তেভাগা আন্দোলন কৃষি উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশের দাবিতে সংগঠিত বর্গাচাষিদের আন্দোলন। এ আন্দোলনে সকল নৃগোষ্ঠীর চাষিরাই অংশগ্রহণ করে। ১৯৪৬-৪৭ সালে ভূমিমালিক এবং ভাগচাষিদের মধ্যে উৎপাদিত শস্য সমান দুইভাগ করার পদ্ধতির বিরুদ্ধে বর্গাদাররা প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে।
১৯৪৬ সালে আমন ধান উৎপাদনের সময়কালে বাংলার উত্তর এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের জেলাসমূহের ভাগচাষিরা নিজেদের উৎপাদিত ফসল কাটতে নিজেরাই মাঠে নামেন এবং তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করেন। দুটি কারণে এটি বিদ্রোহ হিসাবে চিহ্নিত। প্রথমত, তারা দাবি করে যে, অর্ধেক ভাগাভাগির পদ্ধতি অন্যায়। উৎপাদনে যাবতীয় শ্রম এবং অন্যান্য বিনিয়োগ করে বর্গাচাষি; উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পুঁজি বিনিয়োগ, শ্রম এবং অবকাঠামোতে ভূমিমালিকের অংশগ্রহণ থাকে অতিনগণ্য। এ কারণে, মালিকরা পাবেন ফসলের অর্ধেক নয় বরং এক-তৃতীয়াংশ। দ্বিতীয়ত, বর্গাচাষিরা দাবি করেন যে উৎপাদিত শস্যের সংগ্রহ মালিকদের কাছে নয় বরং থাকবে বর্গাচাষিদের বাড়িতে এবং ভূমিমালিক খড়ের কোনো ভাগ পাবেন না।
আন্দোলনটি তীব্র আকার ধারণ করে দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, খুলনা, ময়মনসিংহ, যশোর এবং চব্বিশ পরগনা জেলায়। ভূমিমালিকরা ভাগচাষিদের এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তারা পুলিশ দিয়ে আন্দোলনকারীদের অনেককে গ্রেফতার করে এবং তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু জমিদারদের দমন-পীড়ন আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারেনি। তেভাগা আন্দোলনের অগ্রবর্তী ধাপ হিসাবে কৃষকরা কোনো কোনো এলাকাকে তেভাগা এলাকা বা ভূস্বামী মুক্ত ভূমি হিসাবে ঘোষণা করে এবং তেভাগা কমিটি স্থানীয়ভাবে সেসব এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তেভাগা আন্দোলনের চাপে অনেক ভূস্বামী তেভাগা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে নেন এবং তাদের সাথে আপস করেন।
তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম কিংবদন্তী হলেন নাচোলের রানীমা ইলামিত্র। জমিদার-জোতদারদের হাত থেকে বাঁচতে ১৯৩৬ সালে প্রথম গঠিত হয় সর্বভারতীয় কৃষক সমিতি। তারপর ১৯৪০ সালে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করে ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ চাষীদের দেওয়ার পক্ষে কৃষক সমাজ আস্তে আস্তে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। তখনই ইলামিত্র এই আন্দোলনে শরিক হোন এবং অল্প দিনেই তিনি আন্দোলনের নেতৃত্বে চলে আসেন। ১৯৪৬-৪৭ সালে তেভাগা আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করে তখন পুলিশ ঠাকুরগাঁয়ে তেভাগা আন্দোলনের নেতা ডোমা সিং কে গ্রেফতার করতে গেলে শত-শত কৃষক তা প্রতিরোধ করে। এসময় পুলিশের গুলিতে নিহত হয় সফরচাঁদ, মুকুটসিংহ ও নেনদেনিসিংহ। পুলিশের নির্যাতন-নিপীড়নে আন্দোলন যখন কিছুটা ভাটা পড়ে যায় তখনই এগিয়ে আসে নাচোলের রাণী ইলামিত্র। তিনি অল্প দিনেই সবার কাছে রাণী মা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | প্রথম হাজং বিদ্রোহ ঘটেছিল কেন? কে নেতৃত্ব দিয়েছিল? |
| কাজ- ২: | টংক আন্দোলন কী? এটি কাদের আন্দোলন ছিল? |
Read more