষে 'পাল' অনুসর্গটি যুক্ত ছিল যার অর্থ "রক্ষাকর্তা"। পাল সম্রাটেরা বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী ছিলেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন বাংলায় তেমন কোন যোগ্য শাসক ছিল না ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে গৌড়ের সম্রাটপদে গোপালের নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে এই সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে। অধুনা বাংলা ও বিহার ভূখণ্ড ছিল পাল সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এই সাম্রাজ্যের প্রধান শহরগুলি ছিল পাটলীপুত্র, বিক্রমপুর, রামাবতী (নরেন্দ্র), মুঙ্গের, তাম্রলিপ্ত ও জগদ্দল। বাংলার প্রথম বংশানুক্রমিক শাসন শুরু হয় পাল রাজত্বকালে। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ৪০০ বছর শাসন করেন পাল বংশের রাজারা।

পাল বংশ (Pala Dynasty)

পাল রাজত্বের উত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলার অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটে। বাংলায় প্রথম বংশানুক্রমিক শাসন শুরু হয় পাল বংশের রাজত্বকালে। পাল বংশের রাজারা একটানা চারশত বছর এদেশ শাসন করেন। এত দীর্ঘ সময় আর কোনো রাজবংশ এদেশ শাসন করেনি। পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। পাল রাজাদের পিতৃভূমি (জনকভূ) ছিল বরেন্দ্র।

জেনে নিই

  • বাংলার প্রথম বংশানুক্রমিক শাসন শুরু হয় পাল বংশের মাধ্যমে।
  • বাংলার দীর্ঘস্থায়ী (৪০০ বছর) রাজ্য শাসন করে পাল রাজবংশ।
  • পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।
  • মোট ১৭ জন পাল শাসক বাংলা শাসন কার্য পরিচালনা করেন।
  • পাল রাজাদের পিতৃভূমি ছিল- বরেন্দ্র অঞ্চল।
  • বাংলায় চিত্রশিল্প ও পালি ভাষার বিস্তার ঘটে পাল আমলে।
  • এ সময়ে বাংলা সাহিত্যের একমাত্র প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ রচিত হয়।
  • চর্যাপদ নেপালের রাজদরবার থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কার করেন- ১৯০৭ সালে।
  • পাল যুগে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রথম আবির্ভাব হয়।
Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

পাল রাজাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন ধর্মপাল। বাংলা ও বিহারব্যাপী তাঁর শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। তিনি পরমেশ্বর, পরমতারক মহারাজাধিরাজ উপাধি লাভ করেন। বিক্রমশীল উপাধি অনুসারে 'বিক্রমশীল বিহার' প্রতিষ্ঠা করেন। নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে ‘সোমপুর বিহার’ প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মপাল নেপাল পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। 'সোমপুর বিহার' জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৮৫ সালে বিশ্বসভ্যতার নিদর্শন হিসেবে (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) স্বীকৃত হয়েছে।

ধর্মপাল (৭৮১ ৮২১ খ্রি.) ছিলেন পাল রাজাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। বিক্রমশীল তাঁর উপাধি।

পাল সম্রাট ধর্মপাল (৭৮১–৮২১ খ্রিস্টাব্দ) গোপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ধর্মপাল পাল বংশের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং তিনি ছিলেন এই বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তাঁর ৪০ বছরের দীর্ঘ শাসনামলে পাল সাম্রাজ্য উত্তর ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তিনি কনৌজের আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধে (পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকুট) অংশগ্রহণ করেন এবং সফলভাবে কনৌজ জয় করে সেখানে একটি দরবার আয়োজন করেন।

এই সাফল্যের কারণে তাঁকে 'উত্তরাপথ স্বামী' (উত্তর ভারতের প্রভু) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ধর্মপাল ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের একজন মহান পৃষ্ঠপোষক। তাঁর অমর কীর্তি হলো নওগাঁ জেলার বদলগাছিতে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার, যা বর্তমানে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া তিনি বিক্রমশীলা বিহার এবং ওদন্তপুর বিহারসহ আরও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মঠ নির্মাণ করেন। তাঁর শাসনামলে বাংলায় শিল্পকলা ও শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং বাংলা রাজনৈতিকভাবে উত্তর ভারতে একটি শ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

গোপাল পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা। গোপাল ছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত। ৭৫০ থেকে ৭৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। ভারতের বিহারে 'অদন্তপুরী মহাবিহার' প্রতিষ্ঠা করেন।

গোপাল (৭৫৬-৭৮১ খ্রি.) ছিলেন পাল বংশের প্রথম রাজা।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

দেবপাল ছিলেন রাজা ধর্মপালের পুত্র এবং পাল বংশের তৃতীয় রাজা। তিনি মুঙ্গেরে (বিহার) রাজধানী স্থাপন করেন।তিনি পাল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বেশি সাম্রাজ্য বিস্তারকারী শাসক। দেবপালের পৃষ্ঠপোষকতায় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠে। দেবপাল আসামকে করদ রাজ্যে পরিনত করেন।

পাল সম্রাট দেবপাল (৮২১–৮৬১ খ্রিস্টাব্দ) দেবপাল ছিলেন পাল বংশের অন্যতম শক্তিশালী এবং শ্রেষ্ঠ দিগ্বিজয়ী শাসক। তাঁর ৪০ বছরের শাসনামল ছিল পাল সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তারের স্বর্ণযুগ। তিনি তাঁর সুযোগ্য সেনাপতি ও মন্ত্রীদের সহায়তায় উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারতের বিন্ধ্যা পর্বত এবং কামরূপ (আসাম) থেকে ওড়িশা পর্যন্ত সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তৃত করেন। দেবপাল প্রতিহার রাজা রামভদ্র ও মিহির ভোজকে পরাজিত করে পালদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখেন। তিনি কেবল একজন দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন না, বরং বৌদ্ধ ধর্মের বিশাল পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। তাঁর সময়ে মগধের রাজগৃহ ও নালন্দায় অনেক বৌদ্ধ মঠ নির্মিত হয়। সুমাত্রা ও জাভার শৈলেন্দ্র বংশীয় রাজা বালপুত্রদেব নালন্দায় একটি মঠ নির্মাণের অনুমতি চাইলে দেবপাল তাঁকে পাঁচটি গ্রাম দান করেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক সুখ্যাতির প্রমাণ দেয়। তাঁর শাসনামলে পাল স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের ব্যাপক উন্নতি ঘটে, যার ফলে এই সময়কালকে পাল বংশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় বলা হয়।

Content added By
Content updated By

নারায়ণপাল ছিলেন পাল বংশের পঞ্চম রাজা। তিনি সবচেয়ে বেশি (৫৪ বছর) ক্ষমতায় থাকেন।

পাল রাজা নারায়ণপাল (৮৬৬–৯২০ খ্রিস্টাব্দ) দেবপালের পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে নারায়ণপাল প্রায় ৫৪ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর শাসনামল পাল বংশের সামরিক গৌরবের চেয়ে পতনের গল্পের জন্য বেশি পরিচিত। এই সময়ে পাল সাম্রাজ্য চরম সংকটের মুখে পড়ে এবং উত্তর ভারতের প্রতিহার রাজারা শক্তিশালী হয়ে পালদের অধিকাংশ এলাকা দখল করে নেয়। বিশেষ করে কনৌজ এবং মগধের কিছু অংশ প্রতিহার রাজা মিহির ভোজ এবং মহেন্দ্রপালের কাছে হাতছাড়া হয়ে যায়। তবে তাঁর রাজত্বের শেষের দিকে তিনি হারানো কিছু এলাকা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছিলেন। নারায়ণপাল ধর্মীয়ভাবে উদার ছিলেন; বৌদ্ধ রাজবংশের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তিনি শিব মন্দির নির্মাণে ভূমি দান করেছিলেন, যা তাঁর পরধর্মসহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়। তাঁর সময়েই পাল সাম্রাজ্য কার্যত কেবল বিহার ও উত্তরবঙ্গের কিছু অংশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতনের পথ প্রশস্ত করে।

Content added By
Content updated By

প্রথম মহীপাল (৯৯৫-১০৪৩ খ্রি.) এর সময়ে তালপাতায় অঙ্কিত চিত্রসম্বলিত বৌদ্ধ গ্রন্থ 'অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা' পাণ্ডুলিপির বারোটি রঙ্গিন চিত্র বঙ্গীয় চিত্রকলার প্রাচীনতম নিদর্শন।

মহীপালের রাজত্বকাল ছিল ৫০ বছর। তিনি দিনাজপুরের মহীপাল দীঘি ও মুর্শিদাবাদের মহীপালের সাগরদীঘি নির্মাণ করে। তাঁর উপাধি ছিল 'পরমেশ্বর পরম ভট্টারক মহারাজাধিরাজ'। মহীপালের নামানুসারে বগুড়ার মহীপুর, রংপুরের মাহিগঞ্জ, দিনাজপুরের মাহীসন্তোষ ইত্যাদি অঞ্চলের নামকরণ করা হয়।

প্রথম মহীপাল (৯৯৫–১০৪৩ খ্রিস্টাব্দ) পাল রাজবংশের গৌরব যখন প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছিল, তখন প্রথম মহীপাল সিংহাসনে আরোহণ করে এক নবযুগের সূচনা করেন। নারায়ণপালের পরবর্তী দুর্বল শাসকদের সময়ে পাল সাম্রাজ্য উত্তরবঙ্গের 'বরেন্দ্র' অঞ্চলসহ অধিকাংশ এলাকা হারিয়েছিল। প্রথম মহীপাল তাঁর অদম্য সাহসিকতায় কম্বোজ রাজাদের পরাজিত করে বরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধার করেন এবং পূর্ববঙ্গ ব্যতীত সমগ্র বাংলায় পাল শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এই বিশাল সাফল্যের কারণেই তাকে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর রাজত্বকালেই দক্ষিণ ভারতের শক্তিশালী চোল রাজা রাজেন্দ্র চোল এবং চেদীরাজ গাঙ্গেয় দেব বাংলা আক্রমণ করেছিলেন, যা তিনি সফলভাবে মোকাবিলা করেন। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত উদার ছিলেন এবং সারনাথসহ বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য বৌদ্ধ ও হিন্দু মন্দির সংস্কার ও নির্মাণ করেন। তাঁর জনহিতকর কাজের স্মৃতি হিসেবে আজও উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গে 'মহীপালের দীঘি' এবং অনেক লোকগাথা বা গান (মহীপালের গীত) প্রচলিত আছে।

Content added By
Content updated By

দ্বিতীয় মহীপাল (১০৭৫-১০৮০ খ্রি.) এর শাসনামলে কৈবর্ত বিদ্রোহ হয়। অনেকে শুধু জেলে সম্প্রদায়কে কৈবর্ত বললেও প্রকৃতপক্ষে জেলে, কৃষক এবং শ্রমজীবী মানুষকে সাধারণত কৈবর্ত বলা হতো। পাল রাজাদের এক সামন্ত দিব্যর নেতৃত্বে কৈবর্তরা রাজ্যের বরেন্দ্রীয় অংশ দখল করে নেয়। কৈবর্ত বিদ্রোহকে অনেক সময় বরেন্দ্র বিদ্রোহ বা সামন্ত বিদ্রোহও বলা হয়ে থাকে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের সামন্তবর্ণ দ্বিতীয় মহীপালের সময়ে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কৈবর্ত বিদ্রোহকে বরেন্দ্র বিদ্রোহ বা সামস্ত বিদ্রোহও বলা হয়। জেলে সম্প্রদায়কে কৈবর্ত বলা হলেও এটি মূলত জেলে, কৃষক, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন নিচু শ্রেণীর কর্মজীবী মানুষকে নির্দেশ করে। কৈবর্ত বিদ্রোহের নেতা ছিলেন কৈবর্ত নায়ক দিব্যোক বা দিব্য। তিনি দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে বরেন্দ্র দখল করে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

Content added By
Content updated By

পাল বংশের সর্বশেষ সফল শাসক ছিলেন রামপাল। শাসক রামপাল দিব্যকে পরাজিত করে বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন। তিনি রাজধানী স্থাপন করেন 'রামাবতী' (মালদহে)। দিনাজপুর শহরের নিকট যে রামসাগর রয়েছে তা রামপালের কীর্তি। তাঁর সভাকবি ছিলেন’ রামচরিত' এর রচয়িতা কবি সন্ধ্যাকর নন্দী।

পাল সম্রাট রামপাল (১০৮২–১১২৪ খ্রিস্টাব্দ) প্রথম মহীপালের পর পাল বংশ পুনরায় দুর্বল হয়ে পড়লে এবং দ্বিতীয় মহীপালের সময় 'কৈবর্ত বিদ্রোহের' ফলে পালরা তাদের পিতৃভূমি বরেন্দ্র হারায়। এই চরম সংকটের মুহূর্তে সিংহাসনে আরোহণ করেন রামপাল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও কুশলী শাসক। তিনি তাঁর মামা মথনদেব এবং বিভিন্ন সামন্ত রাজাদের সহায়তায় একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং কৈবর্ত শাসক ভীমকে পরাজিত ও হত্যা করে বরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধার করেন। তাঁর এই বীরত্বগাথা ও জীবন নিয়ে কবি সন্ধাকর নন্দী বিখ্যাত 'রামচরিতম' কাব্য রচনা করেন। রামপাল কেবল বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারই করেননি, বরং কামরূপ (আসাম) এবং ওড়িশাতেও পালদের আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর শাসনামলে বাংলায় শেষবারের মতো পাল সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা ও শান্তি ফিরে এসেছিল।

রামাবতী ও সাংস্কৃতিক অবদান

রামপাল তাঁর নতুন রাজধানী হিসেবে 'রামাবতী' নগরী প্রতিষ্ঠা করেন (যা বর্তমানে মালদহের কাছাকাছি অবস্থিত ছিল)। তিনি প্রজাবৎসল শাসক ছিলেন এবং কৃষির উন্নতির জন্য অনেক দীঘি ও খাল খনন করেন। তাঁর সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি হিন্দু ধর্মের প্রতিও বিশেষ অনুরাগের প্রমাণ পাওয়া যায়। ১১২৪ সালে তাঁর প্রিয় মামা মথনদেবের মৃত্যুতে শোকাতুর হয়ে তিনি গঙ্গায় আত্মবিসর্জন দেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমেই পাল বংশের কেন্দ্রীয় শক্তি কার্যত ভেঙে পড়ে এবং সেন রাজবংশের উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়।

Content added By
Content updated By

মদনপাল (১১৪৩-১১৬২ খ্রি.) ছিলেন পাল বংশের সর্বশেষ রাজা। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ধ্যাকর নন্দী সংস্কৃত কাব্য 'রামচরিতম' রচনা করেন। এই কাব্যে যুগপৎ হিন্দু ধর্মের অবতার রামচন্দ্র এবং পাল রাজা রামপালের চরিতকথা বর্ণিত হয়েছে।

মদনপালের পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিত রচনা করেন। তিনি বিজয় সেনের কাছে পরাজয়ের মধ্যদিয়ে সেনরা বাংলাকে দখল করেন।

মদনপাল ছিলেন পাল রাজবংশের ১৮তম এবং সর্বশেষ স্বীকৃত শাসক। তাঁর রাজত্বকাল ছিল পাল সাম্রাজ্যের চরম দুর্দিন ও পতনের চূড়ান্ত পর্যায়। রামপালের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীদের দুর্বলতার সুযোগে পাল সাম্রাজ্য চারপাশ থেকে আক্রান্ত হতে থাকে। মদনপালের সময়েই দক্ষিণ ভারত থেকে আসা সেন রাজবংশ (বিশেষ করে বিজয় সেন) প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং পালদের হাত থেকে একে একে গৌড় ও বরেন্দ্র অঞ্চল কেড়ে নেয়। মদনপাল তাঁর শাসনের শেষ দিকে কেবল উত্তর বিহারের মগধ অঞ্চলের একটি ছোট অংশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন। ১১৬১ খ্রিস্টাব্দের দিকে তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই বাংলার বুক থেকে পাল রাজবংশের শাসনের চিরতরে সমাপ্তি ঘটে এবং সেনদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

Content added By
Content updated By

সেন রাজবংশ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম দিকের মধ্যযুগীয় একটি হিন্দু রাজবংশ ছিল, সেন বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় একাদশ শতাব্দীর মাঝপর্বে। সেনরাজাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে তারা পালদের হটিয়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন সুদূর কনৌজ পর্যন্ত। কর্ণটি থেকে বৃদ্ধ বয়সে বাংলার আসেন সামন্ত সেন। তিনি প্রথমে বসতি স্থাপন করেন রাঢ় অঞ্চলে বা গঙ্গা নদীর তীরে। তিনি রাজ্য প্রতিষ্ঠা না করায় সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা দেওয়া হয় হেমন্ত সেনকে। আর বিজয় সেনকে বলা হয় সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। সেনরা জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন।

সেন রাজাদের ইতিহাস

সামন্ত সেন ছিলেন বাংলায় সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট থেকে বৃদ্ধ বয়সে বাংলায় আসেন। তিনি প্রথমে বসতি স্থাপন করেন রাঢ় অঞ্চলে গঙ্গা নদীর তীরে। তিনি রাজ্য প্রতিষ্ঠা না করায় সেন বংশের প্রথম রাজার মর্যাদা দেওয়া হয় সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেনকে। সেন বংশের রাজারা ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী।)

জেনে নিই

  • সেন বংশের প্রথম পুরুষ ছিলেন সামন্ত সেন।
  • সেন বংশের রাজাদের আদিনিবাস দক্ষিণাত্যের কর্ণাটক।
  • বর্ণপ্রথার প্রচলন করেছিলেন সেন রাজারা।
  • সেন রাজারা ব্রাহ্মণ ধর্মের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে। ধারণা করা হয়, হেমন্ত সেন পাল রাজাদের অধীনে একজন সামন্ত রাজা ছিলেন।
  • কৈবর্ত বিদ্রোহের সময় পাল বংশের রাজা রামপালকে সাহায্য করেন হেমন্ত সেন।
Content added By
Content updated By

বিজয় সেন (১০৯৮-১১৬০ খ্রি.) ছিলেন সেন বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা। তিনিই সম্ভবত সামন্তরাজা থেকে নিজেকে স্বাধীন রাজারূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। হুগলী জেলার ত্রিবেনীতে অবস্থিত বিজয়পুর ছিল তাঁর প্রথম রাজধানী। তিনি দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে।

হেমন্ত সেনের মৃত্যুর পর বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন বিজয় সেন। সেন বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা বিজয় সেন। মহারাজাধিরাজ, পরমেশ্বর পরমভট্টারক উপাধি গ্রহণ করেন। পাল বংশের পতন ঘটে বিজয় সেনের হাতে। হুগলী জেলার বিজয়পুর ছিল বিজয় সেনের প্রথম রাজধানী। দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে। ধর্মের দিক থেকে বিজয় সেন ছিলেন শৈব।

Content added By
Content updated By

বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৮ খ্রি.) বাংলায় সামাজিক সংস্কার বিশেষ করে কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তক হিসাবে পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন পণ্ডিত ও লেখক। দানসাগর এবং অদ্ভুতসাগর তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। অবশ্য অদ্ভুতসাগর গ্রন্থটির অসমাপ্ত অংশ তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন সম্পূর্ণ করেছিলেন।

বিজয় সেনের পর সিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁর পুত্র বল্লাল সেন । 'দানসাগর' ও 'অদ্ভূতসাগর' গ্রন্থের লেখক বল্লাল সেন। ; অদ্ভুতসাগর' গ্রন্থটি তিনি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। এটি সমাপ্ত করে তাঁর পুত্র লক্ষ্মণ সেন। বল্লাল সেন ছিলেন তন্ত্র হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষক। বল্লাল সেনের আমলে বৌদ্ধ ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। বল্লাল সেন হিন্দু সমাজকে নতুন করে গঠন করার জন্য 'কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তন করেন। বল্লাল সেন শেষ জীবন অতিবাহিত করেন বানপ্রস্থ অবলম্বন করেন। বল্লাল সেনের বিশেষ উপাধি ছিল- অরিরাজ নিঃশঙ্ক শঙ্কর।

Content added By
Content updated By

লক্ষণ সেন (১১৭৮-১২০৬ খ্রি.) ছিলেন সেন বংশের সর্বশেষ স্বাধীন রাজা। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে (ত্রয়োদশ শতাব্দীতে) ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি লক্ষণ সেনের নিকট থেকে নদীয়া
(বাংলা) দখল করেন। ফলে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। বখতিয়ার খলজি আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক দশত্ ই মার্গের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন জাতিতে তুর্কি, বংশে খলজি এবং বৃত্তিতে ভাগ্যান্বেষী সৈনিক। বখতিয়ার খলজি ১২০৫ সালে সেনদের অন্যতম রাজধানী লক্ষণাবতী (গৌড়) অধিকার করেন। এ সময় থেকেই লক্ষণাবতীর নাম হয় লখনৌতি। লক্ষণাবতী (গৌড়) কে কেন্দ্র করে বাংলায় মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। লক্ষণ সেন পলায়ন করে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে লক্ষণ সেনের মৃত্যু হয়। লক্ষণ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন (১২০৬-১২২৫ খ্রি.) ও কেশব সেন (১২২৫-১২৩০ খ্রি.) কিছুকাল পূর্ব বাংলা শাসন করেন। প্রকৃতপক্ষে লক্ষণ সেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় সেন শাসন তথা হিন্দু রাজাদের শাসনের অবসান ঘটে।

গৌরেশ্বর লক্ষ্মণ সেন ছিলেন সর্বশেষ কার্যকরী রাজা। বৃদ্ধ বয়সে লক্ষ্মণ সেন গঙ্গা তীরে দ্বিতীয় রাজধানী নবদ্বীপে বসবাস শুরু করেন। ১১৯৬ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরবন এলাকায় ডোম্মন পাল বিদ্রোহী হয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। লক্ষ্মণ সেনের প্রধানমন্ত্রী ও ধর্মীয় প্রধান ছিলেন হলায়ুধ মিশ্র। হলায়ুধ মিশ্র বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগের সৃষ্টিকর্ম 'সেক শুভোদয়া' রচনা করেন। লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি ছিলেন- জয়দেব। তার রচনা গীতগোবিন্দ। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজি রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করে। লক্ষ্মণ সেন নদীপথে পালিয়ে পূর্ববঙ্গের রাজধানী বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ১২৩০ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মণ সেনের দুই পুত্র কেশব সেন ও বিশ্বরূপ সেন নামমাত্র শাসন করে।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

Promotion

Are you sure to start over?

Loading...