ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ধর্মীয় পুরাণ ও বিশ্বাস (পাঠ ৭)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও মূল্যবোধ - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

230

ধর্মীয় দিক থেকে পবিত্র কাহিনীকে পুরাণ বা মিথ বলা হয়। সকল ধর্মের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সনাতনী ধর্মে কীভাবে জগৎ সৃষ্ট হলো, কীভাবে মানুষের জন্ম হলো-কী তার আচার, আচরণ ও সংস্কৃতি এ সংক্রান্ত কাহিনীর বিবরণ আছে। অতিপ্রাকৃত শক্তির ধরন, সৃষ্টিকর্তা ও দেব-দেবীর অলৌকিক ক্ষমতা এবং মহাজগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়বস্তু নিয়ে গড়ে উঠে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ধর্মীয় পুরাণ বা মিথ। এসব পৌরাণিক কাহিনি থেকে পৃথিবীতে প্রথম মানুষের আবির্ভাব, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সভ্যতার উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায়। ধর্মীয় পুরাণ বা মিথের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সমাজের অনেক রীতি-নীতি, প্রথা ও আইন-কানুন গড়ে উঠে। মানুষের ভালো-মন্দ, জীবন-মৃত্যু, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, সমাজের উচু-নিচু জাত ইত্যাদি বিষয়ে পৌরাণিক কাহিনির মধ্য দিয়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এজন্য পৌরাণিক কাহিনিগুলো মানুষের কাছে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। এসব কাহিনিকে ঘিরে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে পালিত হয় নানারকম আচার-অনুষ্ঠান।

এবার তোমাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী ম্রোদের একটি পৌরাণিক কাহিনি বলব। ম্রো গোষ্ঠীর লোকজন সর্বপ্রাণবাদী ধর্মের অনুসারী। ম্রোরা নিজেদের ম্রোঢ়া বলে থাকে। 'ম্রো' অর্থ মানুষ আর 'চা' অর্থ দল। ম্রো পূরাণ অনুযায়ী, ভূলোকের সৃষ্টিকর্তা থুরাই একবার পৃথিবীর সব জাতি বা দলকে একটি নির্দিষ্ট দিনে একটি নির্দিষ্ট সময় তার কাছে একজন প্রতিনিধি পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন সেই সম্মেলনে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর যে প্রতিনিধি উপস্থিত হবেন তার হাতে তিনি সেই গোষ্ঠীর ধর্মগ্রন্থ তুলে দেবেন। এছাড়াও তাদের জন্য পালনীয় ধর্মের বিধিনিষেধ এবং রীতি নীতি সেই প্রতিনিধিকে বুঝিয়ে বলবেন। যাহোক, সেই দিনের সেই সম্মেলনে ম্রো প্রতিনিধি যথাসময়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। তিনি ছিলেন বৃদ্ধ, তাই তাঁর হেঁটে আসতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তিনি যখন পৌঁছালেন তখন দেখলেন সভাস্থান শূন্য। ইতোমধ্যে, ম্রোদের প্রতিনিধি উপস্থিত না হওয়ায়, সৃষ্টিকর্তা থুরাই একটি গরুকে ম্রো জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের ধর্মগ্রন্থটি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ধর্মগ্রন্থটি ছিল কলাপাতায় লেখা। গরুটি ধর্মগ্রন্থটি নিয়ে ম্রোদের কাছেই আসছিল, কিন্তু পথে তার খুব খিদে পাওয়ায় সে কলাপাতায় লেখা ধর্মগ্রন্থটি খেয়ে ফেলে। এর ফলে থুরাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া, ম্রোদের ধর্মগ্রন্থ তো বটেই, তাদের ভাষার লিখিত রূপ বা বর্ণমালাও হারিয়ে গেল।

এই পুরাণ অনুযায়ী গরুর কারণে ম্রোরা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হারিয়েছে বলে বিশ্বাস করে। আর যেহেতু ঐ হারানো ধর্মগ্রন্থটি লিখিত ছিল তাদের মাতৃভাষায়, তাই বর্তমানে তাদের মাতৃভাষার কোনো লিখিত রূপ বা বর্ণমালা নেই। শুধু তা-ই নয় গরুটি ম্রোদের কাছে এসে বলে যে থুরাই তাদের উপর অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়েছেন। কিন্তু, ম্রোরা পরবর্তীতে সৃষ্টিকর্তা থুরাইয়ের সাথে দেখা হলে সত্য ঘটনা জানতে পারে। সৃষ্টিকর্তা থুরাই মিথ্যা কথা বলার অপরাধে ম্রোদের গরুকে শাস্তি প্রদানের অনুমতি ও অধিকার দেন। তাই ম্রোদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো 'চিয়াছত পর'। এই উৎসবে ম্রোরা একটি গরুকে তাদের ধর্মগ্রন্থ খেয়ে ফেলার শাস্তি স্বরূপ সকলে মিলে হত্যা করে। এছাড়াও মিথ্যা বলে তাদের বিভ্রান্ত করার অপরাধে গরুটির জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়। ম্রোরা এই গরু হত্যা উৎসবটি করে থুরাইয়ের সন্তুষ্টি লাভের জন্য। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময় এই 'চিয়াছত পয়' উৎসবে গোহত্যা করা ছাড়াও, অসুস্থতা থেকে আরোগ্যলাভের জন্য বা কোনো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও তারা এই আচার-অনুষ্ঠানটি পালন করে।

অনুশীলন

কাজ- ১:

ধর্মীয় ভাবধারা ও বিশ্বাসের উপাদান কী কী?

কাজ- ২:

মিথ বা ধর্মীয় পুরাণ কাকে বলে?

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...