মন্দা থেরী
আতুরং অসুচিং পূতিং পল্স নন্দে সমুসযং।
অসুভায় চিত্তং ভাবেহি একগ্গং সুসমাহিতং।
অনিমিত্তঞ্চ ভাবেছি মানানুসযমুজ্জহ।
ততো মানাভিসমযা উপসম্ভা চরিস্সসি।
শব্দার্থ
আতুরং - আঙুর, রুগ্ন, শোকের কারণ; অসুচিং - অশুচি, অপবিত্র; পৃতিং - পূতি, পচা; পস্স - দেখ; সমুস্ল্যং - সুন্দর দেহ, শরীরপিণ্ড; অসুভাষ - অসার, অশুভ; চিত্তং ভাবেহি - চিত্তকে (ধ্যানে) মগ্ন কর; একাগ্গং একাগ্র; - সুসমাহিতং সুসমাহিত; অনিমিত্ত - যা অস্থায়ী পদার্থের ওপর নির্ভর করে না; মান - নিজের রূপ, শরীর, পদ ইত্যাদির অভিমান; উজ্জহ (উৎ+ জহ) - পরিত্যাগ কর; উপসস্তা - উপশম করে; চরিস্সসি - বিচরণ করবে।
সারমর্ম
নন্দা তাঁর সৌন্দর্যের অহংকার করতেন। ভিক্ষুণী হয়েও তা তিনি পরিত্যাগ করতে পারেননি। সেজন্য বুদ্ধ তাঁকে ভৎর্সনা করতেন বলে তাঁর নিকটে যেতেন না। অথচ জ্ঞান লাভের উপযুক্ত ছিলেন। বুদ্ধ মহা-প্রজাপতিকে আদেশ দিলেন যে, সমস্ত ভিক্ষুণী যেন তাঁর নিকট এসে ধর্মোপদেশ শ্রবণ করে। নন্দা নিজের পরিবর্তে অন্যজনকে পাঠালেন। ভগবান প্রতিনিধি পাঠাতে নিষেধ করলেন। এরূপে বাধ্য হয়ে নন্দাকে আসতে হল। ভগবান তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাবলে এক সুন্দরী সত্রীলোকের মূর্তি উপস্থাপিত করলেন। তাঁর বার্ধক্য ও পরিণতি প্রদর্শন করে দেহের অসারতা দেখালেন। ঐ দৃশ্য নন্দার মর্মে আঘাত করল। বুদ্ধ সেই সময় নন্দাকে সম্বোধন করে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তা দুটি গাথায় ঘেরী নিজেই রচনা করেন। নিম্নে তার অনুবাদ দেওয়া হল:
নন্দে! পৃতি, অশুচি ও ব্যাধির এ দেহ-সমষ্টিকে অবলোকন কর। সুসমাহিত ও একাগ্র চিত্তে অশুভভাবনায় চিত্তকে নিয়োজিত কর। অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্মরূপ অনিমিত্তের ওপর চিত্তকে প্রতিষ্ঠিত করে অহংভাব বিদূরিত কর। চিত্তকে সম্যকভাবে দমন করে শান্ত ও নির্মল অবস্থায় স্থিত হও।
টীকা
নন্দা
তিনি বিপসী বুদ্ধের সময়ে বন্ধুমতী নগরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন জনৈক ধনবান নাগরিক। নাম রাখা হয়েছিল অভিরূপ-নন্দা। ছোটকাল থেকে ধর্মে অনুরক্তা ছিলেন। বিপসী বুদ্ধ পরিনির্বাপিত হলে নন্দা তাঁর 'স্মৃতি মন্দিরে রত্ন-খচিত একটি সোনার ছাতা দান করেছিলেন। সেই পুণ্যপ্রভাবে তিনি গৌতম বুদ্ধের সময় কপিলাবস্তু নগরে শাক্য খেমকের প্রধানা সত্রীর কন্যারূপে জন্ম নেন। সুন্দর দেহ গঠনের জন্য তাঁর নাম তখনও অভিরূপ নন্দা রাখা হয়।
স্বয়ম্বর সভার দিন নন্দার ইস্পিত যুবক শাক্যকুমার চরভূতের মৃত্যু হয়। তাই তাঁর পিতামাতা তাঁর অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রব্রজ্যা গ্রহণ করার জন্য বাধ্য করেন। তিনি ভিক্ষুণীসংঘে প্রবেশ করেও নিজ দেহ-সৌন্দর্য দেখে নিজেই মুগ্ধ হতেন। বুদ্ধ জাগতিক অনিত্য-বিষয়ে দেশনা করতেন বলে তাঁর সঙ্গ এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু ভগবান জানতেন নন্দা জ্ঞান লাভের উপযুক্ত পাত্রী।
পরে নন্দা বুদ্ধের অলৌকিক শক্তিবলে পুঁতিগন্ধময় দেহের অসারতা উপলব্ধি করেন। বুদ্ধের ধর্মদেশনাকালে নন্দা অর্হত্বফলে প্রতিষ্ঠিত হন।
থেরী গাথা
থেরীগাথা খুদ্দক নিকায়ের নবম গ্রন্থ। গ্রন্থখানিতে ৭৩ জন ঘেরী-র গাথা সংগৃহীত হয়েছে। তাতে থেরী-দের জীবন কাহিনী বর্ণিত আছে। তাঁদের রচিত গাথার সংখ্যা ৫২২। এঁদের মধ্যে ২৩ জন সম্প্রান্তবংশীয় রাজপরিবারের বধূ ও কন্যা, ১৩ জন শ্রেষ্ঠী বা বণিক সম্প্রদায়, ৭ জন ব্রাহ্মণ ও ১৫ জন পতিতা নারী।
এ গ্রন্থে ভিক্ষুণীদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ ও আধ্যাত্মিক উন্নতির কথা বলা হয়েছে। তাঁরা আত্মশক্তিতে বলীয়ান ছিলেন। সমাজের বহু অবহেলিত নারীকে ধর্মে স্থান দেওয়া হয়েছিল। পুত্রহারা কৃশা গৌতমী; স্বামী পরিত্যক্তা ইসিদাসী, আত্মীয়-স্বজনহারা, পাগলিনীপ্রায় পটাচারা; গণিকা আম্রপালী প্রমুখ নারী ভিক্ষুণীসংঘে যোগদান করে আত্ম-পরহিতে অবদান রেখেছিলেন।
সেই যুগের সমাজে স্ত্রীলোকের স্থান নির্ণয় করার পক্ষে এই সংকলন গ্রন্থটির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার অনেক তথ্যে গ্রন্থটি সমৃদ্ধ। গ্রন্থটিকে ভারতীয় গীতিকাব্য সাহিত্যে প্রথম সারিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন, শিক্ষা-দীক্ষার আলোচনাও এতে সংক্ষেপে উল্লেখ আছে।
এতে বৈষয়িক বর্ণনা বেশি থাকলেও ভিক্ষুণীদের নির্বাণ-সাধনাও কম নেই। সংঘমধ্যে তাঁরা মর্যাদা পেতেন। মুক্তিলাভের আশাই ছিল তাঁদের সংসার ত্যাগের মূল উদ্দেশ্য।