ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজ কৃষি জ্ঞান (পাঠ ৬)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজ জ্ঞান - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

246

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষিকাজ, জুমচাষ ও উদ্যানচাষের উপর নির্ভরশীল। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ পাহাড়ে জুমচাষ ও সমতলে চাষাবাদ- দুটোতেই অভ্যস্ত। তবে যারা পাহাড়চূড়ায় বসবাস পছন্দ করে, জুমচাষ তাদের প্রধান জীবিকা। আর যারা পাহাড়ের পাদদেশ কিংবা সমতল অঞ্চলে বাস করে তাদের কাছে জুমচাষ ও হালকৃষি দুটোই সমান পরিচিত। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাংখোয়া, ম্রো, বম, লুসাই প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর লোকালয়গুলো মূলত উঁচু পাহাড়শ্রেণির ঢালে বা চূড়ায় হয়ে থাকে বলে তারা জুম চাষে অভ্যস্থ। আর অন্য দিকে যারা অপেক্ষাকৃত নিচু পাহাড়, সমতল কিংবা নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বাস করে যেমন রাখাইন, চাকমা, মারমা, মান্দি, হাজং প্রভৃতি জনগোষ্ঠী জুমচাষ ও হাল কৃষি-দুটিতেই অভ্যস্থ। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর জীবিকা নির্বাহের সেই ধারা আজও অব্যাহত আছে। সুতরাং যেসব অঞ্চলে তারা এখন বসবাস করছে সেখানকার ভূপ্রাকৃতিক অবস্থা অনুযায়ী তাদের চাষাবাদের ধরন নির্ধারিত হয়।

চাষাবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের লোকজ জ্ঞান প্রয়োগ করে আসছে। কীটনাশকমুক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে তাদের এই লোকজ জ্ঞানের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। যেমন- পাহাড়ে যে জুমচাষ হয় তাতে শিল্পকারখানায় উৎপাদিত কোনো প্রকার সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। সাধারণত নিজেদের তৈরি জৈবসার ও পোকামাকড় দমনের নিজস্ব পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করে থাকে। সমতল অঞ্চলে হালচাষের ক্ষেত্রেও তারা কৃত্রিম সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করার রীতি মেনে চলে। জুমচাষে যে ধান বা শস্যবীজ ব্যবহার করা হয় সেগুলো একেবারেই অকৃত্রিম দেশজ উপকরণ যা শত শত বছর ধরে এবং বংশ পরম্পরায় এদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো ব্যবহার ও সংরক্ষণ করে আসছে।

চাষাবাদের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর রয়েছে হাজার বছরের লোকজ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রভাব। একই জুমখেতে একযোগে বিভিন্ন ফসলের ফলন কীভাবে পাওয়া যায়, পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে কীভাবে সেই ফসল পর্যায়ক্রমে সারা বছর কাজে লাগানো যায় তা তারা জানে। ফসলের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য যাতে রক্ষা পায় তার জন্য তারা কিছু নিয়ম ও সংস্কারও মেনে চলে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু কিছু এলাকা বা বনভূমি আছে যেখানে তারা জুমচাষ করে না। তাদের ধারণা ঐসব স্থানে জুমচাষ অমঙ্গল বয়ে আনবে। সাপের গর্ত, বাদুরের পুরনো আস্তানা বা পাহাড়গুলোর বিশেষ আড়াআড়ি অবস্থান প্রভৃতি দেখে সমাজের অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ বুঝতে পারেন কোন কোন এলাকায় জুমচাষ এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়া জুমচাষিরা বড় এবং বিশেষ ধরনের উপকারী গাছ গাছালি, বাঁশের মূল এবং বিশেষ কিছু পশু-পাখি ও কীট পতঙ্গকে সযত্নে রক্ষা করে চলে। কোনো স্থানে একবার জুমচাষ করার পর তা তারা চার পাঁচ বছর ধরে অনাবাদি ফেলে রাখে জমির উর্বরতা শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য। এসবই তাদের হাজার বছরের লোকজ জ্ঞানের আবিষ্কার যা তারা পরিবার ও প্রকৃতি থেকে শিখেছে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে এখন ব্যাপক আলোচনা চলছে। সমস্যা হলো, এসব উন্নয়ন আলোচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের হাজার বছরের লোকজ জ্ঞানকে উপেক্ষা করা হয়। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে আশানুরূপ সুফল পাওয়া যায় না। জুমচাষের ভালোমন্দ বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য। দেশের পাহাড় ও বনাঞ্চলে নানা কারণে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া, নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার ফলে এখন জুমচাষের পরিমাণ অনেক কমে এসেছে। সমাজে নানা বিশৃঙ্খলা এবং বনাঞ্চল দখলের প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় জুমচাষের প্রচলিত নিয়মও সর্বদা মানা হচ্ছে না। ফলে চাষিরা জুমচাষ থেকে আশানুরূপ সুফল পাচ্ছে না।

আমাদের দেশে সুন্দরবন ছাড়াও চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও মধুপুরে পাহাড় ও বনাঞ্চল রয়েছে। এই বনাঞ্চল ও পাহাড় আমাদের জাতীয় সম্পদ। এসব বন ও জীববৈচিত্র্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এবং বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজ জ্ঞানকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। বন ও প্রকৃতির কোলে যাদের বসবাস তারা জানে কীভাবে নিজের আশ্রয়স্থলকে সযত্নে রক্ষা ও পরিচর্যা করতে হয়। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে পাহাড়, বন, নদী, সমুদ্র, জলাশয়সহ আমাদের প্রকৃতিকে সযত্নে সংরক্ষণ ও দূষণমুক্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই। তাই দেশের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় প্রকৃতিবান্ধব মিশ্র চাষাবাদ পদ্ধতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজ জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে।

অনুশীলন
কাজ- ১:জুমচাষ কী ধরনের কৃষি পদ্ধতি? জুমচাষে লোকজ জ্ঞান ব্যবহারের কিছু উদাহরণ তুলে ধর।
কাজ- ২:প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজ জ্ঞানকে কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে? তোমার মতামত দাও।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...