ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র (পাঠ ৬ ও ৭)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচিতি - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

286

পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। এগুলো তারা দীর্ঘদিন ধরে বংশ পরম্পরায় চর্চা করে থাকেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি তথা জীবনাচরণের প্রধান দিক এটি। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে ঐতিহ্যময় সংগীত ও নানা রকম বাদ্যযন্ত্র। এখানে কয়েকটি নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও কিছু বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ করা হলো-

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগীত প্রধানত লোকসংগীত। এটি শুধু জনপ্রিয়ই নয়, এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তাদের সরল-সাধারণ জীবনের আলেখ্য। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মান্দিদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনের ঐতিহ্য রয়েছে। তাদের একটি উল্লেখযোগ্য সংগীত হচ্ছে 'রে রে'। এটি তাৎক্ষণিক কথা ও সুরের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই দক্ষ 'রে রে' কার অনায়াসে এ গান করতে পারেন।

পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চাকমাদের সংগীত অন্যান্যদের মতোই যথেষ্ট সমৃদ্ধ, বিশেষ করে গ্রাম্য কবিদের রচিত ও পরিবেশিত গান। চাকমা ভাষায় গানকে গীত বলে। যারা এ গান করেন তাদেরকে গেংখুলি বলে। গেংখুলি হচ্ছে চারণকবি বা পালাগানের গায়ক। বিভিন্ন উৎসবে এরা গান করে থাকে। তঞ্চঙ্গারা তাদের নিজস্ব গান বলতে উভাগীতকে বোঝায়, এর আরেক নাম সাপ্পেগীত। উভাগীত-এর সুরে পুরুষ বাঁশি বাজায় আর নারীরা খেংগ্রং নামক বাঁশের ফালি দিয়ে তৈরি এক প্রকার মাউথ-অর্গান বাজায়। চাকমারা নিজেদের ভাষায় বিভিন্ন উৎসব ও শোক-অনুষ্ঠানে গান করে থাকে। গান হচ্ছে- ছিকাং। বিষ্ণুপ্রিয়া এবং মৈতৈ মণিপুরীদের সংস্কৃতির অন্যতম দিক হচ্ছে গান, নাটক ও নৃত্য। বৈষ্ণবধর্মাবলম্বী বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের প্রাণের সংগীত হচ্ছে কীর্তন। বিষ্ণুপ্রিয়া এবং মৈতৈ উভয় সম্প্রদায়ই মণ্ডপে বিভিন্ন পর্ব-উৎসবে গান করে থাকে।

ত্রিপুরাদের সংগীত যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সংগীত বলতে তারা মূলত নৃত্য, গীত ও বাদ্যকে বোঝায়। ত্রিপুরাদের সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রকৃতি ও জীবন-জীবিকার সঙ্গে একাকার হওয়া। এক সময়ে ত্রিপুরার রাজ দরবারে ভারতবর্ষের খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞদের স্থান হয়েছিল। রাজা ধনমানিক্যও ছিলেন কীর্তিমান শিল্পী। একটি ত্রিপুরা ভাষায় দেশাত্ববোধক গান বঙ্গানুবাদসহ দেওয়া হলো:

বাংলা আনি আচাইম:নি-হাবাংলা আমার জন্মভূমি দেশ
বাংলা আনি আচাইম:নি-হা
বাংলা আনি স্বাধীন খাইম:হা
বাংলা আনি খঃফুমঃনি
কচাংফ: কচাংয়া তুংফ: তুংয়া
তংথাওম:নি হা চামুং কপুংহা
নাই থাওম:নিহা।।
র:নি হাবা: বাই র:নি নোবা: বাই
বাংলা আমা আংন আঃচাই রৈ মি:
বাংলা হামা:ন কংয়ে মাঁতং ঐ।।
আ:রু বাই তাংমুং তৈমুং বাই
বাওহা খাইয়ে মিলি তং ঐ
বাংলা হামা:লে মখানি আরুদৈ
চুংমঃনি আঃরুদৈ।।
বাংলা আমার জন্মভূমি দেশ
বাংলা আমার স্বাধীন একটি দেশ
বাংলা আমার প্রাণের প্রিয় দেশ
গরমও নয় ঠান্ডাও নয়, মনের মতো দেশ
থাকতে যেমন ভালো লাগে
দৃশ্যও তেমনি মনোহরা।।
শস্য ভরা আমার এই দেশ, এখানেতে আলো বাতাস
বাংলা মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন
আমি বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাই নতশিরে।।
এদেশেতে যেমন ঋতু,
খাদ্যশস্য তেমন দিত
বাংলা আমার মনের রুচির দেশ
বাংলা আমার মনের মতো দেশ।।

মারমাদের সংগীত ও গীতিনাট্যের ধারা বেশ প্রাচীন। এগুলো বেশ কয়েকটি ধারায় বিভক্ত। যেমন- কাপ্যা, চাগায়াং, সাখ্রাং, লাঙা, লুংদি প্রভৃতি। এখানে সাম্প্রতিক সময়ের একটি মারমা দেশাত্ববোধক গান বাংলা অনুবাদসহ দেওয়া হলো:

তং জইং পাইরো গা হিবারেপাহাড় আছে চারিদিকে
তং জইং পাই রো গাহিবারে
রে গে খ্যং কাহ্ রো লখারে
তং খ্যং স্রং ছিহ্ পাইরো হিরে
রোয়াদম্রোহ্ সায়া হলো বারে।
বাংলাদেশ অক্যোয়াইরো প্রে ফ্রইতে
দে প্রেমা ইখ্যাই নিহ্ গাইতে
লুখি লুঙে চু: রো পং রো
দে প্রে গো হলো য়ং লোককাইমে।।
ভাঁকসে আসাইং গা নিং থোয়কতে
স্রাক্ পাংতি ঙোয়েরং তক্কিরে
দে প্রে লু: চইক খইং মারে
যাখা মোছে আসাক্কো চোয়েং নন্থইরে।।
পাহাড় আছে চারিদিকে
শংখ নদী নেচে গেছে
নদী-নালা-ঝরণা গান করে
সবুজ এই বান্দরবানে।
মোদের দেশ বাংলাদেশ
সুখে-দুঃখে আছি মিশে
হাতে হাত রাখি সকলে
দেশের উন্নতির কাজে।।
পাখির ডাকে সূর্য উঠে
ঘাসগুলো রূপালি সাজে
রক্ষা করব এ দেশের মান
যায় যদি যাক প্রাণ।।

ওরাঁওদের বড় উৎসব হচ্ছে কারাম। সে উৎসবে তারা একটি গান করে- ভাই হারানোর গান, বেদনার গান। এখানে সাদরি ভাষার এ গানটি দেওয়া হলো-

খুদিয়াই চুনিয়াই পোষালা ভাইয়ারে
ভাইয়া মোরা গেলেই পরদেশা
একে গোটা পিতারকা ভাইয়ারে
ভাইয়া মোরা গেলেই পরদেশা।
আনাহু পাইব ধানাহু পাইব
পিঠাসানা ভাইয়া কাহা পাইব হো
কানাকা সোনাওয়া পিতারকা ভাইয়ারে
ভাইয়া মোরা গেলেই পরদেশা হো...।

ভাবার্থ: চালের খুদ দিয়ে ভালোবেসে কত কষ্ট করে মানুষ করেছি আমার ভাইটাকে, সে ভাই আজ অন্যদেশে গেল। পিতলের মতো একটাই আমার ভাই। ধান, চাল, টাকা, পয়সা সবই পাবো কিন্তু কানের সোনার মতো মায়ের পেটের যে ভাই দেশ ছেড়ে গেল তারে কোথায় পাই?

বাদ্যযন্ত্র: ওরাঁওরা নাচ-গান-বাজনার প্রতি খুবই আগ্রহী। তাঁদের সমাজের অধিকাংশ পরিবারেই সংগীত পরিবেশন এবং নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রের সংরক্ষণ লক্ষ করা যায়। এঁরা সাধারণত নিজ হাতে তৈরি করে এসব বাদ্যযন্ত্র এবং এগুলো বৈচিত্র্যময়। এদেশের প্রায় সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে থাকে। ওরাঁও সমাজে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঢোল, মাদল, বাঁশি, তাল, নাগারা, খঞ্জনী, ঘুটুর প্রভৃতি। এগুলো সাধারণত এরা বিভিন্ন উৎসবে ব্যবহার করে থাকে। অবশ্য বছরের অন্যান্য সময়েও ওরাঁওরা নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে তবলা ও হারমোনিয়ামও ব্যবহার করে থাকে।

পাংখোরা বেশকিছু বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে থাকে। এগুলো তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। সিয়াল রাকি (গয়ালের সিং), ডারসন (পিতলের ঘন্টা), ডারপুই (বড় ঘন্টা), খোয়াং (গাছের কাঠের তৈরি ঢোল), রুয়া খোয়াং (বাঁশের ঢোল) এবং থেই খাং (কৌটার আকৃতি বাঁশের বাদ্যযন্ত্র)। চাকমাদের বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, বাঁশি, ডগর, সারিন্দা, তাক প্রভৃতি। রাখাইন-মারমাদের মধ্যে অনেক ধরনের ঢোলের প্রচলন রয়েছে। যেমন- ছেইন-ওয়েইন বা গোলাকার ঢোল, ক্যে-ওয়েইন বা পেটা ঘড়ির আকৃতির ঢোল, পেট-মাহ সবচেয়ে বড় ঢোল প্রভৃতি।

অনুশীলন

কাজ- ১ :

রে রে' সংগীত কাদের? এটি কীভাবে করা হয়?

কাজ- ২ :

উভাগীত ও খেংগ্রং কী?

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...