বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহাড়িয়ারা এক সময় বন জঙ্গল নদী-নালার উপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে তারা শিকার করে খাদ্য সংগ্রহ করত। ঐ সময় খরগোশ, কুচে এবং শামুক তাদের পছন্দের খাবার ছিল কিন্তু বর্তমানে খুব একটা দেখা যায় না। বর্তমানে ভাত মাছ, ডাল, সবজি প্রভৃতি অন্য সকলের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরও সাধারণ খাবার। চালের গুড়ার তৈরি নানা প্রকার পিঠা ওরাঁওদের ঐতিহ্যময় খাবার। বাঙালিদের পিঠার সঙ্গে এগুলোর সাদৃশ্য রয়েছে। মুড়ি, মুড়কি নাড়ু মোয়াতো রয়েছেই। কোল, গন্ড, তুরি পাহান, বাগদি, মাহাতো, মাহালী, ভূমিজ, মালো, মুন্ডা, রাজোয়াড়, সাঁওতাল প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীর মানুষের খাদ্যাভ্যাস ওরাঁওদের অনুরূপ। তবে ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে কেউ হয়তো কোনো কোনো বিশেষ খাবার গ্রহণ করেন না। যেমন তুরিসহ অনেকেই গরুর মাংস খান না। তবে এদের অনেকেই ভাত হতে এক প্রকার পানীয় তৈরি করে যার নাম হাঁড়িয়া। বিভিন্ন উৎসব, পার্বণে ও বিয়ের অনুষ্ঠানে এই হাঁড়িয়া পান করা হয়।
বর্মন, বানাই, হাজং, ডালু এবং কোচসহ উত্তরবঙ্গের অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের প্রতিদিনের সাধারণ খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত, মাছ, মাংস ইত্যাদি। তবে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের রান্নার প্রক্রিয়ায় কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। আবার উৎসব অনুষ্ঠানের খাবারও আলাদা হয়ে থাকে। মান্দিদের অন্যতম খাবার হচ্ছে বিন্নি চালের ভাত মিমিল, গুলথুমমান্থি, গানথং মাছি, মেগারুজওয়া, মেখপ বিত্তা, খিওয়েক খারি, সথুপা, খাপ্পা, মিব্রাম, নাখাম প্রভৃতি।
পাত্ররা 'পাচুবেন' নামে একটি প্রিয় খাবার খেয়ে থাকে যা মূলত মাছ ও চাপা শুঁটকি দিয়ে রান্না করা এক ধরনের স্যুপ। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী মণিপুরীদের অধিকাংশই নিরামিষ ভোজী। অনুষ্ঠানাদিতে দই, চিড়া, খই এর প্রচলন রয়েছে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে। খাদ্য তালিকায় শাক, সবজি ও ফল তাদের কাছে পছন্দের। রাখাইনদের প্রিয় খাবার বিন্নিভাত এবং ছোট ছোট চিংড়ি মাছের তৈরি নাপ্পি।
সাঁওতালদের প্রতিদিনের সাধারণ খাবারের তালিকা অনেকটা বাঙালিদের মতোই। তবে ভেড়া, ছাগল, হাঁস, মুরগি এবং বন্য প্রাণীর মধ্যে হরিণ, খরগোশ ও কিছু পাখির মাংস খেয়ে থাকে।
পাহাড়ের প্রায় সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরই খাদ্যতালিকায় সাধারণ খাবার হচ্ছে ছোট ছোট চিংড়ি মাছের তৈরি নাপ্পি। এছাড়া খেয়াং বা খুমিরা বন্যপ্রাণী শিকার করলে তার মাংস শুকিয়ে রাখে এবং তা পরে খায়। একাধিক পদের সবজি মাছ অথবা মাংসসহ টক-ঝাল মিশিয়ে তৈরি হয় 'কাইংরাবুং' যা চাকদের ঐতিহ্যবাহী খাবার। শুঁটকি, সিদ্ধ তরকারি, মরিচবাটা ঐতিহ্যবাহী খাবার। সিদ্ধ তরকারিকে 'উসুনা চন' বলে।
চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে রান্না করা খাদ্য ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি অতিথিদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। রান্নার পদ্ধতির মধ্যে উচ্যা, সিক্যা, হলা গুদেয়্যা, কেবাং, গরাঙ, কোরবো উল্লেখযোগ্য। কোনো তরকারি সেদ্ধ করে খাওয়াকে উচ্যা বলা হয়। প্রধানত শাক-সবজিই সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। সিক্যা হচ্ছে লবণ, হলুদ আর মরিচ মিশিয়ে মাংসখণ্ড আগুনে সেঁকে খাওয়া।
'হলা' হলো কম ঝোল দিয়ে মাছ-মাংস রান্না করা। ধাতব কোনো পাত্রে বা বাঁশের চোঙায় মরিচের পরিমাণ বেশি দিয়ে মিশ্রিত বা চূর্ণ করে প্রস্তুতকৃত কোনো তরকারিকে 'গুদেয়্যা' বলে। কলা পাতা বা অন্যান্য পাতা মুড়িয়ে আগুনে রান্না করা কোনো তরকারিকে 'কেবাং' বলে। পাতা দিয়ে রান্না করা হয় বলে এক বিশেষ সুগন্ধি ও স্বাদ সৃষ্টি হয়। প্রচুর মরিচ আর পেঁয়াজ বা শুঁটকি বা সিদোল মিশিয়ে কোনো শাকসবজি মিশ্রিত করে প্রস্তুত খাদ্য হচ্ছে- 'কোরবো'।
অনুশীলন | |
কাজ- ১: | ওরাঁওদের প্রধান প্রধান খাদ্যের নাম লেখ। |
কাজ- ২: | পাহাড়ের অধিকাংশ নৃগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় সাধারণ খাবারের নাম কী? কীভাবে তৈরি হয়? |
Read more