নিদানং
১. যসানুভাবতো যা নেব দসেস্তি ভিংসনং, যমহি চেবানুযুঞ্জন্তো রত্তিং দিবমতন্দিতো।
২. সুখং সুপতি সুত্তো চ পাপং কিঞ্চিং ন পস্সতি, এবমাদি গুণোপেতং পরিত্তং তং ভণাম হে।
সুত্তং
১. করণীযমত্থকুসলেন যন্তং সন্তং পদং অভিসমেচ্চ, সক্কো উজু চ সুজু চ সুবচো চস্স মৃদু অনতিমানী।
২. সন্তুস্সকো চ সুভরো চ অস্পকিচেচাচসল্লহুকবুত্তি সন্তিন্দ্রিযো চ নিপকো চ অপগক্কো কুলেসু অননুগিন্ধো।
৩. ন চ খুদ্দং সমাচারে কিঞ্চি যেন বিষ্ণু পরে উপবদেয্যুং সুখিনো বা খেমিনো হোন্তু সব্বে সত্তা ভবন্তু সুখিতত্তা।
8. যে কেচি পানা ভূতথি তসা বা থাবরা বা অনবসেসা, দীঘা বা যে মহন্তা বা মঝিমা রসকানুকথুলা।
৫. দিষ্ঠা বা যেব অদিষ্ঠা যে চ দূরে বসন্তি অবিদূরে, ভূতা বা সম্ভবেসী বা সব্বে সত্তা ভবন্তু সুখিতত্তা।
৬. ন পরো পরং নিকুব্বেথ, নাতিমঞথ কথচি নং কিঞ্চি ব্যারোসনা পটিঘসঞা নাঞঞমঞঞস দুখমিচ্ছেয্য।
৭. মাতা যথা নিযং পুত্তং আযুসা একপুত্তমনুরক্সে, এবম্পি সব্বভূতেসু মানসং ভাবযে অপরিমাণং।
৮. মেত্তঞ্চ সব্বলোকস্মিং মানসং ভাবযে অপরিমাণং, উদ্ধং অধো চ তিরিযঞ্চ অসম্বাধং অবেরমসপত্তং।
৯. তিষ্ঠং চরং নিসিন্নো বা সযনো বা যাবত বিগতমিদ্ধো, এতং সতিং অধিয্যে ব্রহ্মমেতং বিহারমিধমাতুহু।
১০. দিঠিঞ্চ অনুপগম্ম সীলবা দসনেন সম্পন্নো, কামেসু বিনেয্য গেধং নহি জাতু গল্পসেয্যং পুনরেতী'তি।
শব্দার্থ
যং তং সন্তং পদং - সেই যে শান্ত নির্বাণ পদ্ আছে; তং অভিসমেচ্চ - সেই পদ জ্ঞাত হয়ে; অথকুসলেন করণীযং - তা লাভেচ্ছুর কর্তব্য; সক্কো - দক্ষ; উজু জ্জ ঋজু; সুজু - অকুটিল; সুবচো - মিষ্টভাষি; মুদু - মৃদু; অনতিমানী চ অসূস - নিরভিমান হবে; সন্তুস্সকো - সন্তুষ্ট চিত্ত; সুভরো - সুখপোষ্য; অপকিচ্চো - অল্পকৃত্য; সল?হ্রককুত্তি - সংলঘুক বৃত্তি, অল্পে তুষ্ট হওয়া; সন্তিন্দ্রিযো - শান্তেন্দ্রিয়; নিপকো - প্রজ্ঞাবান; অস্পগন্ধা - অপ্রগল্প; কুলেসু অননুগিন্ধো - গৃহস্থদের প্রতি অনাসক্ত; ন চ কিঞ্চি খুদ্দং সমাচরে - কোন কিছু হীন আচরণ করবে না; যেন পরে বিষ্ণু উপবদেয়্যুং - যা দ্বারা অপর বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ অপবাদ করতে পারেন; সব্বে সত্তা - সকল প্রাণী; সুখিনো - সুখি; সুখিতত্তা ভবস্তু - সুখি হোক, সন্তুষ্টচিত্ত হোক; যে কেচি অনবসেসা - যে সমুদয়; তসা - তৃষ্ণাযুক্ত; থাবরা - তৃষ্ণা ও ভয়হীন; দীঘা - দীর্ঘ; মহন্তা - মহৎ; মজঝিমা - মধ্যমাকৃতি; রসকা - হ্রষা শরীরধারী; অণুকা - ক্ষুদ্রশরীর বিশিষ্ট; থুলা - খুল; পাণা ভূত'থি - জীব আছে; যে চ দিঠা - যে সমুদয় দৃষ্ট; যে চ অদিঠা - যে সমুদয় অদৃষ্ট; যে চ দূরে অবিদুরে বা বসন্তি - যারা দুরে বা নিকটে বাস করে; ভূতা - যারা জন্মেছে; সম্ভবেসী - যারা জন্মাবে; নহিজাতু - জন্মগ্রহণ করেন না; ন পরো পরং - একে অপরকে; নিকুব্বেথ - বঞ্চনা করবে না; কথচি নং কিঞ্চি নাতিমঞেথ - কাউকে অবজ্ঞা করবে না; ব্যারোসনা পটিঘসঞা - কায়মানোবাক্যের বিকৃতিবশত ক্রোধ উৎপাদন করে; অঞো অঞস - একে অপরকে; ন ইচ্ছেয্য - ইচ্ছা করবে না; নিযং স্বীয়; একপুত্তং - একমাত্র পুত্রকে; আযুসা - আয়ু দ্বারা; অনুরত্বে - রক্ষা করে; সব্বভূতেসু - সকল জীবের প্রতি; এবম্পি - এরূপ; অপরিমাণং - অপ্রমেয়; মানসং ভাবযে - মৈত্রী ভাবনা করবে; উদ্ধং অধো চ - ওপরে ও নিচে; তিরিযঞ্চ - তির্যকভাবে; সব্বলোকসিং - সর্বত্র; অসম্বাধং ভেদজ্ঞান রহিত; অবেরং - বৈরিতাহীন, শত্রুতাহীন; তিষ্ঠং - স্থিত অবস্থায়; চরং - বিচরণ করতে করতে; নিসিন্নো বা - উপবিষ্ট অবস্থায়; সযনো বা শায়িত অবস্থায়; যাবতা - যতক্ষণ; বিগতমিদ্ধো অস - মানসিক অলসতা বিগত হয়; এতং সতিং অধিয্যে - এ স্মৃতি অধিষ্ঠান করবে; ইদং ব্রহ্মবিহারমাহ্র - একে ব্রহ্মবিহার - বলে। দিঠিঞ্চি অনুপগস্ম - মিথ্যাদৃষ্টি পরিত্যাগ পূর্বক; সীলবা দস্সনেন সম্পন্না - শীলবান ও সম্যকদৃষ্টিসম্পন্ন - আর্যশ্রাবক; কামেসু - কামের প্রতি; গেধং বিনেয্য - লিপ্সা বিদূরিত করে; গর্ভসেয্যং - গর্ভাশয়; পুনরেতি - পুনরায় আসেন না।
করণীয় মৈত্রী সূত্রের ভূমিকা
এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অবস্থান করছিলেন। তখন বর্ষাবাসের প্রাক্কালে পাঁচশত ভিক্ষু ভগবানের নিকট থেকে কর্মস্থান গ্রহণ করেন। তারপর হিমালয়ের পাদদেশে মনোরম স্থানে বর্ষাবাস আরম্ভ করেছিলেন। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে ভিক্ষাচরণ করে তাঁরা নির্বিঘ্নে শ্রামণ্যধর্ম পালন করছিলেন। নির্মল বায়ু সেবনে ও নিয়মিত ধর্মাচরণে তাঁদের শরীর ও মন প্রফুল্ল হয়েছিল। সেখানে বহু বৃক্ষদেবতা বাস করতেন। ভিক্ষুগণের শীলতেজে তাঁরা স্ব স্ব স্থানে অবস্থান করতে পারছিলেন না। ফলে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে ইতঃস্তত পরিভ্রমণ করছিলেন। ভিক্ষুগণ কখন সেই স্থান পরিত্যাগ করে যাবেন অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু বর্ষাবাস শেষ না করে তাঁরা স্থান ত্যাগ করবেন না বুঝতে পেরে বৃক্ষদেবতাগণ উৎপাত শুরু করেন। তাঁরা রাতে বিরাট আকৃতি ধারণ করে ভিক্ষুদের কাছে এসে চীৎকার করতেন। চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়াতেন। তাঁদের উৎপাতে ভিক্ষুদের শীলের ব্যাঘাত ঘটল। মানসিক দুশ্চিন্তায় তাঁদের শরীর কৃশ হল।
অতঃপর সকল ভিক্ষু পরামর্শ করে এর প্রতিকারের জন্য শ্রাবস্তীতে ভগবান বুদ্ধের নিকট উপস্থিত হলেন। বুদ্ধ তাঁদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন-'ভিক্ষুগণ, তোমরা কেন বর্ষাবাসের মধ্যে দেশভ্রমণ করছ? বর্ষাবাসে দেশভ্রমণ বিধিবদ্ধ নয়। তখন ভিক্ষুগণ তাঁদের অসুবিধার কথা ভগবানকে জানালেন। বুদ্ধ তাঁদেরকে পুনরায় সেস্থানে যাবার জন্য আদেশ দিলেন। অতঃপর তাঁদেরকে মৈত্রীসূত্র শিক্ষা দিয়ে বললেন-'এটাই তোমাদের পরিত্রাণ ও কর্মস্থান হবে।' ভিক্ষুরা পুনরায় সেস্থানে গিয়ে সেই পরিত্রাণ ভাবনা আরম্ভ করলেন। সেই পরিত্রাণের প্রভাবে ভিক্ষুগণ পুনরায় শীলতেজ প্রাপ্ত হলেন। বৃক্ষদেবতাগণও তাঁদের প্রতি মৈত্রীভাবাপন্ন হলেন।
সেজন্য করণীয় মৈত্রী সূত্রের ভূমিকায় বলা হয়েছে:
১. যে পরিত্রাণের প্রভাবে যক্ষগণ ভয় দেখাতে পারেন না, সেই সূত্র দিন রাত আলস্যহীন হয়ে ভাবনা করবে।
২. মৈত্রী সূত্র ভাবনাকারী সুখে নিদ্রা যায়। কোন কুস্বপ্ন দেখেন না।
এরূপ গুণযুক্ত পরিত্রাণ আমি তোমাদের উদ্দেশ্যে পাঠ করব।
করণীয় মৈত্রী সূত্রের সারমর্ম
সাধকের মূল লক্ষ্য হবে নির্বাণ লাভ। তিনি সরল, শান্তস্বভাব ও অভিমানশূন্য হবেন। চঞ্চলতা পরিহার করে সাংসারিক জীবনের প্রতি অনাসক্ত হবেন। কোন পাপ কাজ করবেন না। ছোট-বড় সকল প্রাণীর প্রতি সর্বদা মৈত্রী চিত্তে অবস্থান করবেন। অল্পে তুষ্ট, শান্তেন্দ্রিয় ও প্রজ্ঞাবান হবেন।
বঞ্চনা, অবজ্ঞা, ক্রোধ ও হিংসার বশবর্তী না হয়ে সকলের সুখ কামনা করাই ভাবনাকারীর একান্ত কর্তব্য। মা যেমন তার একমাত্র ছেলেকে নিজের জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করেন, অনুরূপভাবে সাধকও শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ না রেখে সকলের প্রতি মৈত্রীভাবনা করবেন। স্থিত অবস্থায়, হাঁটতে হাঁটতে, উপবেশন অবস্থায়, শয়নে যতক্ষণ নিদ্রা যাবে না, ততক্ষণ এ স্মৃতি করবে। এর নাম 'ব্রহ্মবিহার'। মৈত্রীভাবনার মাধ্যমে যাঁরা কমপক্ষে স্রোতাপত্তি ফল লাভ করেন; তাঁদের ভোগ ও কামলালসা বিদূরিত হয়। তাঁরা এ পৃথিবীতে পুনরায় জন্মগ্রহণ করেন না। ব্রহ্মলোকে উৎপন্ন হয়ে সেখান থেকে নির্বাণ লাভ করেন।
টীকা
খুদ্দক পাঠ
খুদ্দক নিকায়ের প্রথম গ্রন্থ হল খুদ্দকপাঠ। 'ক্ষুদ্র পাঠ', 'অল্পতর পাঠ'- এ অর্থে গ্রন্থটির নামকরণ হয়েছে। নয়টি বিষয়বস্তু নিয়ে গ্রন্থটি সংকলিত হয়। যেমন সরণত্তযং, দসসিক্যাপদং, দ্বাত্তিংসাকারো, কুমারপঞহা, মঙ্গল সুত্তং, রতন সুত্তং, তিরোকুড্ সুত্তং, নিধিকন্ড সুত্তং ও করণীয় মেত্ত সুত্তং।
ত্রিশরণ গ্রহণ ও দশশীল পালন শ্রামণদের নিত্যকর্ম। মানবদেহের ৩২টি অংশ নিয়ে 'দ্বাত্তিংসাকার'- অনিত্যভাবনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেহের ক্ষণস্থায়িত্ব বোঝাতে এবং এর প্রতি ঘৃণার উদ্রেক করার জন্যই এই পাঠ। চতুর্থ অংশ কুমার প্রশ্নে বৌদ্ধধর্মের মূল ধর্ম-দর্শন আলোচিত হয়েছে। পরবর্তী পাঁচটি সূত্র মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠান, ত্রিরত্ন, প্রকৃত সম্পদ প্রভৃতি নিয়ে বর্ণিত। গ্রন্থটি শিক্ষানবিসদের শিক্ষার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
মেত্তা
জীবন সাধনার পরিপূর্ণতায় মেত্তা বা মৈত্রী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৈত্রী সাধনা দ্বারা মানুষ ইহজীবনে অস্থির মনকে শান্ত করে লক্ষ্যস্থলে সহজে পৌছতে পারে। শুধু আধ্যাত্মিক জীবনে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও এর অনুশীলন একান্ত প্রয়োজন। অনাবিল সুখ-শান্তির একমাত্র পথ। মনে সর্বক্ষণ মৈত্রীভাব পোষণ করা পূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকাশের প্রকৃষ্টতম উপায়। চিত্ত ও মনে মৈত্রীভাব পোষণ করে ভাবনা করার নাম 'ব্রহ্মবিহার'। সাধনার সেই চারটি স্তর হল মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা। সুতরাং, মৈত্রী হল বৌদ্ধ সাধনার প্রথম সতর। সাধক মনের উত্তেজনা ও হিংসাভাব বিদূরিত করে সুখে-শান্তিতে অবস্থান করেন।
মা যেমন তাঁর একমাত্র ছেলেকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেন, তদ্রুপ সকল প্রাণীর প্রতি প্রেম বিতরণের নামই মৈত্রী। এ প্রেম মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক মধুর করে এবং পরিবেশকে বিশুদ্ধ রাখে। মৈত্রী ভাবনা দ্বারা আত্ম-পর ভেদজ্ঞান লোপ পায়। সাধক সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী প্রসারিত করে শত্রুহীন, ভয়হীন ও বেদনাহীন হয়ে পরিপূর্ণ উদার মন নিয়ে অবস্থান করেন।
যিনি শত্রু-মিত্রের মধ্যস্থ ও আপনার মধ্যে বিভেদ দেখেন না তিনিই মৈত্রী ভাবনায় সফল হন। তিনি মনুষ্য-অমনুষ্য সকলের প্রিয়ভাজন হন। সুখে শয়ন করেন। দেবতা তাঁকে রক্ষা করেন। অগ্নি তাঁকে দহন করে না। শত্রু তাঁকে আক্রমণ করে না। তাঁর চিত্ত সমাহিত হয়। তিনি মৃত্যুকালে সজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করেন। আর্যমার্গ ফল লাভ করে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন। পুনরায় জন্মগ্রহণ করেন না। নির্বাণ সাক্ষাৎ করে বিমুক্ত হন।