তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১৩)

বাংলাদেশ বিষয়াবলী - সাধারণ জ্ঞান -

4.2k
তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১৩ খ্রি:)

১৩১৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দীন খলজীর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর মাত্র চার বছরের মধ্যে খলজী বংশের অবসান ঘটে। এই বংশের শেষ সুলতান কুতুবউদ্দীন মুবারককে হত্যা করে খসরু মালিক নামক একজন আমীর ক্ষমতা দখল করেন। জন্মসূত্রে তিনি নিম্নবর্ণের হিন্দু। সিংহাসনে বসার পরও তিনি নীচ-স্বভাব ও মনোবৃত্তি ত্যাগ করতে পারেন নি। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি অপ্রিয় হয়ে পড়েন। তাঁর অত্যাচার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমীরগণ ঐক্যবদ্ধ হন। পাঞ্জাবের শাসনকর্তা গাজী মালিক এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে খসরু মালিক পরাজিত ও নিহত হন। আমীরদের বিশেষ অনুরোধে গাজী মালিক সিংহাসনে বসতে রাজী হন। সিংহাসনে বসার সময় তিনি গিয়াসউদ্দীন তুঘলক উপাধি গ্রহণ করেন। এভাবে তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। গিয়াসউদ্দীন তুঘলক, মুহম্মদ বিন-তুঘলক এবং ফিরোজশাহ তুঘলক এই বংশের তিনজন বিখ্যাত সুলতান। মুহম্মদ বিন-তুঘলকের পরিকল্পনাসমূহ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। ফিরোজশাহ তুঘলক জনপ্রিয় সুলতান ছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থাকে 'মাতামহীসুলভ শাসনব্যবস্থা' বলা হয়। ফিরোজশাহ তুঘলকের শাসনামল থেকেই তুঘলক বংশের পতন শুরু হয়। তৈমুর লং ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত আক্রমণ করেন। তাঁর আক্রমণের ফলে তুঘলক বংশের জীবন প্রদীপ এক ফুৎকারে নিভে যায়। তুঘলক আমলে স্থাপত্যশিল্পের যথেষ্ট উন্নতি ঘটে। এ যুগে ইতিহাস, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, ভ্রমণকাহিনী প্রভৃতি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বহু গ্রন্থ রচিত হয়।

Content added By

তুঘলক সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল গিয়াসউদ্দিন তুগলকের মাধ্যমে। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে মুহাম্মদ বিন তুগলক ক্ষমতায় আসীন হন। তিনিই তুগলক সাম্রাজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছিলেন। তারপরও মুহাম্মদ বিন তুগলক তা দূর্বল রাজ্যনীতি, অসহিঞ্চুতা এবং রহস্যময় আচরনের কারণে সমালোচিত ছিলেন। তাই বাংলা এবং উর্দুতে তুগলকি কান্ড বলতে আজব এবং অবান্তর কান্ড-কারখানাকে বুঝায়।

Content added By

মুহম্মদ বিন তুগলক (১৩২৫-১৩৫১ খ্রি.) রাজ্য শাসনের প্রত্যক্ষ অসুবিধা দূর করার জন্য কেন্দ্রীয় রাজধানী দিল্লি থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর করেন। তিনি সোনা ও রূপার মুদ্রার পরিবর্তে প্রতীক তামার মুদ্রা প্রচলন করে মুদ্রামান নির্ধারণ করে দেন। মুহম্মদ বিন তুগলক কৃষির উন্নয়নের জন্য 'দিওয়ান-ই-কোহী' নামে স্বতন্ত্র কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন 'আমির কোহী'।

মুহম্মদ বিন তুঘলক অত্যন্ত প্রতিভাবান ও শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন।তিনি রাজধানী দিল্লি থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর করেন। উত্তর ভারতে মঙ্গলদের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় তিনি রাজধানী দিল্লিতে ফেরত আনেন।তিনি সোনা ও রূপার মুদ্রার পরিবর্তে প্রতীক তামার মুদ্রা প্রচলন করেন। তিনি কৃষির উন্নয়নে প্রতিষ্ঠা করেন দেওয়ান-ই- কোহি নামে কৃষিবিভাগ।

গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জুনা খাঁ 'মোহাম্মদ বিন তুঘলক' নাম ধারণ করে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তিনি একাধারে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর শাসনকাল ছিল দুঃসাহসিক সব প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রচেষ্টায় ভরপুর। তবে বাস্তবজ্ঞানের অভাব, অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পারিপার্শ্বিক অসহযোগিতার কারণে তাঁর অধিকাংশ পরিকল্পনা হিতে বিপরীত হয়। তাঁর সময়েই দিল্লি সালতানাত ভৌগোলিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছিল, কিন্তু তাঁর শাসনকালেই আবার বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহের মাধ্যমে সালতানাত ভাঙতে শুরু করে। বিখ্যাত মরক্কান পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর সময়েই ভারতে আসেন এবং আট বছর দিল্লির কাজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিফল হওয়া ৫টি প্রধান পরিকল্পনাঃ

১. রাজধানী পরিবর্তন (১৩২৭ খ্রি.): মঙ্গোল আক্রমণ থেকে বাঁচতে এবং দক্ষিণ ভারত শাসনের সুবিধার্থে তিনি রাজধানী দিল্লি থেকে ৭০০ মাইল দূরে দেবগিরিতে (নাম পরিবর্তন করে রাখেন দৌলতাবাদ) স্থানান্তর করেন। দিল্লির পুরো জনবসতিকে সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দিলে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে। পরে ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি পুনরায় দিল্লিতে ফিরে আসেন।

২. প্রতীকী তাম্র মুদ্রার প্রচলন (১৩২৯ খ্রি.): সোনা ও রূপার অভাব মেটাতে তিনি তামার তৈরি 'প্রতীকী মুদ্রা' (Token Currency) চালু করেন, যার মান রূপার মুদ্রার (তঙ্কা) সমান ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় মানুষ ঘরে ঘরে তামা দিয়ে জাল মুদ্রা তৈরি শুরু করে, যা অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় নিয়ে আসে।

৩. দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি: গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী উর্বর দোয়াব অঞ্চলে তিনি কর বৃদ্ধি করেন। দুর্ভাগ্যবশত তখন সেখানে দুর্ভিক্ষ চলছিল। কৃষকরা কর দিতে না পেরে বিদ্রোহ শুরু করলে তিনি কঠোর হস্তে তা দমন করেন।

৪. খোরাসান অভিযান: পারস্যের খোরাসান জয়ের নেশায় তিনি ৩ লক্ষ ৭০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করেন এবং তাদের এক বছরের অগ্রিম বেতন দেন। কিন্তু পরে রাজনৈতিক সমীকরণে যুদ্ধ না হওয়ায় রাজকোষের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

৫. কারাজল অভিযান: হিমালয়ের পাদদেশে কুমাউনের উপজাতি দমনের জন্য তিনি বিশাল বাহিনী পাঠান। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ভৌগোলিক কারণে এই অভিযানে তাঁর প্রায় সব সৈন্য মারা যায়।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

মাহমুদ শাহ এর দুর্বলতার সুযোগে ১৩৯৮ সালে তৈমুর ভারত আক্রমণ করে দিল্লি অধিকার করেন। তৈমুর ছিলেন মধ্য এশিয়ার সমরকন্দের অধিপতি। শৈশবে তাঁর একটি পা খোড়া হয়ে যায় বলে তিনি তৈমুর লঙ নামেও অভিহিত। তার পিতার নাম আমির তুরঘাই।

তুঘলক বংশের শেষ সুলতান ছিলেন মাহমুদ শাহ। ১৩৯৮ সালে তৈমুর ভারত আক্রমণ করেন মাহমুদ শাহ এর আমলে। বিখ্যাত তুর্কি বীর তৈমুর ছিলেন মধ্য এশিয়ার সমরকদের অধিপতি। শৈশবে তাঁর একটি পা খোড়া হয়ে যায় বলে তিনি তৈমুর লঙ নামে পরিচিত।

নিচে তাঁদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হলো:

১. সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫–১৪৫৯)

তিনি বাংলার পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং অত্যন্ত সফল একজন শাসক ছিলেন।

  • বংশ পুনরুদ্ধার: রাজা গণেশ ও তাঁর বংশধরদের শাসনের পর তিনি ইলিয়াস শাহী বংশের গৌরব পুনরায় উদ্ধার করেন।

  • রাজধানী পরিবর্তন: তিনি পান্ডুয়া থেকে রাজধানী পুনরায় গৌড়ে স্থানান্তর করেন।

  • খান জাহান আলীর সমসাময়িক: বিখ্যাত সেনাপতি ও সাধক খান জাহান আলী তাঁর রাজত্বকালেই দক্ষিণ-বঙ্গে (বাগেরহাট) খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

  • স্থাপত্য: তাঁর সময়ে গৌড়ের বিখ্যাত 'ষাট গম্বুজ মসজিদ' (খান জাহান আলী কর্তৃক), 'নিন্টু গম্বুজ মসজিদ' ও 'দারাসবাড়ি মসজিদ' নির্মিত হয়।

  • বিখ্যাত উপাধি: তাঁকে 'খলিফাতুল্লাহ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

২. সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩–১৫৩৮)

তিনি ছিলেন বাংলার হোসেন শাহী বংশের সর্বশেষ সুলতান।

  • ক্ষমতা হারানো: তাঁর শাসনামলেই বিখ্যাত আফগান নেতা শেরশাহ সূরী বাংলা আক্রমণ করেন।

  • মুঘল সংযোগ: শেরশাহের আক্রমণ থেকে বাঁচতে তিনি মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সাহায্য চেয়েছিলেন।

  • ইতিহাসের মোড়: ১৫৩৮ সালে শেরশাহের কাছে তাঁর পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের (২০০ বছরের স্বাধীনতা) অবসান ঘটে এবং বাংলা মুঘল ও আফগান দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।

৩. সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ (দিল্লি সালতানাত)

ইনি ছিলেন দিল্লির দাস বংশের শাসক (১২৪৬-১২৬৬), যাঁর সম্পর্কে আপনি আগে জেনেছেন। তাঁকে 'দরবেশ সুলতান' বলা হতো এবং তাঁর নামেই 'তাবাকাত-ই-নাসিরি' গ্রন্থটি রচিত।

Content added By
Content updated By

খানজাহান আলী ছিলেন একজন মুসলিম ধর্মপ্রচারক। খানজাহান আলীর উপাধি উল্লুগ খান খান-ই-আজম। খান জাহান আলী তুঘলক সেনাবাহিনীতে সেনাপতির পদে যোগদান করেন- ১৩৮৯ সালে। তিনি রাজা গণেশকে পরাজিত করে বাংলার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন। তিনি বাগেরহাট জেলায় বিখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদ (১৪৩৫-১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ) নির্মাণ করেন। মসজিদের নাম ষাট গম্বুজ হলেও মসজিদে গম্বুজ মোট ৮১টি তবে মসজিদের ভিতরে ষাটটি স্তম্ভ আছে। এটি বাংলাদেশের মধ্যযুগের সবচেয়ে বড় মসজিদ। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে।

১. পরিচয় ও শাসনকাল

খান জাহান আলী ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত একজন সেনাপতি এবং সুফি সাধক। তিনি সুলতানি আমলে (বিশেষ করে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে) দক্ষিণ-বঙ্গ বা ভাটি অঞ্চল জয় ও শাসন করার জন্য প্রেরিত হন। তিনি মূলত ১৫শ শতাব্দীতে বর্তমান বাগেরহাট অঞ্চল শাসন করেছিলেন।

২. খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা

তিনি দক্ষিণ-বঙ্গে সুন্দরবনের কাছাকাছি একটি সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে তোলেন, যার প্রশাসনিক নাম ছিল 'খলিফাতাবাদ'। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলা। তিনি এই দুর্গম এলাকাকে পরিষ্কার করে চাষযোগ্য ভূমি এবং বসবাসের উপযোগী করে তোলেন।

৩. স্থাপত্য শিল্প ও ইউনেস্কো স্বীকৃতি

খান জাহান আলী তাঁর স্থাপত্যশৈলীর জন্য অমর হয়ে আছেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত নির্মাণ হলো বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ

  • ষাট গম্বুজ মসজিদ: এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম মসজিদ। মজার বিষয় হলো, এর নাম 'ষাট গম্বুজ' হলেও এতে মোট গম্বুজ আছে ৮১টি (৭৭টি মূল গম্বুজ এবং ৪টি কর্নার টাওয়ারের গম্বুজ)।

  • ইউনেস্কো মর্যাদা: ১৯৮৫ সালে বাগেরহাটের এই মসজিদ শহরকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য (World Heritage Site) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

৪. জনহিতকর কাজ (রাস্তা ও দিঘি)

তিনি কেবল শাসনকর্তা ছিলেন না, বরং একজন দক্ষ প্রকৌশলীও ছিলেন। তাঁর আমলে তৈরি হওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ:

  • খান জাহান আলী রোড: তিনি খুলনা থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত একটি দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন।

  • দিঘি: সুপেয় পানির অভাব মেটাতে তিনি অসংখ্য দিঘি খনন করেন। এর মধ্যে বিখ্যাত হলো খাঁজালি দিঘি এবং ঘোড়া দিঘি। খাঁজালি দিঘিতে 'কালাপাহাড়' ও 'ধলাপাহাড়' নামে দুটি কুমির ছিল বলে লোককথা প্রচলিত আছে।

৫. মৃত্যু ও মাজার

১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে এই মহান সাধক মৃত্যুবরণ করেন। বাগেরহাটে তাঁর সমাধি বা মাজার অবস্থিত। তাঁর কবরের গায়ে খোদাই করা লিপি থেকে তাঁর জীবনকাল ও শাসন সম্পর্কে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়।

Content added By
Content updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...