যেকোনো নৃগোষ্ঠীর মানুষেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন পোশাক থাকে। বাংলাদেশের সব নৃগোষ্ঠীর রয়েছে নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাক। নানা বর্ণ নানা বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে এসব নৃগোষ্ঠীর পোশাকসমূহ খুবই আকর্ষণীয়। একদিকে যেমন প্রাত্যহিক বা দৈনন্দিন জীবনে এরা সাধারণ পোশাক পরে আবার বিভিন্ন উৎসবে এরা ঐতিহ্যময় পোশাক পরিধান করে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা নিজেরাই পোশাক তৈরি করে থাকে। তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বর্ণিল পোশাক গুরুত্বপূর্ণ। তোমরা পার্বত্য জেলায় বেড়াতে গেলে চাকমা, তঞ্চঙ্গা, মারমা, ত্রিপুরাদের নানা বর্ণের চমৎকার সব নিজেদের তৈরি পোশাক যেমন দেখতে পাবে তেমনি সিলেটে গেলে মণিপুরী ও খাসিদের নানা রঙের এবং নকশাদার পোশাক তোমাকে মুগ্ধ করবে। এখানে কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পোশাকের বর্ণনা ও ছবি দেওয়া হলো।
খেয়াং, খুমি ও চাক পোশাক: খেয়াংদের নিজস্ব পোশাক রয়েছে। তাদের বুননকৃত পোশাক বিশেষ করে মেয়েদের পোশাক দেখতে অনেকটা রাখাইনদের মতো মনে হলেও থামিকে এরা প্যওন বলে এবং বক্ষবন্ধনীকে লাংগত বলে। খেয়াং পুরুষ নেংটি এবং হাতে সেলাইকরা জামা পরে। বাইরে যাবার সময় তারা মাথায় পাগড়িও পরে।
খুমিরা থামিকে নেনা বলে। এটি নানা রঙে নকশা করা। মহিলারা পাগড়ি পরে, ছেলেরা নেংটি এবং লুঙ্গি। চাকদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হচ্ছে পাংহে কামুহ বা নয়হাতি ধুতি। বর্তমান এটি প্রায় বিলুপ্ত। এর পরিবর্তে লুঙ্গি ব্যবহার করে। ব্লাউজকে এরা বলে 'রাইকাইন পে'।

চিত্র-১.৫: ত্রিপুরা, খেয়াং, চাকমা ও তঞ্চঙ্গাদের পোশাকের ছবি
চাকমা ও তঞ্চঙ্গা: হাতে বোনা বা তৈরি ঐতিহ্যময় তাঁত কাপড়ের জন্য চাকমা ও তঞ্চঙ্গারা বিখ্যাত। বেইন নামে কোমর তাঁতের মাধ্যমে নারীরা কাপড় তৈরি করে। চাকমা নারীদের উল্লেখযোগ্য পোশাক হচ্ছে পিনুন, খাদি কানাই, খবং প্রভৃতি।
তঞ্চঙ্গা নারীদের পোশাকের নাম পিনুন। এটি কোমর থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত রঙিন এবং দৈর্ঘ্য ৪ হাত। দেখতে রংধনুর মতো। চাকমা মহিলাদের পিনুনের মতো তঞ্চঙ্গা পিনুনের দুই প্রান্ত আনুভূমিক ভাবে কালো ও ভেতরের দিকে লাল রঙের মাঝখানে লাল ও হলদে একই মাপের দুই সীমান্ত থাকে। লাল সবুজ, বেগুনি, আকাশি প্রভৃতি রং মিশ্রিত জমিনও থাকে। কিন্তু চাকমাদের পিনুনের মতো উলম্ব (উপর ও নিচে) কোন চাবুগি থাকে না।
সবচেয়ে মজার বিষয় তঞ্চঙ্গাদের কোন গসা বা গোত্র কী পোশাক পরবে তা ঠিক করা আছে। যেমন: কারওয়াসা গসা পিনুন, খাদি, ফারর দুরি, মাথার খবং, সাদা কোবোই সালুম প্রভৃতি। অন্যদিকে মুঅ গসা- পিনুন, খাদি, কালো কোবোই, ব্লাউজ প্রভৃতি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ত্রিপুরাদের পোশাকও খুবই আকর্ষণীয় এবং বৈচিত্র্যময়। ত্রিপুরা মেয়েরা কোমরে পরার জন্য যে তাঁত কাপড় তৈরি করে তার উপরের অংশের নাম রিসাই এবং নিচের অংশের নাম রিনাই।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মান্দি পুরুষরা গান্দো, পান্না, জামা, কাদি বা কটিপ এবং মেয়েরা রেকিং, জারন, আনপান, কপিং প্রভৃতি ব্যবহার করে। এক সময়ে হাজং নারীরা নিজেদের তাঁতের তৈরি লাল ও কালো ডোরার পাঁচহাত লম্বা ৩ হাত প্রন্থের যে কাপড় পরত তার নাম পাতিন। এটি এখন প্রায় লুপ্ত।
মারমা পুরুষগণ ধুতির মতো তাঁতে বোনা 'ধেয়ার' এবং এর সাথে জ্যাকেটের মতো 'ব্যারিস্টা আঙ্গি' জামার উপর পরে। তবে লুঙ্গির প্রচলনও রয়েছে। নারীরা 'বেদাইত আঙ্গি' নামের ব্লাউজ পরিধান করে থাকে। এক সময় সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ছিল পুরুষের পানচি (ধুতি ছোট করে পরা) এবং নারীদের পানচি-পাড়হান্ড নামের দু খণ্ড মোটা কাপড়। এখন আর এ পোশাক তেমন ব্যবহার হয় না বরং পুরুষ ধুতিও লুঙ্গি এবং নারীরা শাড়ি পরে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওরাঁওদের পোশাক সাঁওতালদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। খাসি পুরুষরা এক সময় তাদের ঐতিহ্যবাহী কোট, পাগড়ি, ধুতি মোঙ্গল পরিধান করত। অন্যদিকে নারীরা তাদের কাঁধের পাশে যে ঐতিহ্যময় পোশাক পরে তাকে 'জাংকুবাস' বলে- এটি ঝুলে থাকে।
মণিপুরী নারীদের পোশাকও কম ঐতিহ্যময় নয়। মণিপুরী তাঁতের তৈরি পোশাক খুবই বিখ্যাত। চাকচাবি, ইনাফি, আঙ্গলুরি, চমকির আহিং, ইরুফি, খাংচেৎ প্রভৃতি। আর পুরুষদের পোশাক হচ্ছে-কেইচুম, খুত্তেই কয়েত। মণিপুরীদের পোশাকেও নিজস্ব শিল্প নৈপূণ্যের ছাপ রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমতলে বসবাস করেন তাদের অধিকাংশেরই পোশাক পুরুষদের লুঙ্গি, ধুতি, জামা, পাঞ্জাবি ফতুয়া এবং নারীদের শাড়ি।
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | পার্বত্য জেলায় বেড়াতে গেলে কাদের কাদের ঐতিহ্যময় পোশাক দেখতে পাবে? |
| কাজ- ২: | হাজং নারীদের কোন পোশাকটি এখন প্রায় লুপ্ত? |
Read more