ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ধর্মীয় বিশ্বাসে অতিপ্রাকৃত শক্তির ধারণা (পাঠ ৬)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও মূল্যবোধ - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

202

প্রকৃতির অনেক ঘটনাই মানুষ তার স্বাভাবিক জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারে না। এছাড়াও রয়েছে মানুষের মৃত্যুভয় এবং বেঁচে থাকা নিয়ে অনেক ধরনের অনিশ্চয়তা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাসে এ সকল ঘটনা বা জীবন-মৃত্যু সম্পর্কে নানা ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে।

অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের চেনা জগতের বা পৃথিবীর বাইরের কোনো জগৎ সম্পর্কে ধারণা। এদের অনেকেই বিশ্বাস করে যে, অতি প্রাকৃত শক্তি ঘিরে একটা জগৎ আছে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই অতিপ্রাকৃত জগৎ নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন অতিপ্রাকৃত সত্তা বা শক্তি দ্বারা। যেহেতু মানুষ বিশ্বাস করে অতিপ্রাকৃত শক্তি বা সত্তা বেশি ক্ষমতাশীল, মানুষ তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর তাই মানুষ প্রার্থনা, আচার-অনুষ্ঠান পালন ও উৎসর্গ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অতিপ্রাকৃত সত্তা বা শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। বিশ্বাস করে যে, অতিপ্রাকৃত শক্তির সন্তুষ্টি লাভের সাথে মানুষের ও সমাজের কল্যাণের বিষয়গুলো জড়িত।

বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী চার ধরনের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ও শক্তির কথা জানা যায়। যথা: (১) সৃষ্টিকর্তা, ঈশ্বর বা ভগবান; (২) দেবতা ও দেবী; (৩) পূর্বপুরুষ বা অন্যান্য মৃত মানুষের আত্মা; এবং (৪) অতিপ্রাকৃত বা অতিজাগতিক সত্তা ও শক্তি।

(১) সৃষ্টিকর্তা ও ঈশ্বর: ইসলাম ও খ্রিষ্টানসহ আরও কিছু ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ মনে করে সৃষ্টিকর্তা হলেন একক সত্তা এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ ধরনের ধর্মকে একেশ্বরবাদী ধর্ম বলা হয়।

(২) দেবতা ও দেবী: অনেক ধর্মে বিভিন্ন দেবতা ও দেবীর ধারণা রয়েছে। এই দেব-দেবীদের অস্তিত্ব, ভাবাবেগ, অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ড অনেকটা মানুষের মতো হলেও এরা হলেন বিশেষ অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ক্ষমতার অধিকারী। কোনো কোনো ধর্মে একাধিক দেবতা ও দেবীর ধারণার উল্লেখ আছে। মনে করা হয় দেব-দেবীদের একেকজন একেক ধরনের আলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে মানব জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ধরনের ধর্মকে বহুশ্বরবাদী ধর্ম বলা হয়। পুরাণ বা ধর্মীয় কাহিনিতে দেব-দেবীদের জীবন, পারস্পরিক সম্পর্ক ও কর্মকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়। অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে দেব-দেবীর সন্তুষ্টির জন্য নানা ধরনের আচার অনুষ্ঠানের প্রচলন রয়েছে।

(৩) পূর্বপুরুষ বা অন্যান্য মৃত ব্যক্তির আত্মা: অন্যান্য ধর্মের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ধর্মেও মানুষের মৃত্যু এবং মৃত ব্যক্তিকে ঘিরে বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত রয়েছে। অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও বিশ্বাস করে যে মানব দেহ থেকে আত্মা চলে গেলে মানুষের মৃত্যু হয়। মৃতদেহকে পুড়িয়ে ফেলা বা কবর দেওয়া হলেও মৃত ব্যক্তির আত্মা দেখা যায় না। অদৃশ্য আত্মার ক্ষমতা ও বিচরণ নিয়ে রয়েছে মানুষের অনেক ভয়, বিশ্বাস ও কল্পনা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে অনেক নৃগোষ্ঠীর মানুষই মনে করে, তাদের মৃত পূর্বপুরুষের আত্মা তাদের কাছাকাছিই থাকে। তাদের পূর্বপুরুষের আত্মা তাদের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকাও রাখতে পারে। তাই তারা মৃত পূর্বপুরুষের আত্মাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করে ও নানা কিছু উৎসর্গ করে থাকে। অন্যান্য সমাজের মতো অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে মনে করা হয় যে আত্মহত্যা, অপঘাত বা দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে সেই মৃত ব্যক্তির আত্মা জীবিত মানুষদের ভয় দেখানো বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। এই ধরনের আত্মাকে ভূত, পেত্নি, অশরীরী ইত্যাদি বিভিন্ন নামে বর্ণনা করা হয়।

(৪) অতিপ্রাকৃত বা অতিজাগতিক সত্তা ও শক্তি: তোমরা বিভিন্ন ভূত-প্রেতের গল্প শুনেছ। এগুলোও এক ধরনের অতিপ্রাকৃত সত্তা। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে বিভিন্ন রকমের অতি প্রাকৃত সত্তা বা শক্তির ধারণা রয়েছে। পরী, দেও, অপদেবতা, রক্ষাকারী দেবতা ও অন্যান্য অতি প্রাকৃত সত্তা মানুষের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে বলে অনেক নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা মনে করে। আবার অনেকে মনে করে যে অতি প্রাকৃত শক্তিকে খালি চোখে দেখা না গেলেও অনুভব করা যায় এবং এরা মানুষের উপকার বা অনিষ্ট দুইই করার ক্ষমতা রাখে।

অনুশীলন

কাজ- ১:

অতিপ্রাকৃত সত্তা বা শক্তি কত ধরনের হতে পারে?

কাজ- ২:

মানুষ কেন ও কীভাবে অতিপ্রাকৃত সত্তা বা শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে?

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...