বাংলায় মুসলিম শাসনামল

বাংলাদেশ বিষয়াবলী - সাধারণ জ্ঞান -

12.3k

মুহম্মদ ঘুরীর সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবেকের আদেশক্রমে তুর্কী বার ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী ১২০৪ সালে মাত্র ১৭-১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন সেন বংশের রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলা দখল করেন। বখতিয়ার খলজীর বাংলা অধিকারের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তিনি দিনাজপুরের দেবকোটে বাংলার রাজধানী স্থাপন করেন।

১. প্রাথমিক যুগ ও দিল্লি সালতানাতের অধীনস্থ বাংলা (১২০৪–১৩৩৮)

এই সময়ে বাংলা সরাসরি দিল্লির সুলতানদের অধীনে ছিল অথবা দিল্লির প্রতিনিধিরা এখান শাসন করতেন।

  • বখতিয়ার খলজী: ১২০৪ সালে সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলার একাংশ (লখনৌতি) জয় করেন।

  • সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী: তিনি বাংলার রাজধানী দেবকোটে স্থানান্তর করেন এবং নৌবাহিনী গড়ে তোলেন।

  • বালবনের সময়: দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের সময় তাঁর পুত্র বুঘরা খাঁ বাংলার সুবাদার ছিলেন।

২. স্বাধীন সুলতানি আমল (১৩৩৮–১৫৭৬)

এই ২০০ বছর বাংলা দিল্লির শাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং স্বাধীন ছিল। একে বাংলার ইতিহাসের 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়।

  • ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ: ১৩৩৮ সালে সোনারগাঁওয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি বাংলায় প্রথম স্বাধীন সুলতান হিসেবে স্বীকৃত।

  • শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ: তিনি 'শাহ-ই-বাঙালা' উপাধি ধারণ করেন এবং ছোট ছোট ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করে 'বাঙালা' নাম দেন। তাঁর বংশকে বলা হয় ইলিয়াস শাহী বংশ

  • আলাউদ্দিন হোসেন শাহ: তিনি ছিলেন হোসেন শাহী বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান। তাঁর আমলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি হয়। তাঁকে 'নৃপতি তিলক' ও 'জগৎভূষণ' বলা হতো।

৩. মুঘল ও নবাবী আমল (১৫৭৬–১৭৫৭)

আকবরের সময় থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখল পর্যন্ত এই সময়কাল।

  • আকবরের বাংলা বিজয় (১৫৭৬): রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ খান কররানিকে পরাজিত করে মুঘলরা বাংলা জয় করে।

  • ইসলাম খাঁ ও ঢাকা: সম্রাট জাহাঙ্গীরের সুবাদার ইসলাম খাঁ ১৬১০ সালে ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করেন এবং বারো ভূঁইয়াদের দমন করেন।

  • নবাবী আমল: ১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ কার্যত স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন শুরু করেন।

  • পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭): ২৩শে জুন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ

রাজবংশ/শাসকবিশেষ অবদান
বখতিয়ার খলজীবাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা (১২০৪ খ্রি.)।
ইলিয়াস শাহবাংলার নাম 'বাঙালা' হিসেবে প্রচলন করেন।
খান জাহান আলীদক্ষিণ-বঙ্গে (বাগেরহাট) ইসলাম প্রচার ও স্থাপত্য নির্মাণ।
আলাউদ্দিন হোসেন শাহশ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক, বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক।
শায়েস্তা খাঁচট্টগ্রাম জয় (১৬৬৬) এবং চালের দাম ১ টাকায় ৮ মণ।
নবাব সিরাজউদ্দৌলাবাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।

গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন:

বাংলার মুসলিম শাসনামলের স্থাপত্যগুলো আমাদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ:

  • আদিনা মসজিদ: পান্ডুয়ায় অবস্থিত (সুলতান সিকান্দার শাহ কর্তৃক নির্মিত)।

  • ষাট গম্বুজ মসজিদ: বাগেরহাটে (খান জাহান আলী কর্তৃক নির্মিত)।

  • লালবাগ কেল্লা: ঢাকায় (মুঘল স্থাপত্য, শাহজাদা আজম ও শায়েস্তা খাঁ কর্তৃক নির্মিত)।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্যায় ছিল (১২০৪-১৩৩৮) সাল পর্যন্ত। এ যুগের শাসকগণ সবাই দিল্লির সুলতানের অধীনে বাংলার শাসনকর্তা হয়ে এসেছিলেন। বাংলার অনেক শাসনকর্তাই দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন। বারংবার এমন বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার জন্য দিল্লির ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানী “তারিখ- ই-ফিরোজশাহী" গ্রন্থে বাংলার নাম দিয়েছিলেন বুলগাকপুর বা বিদ্রোহের নগরী।

১. ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী (১২০৪–১২০৬)

তিনি ছিলেন বাংলায় তুর্কি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি জাতিতে তুর্কি এবং আফগানিস্তানের 'গরমশির' এলাকার অধিবাসী ছিলেন।

  • নদীয়া বিজয়: ১২০৪ সালে মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে তিনি রাজা লক্ষণ সেনের অস্থায়ী রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পিছনের দরজা দিয়ে বিক্রমপুরে পালিয়ে যান।

  • রাজধানী: নদীয়া জয়ের পর তিনি গৌড় (লখনৌতি) অধিকার করেন এবং সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন।

  • তিব্বত অভিযান: ১২০৬ সালে তিনি তিব্বত অভিযানে যান, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। তিব্বত থেকে ফেরার পথে তাঁর সেনাপতি আলী মর্দান খলজী তাঁকে হত্যা করেন।

  • অবদান: তিনি বাংলায় অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা এবং খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন।

২. গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী (১২১২–১২২৭)

তুর্কি শাসকদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সফল ছিলেন।

  • রাজধানী স্থানান্তর: তিনি লখনৌতি থেকে রাজধানী দেবকোটে স্থানান্তর করেন।

  • নৌবাহিনী গঠন: বাংলায় নদীমাতৃক ভৌগোলিক পরিবেশ বুঝে তিনি প্রথম একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করেন।

  • স্থাপত্য: তিনি রাজধানীর প্রতিরক্ষার জন্য 'গৌড়' দুর্গ নির্মাণ করেন এবং দুর্গের চারদিকে 'বর্মন' নামক রাজপথ তৈরি করেন।

৩. দিল্লি ও বাংলার দ্বন্দ (১২২৭–১৩৩৮)

এই সময়ে বাংলার তুর্কি শাসকরা দিল্লির সুলতানদের বশ্যতা মেনে চলতেন, তবে সুযোগ পেলেই তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন।

  • মালিক ইখতিয়ার উদ্দিন বলকা খলজী: দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশ তাঁকে পরাজিত করে বাংলায় দিল্লির আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

  • সুলতান নাসিরুদ্দিন বুঘরা খাঁ: দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের পুত্র। তিনি দিল্লির সিংহাসন ত্যাগ করে বাংলায় শাসন করাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • বখতিয়ার খলজীর আগমনের সময় বাংলার রাজা কে ছিলেন? — রাজা লক্ষণ সেন।

  • বাংলার প্রথম তুর্কি বিজয়ী কে? — ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী।

  • কোন শাসকের আমলে বাংলায় প্রথম নৌবাহিনী গঠিত হয়? — গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী।

  • বখতিয়ার খলজী কোন বংশের ছিলেন? — তিনি খলজী বংশের তুর্কি ছিলেন (খলজীরা মূলত তুর্কি হলেও আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে তারা আফগান কৃষ্টির প্রভাব পেয়েছিল)।

তুর্কি শাসনের ধারাবাহিকতা :

সময়কালশাসক/রাজবংশপ্রধান ঘটনা
১২০৪–১২০৬বখতিয়ার খলজীবাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা ও লখনৌতি বিজয়।
১২১২–১২২৭গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজীপ্রশাসনিক সংস্কার এবং নৌবাহিনী গঠন।
১২৮১–১২৯১বুঘরা খাঁদিল্লির অধীনতা থাকা সত্ত্বেও বাংলার স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা।
১৩৩৮ফখরুদ্দিন মোবারক শাহতুর্কি আমলের সমাপ্তি ঘটিয়ে স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনা।

বাংলার তুর্কি শাসনের অবসান ঘটে যখন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং এর ফলে প্রায় ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনা হয়।

বাংলায় তুর্কী শাসক

  • নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাংলার প্রথম তুর্কি শাসক ছিলেন। তিনি ইলতুৎমিসের পৌত্র ছিলেন।
  • সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজি 'বাসনকোর্ট' দুর্গ নির্মাণ করেন। প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠন করে।
  • সুলতান সামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ সিলেটের অত্যাচারী গৌরগোবিন্দকে পরাজিত করেন। তার সময়ে হযরত শাহ জালাল বাংলায় আসেন।
Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নাসিরউদ্দিন মাহমুদ (শাসনকাল: ১২৪৬–১২৬৬) ছিলেন দিল্লির মামলুক সালতানাতের ৮ম সুলতান। তিনি নাসিরউদ্দিন মাহমুদের পুত্র ও সুলতান ইলতুতমিশের পৌত্র ছিলেন। ইলতুতমিশ তাকে তার বাবার নাম প্রদান করেছিলেন। আলাউদ্দিন মাসুদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি মসনদে বসেন।

মাহমুদ ধার্মিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নামাজ এবং কুরআন লিপিবদ্ধকরণে তিনি অনেক সময় ব্যয় করতেন। তার শ্বশুর গিয়াসউদ্দিন বলবন মূলত শাসনকাজ তদারক করতেন।

১২৬৬ সালে মাহমুদ নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর বলবন মসনদে বসেন।

Content added By

হুসামউদ্দীন ইওজ খলজী, যিনি পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দীন ইওজ শাহ নামে পরিচিত হন, ছিলেন ত্রয়োদশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলার একজন গুরুত্বপূর্ণ খলজি শাসক। তিনি প্রথমে ১২০৮–১২১০ খ্রিস্টাব্দে এবং পরে ১২১২–১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। তাঁর শাসনকালকে গঠনমূলক বলা হয়, কারণ তিনি বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা, প্রাচীনতম বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করেন। তিনি বাংলার প্রথম নৌবাহিনী গঠন করেন এবং লখনৌতি (গৌড়) ও বাসনকোট দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন।

গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজীর শাসনামলে বাংলায় দীর্ঘ সময় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। তিনি রাজধানী দেবকোট থেকে গৌড়ে স্থানান্তর করেন এবং পূর্ববঙ্গ, কামরূপ, ত্রিহুত ও উৎকল অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে সেগুলোকে করদ রাজ্যে পরিণত করেন। তবে তাঁর বিহার জয় দিল্লির মামলুক সুলতান ইলতুতমিশের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। ১২২৪ ও ১২২৬ খ্রিস্টাব্দে ইলতুতমিশের অভিযানে গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজী পরাজিত ও নিহত হন। এর ফলে বাংলা দিল্লির মামলুক সালতানাতের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।

Content added By

বখতিয়ার খলজীর মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রায় এক শতাব্দীকাল দিল্লি সালতানাত ও বাংলার মধ্যে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে। দিল্লির সুলতানরা বাংলার শাসনকর্তা নিয়োগ করলেও তাঁরা প্রায়ই স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজীর স্বাধীনতা ঘোষণা ও তুঘ্রিলের বিদ্রোহ এই প্রবণতারই প্রকাশ। এসব বিদ্রোহ দমন করতে দিল্লির সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ ও গিয়াসউদ্দিন বলবনকে বাংলা অভিযানে আসতে হয়। বলবন বিদ্রোহ দমন করে তাঁর পুত্র বুঘরা খানকে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। বাংলার এই বিদ্রোহপ্রবণ চরিত্রের জন্য ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারাণী লখনৌতিকে ‘বলঘাপুর’ বা বিদ্রোহের নগরী বলে অভিহিত করেন।

বলবনের মৃত্যুর পর (১২৮৬ খ্রি.) বুঘরা খান নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন। এই ধারাবাহিকতার ফলেই শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের আবির্ভাব ঘটে। ১৩০০ থেকে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল বাংলার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের প্রথম দিকে লখনৌতি শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের অধীনে স্বাধীন ছিল। দিল্লিতে খলজি বংশের শাসনামলে বাংলা কার্যত স্বাধীন থাকলেও তুঘলক বংশ ক্ষমতায় এলে লখনৌতি পুনরায় দিল্লির অধীনে আসে। তবে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা আবার স্বাধীন হয় এবং এই স্বাধীনতা প্রায় দুইশত বছর স্থায়ী হয়।

সুলতান শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১–১৩২২ খ্রি.) ছিলেন গৌড়ের একজন স্বাধীন ও শক্তিশালী শাসক। তিনি আব্বাসীয় খলিফার নামে মুদ্রা জারি করে নিজের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেন। তাঁর শাসনামলে গৌড় মুসলিম শাসকদের রাজধানী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফিরোজ শাহ রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দেন এবং তাঁর শাসনামলে বাংলা পশ্চিমে সোন ও ঘোড়া নদী থেকে পূর্বে সিলেট এবং উত্তরে দিনাজপুর–রংপুর থেকে দক্ষিণে হুগলী ও সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

ফিরোজ শাহের রাজত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট বিজয়। এই বিজয়ের সঙ্গে সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.) ও সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নাম বিশেষভাবে যুক্ত। তাঁর শাসনামলে সোনারগাঁও ও সাতগাঁও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং বিভিন্ন টাকশাল থেকে মুদ্রা জারি করা হয়। তিনি তাঁর পুত্রদের সহায়তায় শাসনকার্য পরিচালনা করেন এবং ক্ষমতা ভাগ করে দেন, যা বাংলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়।

১৩২২ খ্রিস্টাব্দে শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ফিরোজ শাহের শাসনকাল বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের ভিত সুদৃঢ় করে এবং পরবর্তী দীর্ঘ স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে।

Content added By

দিল্লির সুলতানগণ (১৩৩৮-১৫৩৮) এ দুইশত বছর বাংলাকে তাদের অধিকারে রাখতে পারেনি। এ সময় বাংলার সুলতানরা স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করেন। ১৩৩৮ সালে সোনারগাও এর শাসক বাহরাম খানের মৃত্যু হলে তার বর্মরক্ষক 'ফখরা' সুযোগ বুঝে নিজে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ নামধারণ করে সোনারগাওয়ের সিংহাসন দখল করেন।

বাংলার ইতিহাসে ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে স্বাধীন সুলতানি আমল বলা হয়। এই দীর্ঘ ২০০ বছর বাংলা দিল্লির সুলতানদের নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। এই যুগটি বাংলার রাজনৈতিক ঐক্য, সাহিত্য, স্থাপত্য এবং সামাজিক সংহতির জন্য এক অনন্য অধ্যায়।

১. স্বাধীনতা ঘোষণা ও ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ (১৩৩৮–১৩৪৯)

বাংলার স্বাধীনতার সূচনা হয় সোনারগাঁওয়ে।

  • প্রতিষ্ঠাতা: ১৩৩৮ সালে সোনারগাঁওয়ে দিল্লির শাসন অস্বীকার করে নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ

  • অবদান: তিনি 'ফখরুদ্দিনী' মুদ্রার প্রচলন করেন। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর শাসনামলে (১৩৪৬ সালে) বাংলায় এসেছিলেন। তিনি চাটগাঁ থেকে সোনারগাঁও পর্যন্ত একটি দীর্ঘ রাস্তা ও অসংখ্য সরাইখানা নির্মাণ করেন।

২. শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ও ইলিয়াস শাহী বংশ (১৩৪২–১৪১৪)

ইলিয়াস শাহকে বলা হয় 'বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থপতি'

  • বাংলার ঐক্য: তিনি লখনৌতি, সোনারগাঁও এবং সাতগাঁও—এই তিনটি অংশকে একত্রে জয় করে একটি অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠা করেন।

  • উপাধি: বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করার কারণে তিনি প্রথম 'শাহ-ই-বাঙালা' বা 'সুলতান-ই-বাঙালা' উপাধি ধারণ করেন। তখন থেকেই এ দেশের মানুষের পরিচয় হয় 'বাঙালি' হিসেবে।

  • স্থাপত্য: তাঁর আমলে আদিনা মসজিদ (পান্ডুয়া) নির্মাণের কাজ শুরু হয়, যা সেই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদ ছিল।

৩. রাজা গণেশ ও জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ

মাঝখানে কিছু সময়ের জন্য শাসন ক্ষমতা হিন্দু জমিদার রাজা গণেশের হাতে চলে যায়। তবে তাঁর পুত্র যদু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ নামে সিংহাসনে বসেন। তাঁর সময় থেকে বাংলা ভাষায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পায়।

৪. হোসেন শাহী বংশ (১৪৯৩–১৫৩৮)

এটি ছিল স্বাধীন সুলতানি আমলের শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

  • আলাউদ্দিন হোসেন শাহ: তিনি এই বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান। তাঁকে 'নৃপতি তিলক' এবং 'জগৎভূষণ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

  • সাহিত্য ও ধর্ম: তাঁর সময়ে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল। তিনি বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন (যেমন: মালাধর বসুকে 'গুণরাজ খান' উপাধি প্রদান)। শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণব ধর্ম আন্দোলন তাঁর সময়েই বিকশিত হয়।

  • ছোট সোনা মসজিদ: তাঁর শাসনামলে ওয়ালী মুহাম্মদ কর্তৃক গৌড়ে বিখ্যাত ছোট সোনা মসজিদ নির্মিত হয়।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

খরউদ্দিন মুবারক শাহের পূর্বনাম ফখরা। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান। তিনি সোনারগাঁয়ের শাসন ক্ষমতা দখল ও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন- ১৩৩৮ সালে । স্বাধীন সুলতান হিসাবে তিনি উপাধি গ্রহণ করেন ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ। তিনি চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত রাজপথ নির্মাণ করেন। ইবনে বতুতা তার আমলে (১৩৪৬) সালে বাংলায় আসেন।

বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনা হয়েছিল যাঁর হাত ধরে, তিনি হলেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ। তাঁর শাসনকাল (১৩৩৮–১৩৪৯ খ্রি.) বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

১. স্বাধীনতার ঘোষণা ও সূচনা

  • পরিচয়: তিনি ছিলেন দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের নিযুক্ত সোনারগাঁওয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খাঁ-এর বর্মরক্ষক বা দেহরক্ষী।

  • ক্ষমতা দখল: ১৩৩৮ সালে বাহরাম খাঁ-এর মৃত্যুর পর তিনি সোনারগাঁওয়ের ক্ষমতা দখল করেন এবং নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন।

  • উপাধি: তিনি 'ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ' নাম ধারণ করেন এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে নিজের নামে মুদ্রা (ফখরুদ্দিনী মুদ্রা) জারি করেন।

২. সামরিক সাফল্য ও রাজ্য বিস্তার

  • চট্টগ্রাম বিজয়: ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ প্রথম মুসলিম শাসক যিনি চট্টগ্রাম জয় করেন। তিনি চাটগাঁ জয় করে সেখানে শাসনের সুবিধার্থে একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী মোতায়েন করেন।

  • নৌযুদ্ধ: তাঁর সময়ে দিল্লির সুলতানরা বাংলাকে পুনরায় দখলের চেষ্টা করলেও তাঁর শক্তিশালী নৌবাহিনীর কারণে তারা সফল হতে পারেনি।

৩. পর্যটক ইবনে বতুতার আগমন (১৩৪৬ খ্রি.)

তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা হলো বিখ্যাত মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার বাংলা ভ্রমণ।

  • বাংলার বর্ণনা: ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে বাংলাকে 'দোযখপুর-ই-পুর নেয়ামত' (নেয়ামতে ভরপুর দোজখ) বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এখানে প্রচুর ধনসম্পদ ও সস্তা খাবার ছিল, কিন্তু এখানকার আবহাওয়া ছিল আর্দ্র ও অস্বস্তিকর।

  • দ্রব্যমূল্য: ইবনে বতুতা লিখেছিলেন যে, তখন ১ দিরহামে ৮টি মুরগি এবং ২ দিরহামে ১টি ভালো মানের দাস কেনা যেত।

৪. জনকল্যাণ ও স্থাপত্য

  • সড়ক নির্মাণ: তিনি চাঁদপুর থেকে চাটগাঁ (চট্টগ্রাম) পর্যন্ত একটি দীর্ঘ মহাসড়ক নির্মাণ করেন।

  • সরাইখানা: রাস্তার ধারে পথিক ও ব্যবসায়ীদের বিশ্রামের জন্য তিনি অসংখ্য সরাইখানা ও মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।

  • মেঘনা নদীর বাঁধ: বন্যা প্রতিরোধের জন্য তিনি মেঘনা নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ অবিভক্ত বাংলার প্রথন মুসলিম স্বাধীন সুলতান ছিলেন এবং ইলিয়াস শাহী বংশের করেন। ইলিয়াস শাহী বংশ ১৩৪২ সাল থেকে ১৪১৫ সাল পর্যন্ত একটানা ৭৩ বছর ধরে অবিভক্ত বাংলা শাসন করে।

বাংলার ইতিহাসে সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁকে 'বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থপতি' বলা হয়, কারণ তিনিই প্রথম বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে একত্রিত করে 'বাঙালা' নামক একটি অখণ্ড রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন।

১. ক্ষমতার আরোহণ ও অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠা

  • পরিচয়: তিনি ছিলেন মূলত সিজিস্তানের একজন তুর্কি বীর। লখনৌতির সুলতান আলাউদ্দিন আলী শাহকে পরাজিত করে ১৩৪২ সালে তিনি সিংহাসনে বসেন।

  • অখণ্ড বাংলা: তখন বাংলা তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত ছিল— লখনৌতি (উত্তর বাংলা), সোনারগাঁও (পূর্ব বাংলা) এবং সাতগাঁও (দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলা)।

    • ১৩৪২ সালে তিনি লখনৌতি দখল করেন।

    • ১৩৪৬ সালে সাতগাঁও জয় করেন।

    • ১৩৫২ সালে সোনারগাঁওয়ের ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহকে পরাজিত করে সমগ্র বাংলার অধিপতি হন।

  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: তিনিই প্রথম অখণ্ড বাংলার শাসক হিসেবে 'শাহ-ই-বাঙালা' এবং 'সুলতান-ই-বাঙালা' উপাধি ধারণ করেন। এর মাধ্যমেই এই ভূখণ্ডের নাম স্থায়ীভাবে 'বাঙালা' এবং অধিবাসীদের পরিচয় 'বাঙালি' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. দিল্লির সুলতানের সাথে যুদ্ধ ও একডালা দুর্গ

ইলিয়াস শাহের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ঈর্ষান্বিত হয়ে ১৩৫৩ সালে বাংলা আক্রমণ করেন।

  • একডালা দুর্গ: দিল্লির বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে ইলিয়াস শাহ কৌশল হিসেবে দিনাজপুরের সুরক্ষিত 'একডালা দুর্গে' আশ্রয় নেন।

  • ফলাফল: ফিরোজ শাহ তুঘলক দীর্ঘ সময় দুর্গ অবরোধ করেও ইলিয়াস শাহকে পরাজিত করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি সন্ধি করতে বাধ্য হন এবং ইলিয়াস শাহের স্বাধীনতা মেনে নিয়ে দিল্লি ফিরে যান। এই যুদ্ধের পর থেকেই মুঘল আক্রমণের আগ পর্যন্ত বাংলা প্রায় ২০০ বছর স্বাধীন ছিল।

৩. সাহিত্য, স্থাপত্য ও জনকল্যাণ

  • ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: তাঁর সময়ে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ উচ্চপদে নিয়োজিত ছিল। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

  • স্থাপত্য: তিনি পান্ডুয়ায় বিখ্যাত আদিনা মসজিদ (তৎকালীন উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদ) এবং একডালা দুর্গ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য পরিচিত।

  • নগর পত্তন: তিনি বিহারের হাজিপুর শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

জেনে নিই

  • ১৩৫২ সালে ইলিয়াস শাহ পুরো বাংলা অধিকার করেন।
  • প্রাচীন জনপদগুলোকে একত্রিত করে নাম দেন 'বাঙ্গালাহ'।
  • তার উপাধি 'শাহ-ই-বাঙ্গালাহ' বা ‘শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান’।
  • তিনিই প্রথম উপাধি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলা রাষ্ট্রের পরিচয় তুলে ধরেন।
  • ইলিয়াস শাহ বাংলার রাজধানী গৌড় থেকে পান্ডুয়া নগরীতে স্থানান্তর করেন।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ সিকান্দার শাহের অমর কীর্তি। তিনি সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা সুলতান। সুলতান সিকান্গৌদার শাহ গৌড়ের কোতয়ালী নরজা নির্মাণ করেন।

শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের সুযোগ্য পুত্র সুলতান সিকান্দার শাহ ছিলেন ইলিয়াস শাহী বংশের দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন শাসক। তাঁর দীর্ঘ ৩২ বছরের শাসনকাল বাংলার ইতিহাসে স্থাপত্য এবং সামরিক সাফল্যের জন্য চিরস্মরণীয়।

১. দিল্লির সুলতানের সাথে দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৩৫৯)

পিতার মতো সিকান্দার শাহকেও দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

  • একডালা দুর্গ: ১৩৫৯ সালে ফিরোজ শাহ তুঘলক পুনরায় বাংলা আক্রমণ করলে সিকান্দার শাহ কৌশলগত কারণে একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন।

  • সন্ধি: দীর্ঘকাল অবরোধের পরও দুর্গ জয় করতে না পেরে ফিরোজ শাহ তুঘলক সিকান্দার শাহের সাথে সন্ধি করেন। দিল্লির সুলতান তাঁকে একটি স্বর্ণমুকিট ও অনেক উপঢৌকন দিয়ে বাংলার স্বাধীনতাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন।

  • ফলাফল: এই যুদ্ধের পর থেকে পরবর্তী প্রায় ২০০ বছর দিল্লির কোনো সুলতান বাংলা দখলের চেষ্টা করেননি।

২. স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠত্ব: আদিনা মসজিদ

সিকান্দার শাহের নাম বাংলার স্থাপত্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছে তাঁর নির্মিত আদিনা মসজিদের জন্য।

  • অবস্থান: এটি তৎকালীন রাজধানী পান্ডুয়ায় (বর্তমানে ভারতের মালদহ জেলায়) অবস্থিত।

  • বৈশিষ্ট্য: ১৩৬৯ সালে নির্মিত এই মসজিদটি ছিল তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদ। এর বিশালতা এবং কারুকার্য তৎকালীন বাংলার সমৃদ্ধি ও সুলতানের শৌর্য প্রকাশ করে।

  • অন্যান্য স্থাপত্য: তিনি পাণ্ডুয়ায় একটি চমৎকার বাগান ও জলাশয় নির্মাণ করেছিলেন যা 'সিকান্দার দিঘি' নামে পরিচিত।

৩. বিচারব্যবস্থা ও শাসন

  • সিকান্দার শাহ অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন। কথিত আছে, তাঁর এক বিচারক (কাজী) স্বয়ং সুলতানের বিরুদ্ধেই সমন জারি করেছিলেন এবং সুলতান সাধারণ নাগরিকের মতো আদালতে উপস্থিত হয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছিলেন।

বিশেষ তথ্য:

  • বিখ্যাত স্থাপত্য: আদিনা মসজিদ (পান্ডুয়া)।

  • দিল্লির কোন সুলতান তাঁকে আক্রমণ করেন? — ফিরোজ শাহ তুঘলক।

  • একডালা দুর্গ: এই দুর্গটি দুবার দিল্লির আক্রমণ থেকে বাংলাকে রক্ষা করেছিল (প্রথমবার ইলিয়াস শাহকে, দ্বিতীয়বার সিকান্দার শাহকে)।

  • পারিবারিক ট্র্যাজেডি: তাঁর শেষ জীবন ছিল দুঃখজনক। তাঁর প্রিয় পুত্র গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সাথে তাঁর বিরোধ তৈরি হয় এবং ১৩৯০ সালে সোনারগাঁওয়ের কাছে 'গোয়ালপাড়া'র যুদ্ধে পুত্রের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত অবস্থায় তিনি নিহত হন।

একনজরে সুলতান সিকান্দার শাহ:

বিষয়তথ্য
শাসনকাল১৩৫৮–১৩৯০ খ্রিস্টাব্দ
রাজবংশইলিয়াস শাহী বংশ
প্রধান অর্জনদিল্লির স্বীকৃতি লাভ ও আদিনা মসজিদ নির্মাণ
রাজধানীপান্ডুয়া (ফিরোজাবাদ)
মৃত্যু১৩৯০ (পুত্রের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে)
Content added By
Content updated By

সবচেয়ে জনপ্রিয় সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। আজম শাহ বাংলা ভাষার পরম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর সময়ে ইউসুফ জোলেখা রচনা করেন কবি শাহ মুহম্মদ সগীর । এ সময় কৃত্তিবাসের রামায়ণ বাংলা অনুবাদ করা হয়। পারস্যের কবি হাফিজের সাথে তিনি পত্রালাপ করতেন।

বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়, ন্যায়পরায়ণ এবং বিদগ্ধ শাসক ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। তাঁর শাসনামল (১৩৯০–১৪১১ খ্রি.) যুদ্ধবিগ্রহের চেয়ে সাহিত্য, কূটনীতি এবং ন্যায়বিচারের জন্য বেশি পরিচিত।

১. ন্যায়বিচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ তাঁর প্রখর ন্যায়বিচারের জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এ বিষয়ে একটি বিখ্যাত কাহিনী প্রচলিত আছে:

  • একবার সুলতানের নিক্ষিপ্ত তীরে এক বিধবার পুত্র মারা গেলে, ওই বিধবা কাজী সিরাজুদ্দিনের কাছে বিচার প্রার্থনা করেন।

  • কাজী সুলতানকে আদালতে তলব করেন। সুলতান সাধারণ নাগরিকের মতো আদালতে হাজিরা দেন এবং কাজীর দণ্ডাদেশ মেনে নিয়ে বিধবাকে ক্ষতিপূরণ দেন।

  • বিচার শেষে সুলতান কাজীকে বলেছিলেন, "আপনি যদি বিচারে শিথিলতা করতেন তবে আমি তলোয়ার দিয়ে আপনার মাথা কেটে ফেলতাম।" কাজীও তাঁর লাঠি দেখিয়ে বলেছিলেন, "আপনি যদি আইন অমান্য করতেন তবে আমি এই লাঠি দিয়ে আপনার পিঠ ভেঙে দিতাম।"

২. সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা

তিনি কেবল একজন শাসকই ছিলেন না, বরং সাহিত্যের সমঝদার ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

  • পারস্যের মহাকবি হাফিজ: সুলতান আজম শাহ পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজ শিরাজিকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। হাফিজ আসতে না পারলেও সুলতানের পাঠানো কবিতার চরণের জবাবে একটি বিখ্যাত গজল লিখে পাঠিয়েছিলেন।

  • শাহ মুহাম্মদ সগীর: তাঁর রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর বিখ্যাত কাব্য 'ইউসুফ-জুলেখা' রচনা করেন। এটি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

৩. কূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক

তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিলেন।

  • চীনের সাথে সম্পর্ক: তাঁর আমলে চীনের মিং রাজবংশের সম্রাট ইয়ং লো-এর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। চীনের দূত মা হুয়ান তাঁর দরবারে এসেছিলেন এবং বাংলার রেশম, মসলিন ও সমৃদ্ধির প্রশংসা করেছিলেন।

  • মক্কা-মদিনায় অনুদান: তিনি পবিত্র মক্কা ও মদিনায় দুটি মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং সেখানে পানির নহর বা কূপ খননের জন্য প্রচুর অর্থ দান করেছিলেন, যা 'মাদরাসা-ই-গিয়াসিয়া' নামে পরিচিত ছিল।

Quick Notes:

  • উপাধি: গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করলেও তিনি অত্যন্ত সফল শাসক ছিলেন)।

  • রাজধানী: তাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁও

  • ইবনে বতুতা না মা হুয়ান? — মনে রাখবেন, ইবনে বতুতা এসেছিলেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের আমলে, আর মা হুয়ান এসেছিলেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমলে।

  • বিখ্যাত বন্ধু: পারস্যের কবি হাফিজ

  • বিচারক: তাঁর সময়কার বিখ্যাত কাজীর নাম ছিল সিরাজুদ্দিন

Content added By
Content updated By

বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্য সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ। তাকে বলা হয় বাংলার আকবর, তার শাসনামলকে বাংলার স্বর্ণযুগ বলা হয়। হুসাইন শাহের আমলে বাংলার রাজধানী ছিল গৌড় । তিনি সংগ্রাম থেকে আরাকানীদের বিতাড়িত করেন। হুসাইন শাহের রাজত্বকালে শ্রীচৈতন্য বৈষ্ণব আন্দোলন (বৃন্দাবন) গড়ে তোলেন। হুসাইন শাহের সেনাপতি কবীন্দ্র পরমেশ্বর বাংলা ভাষায় মহাভারত রচনা করেন। বিপ্রদাস, বিজয়গুপ্ত, যশোরাজ খান প্রমুখ সাহিত্যিকগণ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। হুসেন শাহী আমলে বাংলা গজল ও সুফী সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। তাঁর শাসনামলে গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ ও গুমতিদ্বার নির্মিত হয়।

বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের ইতিহাসে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩–১৫১৯ খ্রি.) ছিলেন সবচেয়ে সফল, জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী শাসক। তাঁর শাসনকালকে বাংলার ইতিহাসের 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়। তিনি হোসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

১. ক্ষমতা লাভ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন মূলত আরবের মক্কার অধিবাসী। তিনি বাংলার আবিসিনীয় (হাবশী) সুলতান শামসুদ্দিন মোজাফফর শাহের উজির ছিলেন। হাবশী শাসনের চরম অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে ১৪৯৩ সালে তিনি বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন।

২. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সামাজিক সম্প্রীতি

হোসেন শাহের শাসনকাল হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

  • উচ্চপদ অর্পণ: তাঁর প্রশাসনের উচ্চপদে অনেক যোগ্য হিন্দু ব্যক্তি নিয়োজিত ছিলেন। যেমন— তাঁর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গোপীনাথ বসু (পুরন্দর খাঁ) এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন মুকুন্দ দাস। তাঁর দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান ছিলেন কেশব ছত্রী

  • শ্রীচৈতন্যদেব: তাঁর শাসনামলেই বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর ভক্তি আন্দোলন প্রচার করেছিলেন। সুলতান হোসেন শাহ শ্রীচৈতন্যদেবের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

৩. বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা

বাংলা ভাষার বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক কালজয়ী কাব্য রচিত হয়।

  • মালাধর বসু: তাঁর নির্দেশে মালাধর বসু 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' কাব্য রচনা করেন। সুলতান তাঁকে 'গুণরাজ খান' উপাধিতে ভূষিত করেন।

  • অনুবাদ সাহিত্য: তাঁর সময়েই মহাভারত ও ভাগবতের বাংলা অনুবাদের কাজ শুরু হয়।

  • বিজয়গুপ্ত ও বিপ্রদাস: তাঁর রাজত্বকালেই মনসামঙ্গলের বিখ্যাত কবি বিজয়গুপ্ত ও বিপ্রদাস পিপিলাই তাঁদের কাব্য রচনা করেছিলেন।

৪. স্থাপত্য ও লৌকিক ধর্ম

  • ছোট সোনা মসজিদ: তাঁর শাসনামলে ওয়ালী মুহাম্মদ গৌড়ে বিখ্যাত ছোট সোনা মসজিদ নির্মাণ করেন (এটি বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অবস্থিত)।

  • লৌকিক ধর্ম: তাঁর সময়ে হিন্দু ও মুসলমানদের সমন্বয়ে 'সত্যপীর' নামক এক লৌকিক আরাধনা পদ্ধতির ব্যাপক প্রচলন ঘটে।

Quick Notes:

  • উপাধি: তাঁকে 'নৃপতি তিলক' এবং 'জগৎভূষণ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

  • বাংলার আকবর: উদার ও দূরদর্শী শাসনের জন্য ঐতিহাসিকরা তাঁকে 'বাংলার আকবর' বলে অভিহিত করেন।

  • রাজধানী: তাঁর রাজধানী ছিল একডালা (মতান্তরে গৌড়)।

  • বিখ্যাত স্থাপত্য: ছোট সোনা মসজিদ।

  • সীমানা বিস্তার: তিনি কামরূপ (আসাম) এবং ওড়িশার একাংশ জয় করেছিলেন।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

গৌড়ের বিখ্যাত বড় সোনা মসজিদ (বারদুয়ারি মসজিদ) নির্মাণ করে। সুলতান নাসির উদ্দিন নুসরাত শাহের অমরকীর্তি- কদম রসুল। তার সময়ে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সুযোগ্য পুত্র নাসিরুদ্দিন নুসরাত শাহ ছিলেন হোসেন শাহী বংশের দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী সুলতান। তাঁর শাসনামল (১৫১৯–১৫৩২ খ্রি.) শিল্পকলা, স্থাপত্য এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

১. স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন: বড় সোনা মসজিদ

নুসরাত শাহের নাম বাংলার স্থাপত্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছে তাঁর নির্মিত বিশাল ও রাজকীয় স্থাপনাগুলোর জন্য।

  • বড় সোনা মসজিদ (গৌড়): ১৫২৬ সালে তিনি গৌড়ে এই বিশাল মসজিদটি নির্মাণ করেন। এটি তৎকালীন বাংলার বৃহত্তম মসজিদগুলোর মধ্যে একটি এবং এর বিশালত্বের কারণে একে 'বারোদুয়ারী' মসজিদও বলা হয়।

  • কদম রসূল: তিনি গৌড়ে 'কদম রসূল' নামক একটি ভবন নির্মাণ করেন, যেখানে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পদচিহ্ন সংবলিত একটি পাথর সংরক্ষিত ছিল।

  • অন্যান্য স্থাপত্য: তিনি তাঁর পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে গৌড়ে একটি চমৎকার সমাধি এবং বাঘায় (রাজশাহী) একটি বিশাল মসজিদ ও দিঘি নির্মাণ করেন।

২. মুঘল ও আফগানদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক

নুসরাত শাহের শাসনামল ছিল ভারতীয় ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ, যখন দিল্লিতে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটছে (পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, ১৫২৬)।

  • বাবরের সাথে চুক্তি: মুঘল সম্রাট বাবর যখন ভারত আক্রমণ করেন, নুসরাত শাহ তখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিরপেক্ষতা বজায় রাখেন। পরবর্তীতে বাবরের সাথে তাঁর একটি মৈত্রী চুক্তি হয়, যার ফলে বাংলা মুঘল আক্রমণের হাত থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা পায়।

  • আফগানদের আশ্রয়: তিনি মুঘলদের ভয়ে পালিয়ে আসা আফগান নেতাদের বাংলায় আশ্রয় দিয়েছিলেন, যা বাংলার সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছিল।

৩. সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা

পিতার মতো তিনিও বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ অনুরাগী ছিলেন।

  • মহাভারত অনুবাদ: তাঁরই নির্দেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের একটি অংশ বাংলা অনুবাদ করেন।

  • লৌকিক উৎসব: তাঁর সময়ে গ্রামীণ ও লোকজ মেলা ও উৎসবগুলো রাজকীয় সমর্থন লাভ করত।

Content added By
Content updated By

বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ। ১৫৩৮ সালে শেরশাহ গৌড় দখলের মাধ্যমে বাংলায় স্বাধীন সুলতানী যুগের অবসান ঘটে।

বাংলার হোসেন শাহী বংশের সর্বশেষ সুলতান এবং স্বাধীন সুলতানি আমলের (১৩৩৮–১৫৩৮) চূড়ান্ত শাসক ছিলেন গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ। তাঁর শাসনামল (১৫৩৩–১৫৩৮ খ্রি.) ছিল যুদ্ধবিগ্রহ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় পূর্ণ।

১. হোসেন শাহী বংশের পতন

গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ ছিলেন আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র এবং নুসরাত শাহের ভাই। তিনি তাঁর ভাইপোকে (নুসরাত শাহের পুত্র) হত্যা করে ক্ষমতায় বসেছিলেন, যা তাঁর শাসনামলের শুরুতেই এক ধরণের অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।

২. শেরশাহ সূরীর আক্রমণ ও বাংলার পতন

তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো আফগান বীর শেরশাহ সূরীর সাথে সংঘাত।

  • গৌড় অবরোধ: ১৫৩৮ সালে শেরশাহ সূরী বাংলার রাজধানী গৌড় আক্রমণ ও দখল করেন।

  • পরাজয়: গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ শেরশাহের কাছে পরাজিত হন। তিনি পর্তুগিজদের সহায়তা নিয়েও নিজের সিংহাসন রক্ষা করতে পারেননি।

৩. স্বাধীন সুলতানি আমলের অবসান

১৫৩৮ সালে শেরশাহের কাছে গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি আমলের (যা ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ শুরু করেছিলেন) চিরস্থায়ী অবসান ঘটে। এরপর বাংলা দিল্লির আফগান শাসনের (সূরী বংশ) অধীনে চলে যায়।

Quick Notes:

  • উপাধি: সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ।

  • মর্যাদা: তিনি স্বাধীন সুলতানি আমলের সর্বশেষ সুলতান

  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: তাঁর পতনের মাধ্যমেই মধ্যযুগীয় বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের সমাপ্তি ঘটে এবং আফগান শাসনের সূচনা হয়।

  • পর্তুগিজদের প্রভাব: তাঁর সময়েই পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি চেয়েছিল এবং তাঁকে সামরিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

ইবনে বতুতা ছিলেন মুসলিম পর্যটক, চিন্তাবিদ এবং বিচারক। তিনি ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোয় অনুগ্রাহণ করেন। ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে ইবনে বক্তৃতা ভারতবর্ষে আগমন করেন। সুলতানের সাথে পরিচয় ঘটলে তিনি এই পরিব্রাজককে কাজীর পদে নিযুক্ত করেন। ইবনে বতুতা অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ৮ বছর উক্ত পদে বহাল ছিলেন। ইবনে বতুতা ফখরউদ্দিন মুবারক শাহের রাজত্বকালে ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন। বাংলাদেশে আসার তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল সিলেটে গিয়ে হযরত শাহজালালের সঙ্গে সাক্ষাৎকরা। ইবনে বক্তৃতা প্রথম বিদেশি পর্যটক হিসাবে 'বাঙ্গালা' শব্দ ব্যবহার করেন। নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যাদির প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী ইবনে বতুতাকে আকৃষ্ট করলেও এদেশের আবহাওয়া তাঁর পছন্দ হয়নি। ইবনে বক্তৃতার তার 'কিতাবুল রেহেলা' নামক গ্রন্থে বাংলাকে “দোযখপুর আয নিয়ামত বা 'আশীর্বাদপুষ্ট নরক' হিসাবে আখ্যায়িত করেন।

মধ্যযুগের বিশ্ববিখ্যাত মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলার ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর বর্ণনার মাধ্যমেই আমরা চৌদ্দ শতকের বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি।

১. পরিচয় ও ভ্রমণ

  • পুরো নাম: শেখ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা।

  • জন্ম: ১৩০৪ সালে মরক্কোর তানজিয়ার শহরে।

  • ভ্রমণবৃত্তান্ত: তাঁর বিশ্বভ্রমণের কাহিনী সংবলিত বিখ্যাত বইটির নাম 'রহেলা' (Kitab-ur-Rehla)। তিনি প্রায় ৩০ বছরে প্রায় ৭৫,০০০ মাইল পথ ভ্রমণ করেছিলেন।

২. বাংলায় আগমন (১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দ)

ইবনে বতুতা যখন বাংলায় আসেন, তখন দিল্লির সুলতান ছিলেন মুহাম্মদ বিন তুঘলক। কিন্তু বাংলা তখন ছিল স্বাধীন।

  • কার আমলে আসেন: তিনি স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের শাসনামলে বাংলায় আসেন।

  • উদ্দেশ্য: মূলত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (র.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য তিনি সিলেটে এসেছিলেন।

  • ভ্রমণ পথ: তিনি চাটগাঁ (চট্টগ্রাম) বন্দর দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে সোনারগাঁও ও সিলেট ভ্রমণ করেন।

৩. বাংলার বর্ণনা: "নেয়ামতে ভরা দোজখ"

ইবনে বতুতা তাঁর বইয়ে বাংলাকে 'দোযখপুর-ই-পুর নেয়ামত' (একটি নেয়ামতে ভরপুর দোজখ) বলে অভিহিত করেছেন। এর কারণ ছিল:

  • নেয়ামত: এখানে প্রচুর ধনসম্পদ, সস্তা খাবার এবং শস্য ছিল।

  • দোজখ: এখানকার আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত আর্দ্র ও গরম, যা তাঁর মতো বিদেশি পর্যটকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল।

৪. দ্রব্যমূল্যের বিবরণ

তাঁর বর্ণনা থেকে আমরা তৎকালীন বাংলার সস্তা জীবনযাত্রার একটি চিত্র পাই:

  • ১ দিরহামে ৮টি মুরগি পাওয়া যেত।

  • ২ দিরহামে ১টি ভালো মানের দাস কেনা যেত।

  • ১টি উট মাত্র ৩ দিরহামে পাওয়া যেত। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বিশ্বের আর কোথাও এত সস্তায় জীবনধারণের উপকরণ দেখেননি।

Quick Notes:

  • বিখ্যাত উক্তি: বাংলাকে 'নেয়ামতে ভরা দোজখ' কে বলেছেন? — ইবনে বতুতা

  • ভ্রমণকাল: ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দ।

  • সিলেটে সাক্ষাৎ: তিনি সিলেটে কার সাথে দেখা করেন? — হযরত শাহজালাল (র.)

  • প্রবেশ পথ: তিনি কোন বন্দর দিয়ে বাংলায় ঢোকেন? — চট্টগ্রাম

  • বইয়ের নাম: কিতাবুর রেহেলা।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

সম্রাট আকবর পুরো বাংলার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। বাংলার শক্তিশালী জমিদারগণ মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করেনি। স্বাধীনতা রক্ষার্থে তারা একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। বাংলার ইতিহাসে ভাটি অঞ্চলের এ জমিদারগণ বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত।

বাংলার ইতিহাসে 'বারো ভূঁইয়া' বলতে কোনো নির্দিষ্ট ১২ জন ব্যক্তিকে বোঝায় না, বরং ১৬শ শতাব্দীতে মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে জাহাঙ্গীরের আমল পর্যন্ত বাংলার যে সকল শক্তিশালী জমিদার মোগলদের অধীনতা অস্বীকার করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন, তাঁদের সমষ্টিগতভাবে 'বারো ভূঁইয়া' বলা হয়।

১. বারো ভূঁইয়া কারা?

  • ভূঁইয়া শব্দের অর্থ: 'ভূমি' বা জমির মালিক।

  • সময়কাল: ১৫৭৬ সালে মোগলরা বাংলা জয় করলেও (রাজমহলের যুদ্ধ) তারা বাংলার কেন্দ্রস্থলে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। ১৫৭৬ থেকে ১৬১০ সাল পর্যন্ত এই জমিদাররা মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

  • সংখ্যা: ইতিহাসে 'বারো' সংখ্যাটি একটি অনির্দিষ্ট সংখ্যা বা গোষ্ঠী বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। আসলে তাঁদের সংখ্যা ১২-এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

২. বারো ভূঁইয়াদের নেতা: ঈসা খাঁ

বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছিলেন ঈসা খাঁ

  • রাজধানী: তাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁও

  • উপাধি: তিনি 'মসনদ-ই-আলা' উপাধি ধারণ করেছিলেন।

  • মোগলদের সাথে সংঘর্ষ: ১৫৯৭ সালে মোগল সেনাপতি মানসিংহকে তিনি এগারোসিন্দুর নামক স্থানে পরাজিত করেছিলেন।

  • অঞ্চল: তাঁর জমিদারির কেন্দ্র ছিল বর্তমান কিশোরগঞ্জ ও সোনারগাঁও অঞ্চল।

৩. মুসা খাঁ ও বারো ভূঁইয়াদের পতন

ঈসা খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুসা খাঁ বারো ভূঁইয়াদের নেতৃত্ব দেন।

  • পতন: মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সুবাদার ইসলাম খাঁ ১৬১০ সালে এক বিশাল নৌবাহিনী নিয়ে মুসা খাঁকে পরাজিত করেন।

  • ফলাফল: মুসা খাঁর পরাজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধের সমাপ্তি ঘটে এবং সমগ্র বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।

৪. উল্লেখযোগ্য কয়েকজন বারো ভূঁইয়া ও তাঁদের অঞ্চল

নামশাসন এলাকা (অঞ্চল)
ঈসা খাঁ ও মুসা খাঁসোনারগাঁও ও ভাটি অঞ্চল (কিশোরগঞ্জ)।
প্রতাপাদিত্যযশোর ও খুলনা।
চাঁদ রায় ও কেদার রায়শ্রীপুর (বিক্রমপুর)।
লক্ষ্মণ মাণিক্যভুলুয়া (নোয়াখালী)।
কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্র রায়বাকলা (বরিশাল)।
উসমান খাঁশ্রীহট্ট (সিলেট)।

কয়েকজন শাসক

  • ঈসা খান সোনারগাঁও অঞ্চল শাসন করেন।
  • কেদার রায় বিক্রমপুর শাসন করেন।
  • কিঙ্কর সেন পিরোজপুর শাসন করেন।
  • ওসমান খা উড়িষ্যা শাসন করেন।
  • প্রতিপাদিত্য যশোর অঞ্চল শাসন করেন।
  • ফজল গাজী গাজীপুর শাসন করে।
  • কন্দর্প রায় বরিশাল শাসন করে।
  • পীতাম্বর পুঠিয়া শাসন করে।
Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

বারো ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খান। তিনি বাংলার ধানী হিসেবে সোনারগাও এর গোড়া পত্তন করেন। সম্রাট আকবরের সেনাপতিরা বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন। ঈসা খাঁর মৃত্যুর পর বারো ভূঁইয়াদের নেতা হন ঈসার পুত্র মুসা খান। তার আমলেই বাংলার বারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে দমন করা হয়। সুবেদার ইসলাম খান বারো ভূঁইয়ানের নেতা মুসা খানদের পরাস্ত করেন। এগারসিন্ধুর গ্রাম (কিশোরগঞ্জ) ইসা খানের নাম বিজড়িত মধ্যযুগীয় একটি দূর্গ।

বাংলার বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং বীরত্বগাথার প্রধান নায়ক ছিলেন ঈসা খাঁ। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতাপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলেন।

১. পরিচয় ও উত্থান

  • জন্ম: ১৫২৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে। তাঁর পিতা সুলাইমান খাঁ ছিলেন একজন আফগান মুসলিম।

  • অঞ্চল: তাঁর জমিদারির প্রধান কেন্দ্র ছিল সোনারগাঁও এবং ভাটি অঞ্চল (কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সংলগ্ন এলাকা)।

  • উপাধি: তিনি 'মসনদ-ই-আলা' উপাধি ধারণ করেছিলেন।

  • নেতৃত্ব: তিনি বাংলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন জমিদারদের (বারো ভূঁইয়া) ঐক্যবদ্ধ করেন এবং মোগল আক্রমণের বিরুদ্ধে এক বিশাল গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন।

২. মোগলদের সাথে সংঘর্ষ ও বীরত্ব

সম্রাট আকবর যখন রাজমহলের যুদ্ধের (১৫৭৬) মাধ্যমে বাংলা জয় করতে চান, তখন ঈসা খাঁ তাঁর পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান।

  • মানসিংহের সাথে দ্বৈরথ (১৫৯৭): আকবরের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি মানসিংহ এক বিশাল নৌবাহিনী নিয়ে ঈসা খাঁকে আক্রমণ করেন। কিশোরগঞ্জের এগারোসিন্দুর নামক স্থানে যমুনা নদীর তীরে তাঁদের মধ্যে এক ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ হয়।

  • মহানুভবতা: লোকগাথা অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় মানসিংহের তলোয়ার ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাঁকে আক্রমণ না করে নিজের তলোয়ার দিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর এই মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে মানসিংহ তাঁকে 'বাংলার প্রকৃত রাজা' হিসেবে সম্মান জানিয়েছিলেন এবং সম্রাট আকবরের সাথে একটি সাময়িক সমঝোতা করে দেন।

৩. রাজধানী ও স্থাপত্য

  • সোনারগাঁও: ঈসা খাঁর রাজধানী ছিল ঐতিহাসিক সোনারগাঁও। এটি তখন মসলিন কাপড় এবং সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল।

  • জঙ্গলবাড়ি দুর্গ: কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী বা অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল এই জঙ্গলবাড়ি দুর্গ।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে বাংলার শেষ আফগান শাসক দাউদ কররানী পরাজিত হলে বাংলায় মুঘল শাসন শুরু হয়। এ সময় মুঘল শাসক ছিলেন সম্রাট আকবর। সুবাদারি ও নবাবি এ দুই পর্বে বাংলায় মুঘল শাসন অতিবাহিত হয়। বারোভূঁইয়াদের দমনের পর সমগ্র বাংলায় সুবেদারী প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় সমগ্র বঙ্গ দেশ সুবহ-ই-বাঙ্গালাহ নামে পরিচিত হয়। মুঘল প্রদেশগুলো সুবা নামে পরিচিত ছিল। প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে বলা হতো সুবাদার।

বাংলার ইতিহাসে সুবেদারি শাসন (বা সুবাদারি শাসন) মূলত মোগল আমলের সেই সময়কালকে বোঝায়, যখন বাংলা দিল্লির মোগল সম্রাটদের অধীনে ছিল এবং তাঁদের নিযুক্ত প্রতিনিধি বা 'সুবাদার' দ্বারা শাসিত হতো। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধের মাধ্যমে মোগলরা বাংলা জয় করলেও প্রকৃত সুবেদারি শাসন সুসংগঠিত হয় সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় থেকে।

১. ইসলাম খাঁ (১৬০৮–১৬১৩)

তিনি ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিযুক্ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুবাদার।

  • বারো ভূঁইয়া দমন: তিনি ১৬১০ সালে বারো ভূঁইয়াদের নেতা মুসা খাঁকে পরাজিত করে বাংলায় মোগল শাসন চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।

  • রাজধানী ঢাকা: ১৬১০ সালে তিনি রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। তিনি সম্রাটের নামানুসারে ঢাকার নাম রাখেন 'জাহাঙ্গীরনগর'

  • ধোলাই খাল: ঢাকার জলবদ্ধতা নিরসন ও প্রতিরক্ষার জন্য তিনি বিখ্যাত 'ধোলাই খাল' খনন করেন।

২. শাহজাদা মোহাম্মদ সুজা (১৬৩৯–১৬৬০)

তিনি সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন।

  • শাসনকাল: তিনি দীর্ঘ ২১ বছর অত্যন্ত সাফল্যের সাথে বাংলা শাসন করেন।

  • স্থাপত্য: তাঁর আমলে ঢাকার বড় কাটরা এবং চুড়িহাট্টা মসজিদ নির্মিত হয়।

  • পতন: উত্তরসূরি যুদ্ধে ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি সপরিবারে আরাকানে পালিয়ে যান এবং সেখানে নির্মমভাবে নিহত হন।

৩. মীর জুমলা (১৬৬০–১৬৬৩)

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা বাংলার অত্যন্ত শক্তিশালী সুবাদার ছিলেন।

  • আসাম বিজয়: তিনি মোগল সীমানা আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।

  • মীর জুমলার কামান: তাঁর অসম অভিযানের স্মৃতি হিসেবে ঐতিহাসিক 'বিবি মরিয়ম' বা মীর জুমলার কামানটি বর্তমানে ঢাকার ওসমানী উদ্যানে সংরক্ষিত আছে।

  • মীর জুমলা গেট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরের কাছে অবস্থিত 'ঢাকা গেট' বা মীর জুমলা গেট তাঁরই কীর্তি।

৪. শায়েস্তা খাঁ (১৬৬৪–১৬৮৮)

তিনি বাংলার ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদী এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় সুবাদার ছিলেন।

  • চট্টগ্রাম বিজয় (১৬৬৬): তিনি মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম জয় করেন এবং এর নাম রাখেন 'ইসলামাবাদ'

  • চালের দাম: তাঁর আমলে বাংলায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চরমে পৌঁছেছিল; তখন মাত্র ১ টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেত।

  • স্থাপত্য: তাঁর আমলে লালবাগ কেল্লা (নির্মাণ শুরু করেন শাহজাদা আজম), বিবি পরীর মাজার, চকবাজার মসজিদ এবং সাত গম্বুজ মসজিদ নির্মিত হয়।

৫. মুর্শিদকুলি খাঁ ও সুবেদারির শেষ পর্যায় (১৭১৭–১৭২৭)

তিনি ছিলেন বাংলার শেষ শক্তিশালী সুবাদার এবং প্রথম স্বাধীন নবাব।

  • রাজধানী স্থানান্তর: তিনি ১৭১৭ সালে রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন।

  • নবাবী আমল: তাঁর সময় থেকেই সুবেদারি পদটি বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে এবং কার্যত 'নবাবী আমল' শুরু হয়।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

মানসিংহ সম্রাট আকবরের সেনাপতি ছিলেন। তিনি বাংলা দখল নেওয়ার প্রচেষ্ঠা চালান এবং বারো ভূঁইয়াদের দমন করতে ব্যর্থ হন।

মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি এবং সম্রাট আকবরের 'নবরত্ন' সভার অন্যতম সদস্য ছিলেন রাজা মানসিংহ। বাংলার ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে জড়িত কারণ তিনি মোগল আধিপত্য বিস্তারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১. পরিচয় ও পদমর্যাদা

  • পরিচয়: তিনি ছিলেন রাজস্থানের অম্বর (বর্তমানে জয়পুর) রাজ্যের কচ্ছবাহা বংশীয় রাজা। তাঁর ফুফু ছিলেন সম্রাট আকবরের স্ত্রী যোধাবাই (মরিয়ম-উজ-জমানি)।

  • মনসবদার: তিনি মোগল দরবারের সর্বোচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী ছিলেন। সম্রাট আকবর তাঁকে 'ফারজান্দ' (পুত্র) উপাধি দিয়েছিলেন এবং ৭০০০ মনসবদার পদে উন্নীত করেছিলেন।

২. বাংলার সুবাদার হিসেবে মানসিংহ (১৫৯৪–১৬০৬)

সম্রাট আকবর তাঁকে তিনবার বাংলার সুবাদার হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল অবাধ্য জমিদারদের (বারো ভূঁইয়া) দমন করা।

  • রাজধানী রাজমহল: ১৫৯৫ সালে তিনি বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে রাজমহলে (বর্তমান বিহারে) স্থানান্তর করেন এবং এর নাম দেন 'আকবরনগর'

  • বারো ভূঁইয়াদের সাথে সংঘর্ষ: তিনি রাজা প্রতাপাদিত্য এবং কেদার রায়কে পরাজিত করতে সক্ষম হলেও ঈসা খাঁকে দমনে হিমশিম খেয়েছিলেন।

৩. ঈসা খাঁ ও মানসিংহের দ্বৈরথ (১৫৯৭)

বাংলার ইতিহাসে ঈসা খাঁ ও মানসিংহের লড়াই এক কিংবদন্তি হয়ে আছে।

  • এগারোসিন্দুরের যুদ্ধ: ১৫৯৭ সালে কিশোরগঞ্জের এগারোসিন্দুর নামক স্থানে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে মানসিংহের বাহিনীর সাথে ঈসা খাঁর বিশাল নৌযুদ্ধ হয়।

  • দ্বন্দ্বযুদ্ধ: লোকগাঁথা অনুযায়ী, দুই বীরের মধ্যে এক পর্যায়ে তলোয়ার নিয়ে সরাসরি দ্বন্দ্বযুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মানসিংহের তলোয়ার ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাঁকে আঘাত না করে নিজের তলোয়ার এগিয়ে দেন। ঈসা খাঁর এই মহানুভবতায় মানসিংহ মুগ্ধ হন এবং সম্রাট আকবরের কাছে ঈসা খাঁর বীরত্বের প্রশংসা করেন।

৪. স্থাপত্য ও অবদান

  • রাজমহল শহর: তিনি রাজমহলকে একটি সুরক্ষিত ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

  • মন্দির নির্মাণ: তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে অনেক হিন্দু মন্দির নির্মাণ ও সংস্কার করেন, যার মধ্যে বৃন্দাবনের গোবিন্দ দেব মন্দির অন্যতম।

Content added By
Content updated By

১৬০৮ সালে ইসলাম খানকে সুবেদার হিসেবে নিয়োগ দেয় সম্রাট জাহাঙ্গীর। তিনি বারো ভূঁইয়াদের দমন করে সমগ্র বাংলায় সুবাদারি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৬১০ সালে বিহারের রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসেন। সুবেদার ইসলাম খান ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। ইসলাম খান ঢাকার 'ধোলাই খাল খনন করেন। তিনি বাংলার নৌকা বাইচ উৎসবের সূচনা করেন।

বাংলার মোগল সুবাদারদের মধ্যে ইসলাম খাঁ (১৬০৮–১৬১৩ খ্রি.) ছিলেন অত্যন্ত সফল ও দূরদর্শী একজন প্রশাসক। তাঁর শাসনামলটি বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, কারণ তাঁর হাত ধরেই বাংলায় মোগলদের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ঢাকা প্রথমবার রাজধানীর মর্যাদা পায়।

১. বারো ভূঁইয়া দমন ও রাজনৈতিক বিজয়

সুবাদার ইসলাম খাঁ ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের বাল্যবন্ধু। তিনি বাংলায় এসে উপলব্ধি করেন যে, বারো ভূঁইয়াদের দমন না করলে মোগল আধিপত্য স্থায়ী হবে না।

  • মুসা খাঁকে পরাজয়: ১৬১০ সালে তিনি এক বিশাল নৌবাহিনী নিয়ে বারো ভূঁইয়াদের নেতা ও ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁকে পরাজিত করেন।

  • গেরিলা যুদ্ধের অবসান: তিনি অত্যন্ত কৌশলে একের পর এক জমিদারকে পরাজিত বা বশীভূত করেন। এর মাধ্যমে বাংলায় দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধের অবসান ঘটে।

২. ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা (১৬১০)

ইসলাম খাঁর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান হলো ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করা।

  • কারণ: বারো ভূঁইয়া ও মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমন করার জন্য ঢাকা ছিল ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • জাহাঙ্গীরনগর: ১৬১০ সালে তিনি রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে এর নাম রাখেন 'জাহাঙ্গীরনগর'

৩. ধোলাই খাল ও নগর উন্নয়ন

ঢাকার প্রতিরক্ষাকে মজবুত করতে এবং পানি চলাচলের সুবিধার জন্য তিনি বিখ্যাত 'ধোলাই খাল' খনন করেন। এটি বুড়িগঙ্গা ও বালু নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিল, যা রাজধানীর নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. মগ ও পর্তুগিজ দমন

বাংলার দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে মগ (আরাকানি) এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের চরম উৎপাত ছিল। ইসলাম খাঁ নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করে তাদের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং মোগল সীমানা সুরক্ষিত করেন।

একনজরে ইসলাম খাঁ:

বিষয়তথ্য
পুরো নামশেখ আলাউদ্দিন ইসলাম খাঁ।
নিযুক্তকর্তাসম্রাট জাহাঙ্গীর।
রাজধানী পরিবর্তনরাজমহল থেকে ঢাকা (১৬১০)।
প্রধান সাফল্যবারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্ত পতন।
মৃত্যু১৬১৩ সালে তিনি ঢাকায় থাকাকালীন মৃত্যুবরণ করেন।
Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে। আওরঙ্গজেবের মামা ছিলেন শায়েস্তা খান। চট্টগ্রাম অধিকার করে আরাকানি মগ জলদস্যুদের উৎখাত করেন। আরাকানি জলদস্যুদের হটিয়ে তিনি চট্টগ্রামের নাম রাখেন ইসলামাবাদ। শায়েস্তা খান বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করেন। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত শায়েস্তা খানের আমলে। তাঁর আমলের স্থাপত্যশিল্প ছোট কাটরা, লালবাগ কেল্লা, চক মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ, পরি বিবির মাজার (শায়েস্তা খানের মেয়ে), হোসেনী দালান, বুড়িগঙ্গার মসজিদ, প্রভৃতি।

বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং দীর্ঘমেয়াদী মোগল সুবাদার ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। তিনি দুই দফায় (১৬৬৪-১৬৭৮ এবং ১৬৮০-১৬৮৮) প্রায় ২৪ বছর বাংলা শাসন করেন। তাঁর আমলকে বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং স্থাপত্য শিল্পের প্রসারের জন্য 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়।

১. পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্ক

  • পরিচয়: তিনি ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের পত্নী মমতাজ মহলের ভাই। অর্থাৎ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের আপন মামা

  • উপাধি: সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে 'আমীর-উল-উমারা' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

২. সামরিক সাফল্য: চট্টগ্রাম বিজয় (১৬৬৬)

শায়েস্তা খাঁর শাসনের সবচেয়ে বড় গৌরবময় অধ্যায় হলো চট্টগ্রাম জয়।

  • মগ ও পর্তুগিজ দমন: বাংলার দক্ষিণ উপকূলে মগ (আরাকানি) এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের চরম উৎপাত ছিল। শায়েস্তা খাঁ একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করে তাদের পরাজিত করেন।

  • ইসলামাবাদ: ১৬৬৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম দখল করেন এবং এর নতুন নাম রাখেন 'ইসলামাবাদ'। তিনি সন্দ্বীপও মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।

৩. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: ১ টাকায় ৮ মণ চাল

শায়েস্তা খাঁর আমল সাধারণ মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে সুলভ দ্রব্যমূল্যের জন্য।

  • দ্রব্যমূল্য: তাঁর আমলে বাংলায় কৃষিতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। কথিত আছে, তখন মাত্র ১ টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেত।

  • স্মৃতিচিহ্ন: তিনি যখন ১৬৮৮ সালে চিরতরে ঢাকা ত্যাগ করেন, তখন পশ্চিম দিকের একটি তোরণ (পুরান ঢাকার চকবাজার সংলগ্ন) বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং লিখে গিয়েছিলেন— “আমার মতো সস্তায় চাল না খাওয়াতে পারলে এই দরজা কেউ খুলো না।”

৪. স্থাপত্যশৈলী ও 'শায়েস্তা খাঁ রীতি'

ঢাকাকে স্থাপত্যের নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর আমলের স্থাপত্যকলাকে 'শায়েস্তা খাঁ রীতি' বলা হয়।

  • লালবাগ কেল্লা: এই দুর্গের কাজ শাহজাদা আজম ১৬৭৮ সালে শুরু করলেও, শায়েস্তা খাঁ এর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ অংশ (যেমন: পরী বিবির মাজার) নির্মাণ করেন।

  • পরী বিবির মাজার: এটি তাঁর প্রিয় কন্যা ইরান দুখত (পরী বিবি)-এর সমাধি। এটি বাংলাদেশের একমাত্র স্থাপত্য যেখানে রাজস্থানের মাকরানা মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছে।

  • অন্যান্য স্থাপত্য: চকবাজার শাহী মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ, ছোট কাটরা এবং হুসেনী দালান (সংস্কার)।

একনজরে শায়েস্তা খাঁ:

বিষয়তথ্য
পুরো নামমির্জা আবু তালিব (শায়েস্তা খাঁ)
নিযুক্তকর্তাসম্রাট আওরঙ্গজেব
রাজধানীঢাকা (জাহাঙ্গীরনগর)
প্রধান সামরিক সাফল্যচট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ বিজয়
মৃত্যু১৬৯৪ সালে আগ্রায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন
Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

কাশিম খান জুয়ানি সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রথম সুবেদার। পর্তুগিজদের অত্যাচারের মাত্রা চরমে পৌঁছলে সম্রাট শাহজাহানের আদেশে কাসিম খান তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করেন।

বাংলার সুবাদারদের তালিকায় কাসেম খাঁ জুয়ানি (১৬৩২–১৬৩৫ খ্রি.) ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের নিযুক্ত অন্যতম বিশ্বস্ত প্রশাসক। তিনি সুবাদার কাসেম খাঁ (ইসলাম খাঁর ভাই)-এর সাথে বিভ্রান্তি এড়াতে 'জুয়ানি' নামে পরিচিত। তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো হুগলি থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়ন

১. পর্তুগিজ দমন ও হুগলি বিজয় (১৬৩২)

কাসেম খাঁ জুয়ানির শাসনামলের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো বাংলায় পর্তুগিজদের ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্য বন্ধ করা।

  • কারণ: পর্তুগিজরা হুগলিতে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের নামে দুর্গ তৈরি করেছিল এবং সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করত। এছাড়াও তারা মুঘলদের রাজস্ব ফাঁকি দিত এবং মগ জলদস্যুদের সাথে হাত মিলিয়ে লুণ্ঠন চালাত।

  • অভিযান: সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে ১৬৩২ সালে কাসেম খাঁ জুয়ানি এক বিশাল বাহিনী নিয়ে পর্তুগিজদের প্রধান ঘাঁটি হুগলি আক্রমণ করেন।

  • ফলাফল: দীর্ঘ তিন মাস যুদ্ধের পর পর্তুগিজরা পরাজিত হয়। প্রায় ১০,০০০ পর্তুগিজ নিহত হয় এবং কয়েক হাজারকে বন্দি করে আগ্রায় পাঠানো হয়। এর ফলে বাংলায় পর্তুগিজদের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটে।

২. প্রশাসনিক দক্ষতা

  • তিনি একজন অত্যন্ত কঠোর ও সুশৃঙ্খল প্রশাসক ছিলেন। তাঁর সময়ে বাংলার অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় ছিল।

  • তিনি বাংলায় মুঘল নৌবাহিনীকে (নওয়ারা) শক্তিশালী করেছিলেন যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বিদেশি দস্যু আক্রমণ করতে না পারে।

৩. সাহিত্য ও সংস্কৃতি

  • কাসেম খাঁ জুয়ানি কেবল একজন বীর সেনাপতিই ছিলেন না, তিনি নিজেও একজন সুপণ্ডিত এবং কবি ছিলেন।

  • তিনি ফার্সি ভাষায় কাব্যচর্চা করতেন। তাঁর শাসনামলে রাজদরবারে জ্ঞানী-গুণীদের কদর ছিল।

Content added By
Content updated By

সম্রাট শাহজাহানের ২য় পুত্র শাহ সুজা ২০ বছর বাংলায় সুবাদারি করেন। তিনি ইংরেজদের বিনা শুল্কে বানিজ্য করার সুযোগ নেন। শাহজাদা সুজা ঢাকার চক বাজারে 'বড় কাটরা মসজিদ নির্মাণ করেন। সুজা তার ভ্রাতা আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।

বাংলার ইতিহাসে মুঘল সুবাদারদের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী এবং প্রভাবশালী শাসক ছিলেন শাহজাদা মোহাম্মদ সুজা। তিনি মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র এবং মমতাজ মহলের সন্তান ছিলেন। ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ সাল পর্যন্ত (মাঝখানে সামান্য বিরতিসহ) প্রায় ২১ বছর তিনি বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১. দীর্ঘমেয়াদী শাসন ও স্থিতিশীলতা

শাহ সুজার শাসনামল ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ এবং বাংলার অর্থনৈতিক উন্নতির সময়।

  • রাজধানী স্থানান্তর: সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে পুনরায় রাজমহলে (বর্তমান বিহার) স্থানান্তর করেন। তবে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ঢাকায় তাঁর প্রতিনিধি থাকতেন।

  • ইউরোপীয় বণিকদের সুবিধা: তাঁর সময়ে ইংরেজ, ওলন্দাজ (ডাচ) এবং ফরাসি বণিকরা বাংলায় বাণিজ্য প্রসারের বিশেষ সুযোগ পায়। বিশেষ করে ১৬৫১ সালে তিনি ইংরেজদের মাত্র ৩০০০ টাকার বিনিময়ে বাংলায় বিনাশুল্কে বাণিজ্যের অনুমতি বা 'নিশান' প্রদান করেন।

২. স্থাপত্যশৈলী ও অবদান

শাহ সুজার শাসনামলে নির্মিত স্থাপত্যগুলো আজও ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে:

  • বড় কাটরা (Bara Katra): ১৬৪৪ সালে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এটি নির্মিত হয়। এটি মূলত একটি সরাইখানা বা কাফেলা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর বিশালতা এবং কারুকার্য মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

  • চুড়িহাট্টা মসজিদ: পুরান ঢাকার চকবাজারে তিনি এই ঐতিহাসিক মসজিদটি নির্মাণ করেন।

  • ঈদগাহ (ধানমন্ডি): ১৬৪০ সালে তাঁর নির্দেশে ধানমন্ডিতে বিখ্যাত মুঘল ঈদগাহ নির্মিত হয়।

৩. উত্তরসূরি যুদ্ধ ও করুণ পরিণতি

শাহ সুজার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল অত্যন্ত বিয়োগান্তক।

  • সিংহাসনের লড়াই: ১৬৫৭ সালে সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চার পুত্রের (দারা শিকোহ, সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ) মধ্যে সিংহাসন নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়।

  • খাজোয়ার যুদ্ধ (১৬৫৯): এলাহাবাদের কাছে খাজোয়ার যুদ্ধে শাহ সুজা তাঁর ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হন।

  • আরাকানে পলায়ন: পরাজয়ের পর মীর জুমলার তাড়া খেয়ে তিনি সপরিবারে বাংলার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে আরাকানে (বর্তমান মিয়ানমার) আশ্রয় নেন। ১৬৬০ বা ১৬৬১ সালে আরাকান রাজের সাথে বিরোধের জেরে তিনি সপরিবারে সেখানে নির্মমভাবে নিহত হন।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা সুজাকে দমনের জন্য বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর পর্যন্ত এসেছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে বাংলার সুবাদারের দায়িত্ব নেন। তিনি ঢাকা গেট (পূর্ব নাম মীর জুমলা) নির্মাণ করেন। কৃষকদের নিকট থেকে প্রথম কর আদায় করেন।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

পরিবিবি ছিলেন শায়েস্তা খানের কন্যা। পরিবিবির আসল নাম ইরান দুখত রহমত বানু। লালবাগ দুর্গের মাঝখানে বর্গাকার ভবনটিতে তার কবর।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

যুগে যুগে বাংলার ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের নামেও পরিবর্তন এসেছে।

  • বঙ্গ
  • বাঙ্গালাহ
  • জান্নাতাবাদ
  • সুবে বাংলা
  • বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি
  • পূর্ববঙ্গ
  • পূর্ব পাকিস্তান
  • বাংলাদেশ
Content added By

সর্বপ্রথম বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায় ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থে।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

১৩৫২ সালে সুলতান ইলিয়াস শাহ ১৬ টি জনপদ একত্রিত করে বঙ্গের নাম দেন বাঙ্গালাহ ।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

১৫৩৮ সালে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন গৌড়ের সৌন্দর্য দেখে বাঙ্গালার নাম দেন 'জান্নাতাবাদ'।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

১৫৭৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবর জান্নাতাবাদ নামকরণ করে ‘সুবে বাংলা’। সুবে অর্থ প্রদেশ।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

লর্ড ডালহৌসি ১৮৫৪ সালে সুবে বাংলার নামকরণ করেন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি।

Content added By

লর্ড কার্জনের আমলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে বঙ্গের নাম হয় ‘পূর্ব বঙ্গ’ ।

Content added By

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন বাংলাদেশ।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

বাংলার ইতিহাসের পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নবাবি আমলের গুরুত্ব সর্বাধিক। মুর্শিকুলি খানের শাসন কাঠামোয় আবির্ভাব থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে বদল এসেছিল তারই ধারাবাহিক পরিণতি হিসেবে ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখল করেছিল বাংলার। অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তান মুর্শিদকুলি খান প্রথমে সাধারণ একজন দিউয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। নানা স্থানে দিউয়ানীর কাজে তাঁর অভিজ্ঞতা সম্রাট আওরঙ্গজেবকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল। আওরঙ্গজেব তাঁকে হায়দারাবাদের দিওয়ান নিযুক্ত করার পর তাঁকে "করতলব খান" উপাধিও প্রদান করা হয়। অভিজ্ঞতা ও কর্ম নৈপুণ্যে সন্তুষ্ট হয়ে আওরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রাজস্ব সংস্কারের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। বলতে গেলে তার মাধ্যমেই বাংলায় নবাবি শাসনের উত্থান হয়েছিল। তারপর পরবর্তীকালের শাসকদের অদূরদর্শীতা, অদক্ষতা ও বিশৃঙ্খল আচরণ শেষ পর্যন্ত নবাবি শাসনের পতন ডেকে আনে।

বাংলার নবাবী আমল বলতে মূলত ১৭০৭-১৭৫৭ খ্রিঃ পর্যন্ত সময়কে বোঝায়, যা মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে বাংলার সুবাহদারদের (প্রাদেশিক শাসক) ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রায় স্বাধীনভাবে শাসন করাকে নির্দেশ করে; মুর্শিদকুলী খান এর সূচনা করেন, এবং এই আমলের শেষ স্বাধীন নবাব ছিলেন সিরাজউদ্দৌলা, যিনি পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হলে নবাবী শাসনের কার্যত অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা পায়।

  • মুর্শিদ কুলি খান (১৭১৭-১৭২৭)
  • আলীবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬)
  • অন্ধকূপ হত্যা-১৭৫৬
  • সিরাজউদ্দৌলা (১৭৫৬-১৭৫৭)
  • পলাশীর যুদ্ধ-১৭৫৭
  • বক্সারের যুদ্ধ-১৬৬৪
  • ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

মুর্শিদ কুলি খান বাংলায় প্রথম স্বাধীন নবাবী রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন ১৭১৭ সালে। তাঁর সময় সুবাকে বলা হতো ‘নিজামত’ আর সুবাদারের বদলে পদবি হয় ‘নাজিম’। সম্রাট ফররুখ শিয়ার শাসনকালে মুর্শিদকুলি খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। তিনি বার্ষিক ১ কোটি ৩ লক্ষ টাকা রাজস্ব পাঠাতেন। তাঁর শাসনামলে বাংলা সুবা বাংলা প্রায় স্বাধীন হয়ে পড়ে।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

আলীবর্দি খান বাংলার প্রথম প্রকৃত স্বাধীন নবাব । তিনি মুঘল সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান বন্ধ করেন। মুসলমান শাসনামলে এদেশে এসে অত্যাচার ও লুট করেছে বর্গীরা। বাংলা থেকে মারাঠা বর্গীদের বিতাড়িত করেন আলীবর্দি খান।

Content added By

নবাব সিরাজউদ্দৌলার কলকাতা অভিযানের সময় হলওয়েলসহ কতিপয় ইংরেজ কর্মচারী ফোর্ট উইলিয়ামে বন্দী হয়ে ছিলেন। হলওয়েলের বর্ণনা অনুসারে জানা যায়, নবাব ১৪৬ জন ইউরোপীয় ইংরেজ বন্দীকে একটি ক্ষুদ্র অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ রাখেন। প্রচন্ডে গরমে ক্ষুদ্র জায়গায় ১৪৬ জনের মধ্যে ১২৩ জন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। হলওয়েল কর্তৃক প্রচারিত এই কাহিনি অন্ধকূপ হত্যা নামে প্রচারিত হয়। অন্ধকূপ হত্যার ঐতিহাসিক সত্যতা পাওয়া যায়নি।

Content added By

সিরাজউদ্দৌলার প্রকৃত নাম মির্জা মোহাম্মদ বেগ। তিনি ছিলেন শেষ স্বাধীন নবাব। আলীবর্দি খান নবাব উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আমেনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলাকে। ১৭৫৬ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার সিংহাসনে বসেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে। ১৭৫৬ সালে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করে নেন এবং কলকাতার নাম রাখেন আলীনগর।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। এ যুদ্ধে ইংরেজদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন রবার্ট ক্লাইভ। আলীবর্দির প্রথম কন্যা ঘষেটি বেগমের ইচ্ছে ছিল তাঁর দ্বিতীয় ভগ্নির পুত্র শওকত জঙ্গ নবাব হবেন। ফলে তিনি সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে সাহায্য করেন সেনাপতি মীর জাফর, খালা ঘসেটি বেগম, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, উমিচান, রাজবল্লভ প্রমুখ। নবাবের পক্ষে যুদ্ধ করেন মীরমদন, মোহনলাল ও ফরাসী সেনাপতি সিনফ্রে ।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধে নবাবের সেনাপতি মীর জাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধে অংশগ্রহণে বিরত থাকেন। বিশ্বাসঘাতকতায় অসহায়ভাবে পরাজয় বরণ করেন সিরাজউদ্দৌলা। পলাশির যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা বাংলায় রাজনৈতিক শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে। মুঘল সাম্রাজ্যের স্থিতিকাল প্রায় ৩৩১ বছর (১৫২৬-১৫৫৭)। তবে ১৭৫৮ সাল পর্যন্ত প্রতীকি দায়িত্ব টিকে ছিল মুঘলদের। সর্বশেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ।

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

মীর কাসিম ছিলেন মীর জাফরের জামাতা। তিনি ১৭৬০ সালে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। মীর কাসিম ছিলেন একজন সুযোগ্য শাসক ও একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক। তাই প্রশাসনকে ইংরেজ প্রভাবমুক্ত করার জন্য বিচক্ষণ নবাব সর্বাগ্রে রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তরিত করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে মীর কাশিমের যুদ্ধ হয় বক্সার নামক স্থানে, যুদ্ধে কাশিমকে পরাজিত করে ব্রিটিশ বেনিয়ারা শাসন পাকাপোক্ত করে।

Content added By

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য ষোড়শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত একটি জয়েন্ট‌-স্টক কোম্পানি। এর সরকারি নাম "ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি"। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল‍্যান্ডের তৎকালীন রাণী প্রথম এলিজাবেথ এই কোম্পানিকে ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করার রাজকীয় সনদ প্রদান করেছিলেন।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

Promotion

Are you sure to start over?

Loading...