আদিকাল থেকেই মানুষ স্বাস্থ্য সমস্যা ও রোগব্যাধিকে জয় করার চেষ্টা করছে। যুগে যুগে বিভিন্ন সময়ে রোগের ধরন ও প্রকোপ যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত ও আধুনিক হয়ে উঠেছে চিকিৎসা পদ্ধতিও। তবে আধুনিক যুগে নানা ঔষধ ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের আগে মানুষকে রোগের চিকিৎসার জন্য লোকজ জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হতো। তারা বনের লতাগুল্ম, গাছ-গাছালির ছাল, পাতা ও ফলমূল, শেকড়-বাকড়, খনিজ দ্রব্যাদি, কীট-পতঙ্গ এবং নিজেদের ঘরে তৈরি পানীয় বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করত। কোনো গাছের বা দ্রব্যের কী ঔষধি গুণ আছে এবং কোন অসুখে তা ব্যবহার করতে হবে সেটি তারা ভালোভাবে জানত। কারণ প্রাকৃতিক বা ভেষজ ঔষধের ব্যবহার সম্পর্কে তাদের রয়েছে হাজার বছরের অভিজ্ঞতা এবং লোকজ চিকিৎসা জ্ঞান।
আধুনিক যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। চিকিৎসা পদ্ধতি সহজ ও উন্নত হয়েছে। আবার দেখা গেছে মানব দেহের উপর আধুনিক কিছু ঔষধের ক্ষতিকর প্রভাবও রয়েছে। শুধু তাই নয়, আধুনিক চিকিৎসা সেবা অনেকাংশে ব্যয়বহুল। আবার আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে কিংবা প্রত্যন্ত এলাকায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তির সুযোগ এখনও সীমিত। তাই ঐসব অঞ্চলের মানুষকে তাদের স্থানীয় ও লোকজ চিকিৎসা সেবার উপর অধিক নির্ভর করতে হয়। লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত উপকরণগুলো সহজলভ্য অর্থাৎ স্থানীয় পরিবেশ থেকে সহজেই সংগ্রহ করা যায়। লোকজ চিকিৎসা পদ্ধতির ভিত্তি হলো বিভিন্ন ঔষধি গাছ ও প্রাকৃতিক উপাদানের চিকিৎসা গুণ সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর রয়েছে এ বিষয়ে হাজার বছরের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। লোকজ চিকিৎসা পদ্ধতির জনপ্রিয়তার কিছু মৌলিক কারণ রয়েছে, যেমন (১) দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে এর সফলতা সম্পর্কে মানুষের আস্থা, (২) লোকজ চিকিৎসা সেবা ও জ্ঞান হলো স্থানীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, (৩) স্থানীয়ভাবে সহজেই ও স্বল্পমূল্যে লোকজ চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায়, (৪) আধুনিক চিকিৎসা সেবা স্থানীয়ভাবে কিংবা সবার জন্য সহজলভ্য নয়।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে নিজেদের তৈরি ঔষধ দিয়ে সফলতার সাথে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করা হয় যথা জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, জন্ডিস, সরীসৃপ ও অন্যান্য বিষাক্ত প্রাণীর দংশন, গুটিবসন্ত, জলবসন্ত, বাত, বদহজম, ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, পাইলস, নানা চর্মরোগ, খুসকি, স্ত্রীরোগ, বন্ধ্যাত্ব, ডায়াবেটিস, দন্তরোগ, কাঁটাছেঁড়া, মচকানো বা ভাঙা হাড়ের চিকিৎসা প্রভৃতি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে প্রচলিত চিকিৎসা সেবার একটি হলো লোকজ জ্ঞাননির্ভর ধাত্রীবিদ্যা। শিশুর জন্মের সময় নিবিড় তদারকি এবং নবজাতক ও প্রসূতি মাকে সেবা দানের জন্য তাদের সমাজে বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তি রয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের কোনো সুযোগ হয়তো তাদের অনেকের জীবনে ঘটেনি। সেক্ষেত্রে প্রকৃতিই তাদের আদর্শ শিক্ষক। তারা সাধারণত হয়ে থাকেন বয়স্ক নারী এবং তাদের একটি নির্দিষ্ট পদবিও থাকে। যেমন চাকমা সমাজে ধাত্রীবিদ্যার কাজ যারা করেন তারা 'ওঝা' নামে পরিচিত। মণিপুরী সমাজে তাদেরকে ডাকা হয় 'মাইবি' নামে। এছাড়াও রয়েছেন বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রতিকার সম্পর্কে প্রাচীন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ স্থানীয় কবিরাজগণ। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে ও গবেষণার মাধ্যমে লোকজ চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নয়ন ঘটানো গেলে দেশের জন্য তা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
নিচে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কয়েকটি চিকিৎসা প্রণালি উল্লেখ করা হলো
রোগের নাম | ঔষধ তৈরির বনজ উপকরণ | প্রস্তুত প্রণালি ও ব্যবহার |
জন্ডিস | (১) মোরমোচ্যা আমিল্যা (লতা জাতীয় এক ধরনের টক পাতা যা পার্বত্য এলাকার জঙ্গলে পাওয়া যায়)। | প্রথমে দুইটি উপকরণ ভালোভাবে ধুয়ে বেছে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এরপর পরিমাণ মতো লবণ ও পানি মিশিয়ে সেগুলো ভালোভাবে সেদ্ধ করতে হবে। এসময় কাঠি দিয়ে নেড়ে ফুটন্ত উপকরণগুলো একসাথে গুলিয়ে নিয়ে স্যুপ তৈরি করতে হবে। স্যুপটা কুসুম গরম অবস্থায় দিনে কয়েকবার খেতে হবে। |
বাচ্চাদের সর্দি-কাশি | থোরা গাছের মূল ও পাতা, কুরা চিত শাক এবং লোহার জারণ। | উপকরণগুলো একসঙ্গে বেটে রস আগুনে পোড়ানো লাল লোহার সেঁকা দিয়ে গরম করে নিতে হবে। এরপর প্রতি বার ১/২ ছটাক পরিমাণ সেবন করতে হবে। |
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজ চিকিৎসা জ্ঞান কেন গুরুত্বপূর্ণ? নিজের মতামত দাও। |
| কাজ- ২: | ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে ভেষজ ঔষধ তৈরির জন্য সাধারণত কী কী উপকরণ ব্যবহৃত হয়? |
Read more