আয়তনে একটি ছোট দেশ হলেও বাংলাদেশে ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশে যথেষ্ট বৈচিত্র্য বিদ্যমান। আমাদের দেশের উত্তরে হিমালয় পর্বত শ্রেণি এবং দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের পাহাড়ের শাখা বিস্তৃত। এই সব পাহাড়ি এলাকা উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ এবং এই স্থানগুলোকে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বলে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের তিনটি ধরন এখানে আলোচনা করা হলো, যথা:
(১) জীব প্রজাতির বৈচিত্র্য, (২) প্রতিবেশ-ব্যবস্থার বৈচিত্র্য ও (৩) বংশগতির বৈচিত্র্য।
(১) জীব প্রজাতির বৈচিত্র্য: বাংলাদেশে প্রায় ৫,৭০০ প্রজাতির স্থল উদ্ভিদ, ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৬২৮ প্রজাতির পাখি, ১২৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২২ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৭০৮ প্রজাতির মাছ, ২৪৯৩ প্রজাতির পোকামাকড়, ১৯ প্রজাতির অণুজীব, ১৬৪ প্রজাতির শৈবালসহ নাম না জানা আরও অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা অণুজীব রয়ে গেছে। জীববিজ্ঞানীদের মতে, আমরা গত এক শতাব্দীর মধ্যে উদ্ভিদ প্রজাতির প্রায় ১০ শতাংশ এবং ১২ থেকে ১৮ প্রজাতির বন্যপ্রাণী চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। এছাড়া ৪০ প্রজাতির স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪১ প্রজাতির পাখি, ৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং ১০৬ থেকে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ আজ বিলুপ্তির হুমকির মুখে রয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশের জীব প্রজাতির বৈচিত্র্যে যুক্ত হয়েছে বহু বহিরাগত জীব প্রজাতি। যেমন: উদ্ভিদের মধ্যে অন্যতম একটি প্রজাতি হচ্ছে কচুরিপানা যা কিনা বহিরাগত একটি উদ্ভিদ প্রজাতি। অথচ এখন আমাদের দেশে ডোবা, পুকুর থেকে শুরু করে বড় নদীগুলোও কচুরিপানায় ঢেকে থাকে এবং জলাশয়কে এই আগাছা মুক্ত করা খুব কঠিন।
(২) প্রতিবেশ-ব্যবস্থার বৈচিত্র্য: বাংলাদেশে আমরা অনেকগুলো প্রতিবেশ-ব্যবস্থা দেখতে পাই। জীববৈচিত্র্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে মূলত চারটি প্রধান প্রতিবেশ-ব্যবস্থা চিহ্নিত করা যায়:
| (ক) উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক প্রতিবেশ- ব্যবস্থা | উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভবন যা সারা বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ স্থান হিসাবে পরিচিত। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে নানা দ্বীপ ছড়িয়ে রয়েছে। তার মধ্যে নারিকেল জিঞ্জিরা দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এটি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলবর্তী স্থানগুলোতে নানা ধরনের পাখি ও অতিথি পাখি সমবেত হয়। |
| (খ) স্বাদু বা মিঠাপানির প্রতিবেশ-ব্যবস্থা | বাংলাদেশ জুড়ে রয়েছে অজস্র নদী-নালা, খাল-বিল হাওর-বাওর জলাভূমি। এছাড়াও প্রতিবছরই দেশের একটি বৃহদাংশ বন্যায় প্লাবিত হয়। ফলে দেশের মূল ভূখণ্ডে স্বাদু বা মিঠাপানির নদীভিত্তিক প্রতিবেশ-ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। দেশের ভূভাগে রয়েছে অনেক অভ্যন্তরীণ জলাভূমি। দেশের জলাভূমির মোট আয়তন আনুমানিক ৭৫ লক্ষ হেক্টর। এসব জলাভূমি ও উত্তর-পূর্বে অবস্থিত হাওরগুলো জীববৈচিত্র্যের আধার। |
| (গ) উচ্চভূমি ও পার্বত্য বনাঞ্চলের প্রতিবেশ-ব্যবস্থা | উচ্চভূমি ও পার্বত্য বনাঞ্চলের প্রতিবেশ-ব্যবস্থার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি বনভূমি, বরেন্দ্র ভূমি, মধুপুরের উচু বনভূমি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। পাহাড়ি প্রতিবেশ-ব্যবস্থাগুলোতে উদ্ভিদ ও লতা-গুল্মের বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়। মধুপুরের প্রতিবেশ ব্যবস্থায় শাল গাছ ছাড়াও ১৭০ প্রজাতির পাখি ও ২৮ প্রজাতির সরীসৃপ আছে। |
| (ঘ) মানুষ পরিবর্তিত প্রতিবেশ-ব্যবস্থা | সময়ের সাথে মানুষ দ্বারা প্রকৃতির বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ফলে বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেশ-ব্যবস্থায় সর্বত্র একই ধরনের জীববৈচিত্র্য সবসময় দেখা যায় না। যেমন, পার্বত্য প্রতিবেশ-ব্যবস্থার মাঝে কাপ্তাই হ্রদ কৃত্রিমভাবে নির্মিত। ফলে কাপ্তাই হ্রদের জীববৈচিত্র্য অন্যান্য পাহাড়ি প্রতিবেশ-ব্যবস্থার অনুরূপ নয়। |
(৩) বংশগতির বৈচিত্র্য: বাংলাদেশে গৃহপালিত পশু-পাখি এবং চাষকৃত ফসল বা উদ্ভিদ উভয় ক্ষেত্রেই বংশগতির বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের দেশের কৃষি প্রতিবেশ ব্যবস্থায় উদ্ভিদ ও প্রাণিজ সম্পদের বংশগতিগত ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে কারণ শত শত বছরব্যাপী স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলো প্রজাতির বংশগতিগত ভিন্নতাকে সযত্নে সংরক্ষণ করেছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো চাষকৃত বা পালিত সকল ধরনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এগিয়ে আসছে। উদ্ভিদ ধান, তেলের বীজ, আলু, পাট এসব প্রজাতির অসংখ্য বংশগতিভিত্তিক বৈচিত্র্য রয়েছে। সবচাইতে বেশি বংশগতিভিত্তিক বৈচিত্র্য রয়েছে ধানের। বাংলাদেশে প্রায় ৬০০০ রকম ধানের সন্ধান পাওয়া যায়। গৃহপালিত পশু-পাখির ক্ষেত্রে গবাদি পশুর বংশগতিগত বৈচিত্র্য সর্বাধিক। কুকুর, বিড়াল এবং পাহাড়ি এলাকায় শূকর প্রজাতির মধ্যেও বংশগতিগত বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | বাংলাদেশের জীব প্রজাতিগত বৈচিত্র্য সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? |
| কাজ- ২: | বাংলাদেশে কয় ধরনের প্রতিবেশ ব্যবস্থা দেখা যায়? |
Read more