ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজে ধর্মের উৎপত্তি নিয়ে নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ সম্পর্কে তোমাদের কিছু সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য ধর্মের উৎপত্তির দুটি ব্যাখ্যা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি। যথা: (১) আত্মার ধারণা থেকে ধর্মের উৎপত্তি এবং (২) জাদুবিদ্যা থেকে ধর্মের উৎপত্তি।
(১) আত্মার ধারণা থেকে ধর্মের উৎপত্তি: খুবই সাধারণ কিছু প্রাকৃতিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রাচীন মানুষের জানা ছিল না। এ ধরনের একটি সাধারণ ঘটনা হলো মানুষের ঘুমিয়ে পড়া। ঘুমের মাঝে মানুষ স্বপ্ন দেখে থাকে। আর স্বপ্নে সে অনেকসময় অতীতের কোনো ঘটনা কিংবা মৃত বা অচেনা কোনো ব্যক্তিকে জীবন্ত দেখে থাকে। এই বিষয়গুলো প্রাচীনকালের মানুষকে অনেক ভাবিয়ে তোলে। এছাড়াও, জীবিত, ঘুমন্ত ও মৃত মানুষের দেহের পার্থক্য কী? আবার ঘুমন্ত মানুষ যেমন জেগে উঠে, তেমনি মৃত মানুষ কেন জেগে উঠে না বা ফিরে আসে না? দিনের বেলা কেন মানুষের ছায়া সব সময় তাকে অনুসরণ করে? এ ধরনের নানা প্রশ্ন নিয়ে মানুষ কৌতূহলী হয়ে উঠে।
আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা আর অনুমানের ভিত্তিতে আদি মানুষেরা এসকল প্রশ্ন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। তারা অনুমান করে যে, মানুষের শরীরের ভিতরে অদৃশ্য কিছু অবস্থান করে। এভাবেই প্রথম প্রাচীন মানুষ আত্মার ধারণা লাভ করে। মানব দেহে আত্মার ধারণা লাভের ফলে মানুষের মৃত্যু, স্বপ্ন দেখা, ঘুমিয়ে পড়ার সময় মানুষের কী হয়, এসব প্রশ্নের জবাব মানুষ খুঁজে পায়। মানুষের দেহে আত্মার অবস্থানের কারণে মানুষ জীবিত থাকে। দেহ থেকে আত্মা চলে গেলে মানুষের মৃত্যু ঘটে। প্রাচীন মানুষের ধারণা অনুযায়ী, আত্মা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় এবং এক দেহ থেকে অন্য দেহে ভ্রমণ করতে পারে। আত্মার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই বলে তারা ধারণা করত যে, শুধু মানুষ থেকে মানুষের দেহেই নয়, বরং যে কোনো প্রাণীর দেহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গাছপালা, এমনকি, প্রকৃতি জগতের বিভিন্ন বস্তুতেও আত্মা অবাধে বিচরণ করতে পারে। অর্থাৎ, আত্মা যে কোনো প্রাণী, গাছপালা কিংবা বস্তুর আকার ধারণ করতে পারে বলে মানুষ বিশ্বাস করে। আদি মানুষ আরও মনে করত, ঘুমানোর সময় আত্মা জীবিত মানুষের দেহ ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে পারে এবং সে কারণেই মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন ঘটনা দেখতে পায় স্বপ্নের মাধ্যমে। অর্থাৎ, স্বপ্ন হলো ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের আত্মা অন্যত্র চলাফেরা বা বিচরণ করার ফলে দেখা ঘটনা যেগুলো জেগে থাকার সময় দেখা যায় না। আর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আত্মা একেবারে দেহকে ছেড়ে যায়। তারা আরও বিশ্বাস করত মানুষের মৃত্যু হলেও আত্মার মৃত্যু বা ধ্বংস হয় না কখনো। তাই মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা যায়।
আদি মানুষ আরও মনে করত, আত্মার ক্ষমতা সাধারণ জীবিত মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। অলৌকিক বা অতিজাগতিক ক্ষমতার অধিকারী আত্মা মানুষের মঙ্গল কিংবা অমঙ্গলের কারণ হতে পারে বলে মানুষ মনে করত। আত্মা যেমন মানুষের জন্য অনিষ্টকর বা ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি আত্মা মানুষের উপকারও করতে পারে। মানুষের কাজে আত্মারা যেমন খুশি ও সন্তুষ্ট হতে পারে, তেমনিভাবে বিরক্ত, অসন্তুষ্ট বা রাগান্বিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই বিভিন্ন সমাজের মানুষ নানা কাজের মাধ্যমে আত্মাদের সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করতে থাকে। আবার আত্মারা বিরক্ত হতে পারে এমন কাজ এড়িয়ে চলতেও মানুষ সদা সচেষ্ট থাকে। এভাবেই আত্মার ধারণাকেই ধর্মের উৎপত্তির মূল ভিত্তি বলে মনে করেন নৃবিজ্ঞানীরা। আদি থেকে বর্তমানের সকল সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের মাঝেই বিভিন্নভাবে আত্মার ধারণা রয়েছে।
(২) জাদুবিদ্যা থেকে ধর্মের উৎপত্তি: প্রকৃতির উপর মানুষ সব সময়ই নির্ভরশীল। ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা থেকে শুরু করে বন্য প্রাণীর আক্রমণ কিংবা শীত-গ্রীষ্মকাল প্রভৃতি প্রাকৃতিক ঘটনার উপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ সব সময়ই ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। তাই মানুষ সব সময়ই প্রাকৃতিক অবস্থা বা চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে শিখেছে। আদি যুগে মানুষের জীবনে নানা রকম অনিশ্চয়তা ও ভীতির পরিমাণও ছিল অনেক বেশি। বিভিন্ন প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তা থেকে মানুষ নিজেদের নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছে। নিরাপত্তা বিধান ও বিভিন্ন অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য মানুষ সর্বকালেই প্রকৃতিকে জানার মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রকৃতিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করেছে। মানুষের এই প্রচেষ্টা থেকেই জাদুবিদ্যার উদ্ভব। এভাবে নানা কলাকৌশল প্রয়োগ করে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা পূরণের জন্য জাদুবিদ্যা ব্যবহৃত হতো বলে মনে করা হয়।
অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে জাদুবিদ্যার প্রচলন দেখা যায়। জাদুবিদ্যার দ্বারা মানুষ নানাভাবে বিভিন্ন অনিশ্চয়তা দূর করার এবং নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী বিভিন্ন ঘটনার ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। যেমন: শত্রুকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য বাণ মারার প্রচলন বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আছে। কোনো ব্যক্তির ক্ষতি সাধনের জন্য তার দেহের কোনো অংশ যেমন, চুল, নখ ইত্যাদিসহ মন্ত্রের ব্যবহার করা জাদুবিদ্যার অন্তর্গত। আবার কাউকে সাপে কামড়ালে ওঝার কথাই সবার আগে মনে হয়। এছাড়া, বিভিন্ন রকম জটিল রোগ-ব্যাধি ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার জন্য অনেকেই ঝাড়ফুঁক, মন্ত্র, তাবিজ-কবচ ইত্যাদির সাহায্য নেয়। এ সকল ক্ষেত্রে চিকিৎসক, তান্ত্রিক বা ওঝার আলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করে মানুষ।
আদিকালে মানুষ শুধু জাদুবিদ্যা নির্ভর থাকলেও ক্রমশ তারা এর বিভিন্ন দুর্বল দিক আবিষ্কার করে। মানুষ বুঝতে পারে যে, শুধু জাদুবিদ্যা দিয়ে প্রকৃতির সব বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ওঝাদের সীমিত ক্ষমতা ও জাদুবিদ্যার দুর্বলতা থেকে মানুষের মাঝে ক্রমশ অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন অতিপ্রাকৃত শক্তি এবং দেবতা ও দেবীদের ধারণার সৃষ্টি হয়। ধর্ম ও জাদুবিদ্যা মূলত বিশ্বাস নির্ভর। জাদুবিদ্যা বাস্তবে কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারুক বা না পারুক এর অনুসারীরা বিশ্বাস করে যে, জাদুর মাধ্যমে ইচ্ছাপূরণ বা পরিস্থিতি পরিবর্তন সম্ভব। ধর্মের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন যে, সৃষ্টিকর্তা বা দেবতাদের দ্বারাই বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে। এভাবে প্রাচীনকালের মানব সমাজে জাদুবিদ্যা থেকে ধর্মের উৎপত্তি হয় বলে নৃবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ মনে করেন।
অনুশীলন | |
কাজ- ১: | ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ধর্মের উৎপত্তি কীভাবে হলো? |
কাজ- ২: | বিভিন্ন সংস্কৃতিতে জাদুবিদ্যার প্রচলন হলো কেন? তোমার ধর্মে কী জাদুবিদ্যার প্রচলন আছে? |
Read more