পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহেরও রয়েছে নিজস্ব প্রথাগত শাসন ব্যবস্থা। সমাজের যিনি প্রধান বা সমাজপতি তিনিই এই প্রথাগত শাসন-ব্যবস্থার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে ঐক্য ও সংহতির প্রতীক।
পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খিয়াংসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার জীবনধারা এখনও তাদের প্রথাগত আইন ও শাসন-ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়, যা রাষ্ট্রের আইন দ্বারাও স্বীকৃত। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা যেমন - রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের জন্য রয়েছে তিনটি সার্কেল বা প্রথাগত প্রশাসনিক এলাকা। সেগুলো হলো- চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল। চাকমা সার্কেলটি রাঙামাটি জেলায়, বোমাং সার্কেল বান্দরবান জেলায় এবং মং সার্কেলটি খাগড়াছড়ি জেলায় অবস্থিত। প্রতিটি সার্কেলে আছেন একজন সার্কেল প্রধান, যিনি রাজা নামে বেশি পরিচিত। প্রত্যেকটি সার্কেল আবার কয়েকটি মৌজায় এবং প্রতিটি মৌজা কয়েকটি আদাম বা পাড়ায় (বাংলায় গ্রাম) বিভক্ত। প্রত্যেকটি মৌজায় আছেন একজন হেডম্যান, যিনি রাজার সুপারিশ অনুসারে জেলা প্রশাসক কর্তৃক নিযুক্ত হন। হেডম্যান মৌজার প্রজাদের কাছ থেকে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত জুম বা ভূমি কর আদায় এবং সামাজিক বিচার আচার সম্পাদনসহ সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনুরূপভাবে একটি পাড়ার প্রধান হলেন কারবারী। তিনিও তার আদাম বা পাড়ায় সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকেন এবং সমাজের সদস্যদের যে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি করেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে প্রচলিত প্রথাগত আইন অনুসারেই এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। কারবারীর প্রথাগত আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট হতে না পারলে ঐ ব্যক্তি হেডম্যানের আদালতে এবং তাতেও সন্তুষ্ট না হলে রাজার কোর্টে আপীল করতে পারেন। অনুরূপভাবে, দেশের সমতল অঞ্চলের মান্দি, খাসি, মণিপুরী, সাঁওতাল, হাজং প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর সমাজেও নিজ নিজ প্রথাগত আইন চালু আছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে মান্দি এবং খাসিদের সমাজ হলো মাতৃসূত্রীয় (Matrilineal)। মান্দি সমাজের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সামাজিক-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আখিং নকমা (নকমা মানে প্রধান), সংনি নকমা (গ্রাম প্রধান), ড্রা পান্থে (মেয়ে পক্ষের পুরুষ আত্মীয়) প্রভৃতি ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশের সাধারণ প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির কারণে ধীরে ধীরে মান্দিদের এসব প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব কমে এলেও তাদের প্রথাগত নৈতিক আইন এবং অনুশাসন এখনও যথাসম্ভব মেনে চলা হয়। অনুরূপভাবে খাসি জনগোষ্ঠীর সমাজে রয়েছে পুঞ্জীভিত্তিক মন্ত্রী বা হেডম্যান প্রথা, বংশভিত্তিক পরিষদ "সেংকুর", "খাদ্দুহ্” প্রভৃতি ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠান। হাজংদের কয়েকটি পরিবার নিয়ে একটি পাড়া এবং কয়েকটি পাড়া নিয়ে একটি গ্রাম গঠিত হয়। পাড়া প্রধানের উপাধি হলো "গাঁও বুড়া” এবং গ্রাম প্রধানকে বলা হয় 'মোড়ল'। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় একটি চাকলা বা জোয়ার এবং কয়েকটি চাকলার সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি পরগনা। চাকলার প্রধান হলেন 'সড়ে মোড়ল' আর পরগনা প্রধানের উপাধি হলো রাজা। রাজা হলেন হাজংদের সর্বোচ্চ শাসক, রক্ষক ও প্রতিপালক। তবে বাংলাদেশের হাজং সমাজে রাজা প্রথাটি এখন আর প্রচলিত নেই। অন্যদিকে সাঁওতাল সমাজের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক নেতৃত্ব ও শাসন ব্যবস্থা এখনও বহাল আছে। গ্রামের প্রধানকে বলা হয় মাজহী। যিনি নৈতিকভাবে যাবতীয় বিষয়ের অভিভাবক তার নাম জগমাজহী। এছাড়া আছেন পারানিক (মাজহী সহকারী), নায়কে (পুরোহিত), কুড়ম নায়কে (সহকারী পুরোহিত) এবং গোডেথ (বার্তাবাহক)। সমাজের যে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাদের আছে চার স্তর বিশিষ্ট আদালতের প্রথাগত বিচার-পদ্ধতি। সেগুলো হলো মাজহী, দেশ মাজহী পরগনা এবং ল-বির বা জঙ্গল মহাসভা। বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট এলাকাকে সাঁওতালরা দিশাম বলে অভিহিত করে থাকেন। আর ল-বির হলো তাদের সর্বোচ্চ আদালত, যা বছরে একবার বসে। এই আদালতে সবাই মিলে আলোচনার মাধ্যমে সমাজের জটিল সব সমস্যার সমাধান করেন। ল-বির প্রধানকে বলা হয় দিহরি। এভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা তাদের প্রথাগত আইন, রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি এবং অনুশাসন যুগ যুগ ধরে এবং বংশ পরম্পরায় পালন করে আসছে।
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত শাসন কাঠামোর বিবরণ দাও। |
| কাজ- ২: | বাংলাদেশের হাজং এবং সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর প্রথাগত শাসন কাঠামো সম্পর্কে যা জানো লেখ। |
Read more