প্রথাগত আইনে অপরাধের বিচার (পাঠ ৭)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

143

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের দৈনন্দিন জীবনচর্চায় প্রথাগত আইনের ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে। গুরুতর কোনো অপরাধ বা বিরোধের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো দেশের সাধারণ আইন বা প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও সচরাচর প্রথাগত আইনের সাহায্যেই এখনও নিজেদের সব বিরোধ বা সমস্যা নিষ্পত্তি করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ জেলা প্রশাসন এবং আইন-আদালত বহাল থাকলেও ফৌজদারি কিংবা ভূমি সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের অন্যান্য সামাজিক বিরোধ বা সমস্যা প্রথাগত আইনের মাধ্যমে কারবারি, হেডম্যান বা রাজার আদালতে মীমাংসা করা হয়। এখানে প্রথাগত আইন দ্বারা সাধারণত যেসব বিষয়ে সমস্যার নিষ্পত্তি করা হয় সেগুলো হলো -বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, সন্তান দত্তক গ্রহণ, স্ত্রীর মর্যাদা ও ভরণপোষণ, পিতৃত্ব এবং পিতার দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ, নাবালকের অভিভাবকত্ব, দান গ্রহণ ও হস্তান্তর, পরিবারের ভরণপোষণ, উইল সম্পাদন এবং অন্যের সম্পদের ক্ষতিসাধন, সম্মানহানি, অসামাজিক কার্যকলাপ প্রভৃতিসহ নানা সামাজিক বিরোধ ও অপরাধের বিচার। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের এসব প্রথাগত আইনের উৎস হলো সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, প্রাচীনকাল থেকে লালন করে আসা মূল্যবোধ ও বিশ্বাস; ধর্মীয় আনুগত্য ও অনুশাসন; প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি অবিমিশ্র শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো প্রথাগত আইনের মাধ্যমে সাধারণত যেসব অপরাধের বিচার কিংবা বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকে তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো।

অপরাধের ধরন -

১) জুমচাষের ভূমি বা অন্যান্য সম্পদের মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ;
২) ফসল, গৃহপালিত পশু ইত্যাদি চুরি বা বেদখল করা;
৩) জনগোষ্ঠীর সামাজিক মালিকানার সম্পত্তি বা সেবা, যেমন- জনসাধারণের পানির উৎস, সামাজিক বন, রাস্তাঘাট, ধর্মীয় স্থান, শ্মশান প্রভৃতির ক্ষতি সাধন বা পবিত্রতা নষ্ট করা;
৪) অন্যের জমির ফসল বা বাগানের ক্ষতি সাধন করা;
৫) অন্যের সম্মানহানি এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা;
৬) পরিবার ও সমাজে কলহ সৃষ্টির মাধ্যমে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করা;
৭) মিথ্যা বলা, দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতিসহ নানা অসামাজিক কার্যকলাপের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের সম্মান নষ্ট করা;
৮) পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা;
৯) সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করা;
১০) ভিন্ন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের কারও সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা;
১১) ঋণ বা দেনা পরিশোধ না করা;
১২) সামাজিক প্রথা বা রীতিনীতির প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং অন্য কারও ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস বা অনুভূতিতে আঘাত করা;
১৩) বেপরোয়াভাবে ও নির্বিচারে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস এবং বনের পশু-পাখি হত্যা করা;
১৪) শিক্ষা, সংস্কৃতিচর্চা এবং ধর্ম পালনে বাধাদান প্রভৃতি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দেশের সমতল অঞ্চলের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোও নিজেদের সমাজের নানা সমস্যা ও বিরোধ প্রথাগত আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে থাকে। তবে তাদের সমাজে দেশের সাধারণ প্রশাসন এবং বিচার-ব্যবস্থার প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সামাজিক সমস্যা ও বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো প্রধানত তাদের প্রথাগত আইনই মেনে চলে। এখানে বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাসকারী মান্দিদের সমাজ-ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যুগ যুগ ধরে মান্দি জনগোষ্ঠী তাদের কিছু প্রথাগত নৈতিক আইন ও রীতি নীতি মেনে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখছে। তাদের বিশ্বাস হলো, সমাজে কেউ যদি দুর্নীতি, নিয়মভঙ্গ বা অন্যায় কাজ করে থাকে তাহলে সূর্য ও চন্দ্রের দেবতা সালজং এবং সুসিমে তাকে শাস্তি দেন। এছাড়া তাদের সমাজের প্রথাগত গ্রাম আদালত বা ড্রা-ও শাস্তির বিধান করে থাকে। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি-নীতি বা বিধি-নিষেধ মেনে না চলা, বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য না করা, সংরক্ষিত পবিত্র বন থেকে কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি সংগ্রহ, মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করা, একই গোত্রের মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, জনসাধারণের কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ না করা; চুরি, মিথ্যাচার ও হুমকি প্রদান; দেনা পরিশোধ না করা, ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের ক্ষতি করা প্রভৃতি কাজ মান্দি সমাজে গুরুতর অপরাধ হিসাবে বিবেচিত। এসব অপরাধের জন্য দেবতা কর্তৃক শাস্তি ছাড়াও সমাজে নানা শাস্তির বিধান রয়েছে। কিছু কিছু ব্যতিক্রম বাদে অনুরূপ প্রথাগত আইন সাঁওতাল, মণিপুরী, হাজং, কোচ, ডালু, বর্মন, খাসি, ওরাঁও, মুন্ডাসহ বাংলাদেশের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে কমবেশি প্রচলিত রয়েছে।

অনুশীলন
কাজ- ১:বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত আইনে সাধারণত কী কী অপরাধের বিচার করা হয়?
কাজ- ২:মান্দি সমাজে কী ধরনের প্রথাগত আইন চালু আছে? সাধারণত কোন কোন ক্ষেত্রে সেসব আইন প্রয়োগ করা হয়?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...