লোকজ জ্ঞান (পাঠ ১)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজ জ্ঞান - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

343

কোনো অঞ্চলে শত শত বছর বসবাস করে স্থানীয় পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব জীবনধারা ও সংস্কৃতি গড়ে তোলে। বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের উৎস, আহরণের উপায় ও প্রস্তুত করার কৌশল উদ্ভাবন করেছে। এভাবেই তারা তাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানের সাহায্যে আবাসস্থল নির্মাণ করে কিংবা তার চারপাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে জীবন ধারণ করে। এসব বিষয়ে সকল সংস্কৃতির মানুষেরই রয়েছে নিজস্ব স্থানীয় জ্ঞান। কৃষিকাজ, স্বাস্থ্যরক্ষা, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য বহুবিধ কাজে এ ধরনের লোকজ বা আঞ্চলিক জ্ঞান ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবে সকল সংস্কৃতির মানুষই তাদের নিজস্ব পরিবেশ সম্পর্কে স্থানীয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করে। সংস্কৃতিলব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমেই মানুষ স্থানীয় প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। নিজস্ব বসবাস অঞ্চলের পরিবেশ সম্পর্কে কোনো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিলব্ধ জ্ঞান হলো লোকজ জ্ঞান।

মানুষের জীবনধারণের অভিজ্ঞতা থেকে লোকজ বা স্থানীয় জ্ঞানের উৎপত্তি। এই জ্ঞানের উৎস কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়। বরং সাধারণ মানুষের আলোচনার মাধ্যমে বা মুখে মুখে লোকজ জ্ঞান বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হয়। এসকল লোকজ জ্ঞান সাধারণত কোনো বই বা গ্রন্থে সবসময় মুদ্রিত থাকে না। লোকজ বা স্থানীয় জ্ঞান তাই নির্দিষ্ট অঞ্চল ও সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে। লোকজ জ্ঞান হলো নির্দিষ্ট সমাজ-সংস্কৃতিতে গড়ে উঠা স্থানীয় পর্যায়ের জ্ঞান যা ঐ সমাজ-সংস্কৃতির অনন্য ঐতিহ্য। আমাদের দেশে কৃষকের বিভিন্ন অঞ্চল ভিত্তিক চাষাবাদ সম্পর্কিত পৃথক পৃথক জ্ঞানকে লোকজ বা স্থানীয় জ্ঞান বলা যেতে পারে। কৃষক জানেন যে কীভাবে বীজ সংরক্ষণ করতে হয়, কীভাবে বীজতলা করলে ভালো চারা উৎপন্ন হয়, কোন জমিতে কোন ধরনের ফসল ভালো হয়, কখন সার দিতে হয় ইত্যাদি। একইভাবে আকাশে মেঘের অবস্থান ও রং দেখে গ্রামের সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কতটা। এগুলো সবই লোকজ বা স্থানীয় জ্ঞানের উদাহরণ। লোকজ জ্ঞানের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যথা:

  • এটি অঞ্চল ও সংস্কৃতিভেদে নির্দিষ্ট।
  • জীবনধারণ ও প্রতিনিয়ত টিকে থাকার জন্য এই জ্ঞান অপরিহার্য।
  • এই জ্ঞান বই-পুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ বা লিপিবদ্ধ নয়।
  • এই জ্ঞানের প্রসার ও প্রবাহ হয় সাধারণত মৌখিক, কথ্য রীতি বা আলোচনার মধ্য দিয়ে।
  • মানুষের অভিজ্ঞতা, খাপ খাওয়ানো বা অভিযোজন, পরীক্ষা- নিরীক্ষা ও আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করেই এই জ্ঞান সৃষ্টি হয়।

লোকজ জ্ঞান এবং আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য

লোকজ জ্ঞানআধুনিক জ্ঞান
লোকজ জ্ঞান সাধারণত মানুষের মুখে মুখে বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হয়।আধুনিক জ্ঞান হলো লিখিত। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে আধুনিক জ্ঞান শেখানো হয়।
দৈনন্দিন কাজকর্ম আর কাজের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে লোকজ জ্ঞান অর্জিত হয়।আধুনিক জ্ঞান বিশ্লেষণমূলক। যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে আধুনিক জ্ঞান আহরণ করা হয়।
সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে সম্পর্কিত এই জ্ঞান অনুসারে প্রকৃতির সকল উপাদান আন্তসম্পর্কীয়। তাই লোকজ জ্ঞান সামগ্রিক এবং আলাদা বা শাখা-উপশাখায় বিভক্ত নয়।আধুনিক জ্ঞান বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বা ধারা-উপধারায় বিভক্ত। যেমন: বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা।

বর্তমানে আধুনিক জ্ঞান প্রসারের কারণে এই লোকজ জ্ঞান নানা ভাবে অবহেলিত হয়েছে। আমরা খুব সহজে ভুলে যাই যে এই লোকজ জ্ঞান ও কৌশল দ্বারাই শত শত বছর ধরে মানুষ তার প্রকৃতি, সমাজ ও পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে বসবাস করে আসছে। যেহেতু লোকজ জ্ঞান মানুষের বেঁচে থাকার সাথে সম্পর্কিত, স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এই জ্ঞানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ও জীবনধারণ করে। উল্লেখযোগ্য কিছু ক্ষেত্র হলো: (১) কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, (২) স্বাস্থ্য, (৩) শিক্ষা, (৪) প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও (৫) সমাজ ভিত্তিক অন্যান্য কার্যক্রম।

অনুশীলন
কাজ- ১:লোকজ জ্ঞান বলতে কী বোঝায়? লোকজ জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে আলোচনা করো।
কাজ- ২:লোকজ জ্ঞান ও আধুনিক জ্ঞানের পার্থক্য লেখ।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...