ধর্মীয় ভাবধারা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের বিভিন্ন আচরণ, কার্যাবলি বা অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। এগুলোকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বলা হয়ে থাকে। এই আচার-অনুষ্ঠান ধর্মের অত্যাবশ্যক বিষয়। আচার-অনুষ্ঠানগুলো এর অর্থ ও গুরুত্বের দিক থেকে দৈনন্দিন অন্যান্য কার্যক্রমের চেয়ে আলাদা হয়। অতিপ্রাকৃত শক্তিকে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে নিজেদের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা এই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে এগুলো পালনের মাধ্যমে তারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র আত্মা, শক্তি বা জগতের সাথে নিজেকে সম্পর্কযুক্ত করার চেষ্টা করে।
কোনো কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক ভঙ্গির ব্যবহার করে, পবিত্র বাণী উচ্চারণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বস্তু বা সামগ্রী ব্যবহার করে। ধর্ম বিশ্বাসীদের জন্য এই কার্যক্রম পালন করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। অতিপ্রাকৃত শক্তিকে তুষ্ট করার জন্য পালিত এসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলোর পদ্ধতি বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন, (১) প্রার্থনা, সাধনা ও ভক্তিমূলক, (২) বলিদান, উৎসর্গ বা বিসর্জনমূলক এবং (৩) জাদুবিদ্যামূলক। সংস্কৃতি ও ধর্ম ভেদে এই আচার-অনুষ্ঠানগুলোর দৃশ্যমান রূপ বা উপস্থাপনে পার্থক্য দেখা যায়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাইরে অন্যান্য গোষ্ঠীর সদস্যরাও এ ধরনের অনেক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। যেমন মৃত ব্যক্তির দেহের সৎকার ও আত্মার কল্যাণের জন্য সব সমাজেই কিছু না কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় ভাবধারা অনুসারে মৃত ব্যক্তির আত্মা ও তার পরিবারের কল্যাণের জন্য কেউ মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে, আবার কেউবা মৃতদেহকে কবর দেয়। আর মৃতদেহ সৎকারের আগে ও পরে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। আবার বিশেষ কোনো ইচ্ছাপূরণের জন্য, রোগ কিংবা বিপদ মুক্তিতে সাহায্যের আশায় ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। এ সকল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ধরন এবং পালনের উদ্দেশ্য ও সামাজিক ফলাফল এখানে আলোচনা করা হলো:
| আচার-অনুষ্ঠানের ধরন | ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের উদ্দেশ্য | আচার-অনুষ্ঠান পালনের সামাজিক ফলাফল |
| ভাবাবেগ বৃদ্ধির কৃত্য বা আচার-অনুষ্ঠান | (১) প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ; (২) ব্যক্তির নিয়তি বা ভাগ্য নির্ধারণ; (৩) গোষ্ঠী বা সমাজের সকলের নিয়তি বা ভাগ্য নির্ধারণ; (৪) পাপ মোচন অর্থাৎ পাপ কাজের পরিণাম থেকে মুক্তি পাওয়া; (৫) ব্যক্তির আত্মিক উন্নয়ন ও সাধনার জন্য। | নির্দিষ্ট সমাজের অভ্যন্তরের: (১) বিভিন্ন গোষ্ঠী ও দলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে; (২) বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলের মাঝে সামাজিক সংহতি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি গড়ে উঠে, দৃঢ় হয় এবং বজায় থাকে। |
| জীবন পর্যায় পরিবর্তনের কৃত্য বা আচার-অনুষ্ঠান | ব্যক্তিজীবনের বা জীবনচক্রের এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে সামাজিক মর্যাদা আর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটান। যেমন: (১) একটি শিশুর জন্ম উপলক্ষে পালিত আচার-অনুষ্ঠান; (২) একটি শিশুর নামকরণের আচার-অনুষ্ঠান; (৩) বাচ্চাদের বয়ঃসন্ধির সময় পালিত আচার-অনুষ্ঠান; (৪) বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান; (৫) মৃত্যু ও মৃতদেহ সৎকার নিয়ে পালিত আচার-অনুষ্ঠান। | (১) ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থানের পরিবর্তন। (২) সামাজিক দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি ও বৈধতা অর্জন। যেমন বিয়ের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একটি দম্পতি এক সাথে থাকা কিংবা সন্তান জন্মদানের স্বীকৃতি ও বৈধতা অর্জন করে। |
নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, সামাজিক সংহতি ও ঐক্যের বোধ ধরে রাখার জন্য এ সকল নৃগোষ্ঠীর মাঝে বিদ্যমান আচার-অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম। মসজিদ, মন্দির, চার্চ কিংবা প্যাগোডাতে অথবা সমাজের সবাই একসাথে মিলিত হয়ে নিয়মিতভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে সকলের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও একাত্বতার চেতনা গড়ে উঠে।
অনুশীলন | |
কাজ- ১: | ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মানুষ কেন পালন করে? |
কাজ- ২: | ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সামাজিক ফলাফল কী কী? |
Read more