আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি যে, প্রথাগত আইন হচ্ছে যুগ যুগ ধরে কোনো জনগোষ্ঠীতে বংশ পরম্পরায় অনুসৃত হয়ে আসা চিরকালীন রীতি-নীতি এবং নিয়ম-কানুন বা সেসব রীতি-নীতি ও নিয়ম-কানুনের সমষ্টি। প্রথাগত আইন শুধু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের বেলায় প্রযোজ্য। যারা ঐ জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সদস্য নন তাদের ক্ষেত্রে উল্লেখিত প্রথাগত আইন প্রযোজ্য নয়। অন্যদিকে সাধারণ আইন হলো সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রবর্তিত আইন, যা সারা দেশে এবং সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতি বজায় রাখার জন্য এবং নাগরিকদের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সরকারের মাধ্যমে সময়ে সময়ে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে থাকে। এসব নীতিমালার ভিত্তিতে, যে বিষয়ে নীতিমালা প্রণীত হয়েছে তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার জন্য, সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুন তৈরি করা হয়। সরকারের মন্ত্রিসভা এবং জাতীয় সংসদ দ্বারা অনুমোদিত হওয়ার পর মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি ও স্বাক্ষর নিশ্চিত হলে তবে ঐসব বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুন রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত হয়। আইনে পরিণত হওয়ার পর সেসব বিধি-বিধান দেশের আদালত বা বিচার-ব্যবস্থা এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ প্রশাসনের মাধ্যমে সারা দেশে সকল নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়ে উঠে। এদিক থেকে রাষ্ট্রীয় আইন হলো একটি ব্যাপকতর ও সর্বজনীন আইন। এর পরিধি ব্যাপক এবং সকল নাগরিকের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য।
প্রথাগত আইন হলো শুধু বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর দ্বারা উদ্ভাবিত এবং ঐ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য আইন। এসব প্রথাগত আইন হচ্ছে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য প্রায় অলংঘনীয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিসরে অবশ্য পালনীয় নয়। প্রথা ভাঙলে রাষ্ট্র শাস্তির বিধান করে না, কিন্তু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী শাস্তির বিধান করে থাকে। বংশ পরম্পরায় যুগের পর যুগ ধরে পালন করতে করতে কোনো নিয়ম বা লোকাচার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে এতটাই অলঙ্ঘনীয় হয়ে পড়ে যে, তার ব্যতিক্রম ঘটানো বা প্রচলিত ঐ নিয়মকে অমান্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠে। এধরনের নিয়ম বা লোকাচার চিরকালের প্রথা বা বিধি-বিধানে পরিণত হয়। আর এসব প্রথার প্রতি সংশ্লিষ্ট মানবগোষ্ঠীর থাকে অগাধ বিশ্বাস, আস্থা এবং দুর্বলতা। এই নির্ভরতার সাথে জড়িত থাকে ঐ মানবগোষ্ঠীর লৌকিক-অলৌকিক বিশ্বাস, আদি জ্ঞান, হাজার বছরের অভিজ্ঞতা এবং চিরাচরিত কিছু অভ্যাস ও অনুশীলন।
বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে না হলেও 'পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি- ১৯০০' অনুসারে পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত আইন ও জীবনধারা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। কারণ দেশের সাধারণ আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি কয়েক দফা সংশোধনীর পর 'পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি- ১৯০০' এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে বলবৎ আছে। এই শাসনবিবিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত আইন ও জীবনধারাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ নং অনুচ্ছেদে কী কী বিষয় আইন হিসেবে গণ্য হবে তার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, "আইন” অর্থ কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোনো প্রথা বা রীতি। এদিক থেকে দেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের মাঝে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত প্রথা বা রীতি-নীতির জন্য এক ধরনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আছে বলা যায়।
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | প্রথাগত আইন এবং সাধারণ আইনের মধ্যে কী কী পার্থক্য রয়েছে তা বুঝিয়ে লেখ। |
| কাজ- ২: | পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি-১৯০০' ব্যাখ্যা করো। |
Read more