কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক বিচার ব্যবস্থার উদাহরণ (পাঠ ৯ ও ১০)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

178

চাকমা সমাজে নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত বিবাহ: রক্ত সম্পর্কিত নিকটাত্মীয় এবং ভিন্ন ধর্ম ও জাতির পাত্রেরসাথে বিবাহ চাকমা সমাজে নিষিদ্ধ। এ ধরনের কোনো বিবাহকে নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত বিবাহ বলে গণ্য করা হয়। নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ দম্পতিকে সামাজিক আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করার বিধান রয়েছে। সমাজে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শপথনামা পাঠ কিংবা অন্যান্য প্রথাগত অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করলেও এ ধরনের বিবাহ নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত বিবাহ বলে গণ্য হবে। এ ধরনের অননুমোদিত বিবাহ বা নিষিদ্ধ সম্পর্কের শাস্তি স্বরূপ চাকমা সমাজের প্রথা অনুযায়ী জরিমানা হিসাবে শূকর ও অর্থদণ্ড দিতে হয়।

সম্পত্তিতে চাকমা নারীর উত্তরাধিকার: চাকমা সমাজে কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রথাগত আইন অনুযায়ী তার প্রতিকারের বিধান রয়েছে। সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে, চাকমা সমাজে নারীরা পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। এই অভিযোগ সর্বাংশে সত্য নয়। কোনো পিতা ইচ্ছা করলে তার সম্পত্তি পুত্র কন্যা নির্বিশেষে সবার মাঝে সমান ভাবে বণ্টন করে দিতে পারেন। এ ছাড়া কোনো পিতা মাতা অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে কন্যারা তাদের সম্পত্তির অধিকার লাভ করে। সন্তান বা অন্য কোনো উত্তরাধিকারী ছাড়া ভাই মারা গেলে বোনেরাই তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। এছাড়া বিধবা স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে। বর্তমানে চাকমা সমাজের নারীরা যাতে পুরুষ উত্তরাধিকারীদের মতো সম্পত্তির সমান অংশ পায় তার জন্যে চাকমা সমাজের প্রথাগত আইনের সংশোধন বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা অব্যাহত আছে।

লুসাই জনগোষ্ঠীর সামাজিক বিচার ব্যবস্থা: পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে লুসাইরা জনসংখ্যার বিচারে সবচেয়ে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। লুসাই সমাজপতি বা সর্দারকে 'লাল' নামে অভিহিত করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্বে 'লাল'-এর কর্তৃত্বাধীনে লুসাই সমাজের বিচার ও শাসন কার্য পরিচালিত হতো। সমাজপতি বা সর্দারকে সহযোগিতা প্রদানের জন্য উপা (কাউন্সিলর), পুইথিয়াম (পুরোহিত), জালেন (নিরপেক্ষ), রামহুয়ালতু (ভূমি বিশেষজ্ঞ), টুলাংআউ (ঘোষক) এবং থিরদেং (কামার) এসব পদবিধারীরা নিয়োজিত ছিল। পরে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি প্রবর্তিত হওয়ায় এর অধীনে কারবারী, হেডম্যান এবং সার্কেল চিফ এই তিন স্তরের প্রথাগত আদালতের মাধ্যমে তাদের যাবতীয় সামাজিক বিরোধ নিষ্পন্ন হয়ে আসছে। লুসাই সমাজের প্রথাগত আইন অনুসারে মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রী আইনগত উত্তরাধিকারী নন। মৃতের পুত্র সন্তানরাই পিতার যাবতীয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। আর পুত্র সন্তান যদি না থাকে তাহলে মৃত ব্যক্তির ভাই, ভ্রাতুষ্পুত্র বা গোত্রের রক্ত সম্পর্কিত পুরুষ আত্মীয়রাই মৃতের সম্পত্তি পেয়ে থাকে। কণিষ্ঠ পুত্র পিতার সম্পত্তির বড় অংশ পেয়ে থাকে। কারণ লুসাই সমাজের রীতি অনুসারে তাকে পিতা মাতার ভরণপোষণ করতে হয়। তবে মৃতের বিধবা স্ত্রী সন্তানদের সাথে বসবাস করলে পরিবারে তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়। আর বিধবা স্ত্রী পুনরায় বিবাহ করলে তাকে আগের স্বামীর পরিবার থেকে আমৃত্যু ভরণপোষণ লাভের অধিকার হারাতে হয়।

কন্যা সন্তানেরা পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী না হলেও বিয়ের আগ পর্যন্ত পরিবার থেকে যাবতীয় ভরণপোষণ পেয়ে থাকে। তবে পিতা মাতা বা অন্য কেউ যদি কোনো সম্পত্তি দান বা উইল করে দেন তাহলে কন্যাদের সে সম্পত্তি পেতে কোনো বাধা নেই। বিবাহ বিচ্ছেদের কারণেও স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির অংশ পেয়ে থাকে। বিবাহের আগে বা পরে নিজের উপার্জিত অর্থে বা স্বীকৃত অন্য কোনো উপায়ে সম্পত্তি অর্জন করলে তার উপর নিরঙ্কুশ মালিকানা বা অধিকার লুসাই নারী ভোগ করতে পারেন। সমাজ স্বীকৃত সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে স্বামী বা স্ত্রী উভয়েই সমাজপতি বা সামাজিক আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। লুসাই ভাষায় বিবাহ বিচ্ছেদকে "ইনঠেন” বলা হয়।

বিধবা কিংবা স্বামী বিচ্ছিন্ন স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহ লুসাই সমাজে স্বীকৃত। তবে স্বামী যদি স্ত্রীর ভরণপোষণ না করে বা দাম্পত্য সম্পর্ককে নিরবচ্ছিন্ন না রাখে কিংবা যদি কন্যা সন্তান বা স্ত্রী নিজের বেলায় উপরে উল্লিখিত যাবতীয় অধিকার খর্ব হচ্ছে মনে করে, সেক্ষেত্রে সমাজপতি 'লাল' কিংবা সামাজিক ও দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করার মাধ্যমে তারা নিজেদের অধিকার পুনরুদ্ধার করতে পারেন।

ওরাঁও জনগোষ্ঠীর সামাজিক বিচার ব্যবস্থা: সমাজের যাবতীয় বিবাদ নিষ্পত্তি এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ওরাঁওদের গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত গ্রাম সংগঠন রয়েছে। এই সংগঠনকে তাদের ভাষায় পাঞ্চেস বলা হয়। গ্রামের বয়স্ক সাত আটজন ব্যক্তি নিয়ে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য পাঞ্চেস গঠিত হয়। প্রতিটি গ্রামে একজন মহাতোষ এবং একজন পুরোহিত বা নাইগাস থাকেন। মূলত তাদের নেতৃত্বে পাঞ্চেস পরিচালিত হয়। পাঞ্চেস-এর কাছে বিচার প্রার্থীকে নির্দিষ্ট পরিমাণে ফি পরিশোধ করতে হয়। সাধারণ বিবাদের জন্য এই ফি-এর পরিমাণ হয়ে থাকে ১.২৫ টাকা এবং জমি সংক্রান্ত বিবাদের জন্য ১০ টাকা থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত। পাঞ্চেস এর রায়ে সন্তুষ্ট হতে না পারলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ "পাঁড়হা-পাঞ্চেস"-এ আপীল করতে পারে। পাঁড়হা হলো সাধারণত সাত থেকে বারোটি গ্রাম নিয়ে গঠিত একটি কনফেডারেশন।

গ্রামের পাঞ্চেসের মধ্য থেকে একজনকে পাঁড়হা প্রধান বা রাজা নিযুক্ত করা হয়। ওরাঁও ভাষায় যার নাম "পাঁড়হা বেলাস”। তার নেতৃত্বে গঠিত হয় "পাঁড়হা পাঞ্চেস”। সমাজে বা গ্রামগুলোর মধ্যে কোনো বিবাদ সংগঠিত হলে "পাঁড়হা পাঞ্চেস"-এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। সামাজিক এসব বিচার ব্যবস্থা বা পাঞ্চেসের সদস্যগণ কোনো পারিশ্রমিক নেননা। তারা স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে নিজেদের শ্রমের বিনিময়ে সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। তবে সামাজিক বন্ধন শিথিল হওয়ার কারণে বর্তমানে ওরাঁও সমাজের অনেকেই প্রথাগত বিচার ব্যবস্থার চেয়ে দেশের সাধারণ আইন আদালতের প্রতি বেশি আগ্রহী।

মান্দি জনগোষ্ঠীর সামাজিক-বিচার ব্যবস্থা: ওরাঁওদের মতো মান্দি জনগোষ্ঠীর সমাজে প্রচলিত কিছু সামাজিক বিচার প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। চুরি, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যাচার, সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা, হুমকি প্রদান, শ্লীলতাহানির চেষ্টা ইত্যাদি অপরাধের জন্য মান্দি সমাজের গ্রাম প্রধান এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মিলে শাস্তির বিধান করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো চোর ধরা পড়ে তাহলে তাকে চুরি যাওয়া যাবতীয় সম্পত্তি ফেরত দিতে হবে বা টাকার অংকে সম্পত্তির সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করতে হবে। কারও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সেই বাড়ি পুনঃনির্মাণ করে দেওয়ার জন্য বাধ্য করা হয় এবং গ্রাম প্রধান কর্তৃক নির্ধারিত জরিমানাও আদায় করা হয়। ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে ঋণ গ্রহণকারীর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে তা পরিশোধ করতে হয়। সমাজের কোনো সদস্য যদি কাউকে হুমকি দেয় তাহলে সেই অপরাধের জন্য তাকে কমপক্ষে এক হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়। তবে বাংলাদেশে নানা প্রতিকূল অবস্থার কারণে প্রথাগত সামাজিক আদালতের গুরুত্ব কমে যাওয়ায় মান্দি সমাজের অনেকেই এখন দেশের সাধারণ প্রশাসন বা বিচার ব্যবস্থার শরণাপন্ন হন। বাংলাদেশের অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে নিজস্ব প্রথাগত বিচার-ব্যবস্থা চালু থাকলেও সেগুলোর কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি এখনও নেই। তার উপর দেশের সাধারণ প্রশাসন ও বিচার-ব্যবস্থার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত আইন ও বিচার-ব্যবস্থার গুরুত্ব ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে।

অনুশীলন
কাজ- ১:চাকমা সমাজে অননুমোদিত বিবাহ বলতে কী বোঝায়? সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে চাকমাদের প্রথাগত আইনের অবস্থান ব্যাখ্যা করো।
কাজ-২:লুসাই নৃগোষ্ঠীর প্রথাগত নেতৃত্ব এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার ব্যবস্থার বিবরণ দাও।
কাজ-৩:ওরাঁও নৃগোষ্ঠীর পাঞ্চেস প্রথা এবং সামাজিক বিচারে জরিমানার কিছু উদাহরণ তুলে ধরো।
কাজ-৪:মান্দি নৃগোষ্ঠীর সামাজিক বিচারে অভিযুক্তকে কী ধরনের শাস্তি প্রদান করা হয়?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...