দাস বংশের ইতিহাস ( ১২০৬ - ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ ) দাস বংশের ইতিহাস শুরু কুতুবউদ্দিন আইবকের হাত ধরে । কুতুবউদ্দিন আইবক ( ১২০৬ - ১২১০ খ্রিস্টাব্দ ) মহম্মদ ঘোরীর দাস ছিলেন কুতুবউদ্দিন আইবক। নিঃসন্তান ঘোরীর মৃত্যুর পর তার বিশ্বস্ত সেনাপতি তথা দাস কুতুবউদ্দিন আইবক ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে নিজেকে স্বাধীন নরপতি ঘোষণা করেন। আইবক কথাটির অর্থ হলো দাস। কুতুবউদ্দিন আইবক ছিলেন দিল্লির প্রথম সুলতান ও ভারতে দাস বংশের প্রতিষ্ঠাতা।
কুতুবউদ্দিন আইবেক মুহম্মদ ঘুরীর একজন ক্রীতদাস হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি মুহম্মদ ঘুরীর অনুমতিক্রমে ভারত বিজয়ের পর দিল্লীতে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করেন ১২০৬ সালে। উপমহাদেশে স্থায়ী মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আইবেক। ১২০৬ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৩০০ বছর ধরে ভারতে শাসনকারী একাধিক মুসলিম সাম্রাজ্যসমূহ দিল্লি সালতানাত নামে পরিচিত।
জেনে নিই
- কুতুবউদ্দিন আইবেক ছিলেন তুর্কিস্তানের অধিবাসী।
- উপমহাদেশে প্রথম স্থায়ী মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা, তার রাজধানী ছিল দিল্লি।
- দানশীলতার জন্য তাঁকে লাখবক্স' বলা হত।
- কুতুবউদ্দিন আইবেক দিল্লির কুতুবমিনার (সুউচ্চ মিনার) নির্মাণ কাজ শুরু করেন।
- 'আড়াই দিনকা পড়া' মসজিদ নির্মাণ করেন- আজমিরে।
- দিল্লীর বিখ্যাত সাধক কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকির নামানুসারে এর নাম রাখা হয় কুতুবমিনার
- কুকুরউদ্দিন আইবেক ও তাঁর উত্তরাধিকারদের শাসনামলকে প্রাথমিক যুগের তুর্কী শাসনও বলা হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ (১২১১-১২৩৬ খ্রি.) কে দিল্লির সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ভারতে মুসলমান শাসকদের মধ্যে তিনিই প্রথম মুদ্রা প্রচলন করেন। ইলতুৎমিশ ১২২৯ খ্রি. বাগদাদের খলিফা আল মুনতাসির বিল্লাহ কর্তৃক 'সুলতান-ই-আজম' উপাধিতে ভূষিত হন। সুলতান ইলতুৎমিশ চল্লিশজন তুর্কি ক্রীতদাসদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন যা ইতিহাসে 'বন্দেগান-ই-চেহেলগান' বা চল্লিশ চক্র নামে পরিচিত।
কুতুব মিনার ![]() অবস্থান: দিল্লি, ভারত। নির্মাতা : কুতুবউদ্দিন আইবেক নির্মাণ কাজ শুরু করলেও সমাপ্ত করেন তাঁর জামাতা সুলতান ইলতুৎমিশ। নামকরণ: দিল্লির বিখ্যাত সাধক কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকির নামানুসারে। |
সুলতান ইলতুতমিশকে দিল্লী সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। কুতুবউদ্দিন আইবেকের জামাতা ছিলেন ইলতুতমিশ। শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের উপাধি সুলতান-ই আজম। তিনি বন্দেগান-ই-চেহেলগান বা চল্লিশ চক্র নামে দল গঠন করেন তুর্কি দাস নিয়ে। ভারতে মুসলমান শাসকদের মধ্যে তিনি প্রথম মুদ্রা প্রচলন করেন। তিনি কুতুবমিনারের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ইলতুতমিশের কন্যা ছিলেন সুলতানা রাজিয়া। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন দিল্লীর মসনদে আরোহণকারী প্রথম মুসলমান নারী।
সুলতানা রাজিয়া ছিলেন দাস বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ-এর সুযোগ্য কন্যা। ইলতুতমিশ তাঁর পুত্রদের অযোগ্যতা বিবেচনা করে রাজিয়াকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান, যা ছিল তৎকালীন সময়ে একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। ১২৩৬ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি 'সুলতানা' উপাধি গ্রহণ করেন (যদিও তিনি নিজেকে 'সুলতান' বলতেই পছন্দ করতেন)। তিনি একজন দক্ষ যোদ্ধা এবং দূরদর্শী শাসক ছিলেন। পর্দার অন্তরালে না থেকে তিনি পুরুষের পোশাক পরিধান করে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে এবং রাজদরবারে উপস্থিত হতেন। প্রশাসনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি তুর্কি অভিজাতদের (চল্লিশ চক্র বা বন্দেগান-ই-চাহেলগান) একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করার চেষ্টা করেন। তিনি অ-তুর্কি জাবাশী ক্রীতদাস জালালুদ্দিন ইয়াকুতকে উচ্চপদে আসীন করলে তুর্কি আমিররা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। বিদ্রোহী নেতা আলতুনিয়ার কাছে পরাজিত হয়ে তিনি বন্দি হন, কিন্তু কৌশলে আলতুনিয়াকে বিবাহ করে পুনরায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। তবে ১২৪০ সালে কৈথালের কাছে এক যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সুলতান নাসিরউদ্দিন অত্যন্ত ধর্মভীরু লোক ছিলেন। সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনের জন্য তিনি ফকির বাদশাহ নামে পরিচিত। তিনি কুরআনের প্রলিপি ও টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
নাসির উদ্দিন মাহমুদ ছিলেন সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের কনিষ্ঠ পুত্র। তিনি দিল্লির সিংহাসনে প্রায় ২০ বছর রাজত্ব করেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি ছিলেন একজন নামমাত্র শাসক বা 'পুতুল সম্রাট'। শাসনের প্রকৃত ক্ষমতা ছিল তাঁর প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান সেনাপতি গিয়াসউদ্দিন বলবনের হাতে। নাসির উদ্দিন মাহমুদ তাঁর অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনের জন্য ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। প্রচলিত আছে যে, রাজকোষ থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ না করে তিনি কুরআন নকল করে এবং টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এ কারণে তাঁকে অনেক সময় 'দরবেশ সুলতান' বা 'ফকির সুলতান' হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর সময়ে শাসনকার্যে বলবনের একক আধিপত্যের কারণে তুর্কি অভিজাতদের (চল্লিশ চক্র) মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, যা দমন করার দায়িত্ব বলবনই অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করেন। ১২৬৬ সালে সুলতানের মৃত্যুর পর তাঁর কোনো উত্তরাধিকারী না থাকায় বলবন নিজেই দিল্লির সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেন।
সুলতান গিয়াসউদ্দিন বিদ্যোৎসাহী ও গুণীজনের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। শান্তি শৃঙ্খলার জন্য 'রক্তপাত ও কঠোর নীতি' (Blood & Iron Policy) অবলম্বন করেন। 'মহান শাসক' উপাধি লাভ করেন তিনি। "ভারতের তোতা পাখি' (বুলবুল-ই-হিন্দু) নামে পরিচিত আমীর খসরু বলবনের দরবার অলংকৃত করতেন।
গিয়াসউদ্দিন বলবন ছিলেন দিল্লি সালতানাতের দাস বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং কঠোরতম শাসক। তিনি সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০ বছর এবং পরবর্তীতে সুলতান হিসেবে ২১ বছর শাসন করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল সুলতানের মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং বিশৃঙ্খলা দমন করা। তিনি অত্যন্ত কঠোর হস্তে তুর্কি অভিজাতদের শক্তিশালী সংগঠন 'চল্লিশ চক্র' (বন্দেগান-ই-চাহেলগান) ধ্বংস করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সুলতান হলেন পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি (জিলুল্লাহ), তাই তিনি দরবারে 'সিজদা' (সুলতানকে মাথা নত করে অভিবাদন) এবং 'পায়বোস' (সুলতানের পদচুম্বন) প্রথা প্রবর্তন করেন। অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষায় তিনি একটি অত্যন্ত দক্ষ ও শক্তিশালী গোয়েন্দা বাহিনী গঠন করেন এবং 'রক্ত ও লৌহ নীতি' (Blood and Iron Policy) অনুসরণের মাধ্যমে মেওয়াটি দস্যু ও বিদ্রোহ দমনে চরম কঠোরতা প্রদর্শন করেন। তাঁর সময়েই বাংলার সুবাদার তুঘরিল খাঁ বিদ্রোহ করলে বলবন নিজে বাংলায় এসে বিদ্রোহ দমন করেন।
