বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কাঠামোতে অঞ্চল ও নৃগোষ্ঠীভেদে বেশ কিছু পার্থক্য দেখা যায়। যেমন দেশের প্রায় ৪৫ টি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে মান্দি এবং খাসি জনগোষ্ঠী হলো মাতৃসূত্রীয় এবং বাকি সবাই পিতৃসূত্রীয়। স্বভাবতই মাতৃসূত্রীয় সমাজ কাঠামোর সাথে পিতৃসূত্রীয় সমাজ কাঠামোর বেশ পার্থক্য রয়ে গেছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের সমতল অঞ্চলের অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যেও রয়েছে বেশ কিছু পার্থক্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজ পিতৃসূত্রীয়। তারা সবাই চাকমা, বোমাং এবং মং এই তিনটি সার্কেলের মধ্যে কোনো না কোনো একটির বাসিন্দা। সার্কেল প্রধান হলেন রাজা এবং রাজার আদালতই প্রথাগত আইন ও শাসন-ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ আদালত। রাজা তার সার্কেলের আওতাভুক্ত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক বিচার কার্য ও বিরোধ নিজ নিজ নৃগোষ্ঠীতে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী সমাধা করে থাকেন। এর পরের স্তরে আছেন হেডম্যান বা মৌজা প্রধান। তিনি তার মৌজার বাসিন্দাদের সামাজিক বিরোধ ও বিচার কাজ নিষ্পত্তি এবং সরকার নির্ধারিত হারে ভূমি ও জুমের খাজনা আদায় করেন। হেডম্যানের বিচার কাজে সন্তুষ্ট না হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রাজার আদালতে আপিল করতে পারেন। এর পরে রয়েছেন গ্রাম প্রধান বা কারবারী। তিনিও একইভাবে তার গ্রামের বাসিন্দাদের সামাজিক বিরোধ নিস্পত্তি করেন এবং গ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত হয় এক একটি গ্রাম (চাকমা ভাষায় যার নাম আদাম বা পাড়া)। পিতা হলেন পরিবারের কর্তা। পরিবারে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিতার ভূমিকাই মুখ্য। অন্যদিকে মান্দি ও খাসি সমাজ মাতৃসূত্রীয় হওয়ায় পরিবারে মাতা এবং মামার ভূমিকাই প্রধান, যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে।
বর্তমানে সমাজপতি হিসাবে রাজার অস্তিত্ব না থাকলেও প্রাচীনকালে মান্দি সমাজে রাজপ্রথা বা রাজার শাসন চালু ছিল। সময়ের পরিক্রমার সাথে মান্দিদের প্রথাগত নেতৃত্বে ও ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় আখিং নকমা (আখিং প্রধান), সংনি নকমা (গ্রাম প্রধান), ড্রা পান্থে (মেয়ের পক্ষের পুরুষ আত্মীয়বর্গ) প্রভৃতি প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের বেশ গুরুত্ব ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আগে সমাজের যাবতীয় বিরোধ এবং অপরাধের বিচার নিষ্পত্তি হতো। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। ফলে সমাজের সদস্যরা এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং দেশের সাধারণ প্রশাসন ও আইন আদালতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
অন্যদিকে মণিপুরী সমাজে ঐতিহ্যবাহী প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও টিকে আছে। পাড়া বা গ্রাম হচ্ছে মণিপুরী সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। প্রত্যেক গ্রামে রয়েছে একটি গ্রাম পঞ্চায়েত। গ্রামের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান নিযুক্ত হন। সমাজের সদস্যদের বিভিন্ন বিরোধ এবং অপরাধের বিচার গ্রাম পঞ্চায়েত নিষ্পত্তি করে থাকে। মণিপুরীদের সব গ্রামের সমন্বয়ে গড়ে উঠে পরগনা পঞ্চায়েত। জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এই পরগনা পঞ্চায়েতের সদস্য পদ লাভ করেন। গ্রাম পঞ্চায়েতে যেসব বিরোধ বা সমস্যার নিষ্পত্তি হয় না সেসব জটিল এবং অমীমাংসিত সমস্যাগুলো পরগনা পঞ্চায়েতে নিষ্পত্তি করা হয়। সিংলুপ নামে মণিপুরীদের আরেকটি প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত এই সিংলুপের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ এবং জ্ঞানী ব্যক্তিগণ এই সিংলুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
অনুরূপভাবে বাংলাদেশের সকল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে তাদের নিজস্ব প্রথাগত নেতৃত্ব এবং ক্ষমতা কাঠামো রয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বাদে অন্য প্রায় সকল নৃগোষ্ঠীর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের প্রথাগত নেতৃত্ব মূলত গ্রামকেন্দ্রিক। গ্রাম সমাজকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাদের বিভিন্ন প্রথাগত প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কাঠামো। এর পাশাপাশি বর্তমানে দেশে প্রচলিত সাধারণ প্রশাসনের গুরুত্বও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সমাজে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ সমাজের অগ্রসর এবং শিক্ষিত ব্যক্তিদের অনেকেই এখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে জনপ্রতিনিধি কিংবা সামরিক বেসামরিক আমলা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথাগত নেতৃত্ব এবং দেশের সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টাও কোথাও কোথাও লক্ষ করা যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত নেতৃত্ব এবং সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামোর সহাবস্থান এখানে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত নেতৃত্ব এবং ক্ষমতা কাঠামোর (রাজা-হেডম্যান-কারবারী) পাশাপাশি রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং দেশের সাধারণ জেলা এবং উপজেলা প্রশাসন। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। এই পরিষদের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মূলত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে আসা রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং অন্যান্য স্থানীয় পরিষদসমূহের অধীনে পরিচালিত সকল উন্নয়ন কার্যক্রম এবং অন্যান্য বিষয়, তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন এবং আইন শৃঙ্খলার তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধন; ভারী শিল্পের লাইসেন্স প্রদানের দায়িত্বসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত রীতিনীতি, সামাজিক বিচার-আচার, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, এনজিও কার্যক্রম, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকান্ড - প্রভৃতির তত্ত্বাবধান এবং সমন্বয় সাধন করা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের অন্যতম দায়িত্ব। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের অনেক নেতা কর্মী জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে দেশের জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের কেউ কেউ সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ কিংবা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেউ কেউ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসাবেও দায়িত্ব পালন করে থাকেন। প্রথাগত নেতৃত্ব ও শাসন কাঠামোর বাইরে জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের অংশগ্রহণ কিংবা ভূমিকাও দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের প্রেক্ষাপট এবং এর কার্যবলি সম্পর্কে আলোচনা করো। |
| কাজ-২: | একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের পদবি কি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কাঠামোর অংশ? |
Read more