মালুঙ্ক্যপুত্তো থেরো
মনুজম্স পমত্তচারিনো তণহা বড়তি মালুবা বিষ,
সো পল্লবতি হুরাহুরং ফলমিচ্ছং'ব বনস্মিং বানরো।
যং এসা সহতে জম্মী তণহা লোকে বিসত্তিকা,
সোকা তস পবন্তি অভিবটুং'ব বীরণং।
যো বে তং সহতে জম্মিং তহং লোকে দুরচ্চযং,
সোকা তম্হা পপতন্তি উদবিন্দু'ব পোখরা।
তং বো বদামি ভদ্দং বো যাবন্তেথ সমাগতা,
তহায মূলং খনথ উসীরখো'ব বীরণং।
মা বো নলং'ব সেতো'ব মারো ভঞ্জি পুনপুনং,
করোথ বুদ্ধবচনং খণো বো মা উপচ্চগা।
খণা তীতা হি সোচন্তি নিরযাহ সমষ্পিতা, পমাদো রজো,
পমাদানুপতিতো রজো;
অপমাদেন বিজ্ঞায অব্বহে সল্লমত্তনো'তি।
শব্দার্থ
মনুজম্স - মানুষের; পমত্তচারিণো - প্রমত্তচারী; তণহা - তৃষ্ণা; মালুবা - মালুলতা, পত্রলতা (যে লতা অন্য বৃক্ষকে ধ্বংস করে); বিষ - মত, ন্যায়; বড়তি - বর্ধিত হয়; পল্লবতি - ধাবিত হয়; ফলমিচ্ছং'ব - ফলের প্রত্যাশায়; হুরাহুরং - এক স্থান থেকে অন্যস্থানে; বনস্মিং - বনে; বিসত্তিকা - বিষতুল্য; জম্মী - হীন, নিচ; সোকা - শোকসমূহ। বীরণ - বীরণতৃণ, বেণা বা খড় থেকে যে তৃণ জন্মে; সহতে - অভিভূত হয়, সহ্য হয়; উদবিন্দু'ব বৃষ্টির জলের ন্যায়; দূরচযং - দুরতিক্রম্য; অতিক্রম করা কষ্টসাধ্য; পবতি - প্রকৃষ্টরূপে বৃদ্ধি পায়; পপতন্তি - পড়ে যায়; পোখরা - পদ্ম; তং বো বদামি - সেই কারণে বলছি; যাবস্তেথ সমাগতা - যারা এখানে সমাগত হয়েছে; তহায মূলং - তৃষ্ণার মূল; খণথ - খনন কর; উসীরখো'ব বীরণং - বীরণ তৃণকে কোদাল দ্বারা; নলং'ব সেতো'ব - নদী তীরে জাত - নলবনকে নদীস্রোত যেমন; ভক্তি - ভেঙ্গে ফেলে; পুনপুনং - বারবার; করোথ - করবে; উপচ্চগা - অতিক্রম কর; খণাতীতা - সুক্ষণকে যারা অতিক্রম করে; নিরযাহ সমষ্পিতা - নিরয়ে পতিত হয়; পমাদানুপতিতো - প্রমাদের বশবর্তী হয়ে; সল্লমত্তনো - কামরাগাদি শল্যসমূহ (প্রতিবন্ধক)।
সারমর্ম
প্রমত্তচারী ব্যক্তির তৃষ্ণা মালুব লতার ন্যায় বৃদ্ধি পায়। বানর ফল লাভের আশায় বৃক্ষ থেকে বৃক্ষান্তরে গমন করে। তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিও ভব থেকে ভবান্তরে ধাবিত হয়। বিষতুল্য বিষাক্ত তৃষ্ণা যে ব্যক্তিকে অভিভূত করে তার শোক ক্রমেই বর্ধিত হয়। যিনি হীন তৃষ্ণা ধ্বংস করেন, তাঁর শোকসমূহ পদ্মপত্র থেকে জলবিন্দু পতনের ন্যায় দূরীভূত হয়।
সেই কারণে মালুঙ্ক্যপুত্র স্থবির উপস্থিত সবাইকে অপ্রমত্ত হয়ে তৃষ্ণার বিনাশসাধন করতে বলেছিলেন। কৃষকেরা বীরণ তৃণকে কোদাল দ্বারা খনন করেন। সেরূপ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা অর্হৎমার্গরূপ প্রজ্ঞাকোদাল দিয়ে অবিদ্যাদি ক্লেশরাশিকে ছেদন করেন।
মারের রাজ্য অতিক্রম করার জন্য বুদ্ধবচন যথানিয়মে সম্পাদন করেন। যে বুদ্ধবচন রক্ষা করে না, সে সমস্ত সুক্ষণ অতিক্রম করে। তারা নিরয়ে পতিত হয়ে শোকার্ত হয়। দুঃখভোগ করে। প্রমাদ জন্মান্তর বৃদ্ধি করে। অপ্রমাদ ও মার্গফলরূপ বিদ্যা হৃদয়ে আশ্রিত কামরাগাদির মূল উৎপাটন করে।
টীকা
মালুঙ্ক্যপুত্ত থের
তিনি পূর্ববুদ্ধগণের আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়ে গৌতম বুদ্ধের সময় শ্রাবস্তীর কোশলরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন অগ্রাসনিক। মাতার নাম মালুঙ্ক্যা। তাই মাতার নাম অনুসারে তিনি 'মালুঙ্ক্যপুত্র' বলে পরিচিত হন।
তিনি যৌবনে গৃহত্যাগ করে পরিব্রাজক হিসেবে ঘুরে বেড়ান। পরে বুদ্ধের ধর্ম শুনে প্রব্রজিত হন এবং সহসা ষড়াভিজ্ঞ হন। জ্ঞাতিদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তিনি তাঁদের নিকট যান। জ্ঞাতিগণ ভাল খাদ্য পরিবেশন করে ধনের প্রলোভন দেখান। তারা তাঁর সম্মুখে ধনসস্তূপ স্থাপন করেন। তাঁকে চীবর ত্যাগ করে সেই ধন দিয়ে সত্রী-পুত্র প্রতিপালন পূর্বক পুণ্যকার্য সম্পাদন করতে অনুরোধ জানান। স্থবির তাঁদের অভিপ্রায় জ্ঞাত হয়ে আকাশে উপবেশন করেন। সেই সময় তিনি যে গাথাগুলো ভাষণ করেছিলেন সেগুলোই থের গাথায় লিপিবদ্ধ হয়েছে।
থের গাথা
থের গাথা খুদ্দক নিকায়ের অষ্টম গ্রন্থ। এতে বুদ্ধের সমসাময়িক ২৬৪ জন থের কর্তৃক রচিত গাথা সংকলিত হয়েছে। জ্ঞানী ও বয়োবৃদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের থের বা স্থবির বলা হয়। এ গ্রন্থে ১৩৬০টি গাথা আছে। গাথাগুলোকে ২১টি নিপাতে বিভক্ত করা হয়েছে: যেমনজ্জ একে নিপাত, দ্বিক নিপাত, তিক নিপাত ইত্যাদি। গাথার সংখ্যা অনুসারেই এটা করা হয়েছে। গাথাগুলোতে বৌদ্ধ স্থবিরদের অভিজ্ঞতা সুন্দরভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা বর্ণনা প্রসঙ্গে তাঁরা প্রকৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। বুদ্ধযুগে রচিত কাব্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে থেরগাথা অন্যতম। প্রব্রজ্যা জীবনের ঘটনা এবং লোকোত্তর জীবনের পূর্ণতা এতে সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে। তাছাড়া, বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ ও তত্ত্বগুলোর ব্যাখ্যা রয়েছে। লোভ, দ্বেষ, মোহ বর্জন করে সংসারের প্রতি অনাসক্ত হয়ে জীবনচর্চার উপদেশ রয়েছে। মেত্তা, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষার আদর্শগুলো প্রতিপন্ন করা হয়েছে। মহাজ্ঞানী সারিপুত্র, মহাঋদ্ধিমান মৌদগল্যায়ন, আনন্দ, উপালি, বঙ্গীশ, অঙ্গুলিমাল, তালপুট প্রভৃতি স্থবিরদের জীবনের গতি ও পরিণতি সকলের চিত্ত আকর্ষণ করে।