ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সামাজিক নিষেধাজ্ঞা ও মানব জীবনে ধর্মের প্রভাব (পাঠ ১০)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও মূল্যবোধ - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

207

বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে ধর্মবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে অনেক পার্থক্য থাকলেও পৃথিবীব্যাপী সকল ধর্মের রয়েছে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য। সকল নৃগোষ্ঠীর ধর্মেই অতিপ্রাকৃতের প্রতি এক ধরনের ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধ থাকে। এই বোধের দ্বারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য ও পবিত্র-অপবিত্রের সীমারেখা টানে, আর সে অনুযায়ী আচরণ করে। কেননা, তাঁরা মনে করে যে, এই নির্দিষ্ট ভালো আচরণের দ্বারাই মানুষ অতিপ্রাকৃত শক্তি বা সত্তার অনুগ্রহ লাভ করতে পারবে। অতিপ্রাকৃত শক্তির অনুগ্রহ লাভের আশায় সকল নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা বিভিন্ন অনুশাসন মেনে চলে। এই ধর্মীয় অনুশাসনগুলোকে বলে সামাজিক নিষেধাজ্ঞা।

পৃথিবীব্যাপী সকল ধর্মেই অন্য মানুষের প্রতি ভালো আচরণ ও মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত কাজকে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রতি ভক্তির নিদর্শন হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সুপ্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মাঝে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান বিরাজমান। সময়ের সাথে সাথে সকল নৃগোষ্ঠীর ধর্মের ক্ষেত্রে অনেক কিছু বদলে গেলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক জীবনে ধর্মের উপস্থিতি রয়েই গেছে। এ কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে ধর্মের কার্যকারিতা ও ভূমিকা বুঝতে পারা জরুরি। ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাগুলো হলো:

(১) সামাজিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কোনো একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা ভালো-মন্দ সংক্রান্ত ধ্যানধারণা গঠন করে এবং সমাজে ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। ধরা যাক, তুমি কারও বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেখলে খুব সুন্দর একটি জিনিস, যা তোমার নিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। তুমি যদি কাউকে না জানিয়ে জিনিসটি নিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েও যাও, তবুও তুমি তা নাও না, কারণ তুমি জানো একে বলে চুরি এবং চুরি করা অন্যায় ও পাপ কাজ। একই ভাবে, মিথ্যা বলা, কিংবা কাউকে আঘাত করা এগুলোও তাদের সমাজের সেখে অন্যায় বলেই মানুষ তা করা থেকে বিরত থাকে। এই ন্যায়-অন্যায়ের বোধ তারা প্রধানত তাদের ধর্ম থেকে পায়, আর এই নৈতিকতা বোধই তাদেরকে নানা অপকর্ম ও অনাচার থেকে বিরত রাখে।

(২) জীবন-মৃত্যু ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৌতূহলও চিরন্তর। তারাও কখনো না কখনো ভাবে 'আমি কোথা থেকে এলাম? মানুষই বা কোথা থেকে এলো? মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাব? বিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হলো?' তাদের ধর্মও তাদের কোনো না কোনোভাবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়। জীবন-মৃত্যু, বিশ্ব-সৃষ্টির রহস্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্ম মানুষের সাথে প্রকৃতির এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্কের দিক-নির্দেশনা দেয়। এভাবে মানুষের জীবন ও বেঁচে থাকাকে অর্থবহ করে তোলে ধর্ম।

(৩) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের নানা ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে সমাজের সদস্যদের মাঝে একাত্মতা ও সংহতিবোধ তৈরি করে, যার মাধ্যমে তাদের সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয় এবং সমাজ-ব্যবস্থা টিকে থাকে। এ সকল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস আর মূল্যবোধ আরও প্রগাঢ় ও সুদৃঢ় হয়। এভাবে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঐ ধর্মের অনুসারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মাঝে সামাজিক স্থিতি ও সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়।

(৪) বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে নানাভাবে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ভোগে। এছাড়াও রয়েছে নানাবিধ অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা। এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করে সফলতা লাভের আশায় এ সকল সমাজের মানুষেরা অতিপ্রাকৃত সত্তার কাছে প্রার্থনা জানায় বা বিভিন্ন আচার পালন করে। অনিশ্চয়তার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য ধর্ম তাদেরকে সহযোগিতা করে বলে তারা বিশ্বাস করে।

(৫) বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা মনে করে যে পবিত্রতা সংক্রান্ত কার্যাবলির মধ্য দিয়ে মোহ ও ভীতি দুই ধরনের অনুভূতিই তৈরি হয়। ধর্মীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের মানসিক মুক্তিও ঘটে। এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন চাপ সৃষ্টিকারী অনুভূতি, যেমন-ভয়, অপরাধবোধ, অনুতাপ, লজ্জা, ক্রোধ এবং উৎকণ্ঠার মুক্তি ঘটে এবং ইতিবাচক অনুভূতি যেমন-আশা, শান্ত, সৌহার্দ ইত্যাদি জন্ম হয়।

(৬) অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ তার চারপাশের জগতের অনেক কিছুকে স্বাভাবিক জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে না, ধর্ম তাদেরকে এক ধরনের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। নানা ধরনের আবেগ, উৎকণ্ঠা (সিদ্ধান্তহীনতা) ও মানসিক চাপ থেকে তারা মুক্তিলাভ করে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে। আবার ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে নানাভাবে অন্যকে সহযোগিতা করার জন্য উৎসাহিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজে কোনো ইহজাগতিক লাভ না থাকলেও পারলৌকিক পুরষ্কার ও পূণ্যের ভাবনা তাদেরকে নানা ধরনের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে উৎসাহিত করে।

ধর্মের কার্যাবলি: পৃথিবীর সকল ধর্মই মানুষকে অন্যদের প্রতি সহনশীল ও মানবিক আচরণের শিক্ষা দিলেও কিছু কিছু অনুসারীর মধ্যে এক ধরনের অনমনীয় মনোভাব দেখা যায়। এরা অন্য মানুষের ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে থাকে। অন্য ধর্ম বা অন্য ধর্মীয় মতবাদের প্রতি অশ্রদ্ধা ও বিরূপ মনোভাব সমাজে নানা বিপদ ও সংঘাত ডেকে আনতে পারে। এই ধরনের কিছু সমস্যা বাদ দিলে, সাধারণ অর্থে সমাজ ও ব্যক্তির নৈতিকতা ও মানব কল্যাণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ধর্মের অনেক কার্যকর ভূমিকা রয়েছে তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে। ধর্মের নানা ধরনের মনোজাগতিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে যেমন:

মনোজাগতিক প্রভাব

সামাজিক প্রভাব

○ বিশ্বব্রহ্মান্ডের অজানা বিষয় সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রদান করে।
○ অজানা ও অস্পষ্ট বিষয়কে ব্যাখ্যা করে ভীতি, দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা দূর করে।
○ সামাজিক ও নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
○ অনিশ্চিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে অতিপ্রাকৃত শক্তির সাহায্য ও সহায়তা লাভের আশা মানুষকে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ দেয়।

○ সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও আচরণবিধি প্রতিষ্ঠার নৈতিক রূপরেখা প্রদান করে।
○ সামাজিক শৃঙ্খলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করে।
○ সমাজের সংহতি ও সম্প্রীতি ধরে রাখে।
○ কোনো সামাজিক দলের সাথে ব্যক্তির সামাজিক পরিচয় ও সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে।
○ সামাজিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।

অনুশীলন

কাজ- ১:

সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পরিচয় দাও।

কাজ- ২:

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনে ধর্মের মনোজাগতিক ও সামাজিক প্রভাবসমূহ কী?

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...