পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ (পাঠ ১০)

জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

175

সমগ্র পৃথিবী জুড়েই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রকৃতির কাছাকাছি বসবাস করে। প্রকৃতির সাথে এদের জীবনধারা ও জীবিকার রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। হাজার বছর ধরে প্রকৃতির সাথে নিবিড় ও পরিপূরক সম্পর্ক রেখে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা সংরক্ষণ করেছে প্রকৃতিকে এবং রক্ষা করেছে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যসহ এই পৃথিবীকে রক্ষার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বংশ পরম্পরায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীও এর ব্যতিক্রম নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো সরকারের বিভিন্ন বিভাগের নানা কার্যক্রমের পাশাপাশি নিজেদের সাধ্যমতো প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করে চলেছে। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক নানা অস্থিরতার মাঝেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে রক্ষার জন্য গ্রাম ভিত্তিক সামাজিক বনায়নের কাজ করছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গ্রাম ভিত্তিক সামাজিক বন (Village Common Forest বা VCF) হলো জীববৈচিত্র্যকে রক্ষার সনাতনী পদ্ধতি। সমষ্টিগত মালিকানা এসব বনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সংশ্লিষ্ট গ্রাম বা সম্প্রদায়ের সদস্যরা সামাজিক গ্রাম বন থেকে ভেষজ ঔষধপত্র, কাঠ, বাঁশ, বেতসহ জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ সংগ্রহ করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো এসব বন যুগ যুগ ধরে সংরক্ষণ করে আসছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের গ্রামগুলোর চারপাশে গ্রামবাসী মিলে বনায়ন করে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে থাকে। এই ধরনের বনকে গ্রাম ভিত্তিক সামাজিক বন বলা হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রথাগত আইন দ্বারা এসব বন পরিচালিত হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অনুকূল সরকারি নীতিমালার অভাবে এসব বনের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কয়টি গ্রাম ভিত্তিক সামাজিক বন টিকে আছে সেগুলোর মোট পরিমাণ আনুমানিক ২০২ হেক্টর।

পার্বত্য চট্টগ্রামের গ্রামভিত্তিক সামাজিক বনগুলোতে গড়ে ১৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৬০ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। এক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলের গ্রাম ভিত্তিক সামাজিক বনগুলো পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

গ্রামভিত্তিক সামাজিক বন ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের প্রতিদিনের জীবনচর্চায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করছে। যেমন, জুমচাষের সময় তারা বিশেষ কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলে। নির্দিষ্ট কিছু গাছপালা, ঔষধি বৃক্ষ বা বন্যপ্রাণীকে ধ্বংস না করে তারা বরং এদেরকে বাঁচিয়ে রাখে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য। বনজ সম্পদ আহরণের বেলায়ও তারা ঋতুভেদ মেনে চলে। কোন ঋতুতে কোন জিনিসটি আহরণ করা যাবে না এবং কোনটি করা যাবে, সে বিষয়ে কিছু প্রথাগত বিধিনিষেধ তাদেরকে মেনে চলতে হয়। উদ্ভিদ এবং প্রাণী উভয়ের জন্যই এসব রীতিনীতি প্রযোজ্য।

বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকা রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে ঘোষণা করেছে। সাধারণভাবে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এই তিন জেলায় বিভিন্ন শ্রেণির সম্মিলিত বনের পরিমাণ হলো ১০,৯৯,৫৮৪ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ৩,৩৪১৬০ হেক্টর বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরক্ষিত বনাঞ্চল যা পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আয়তনের এক চতুর্থাংশ। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা এই বনাঞ্চল রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট রয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলে রয়েছে বন্যপ্রাণীর জন্য দু'টি অভয়ারণ্য। এর একটি রাঙামাটি জেলার কাসালং রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকার পাবলাখালিতে অবস্থিত। এই অভয়ারণ্যটি ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার আয়তন ৪২,০৬৭ হেক্টরের বেশি। অন্যটি হলো রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামপাহাড়-সীতাপাহাড় জাতীয় উদ্যান। এটির আয়তন ৩,০২৬ হেক্টর। তবে প্রয়োজনীয় তদারকি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে সরকারের এসব সংরক্ষিত বনভূমি এবং অভয়ারণ্য ক্রমে উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

অনুশীলন
কাজ- ১:পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রক্রিয়া বর্ণনা করো।
কাজ- ২:পার্বত্য চট্টগ্রামে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরকারের ভূমিকা কী?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...